জুম্’আর খুতবা

অধ্যক্ষ মাওলানা মুহাম্মদ বদিউল আলম রিজভি

শুক্রবার , ১৫ মার্চ, ২০১৯ at ১০:২৩ পূর্বাহ্ণ
71

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, আমরা তাঁরই গুণগান করছি। তাঁরই সাহায্য প্রার্থনা করছি। তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি। তাঁর সমীপে তাওবা করছি। আমাদের আত্মার অনিষ্টতা হতে আলস্নাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি। আলস্নাহ যাকে হিদায়ত করেন কেউ তাকে পথভ্রষ্ট করতে পারে না। আলস্নাহ যাকে গোমরাহ করেন, কেউ তাকে হিদায়ত করতে পারে না। আমি সাক্ষয দিচ্ছি যে, আলস্নাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই, তিনি একক ও অদ্বিতীয় তাঁর কোন অংশীদার নেই। আরো সাক্ষয দিচ্ছি যে, আমাদের সর্দার আমাদের মহান নবী, আমাদের অভিভাবক হযরত মুহাম্মদ সালস্নালস্নাহু আলাইহি ওয়াসালস্নাম তাঁর প্রিয় বান্দা ও প্রিয় রাসূল। তাঁর উপর দরুদ সালাম বর্ষিত হোক। তাঁর পবিত্র বংশধরগণ সম্মানিত সাহাবাগণ নিষ্ঠার সাথে কিয়ামত অবধি তাঁর অনুসারীদের প্রতি করুণাধারা বর্ষিত হোক।
আম্মাবাদ: সম্মানিত মুসলিম ভাইয়েরা! আলস্নাহ তা’য়ালাকে ভয় করুন! বিশ্বাস করুন যে, আলস্নাহতা’য়ালা তাঁর সৃষ্টিরাজির মধ্যে হিকমতপূর্ণ মহিমায় শ্রেষ্ঠত্ব দান করেন। আপনারা অবগত আছেন যে, আলস্নাহতা’য়ালা কতেক মাস, দিন ও রজনী সমূহকে কতেক মাস দিন ও রজনীর উপর ফজিলত দান করেছেন। মহান আলস্নাহতা’য়ালা পবিত্র কুরআন মজীদে এরশাদ করেছেন। “ নিশ্চয়ই আকাশম-লী ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন হতেই আলস্নাহর বিধানে আলস্নাহর নিকট গণনার মাস বারটি, তন্মধ্যে চারটি নিষিদ্ধ ” (সূরা: ৯, তাওবা পারা:১০, আয়াত: ৩৬)
নিষিদ্ধ মাস সমূহ যথাক্রমে জিলক্বদ, জিলহজ্ব, মহররম তিনটি সংযুক্ত, অপরটি রজব। যেটি জমাদিউস সানী ও শাবান মাসের মধ্যবর্তী মাস। আজকের দিনে আমরা ইসলামী হিজরি সনের একটি নতুন মাসে পদার্পণ করেছি, যেটি হলো চন্দ্র মাস। যে মাসগুলোকে আলস্নাহ তা’য়ালা সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্য সময় নির্ধারণী মাস হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। আলস্নাহ তা’য়ালা এরশাদ করেছেন “ লোকেরা আপনাকে নবচন্দ্র সম্বন্ধে প্রশ্ন করে আপনি বলুন: তা হচ্ছে মানুষ এবং হজ্বের জন্য সময় নির্দেশক।
