জুম্’আর খুতবা

অধ্যক্ষ মাওলানা মুহাম্মদ বদিউল আলম রিজভি

শুক্রবার , ১২ জুলাই, ২০১৯ at ৮:০০ পূর্বাহ্ণ
65

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি স্বীয় বান্দাদের উপর বায়তুল্লাহ শরীফের হজব্রত পালন ফরজ করেছেন, এ পুণ্যময় কাজ সম্পাদনকারীকে অপরিসীম সওয়াব ও পুরস্কার দানে ধন্য করেছেন। যে বান্দা অশ্লীলতা ও পাপমুক্ত হয়ে হজ আদায় করলো, সে যেন নবজাত শিশুর মত নিষ্পাপ ফিরে এলো। পাপ পঙ্কিলতা ও গুনাহ থেকে সে যেন পবিত্রতা অর্জন করলো। আল্লাহর দরবারে কবুলকৃত হজের জন্য শান্তি নিকেতন জান্নাতই তাঁর একমাত্র পুরস্কার। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই, তিনি একক, অদ্বিতীয়, তাঁর কোন অংশীদার নেই। যিনি মহিমাময় ও মহানুভব। আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আমাদের সর্দার আমাদের মহান নবী অভিভাবক হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর প্রিয় বান্দা ও প্রিয় রাসূল। নামায, রোজা, হজ যাকাতসহ শরয়ী বিধান বাস্তবাবায়নে যিনি সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বোত্তম আদর্শ। তাঁর উপর দরুদ-সালাম বর্ষিত হোক, তাঁর পবিত্র বংশধরগণ, সম্মানিত সাহাবাগণ, কিয়ামত অবধি নিষ্ঠার সাথে তাঁর পদাঙ্ক অনুসারীদের প্রতি অসংখ্য করুণাধারা বর্ষিত হোক।
হে মানব মণ্ডলী! আল্লাহতা’য়ালাকে ভয় করুন, আল্লাহর ঘর পর্যন্ত পথ গমনে সামর্থবান আল্লাহ কর্তৃক ফরজকৃত হজব্রত পালন করুন, এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহতা’য়ালা পবিত্র কুরআন মজিদে হজের বিধান ঘোষণা করেছেন।
পবিত্র কুরআনের আলোকে হজের গুরুত্ব: “এরশাদ হয়েছে এবং আল্লাহর জন্য মানবকুলের উপর বায়তুল্লাহর হজ ফরজ, যার তথায় পৌছার সামর্থ রয়েছে। তবে নিশ্চয় আল্লাহতায়ালা সকল সৃষ্টি হতে অমুখাপেক্ষী।” (সূরা: আল ইমরান, আয়াত: ৯৭)
হজের বিধান প্রসঙ্গে আল্লাহতা’য়ালা আরো এরশাদ করেছেন “এবং মানুষের মধ্যে হজের জন্য ঘোষণা প্রচার কর, তারা তোমার কাছে আসবে পায়ে হেঁটে এবং সর্বপ্রকার কৃশকায় উটের পিঠে সওয়ার হয়ে, দূর-দূরান্ত থেকে” (সূরা: হজ আয়াত: ২৭)
আয়াতের প্রাসঙ্গিক তাফসীর হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, আল্লাহ কর্তৃক হজ ফরজ হওয়ার ঘোষণা প্রচার করার জন্য যখন হযরত ইবরাহীম (আ:) আদিষ্ট হন, তিনি আল্লাহর দরবারে আরজ করলেন, এখানে তো জনমানব শূন্য প্রান্তর। এখানে আমার আহবান কে শুনবে। যেখানে মানব জাতির বসতি আছে সেখানে আমার আহবানের ঘোষণা কিভাবে পৌছবে? আল্লাহ বললেন ঘোষণা করা তোমার দায়িত্ব বিশ্বের সর্বত্র এ ষোষণা পৌছানো আমার দায়িত্ব। হযরত ইবরাহীম (আ.) মকামে ইবরাহীমে দাড়িয়ে ঘোষণা দিলে আল্লাহ এ ঘোষণা পৃথিবীর সর্বত্র পৌছিয়ে দেন। তখনকার জীবিত মানুষও কিয়ামত পর্যন্ত আগমনকারী সকলের কানে এ আওয়াজ পৌছি দেয়া হয়। যাদের তাকদীরে হজ-পালন রয়েছে তাঁর প্রত্যেকেই লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক বলে সাড়া দিয়েছে। দুনিয়াতে তাদের হজ নসীব হবে। (তাফসীরে কুরতুবী, আযহারী)
