জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জঙ্গি উত্থান রুখতে হবে

সোমবার , ৮ অক্টোবর, ২০১৮ at ১০:৩৮ পূর্বাহ্ণ
29

জঙ্গিবাদ কিংবা সন্ত্রাসবাদ একটি অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়; এটি বিশ্বব্যাপী সমস্যা। সামপ্রতিককালের বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ভয়াবহ জঙ্গি হামলা প্রমাণ করে সন্ত্রাসের কোনো দেশ নেই, কোনো সীমানা নেই। যদিও আইএস ইরাক ও সিরিয়াকেন্দ্রিক কিন্তু যে কোনো আত্মঘাতী হামলাকে আইএসের কাজ বলে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ফ্রান্সের প্যারিসে ভয়াবহ হামলা, জার্মানিতে হামলা, যুক্তরাষ্ট্রের সমকামীদের নাইট ক্লাবে বন্দুকধারীদের হামলা, ভারতের মুম্বাই হামলা আফগানিস্তানের সরকারি বাহিনী ও সাধারণ মানুষের ওপর নিয়মিত হামলা প্রমাণ করে ইউরোপ থেকে এশিয়া আজ কোনো দেশই জঙ্গি হামলা থেকে নিরাপদ নয়। বিশ্বজনীন সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত এই ঘৃণ্য আপদ বিশ্বশান্তির জন্য এর মধ্যেই বিড়ম্বনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর অপচর্চা বেশ কিছু দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও উন্নয়নকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে। বৈশ্বিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্যও তা বিসংবাদ সৃষ্টি করে চলেছে। বাংলাদেশ প্রথম থেকেই সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। এই জঘন্য আপদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াইয়ের প্রাসঙ্গিকতাকে স্বীকার করে বিশ্বসমপ্রদায়ের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়েছে বাংলাদেশ। সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় আমাদের বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের বিষবাষ্প দমানোর সফল উদ্যোগ সত্ত্বেও এখনো আমরা নিশ্চিন্তে বলতে পারি না যে ‘আমরা নিঃশঙ্ক’। কেননা, মীরসরাই উপজেলায় একটি জঙ্গি আস্তানায় কয়েক ঘণ্টা ধরে র‌্যাবের সাথে জঙ্গিদের গুলি বিনিময় হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে শুরু হওয়া এই ঘটনার এক পর্যায়ে দুই জঙ্গি সদস্য ভোর ৫টার দিকে আত্মঘাতী বিস্ফোরণে মারা যায়। ঢাকা থেকে র‌্যাবের বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দল এসে বেলা সাড়ে ১১টা নাগাদ বোমাগুলোর বিস্ফোরণ ঘটায়।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, বিশ্ব জঙ্গিবাদ মানবসমাজকে ঠেলে দিতে চাইছে এমন একটি অন্ধকার সময় ও স্থানের দিকে, যেখানে গণতান্ত্রিক সমাজের ধারণাগুলো বিলুপ্ত। যেখানে বিশ্বজনীন আন্তর্জাতিক নিয়মনীতি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত। সেটা তারা করতে চাইছে সমাজ কাঠামোতে ভাঙন ধরিয়ে চতুর কৌশলে মানবসমাজে বিভাজন সৃষ্টির মাধ্যমে। সভ্য মানুষের বিশ্বাস, সংস্কার কিংবা আচার আচরণের মূলে কুঠারাঘাত দিয়ে ভয়াল বিপর্যয় ঘটিয়ে নিত্যনতুন নির্মম সন্ত্রাস, অমীমাংসিত হত্যাকাণ্ড ও অরাজক পরিস্থিতিতে অসহনীয় পারিপার্শ্বিকতা তৈরি করে। যাতে নাগরিক মানুষের মনে সন্দেহ, সংশয়, আতঙ্ক ও ত্রাস সৃষ্টি হয় এবং সুশীল সমাজে স্বাধীনতা ও সাধারণ মানুষের বাঞ্ছিত জীবনযাত্রা বিঘ্নিত হতে হতে সামাজিক পরিবেশ জুড়ে নেমে আসে মৃত্যুশীতল বিপর্যয়। কেননা সমাজবদ্ধ মানুষের সুস্থ চেতনাই মানব সভ্যতাকে এগিয়ে দেয় সুস্থতর ভবিষ্যৎ নির্মাণের দিকে। মানুষকে করে তোলে মানবিক গুণাবলির আদর্শের ধারক। মানুষকে করে তোলে অমলিন মনুষ্যত্ব বিকাশের অনির্বাণ বাহক।
বিশ্বে বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের রোল মডেল। এই উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে বাধাগ্রস্ত করতে, বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল ও ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করতে প্রতিক্রিয়াশীল স্বাধীনতাবিরোধী জঙ্গিবাদী চক্র দেশকে নিয়ে গভীর চক্রান্ত দীর্ঘদিন ধরে চালিয়ে আসছে। এই উগ্র ধর্মান্ধ জঙ্গিবাদী গোষ্ঠী বাংলাদেশের উন্নয়ন ও গণতন্ত্র চায় না। এই অপশক্তি বাংলাদেশের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করতে ও দেশকে একটা জঙ্গি রাষ্ট্রে পরিণত করার ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
জঙ্গি দমনে সরকারের পাশাপাশি সর্বমহল থেকে দায়িত্বশীল ও কঠোর ভূমিকা পালন করতে হবে। জঙ্গি সংগঠনগুলোকে সংগঠিত হওয়ার আগেই তাদের নিষ্ক্রিয় করতে হবে। জঙ্গিদের সাংগঠনিক কার্যক্রম ভেঙে দিতে পারলে তাদের মনোবলও ভেঙে যাবে। রাজনৈতিক দিক থেকেও নানা কার্যক্রম নিয়ে জঙ্গি উত্থানের আশঙ্কা নস্যাৎ করতে হবে। ব্যবহার করতে হবে গণমাধ্যমকেও। গড়ে তুলতে হবে জনসচেতনতা। জনগণের মধ্যে সচেতনতা গড়ে তুলতে পারলে জঙ্গিবাদ কোনোভাবেই মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারবে না। এ ব্যাপারে সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠনগুলোকেও কাজে লাগানো যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে প্রয়োজন হবে সরকার ও রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতা। সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা গেলে জঙ্গি সংগঠনগুলো তৃণমূল পর্যায়েই কার্যকারিতা হারাবে। জননিরাপত্তা ও রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জঙ্গি উত্থান রুখতে হবে। তাই বলা যায়, রাজনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তুলে এই ধরনের পরিস্থিতি মোকাবেলা করা সম্ভব। এ ব্যাপারে সব শ্রেণি পেশার মুক্তমনা মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে।

x