হাদীস শরীফের আলোকে রজব মাসের গুরুত্ব:
রজব মাসের গুরুত্ব সম্পর্কে অসংখ্য হাদীস শরীফ এরশাদ হয়েছে। নিম্নে কয়েকটি হাদীস শরীফ উপস্থাপন করা হলো:
১.হযরত ইকরামা (রা.) হযরত আবদুলস্নাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, প্রিয় নবী সালস্নালস্নাহু আলাইহি ওয়াসালস্নাম এরশাদ করেছেন, রজব আলস্নাহর মাস, শাবান আমার মাস, রমজান আমার উম্মতের মাস। (গুনীয়াতুত তালেবীন, পৃ: ২৫০)
হযরত মুসা বিন ইমরান (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আনাস বিন মালেক (রা.) কে বলতে শুনেছি, প্রিয়নবী সালস্নালস্নাহু আলাইহি ওয়াসালস্নাম এরশাদ করেছেন, জান্নাতে একটি স্রোতস্বীনি রয়েছে যার নাম রজব, যার পানি দুধের চেয়ে সাদা মধুর চেয়ে মিষ্ট, যে ব্যক্তি রজব মাসে কোন একদিন রোজা রাখবে আলস্নাহ তায়ালা তাকে সে নহর থেকে পানি পান করাবেন। (গুনীয়াতুত তালেবীন, পৃ: ২৫৬)
রজব শব্দের তাৎপর্য :
অলীকুল সম্রাট শায়খ সৈয়দ আবদুল কাদের জিলানী (র.) স্বীয় রচিত “গুনীয়াতু লেতালিবে তরিবীল হক্ক” কিতাবে উলেস্নখ করেন, আরবী ‘রজব’ তিনটি বর্ণের সমষ্টি। রা, জীম,বা, আরবি ‘রা’ বর্ণ দ্বারা আলস্নাহর রহমত উদ্দেশ্য। ‘জীম’ বর্ণ দ্বারা জুদুলস্নাহ, আলস্নাহর দান। ‘বা’ বর্ণ দ্বারা “বিররুলস্নাহ” তথা আলস্নাহর পুণ্য বুঝানো হয়েছে। এ মাসের শুরু থেকে শেষ পর্যনত্ম আলস্নাহর পক্ষ থেকে বান্দার জন্য তিনটি উপহার রয়েছে শাসিত্ম ব্যতিরেকে রহমত প্রাপ্তি। অকৃপণভাবে আলস্নাহর দান প্রাপ্তি, ক্রোধ ব্যতিরেকে পুণ্য প্রাপ্তি।
রজব হচ্ছে তাওবার মাস। শাবান হচ্ছে স্রষ্টা ও সৃষ্টির প্রতি ভালবাসার মাস। রমজান স্রষ্টার নৈকট্য অর্জনের মাস। আরো উলেস্নখ রয়েছে, রজব ইবাদতের মাস, শাবান খোদাভীতি ও তাকওয়া অর্জনের মাস, রমজান অধিক হারে পূণ্য অর্জনের মাস।
হযরত জুননুন মিসরী (র.) বলেন, রজব হচ্ছে বীজ বপনের মাস, শাবান পানি সেচনের মাস, রমজান ফসল কাটার মাস। সুতরাং যে ব্যক্তি রজব মাসে ইবাদতের বীজ বপন করল না শাবান মাসে আলস্নাহর ভয়ে অশ্রু বিসর্জন দিয়ে পানি সেচন করল না, সে কিভাবে রমজান মাসে রহমতের ফসল কাটতে পারবে?