হজের অর্থ ও শরয়ী সংজ্ঞা: হজ শব্দের আভিধানিক অর্থ হল সাধারণ ইচ্ছা করা, সম্মানিত বস্তুর প্রতি ইচ্ছা করা, শরয়ী পরিভাষায় হজ হচ্ছে “সম্মানের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে বায়তুল্লাহ শরীফের যিয়ারতের ইচ্ছা পোষণ করাকে হজ বলা হয়। হজের ফরজ তিনটি: ১. ইহরাম বাঁধা, ২. ৯ই জিলহজ আরাফাত ময়দানে অবস্থান করা, ৩. তাওয়াফে যিয়ারত করা। ১০ই জিলহজ থেকে ১২ জিলহজের সূর্যাস্তের পূর্বেই কাবা শরীফে গিয়ে তাওয়াফে যিয়ারত অবশ্যই সম্পন্ন করতে হবে।
হজ ও ওমরা করার ইচ্ছা করলে ইহরাম পরিধান করা ফরয। ইহরাম ছাড়া হজ বা ওমরা হবে না। ইহরাম পরিধান করে শুধু হজের নিয়তকারী হজকারীগণ নিম্নরূপ নিয়ত করবেন:
“আল্লাহুম্মা ইন্নী উরিদুল হাজ্বা ফা ইয়াচ্ছিরহু লী ওয়া তাক্বাব্বালহু মিন্নী” অর্থ:- হে আল্লাহ আমি হজের নিয়ত করছি, তুমি আমার জন্য তা সহজ সাধ্যকর এবং আমার পক্ষ থেকে কবুল কর। ইহরামের কাপড় পরিধান করে দুই রাকাত সুন্নাত ইহরাম নামায পড়বেন, নামায শেষে পুরুষগণ মাথার টুপি খুলে রেখে উচ্চঃস্বরে তিনবার তালবিয়া পাঠ করবেন। মহিলাগণ মনে মনে বলবেন। তালবিয়া নিম্নরূপ:
লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইকা, লাব্বাইকা লা শরীকা লাকা, লাব্বাইকা ইন্নাল হামদা ওয়ান নি’মাতা লাকা ওয়াল মুলক লা শরীকা লাকা। অর্থ:- আমি তোমার সান্নিধ্য লাভে উপস্থিত হয়েছি, হে আল্লাহ! আমি তোমার সান্নিধ্যে হাজির। আমি তোমার নিকট হাজির, তোমার কোন অংশীদার নেই, আমি তোমার নিকট হাজির নিশ্চয়ই সকল প্রশংসা ও নিয়ামত তোমারই এবং সাম্রাজ্যে তোমার কোন অংশীদার নেই।
উকুফে আরাফাহ: জিলহজ মাসের নবম তারিখে সূর্য পশ্চিম দিকে ঢলে যাবার পর থেকে সূর্য অস্ত যাওয়া পর্যন্ত সময়ের মধ্যে আরাফাত ময়দানে অবস্থান করার নামই হজ।
হজ ফরজ হওয়ার সময়কাল: হজ ফরজ হওয়ার সময়কাল সম্পর্কে ফকীহ ওলামাগণের মধ্যে মত পার্থক্য রয়েছে, কারো মতে কারো হিজরতের পূর্বে হজ ফরজ করা হয়েছে, প্রসিদ্ধ মত অনুযায়ী ষষ্ঠ হিজরীতে হজ ফরজ হয়।
সম্মানিত মুসলিম ভাইয়েরা! জেনে রাখুন ইসলাম পঞ্চ বুনিয়াদের উপর স্থাপিত, হজ ইসলামের অন্যতম মৌলিক বিধান, সামর্থবান বান্দার হজ পালন ছাড়া তার ইসলামের ভিত্তি সুদৃঢ় হবে না। জীবনে একবার হজব্রত পালন করা ফরজ। প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ার পর মুমীন যখন একবার হজ আদায় করল তাঁর ফরজ আদায় হলো, ইসলামের বিধান পূর্ণ করে নিল। একবার হজ আদায়ের পর দ্বিতীয়বার আদায় করা তার উপর ওয়াজিব নয়।
হাদীস শরীফের আলোকে হজের গুরুত্ব ও তাৎপর্য: হজের গুরুত্ব ও তাৎপর্য প্রসঙ্গে অসংখ্য হাদীস শরীফ বর্ণিত হয়েছে, হজ মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের প্রতীক। মুসলিম উম্মাহর ইসলামী জাগরণের এক মহাসম্মিলন। এর ধর্মীয় ও আন্তর্জাতিক গুরুত্ব অপরিসীম। সর্বাধিক হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবী হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের উদ্দেশ্যে ভাষণ প্রদান করলেন, তিনি এরশাদ করেন, হে মানব মন্ডলী, তোমাদের উপর হজ ফরয করা হয়েছে। অতএব তোমরা হজ পালন কর। এক ব্যক্তি প্রশ্ন করলেন (আকরা ইবনে হাবেস) ইয়া রাসূলাল্লাহ? আমাদের উপর প্রতি বছর হজ পালন করা কি ফরজ? রাসূলুল্লাহ নিরবতা পালন করলেন। লোকটি তার প্রশ্নটি তিনবার উত্থাপন করলো, পরিশেষে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন তোমার প্রশ্নের উত্তরে আমি যদি হ্যাঁ বলতাম প্রতি বৎসর হজ পালন করা আবশ্যক হয়ে যেত। এতে তোমরা সক্ষম হতে না। অত:পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করলেন, তোমরা আমাকে ততক্ষণ পর্যন্ত ছেড়ে দাও, যতক্ষণ আমি তোমাদেরকে (কোন বিধান আরোপ করা ছাড়া) ছেড়ে দেই। মূলত: তোমাদের পূববর্তী জাতিগুলো তাদের নবীদের নিকট অতিমাত্রায় প্রশ্ন এবং পারস্পরিক মতানৈক্যের কারণে ধ্বংস হয়ে গেছে। সুতরাং আমি যখন কোন বিষয়ে তোমাদের নির্দেশ করবো তোমরা তা নিজেদের সাধ্যানুসারে পালন করবে। আর যখন কোন বিষয়ে নিষেধ করব তখন তা বর্জন করবে। বর্ণিত হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হলো জীবনে একবার হজ পালন করা ফরজ। রসূলুল্লাহর আদেশ নির্দেশ ও যাবতীয় বিধানাবলী নিঃশর্তে মেনে নেওয়া অপরিহার্য ও মুমীনের পরিচায়ক। “রসূলুল্লাহর বাণী “ আমি যদি হ্যা বলতাম তা ফরজ হয়ে যেত, এতে প্রতীয়মান হলো, শরীয়তের বিধি-বিধানের প্রবর্তনের দায়-দায়িত্ব ও কর্তৃত্ব আল্লাহর পক্ষ থেকে রাসূলুল্লাহর এখতিয়ারে ছিল অর্থাৎ তিনি যা বলতেন তা শরীয়তের বিধানে পরিণত হত।
হজ ওয়াজিব হওয়ার শর্তাবলী: হজ ওয়াজিব হওয়ার অন্যতম শর্ত হলো আথির্ক ও শারীরিকভাবে সামর্থবান হওয়া, যে সামর্থবান নয় তার উপর হজ ওয়াজিব নয়। মহিলার সাথে মুহরিম না থাকলে তার উপর হজ ওয়াজিব নয়। মহিলার জন্য মুহরিম ছাড়া সফর করা শরয়ীভাবে নিষিদ্ধ। এ নিষিদ্ধতার কারণ হলো নারী জাতির নিরাপত্তা ও পবিত্রতা হিফাজত করা ও নিশ্চিত করা। যার উপর হজ ফরজ হয়েছে সে যেন তাড়াতাডি তা পালন করে। ভবিষ্যৎ জীবনে শারীরিক সুস্থতা, আর্থিক সচ্ছলতা, যাতায়াতের নিরাপত্তা কোনোটির ব্যাপারে মানুষ নিশ্চিত নয়।