ওহে আলস্নাহর বান্দাগণ! জেনে রাখুন! রজব মাস হচ্ছে বরকতের প্রথম মাস। এটা এমন মাস যে মাসে পুণ্য ও বরকত বৃদ্ধি পায়, এটা ক্ষমা প্রার্থনা ও গুনাহ অর্জনের মাস। আলস্নাহর ভীতি অর্জন সাধনা ও অনুশোচনার মাস।
হযরত সাওবান (রা.) থেকে বর্ণিত, প্রিয়নবী সালস্নালস্নাহু আলাইহি ওয়াসালস্নাম এরশাদ করেছেন, কোন মুসলমান নর-নারী যদি রজব মাসে একদিন সিয়াম পালন করে, রজনীতে ইবাদতরত থেকে আলস্নাহর সন্তুষ্টি কামনা করে আলস্নাহতা’য়ালা তাঁকে পূর্ণ এক বৎসর দিনে রোজা ও রাত্রে জাগ্রত থেকে ইবাদত করার সমপরিমাণ সওয়াব দান করবেন।
অন্য মাসের উপর রজব মাসের ফজিলত :
হযরত আনাস ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত, প্রিয় নবী সালস্নালস্নাহু আলাইহি ওয়াসালস্নাম এরশাদ করেছেন, সকল মাসের উপর রজব মাসের শ্রেষ্ঠত্ব তদ্রুপ যেমন পবিত্র কুরআনের ফজিলত সকল কিতাবের উপর। শাবান মাসের ফজিলত সকল মাসের উপর তদ্রুপ যেমন আমি নবীর শ্রেষ্ঠত্ব সকল নবীদের উপর। রজমানের ফজিলত সকল মাসের উপর তদ্রুপ যেমন আলস্নাহর শ্রেষ্ঠত্ব সমগ্র সৃষ্টিরাজির উপর। (গুনীয়াতুত তালেবীন, পৃ: ২৬৩)
প্রত্যেক সৃষ্টির চার সৃষ্টি আলস্নাহর নির্বাচিত :
আলস্নাহ তা’য়ালা এরশাদ করেছেন তোমার প্রতিপালক যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন এবং যাকে ইচ্ছা মনোনীত করেন। (সূরা: ২৮ কাসাস, পারা: ২০, আয়াত: ৬৮)
আলস্নাহ প্রত্যেক সৃষ্টির চারটি মানোনীত করেছেন। ফেরেস্তাদের মধ্যে মনোনীত,জিব্রাইল মিকাঈল, ইসরাফিল ও আজরাঈল আলাইহিমুস সালাম। তাঁদের মধ্যে জিব্রাইল (আ:)কে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন।
সম্মানিত নবীগণের মধ্যে চারজন। হযরত ইবরাহীম (আ:) হযরত মুসা (আ:) হযরত ঈসা (আ:) ও হযরত মুহাম্মদ সালস্নালস্নাহু আলাইহি ওয়াসালস্নাম। এ চারজনের মধ্যে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ সালস্নালস্নাহু আলাইহি ওয়াসালস্নামকে সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হিসেবে মনোনীত করেছেন।
সাহাবাদের মধ্যে মনোনীত চারজন। হযরত আবু বকর (রা.), হযরত ওমর (রা.), হযরত ওসমান (রা.) ও হযরত আলী (রা.), তাঁদের মধ্যে হযরত আবু বকর কে শ্রেষ্ঠ করেছেন।
মসজিদগুলোর মধ্যে চারটি। মসজিদুল হারাম, মসজিদুল আকসা, মসজিদে নববী শরীফ ও মসজিদে তুরেসীনা। তন্মধ্যে মসজিদুল হারামকে শ্রেষ্ঠ করেছেন।
দিবসের মধ্যে চারটি। ঈদুল ফিতর, ঈদুল আযহা, আরাফাত দিবস ও আশুরা দিবস। তন্মধ্যে আরাফাত দিবসকে শ্রেষ্ঠ দিবস করেছেন। পুন্যময় রজনীর মধ্যে চারটি। লায়লাতুল বারাত, লায়লাতুল কদর, লায়লাতুল জুমআহ, লায়লাতুল ঈদ। তন্মধ্যে লায়লাতুল কদরকে শ্রেষ্ঠ করেছেন।
মাসসমূহের মধ্যে চারটি। রজব, শাবান, রমজান, মহররম তন্মধ্যে শাবান মাসকে মহিমান্বিত করেছেন।
দুআ কবুল হওয়ার পাঁচ রজনী :
সম্মানিত মুসলস্নীবৃন্দ ! জেনে রাখুন পাঁচ রজনীতে দুআ ফেরত হয়না। হযরত আবদুলস্নাহ ইবনে ওমর (রা.) হতে বর্ণিত, প্রিয়নবী সালস্নালস্নাহু আলাইহি ওয়াসালস্নাম এরশাদ করেছেন, পাঁচ রজনীর দুআ আলস্নাহ ফেরত দেন না। ১. জুমার রজনী, ২. রজব মাসের প্রথম রজনী, ৩. শাবান মাসের পনের তারিখ দিবাগত রজনী, ৪. ও ৫. দু ঈদের ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার রজনী। (সূত্র: ইমাম আবদুর রাজ্জাক মুসান্নাফ, হাদীস নং : ২৯২৭)
হযরত আবু উসামা (রা.) থেকে বর্ণিত, প্রিয়নবী সালস্নালস্নাহু আলাইহি ওয়াসালস্নাম এরশাদ করেছেন, পাঁচ রজনীর দুআ আলস্নাহ ফেরত দেন না। ১. রজবের প্রথম রাত, ২. বরাতের রাত, ৩. জুমার রাত, ৪ ও ৫. ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার রাত। (ইবনে আসাকির, “তারিখে দামেস্ক” ১০/৪০৮ পৃষ্ঠা, হাদীস নং: ৯৬৮)
২৭ রজব পুণ্যময় আমলের ফজিলত :
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নূর নবীজি সালস্নালস্নাহু আলাইহি ওয়াসালস্নাম এরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি রজব মাসের ২৭ তারিখ রোজা পালন করল, ষাট মাস রোজা রাখার সওয়াব তার আমল নামায় লিপিবদ্ধ করা হবে। ২৭ রজব মিরাজ রজনী: এ মাসের ২৭ তম রজনীতে মিরাজুন্নবী সালস্নালস্নাহু আলাইহি ওয়াসালস্নাম সংঘটিত হয়েছে। এ রজনীতে সৎকর্ম করা মুসলিম সমাজের প্রচলিত আমল। (তাফসীরে রুহুল বয়ান ৫ম খন্ড পৃ: ১০৩)
উপমহাদেশের বিখ্যাত হাদীস বিশারদ হযরত আবদুল হক মুহাদ্দিস দেহলভী (রা.) প্রণীত “মাসাবাতা বিসসুন্নাহ” কিতাবে উলেস্নখ করেন। জেনে রাখুন! আরবদেশের জনগণের মাঝে এ কথা প্রসিদ্ধ যে, রজব মাসের ২৭ তারিখ রজনীতে নবীজির মিরাজ সংঘটিত হয়েছে উক্ত রজনীতে মিরাজুন্নবী উদযাপন করার প্রথা আরব দেশের মুসলমানদের নিকট প্রসিদ্ধ। (মাসাতা বিসসুন্নাহ, পৃ: ১৯১)
রজব মাসে নবীজি দু হাত মুবারক তুলে নিম্নরূপ দুআ করতেন, আলস্নাহুম্মা বারিক ফী রাজবাও ওয়াশাবান ওয়াবালিস্নগনা ইলা রমদানা। অর্থ: হে আলস্নাহ আমাদের রজব ও শাবান মাসে বরকত দান করুন এবং রমজান পর্যনত্ম আমাদের পৌছায়ে দিন।
হে আলস্নাহ আমাদেরকে তাওবাকারী ও পবিত্রতা অবলম্বনকারীদের অনত্মর্ভুক্ত করুন এবং তোমার পুণ্যবান মকবুল বান্দাদের দলভুক্ত করুন। তোমার নৈকট্যধন্য আউলিয়া কেরামের অনুসারী করুন। আলস্নাহ আমাদের সকলকে কুরআনের বরকত দান করুন। কুরআনের আয়াত ও প্রজ্ঞাপূর্ণ উপদেশ দ্বারা আমাদের নাজাত দান করুন। আমি বিতাড়িত শয়তানের অনিষ্টতা হতে আলস্নাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি। মহান আলস্নাহতা’য়ালা এরশাদ করেছেন “ নিশ্চয়ই আকাশম-লী ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন হতেই আলস্নাহর বিধানে আলস্নাহর নিকট গণনার মাস বারটি। তন্মধ্যে চারটি নিষিদ্ধ। (সূরা: ৯, তাওবা, পারা: ১০, আয়াত: ৩৬) আমীন বেহুরমাতি সৈয়্যদিল মুরসালীন সালস্নালস্নাহু আলাইহি ওয়ালিহি ওয়াসালস্নাম।
লেখক : খতীব, কদম মোবারক শাহী জামে মসজিদ

x