হজ পালনে বিলম্ব করা যাবে না: হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, হজের ইচ্ছা পোষণকারী যেন তাড়াতাড়ি তা সম্পন্ন করেন। কেননা সে অসুস্থ হয়ে যেতে পারে। তার উট হারিয়ে যেতে পারে বা তার ইচ্ছা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। (ইবনে মাজাহ শরীফ, হাদীস নং ২৮৮৩)
হজ ও ওমরা দারিদ্র নিশ্চিহ্ন করে দেয়: হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, তোমরা হজ ও ওমরা পরপর সঙ্গে সঙ্গে আদায় কর। কেননা এ দুটি কাজ দারিদ্র ও গুনাহ নিশ্চিহ্ন করে দেয়। যেমন রেত লোহার মরিচা ও স্বর্ণ রৌপ্যের মরিচা দুর করে দেয়। আর কবুলকৃত হজের সওয়াব জান্নাত ব্যাতীত আর কিছুই নয়। (তিরমিযী শরীফ, হাদীস নং:৮১০)
সামর্থ থাকা সত্ত্বেও হজ না করার পরিণতি: হযরত আবু উমামা (রা.) থেকে বর্ণিত, প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, যাকে প্রকাশ্য কোন প্রয়োজন অথবা বাধাদানকারী কোন রোগব্যাধি অথবা অত্যাচারী বাদশাহ হজ করতে বাধা না দেয়া সত্ত্বেও হজ করলোনা। চাই সে ইয়াহুদী হিসেবে বা নাসারা হিসেবে মৃত্যু বরণ করুক। (ইমাম বায়হাকী, সুনান কোরবা ৪/৩৩৪)
হাজীদের সাক্ষাৎ সালাম বিনিময়ে গুনাহ মাফ হয়: হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, “যখন তুমি কোন হাজীর সাক্ষাৎ পাবে তাকে সালাম করবে, তার সাথে মুসাফাহা করবে এবং তাকে বলবে সে যেন তার ঘরে প্রবেশের পূর্বে তোমার জন্য আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে, কেননা তাকে ক্ষমা করা হয়েছে। (আহমদ হাদীস নং ২৪১৩)
হে আল্লাহ আমাকে মকবুল হজের তাওফিক দান করুন, আমার প্রচেষ্টা সফল করুন, আমার গুনাহ ক্ষমা করুন, আমার নেক আমাল কবুল করুন, এমন তেজারত নসীব করুন যাতে ক্ষতি নেই। হে অন্তর্যামী হে আল্লাহ, আমাকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে বের করুন। হে পরাক্রমশালী ক্ষমাশীল! প্রার্থনা করি জান্নাত প্রাপ্তির, জাহান্নাম থেকে মুক্তির। মুত্তাকী ও নেক্কার বান্দাদের সাথে আমাদের হাশর করুন। হে আল্লাহ আমাদেরকে হজে বায়তুল্লাহ ও আপনার প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রওজা মোবারক যিয়ারত করার তাওফিক নসীব করুন। আল্লাহ তায়ালা আমাদের আপনাদের সকলকে পবিত্র কুরআনের বরকত দান করুন। নিশ্চয়ই তিনি মহান দানশীল, সৃষ্টি জগতের মালিক, পুণ্যময় অনুগ্রহশীল ও দয়ালু। আমীন।
লেখক : খতীব, কদম মোবারক শাহী জামে মসজিদ।

x