চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় সাহিত্যচর্চা

অনিন্দ্য বড়ুয়া

শুক্রবার , ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ at ৫:৫৮ পূর্বাহ্ণ
35

চট্টগ্রামের আঞ্চলিক-ভাষায় সাহিত্য চর্চায় আগ্রহীর সংখ্যা ধীরে হলেও বেড়েছে অনেক, বিশেষ করে ছড়া সাহিত্যের সঙ্গে চট্টগ্রামের যে সমস্ত ভূমিপুত্র যুক্ত আছেন তাঁরা সবাই অন্তত একবার হলেও চেষ্টা করেছেন আঞ্চলিক ভাষায় ছড়া লিখতে, ছড়া-শিল্পীদের বাইরে কবি মুহাম্মদ নুরুল হুদা, কবি ওমর কায়সার, গল্পকার বিশ্বজিৎ সেন, উপন্যাসিক হরিশংকর জলদাস বাংলার এই উপভাষাকে তাঁদের সাহিত্য কর্মে তুলে এনেছেন স্বছন্দে তবে ছড়া-যাদুকর সুকুমার বড়ুয়ার অনেক গুলি আঞ্চলিক ছড়া আর ওয়াসাকে নিয়ে নূর মোহাম্মদ রফিকের (সদ্য প্রয়াত) একটি মাত্র ব্যাঙ্গাত্মক ছড়া-ই ছড়িয়ে দিয়েছে সবার হৃদয়ে সুরের আগুন। সুদূর অতীতেও এই ভাষায় সাহিত্য চর্চার প্রমাণ পাওয়া যায় লিখিত-অলিখিত অনেক লোকজ ছড়ার মধ্যে, গ্রাম্যতা দোষে যেসব ছড়া আবৃত্তিযোগ্যতা হারিয়েছে বর্তমান সময়ে। যতদূর জানা যায় চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় ‘গ্রাম্যতা দোষ’ বিবর্জিত প্রথম রচনা সুচরিত চৌধুরির নাটক “অলি কহ্‌ই য (অলি বলে যাও)” । সাবলীলতা বজায় রেখে গ্রামত্যাকে দূরে সরিয়ে যাঁরা এই ভাষায় অবিরত ছড়া চর্চা করে যাচ্ছেন তাদের মধ্যে উৎপল কান্তি বড়ুয়া, বিপুল বড়ুয়া, সনতোষ বড়ুয়া, অরুণ শীল, সনজীব বড়ুয়া, রমজান মাহমুদ, মর্জিনা আখতার, জহুর উস শহীদ, মসউদ উশ শহীদ, কেশব জিপসী, আবুল কালাম বেলাল, নিশাত হাসিনা শিরিন, মুহাম্মদ নাসির উদ্দিন, আলেঙ আলীম, গোফরান উদ্দীন টিটু, সৈয়দা সেলিমা আক্তার, আরকানুল ইসলাম অন্যতম। বিশেষ কোন উপলক্ষে লিখতে দেখা যায় রফিক আনোয়ার (প্রয়াত), সঞ্জিত বনিক, বিকিরণ বড়ুয়া, সনজিত দে, লিটন চৌধুরী, গৌতম কানুনগো, করুণা আচার্য্য, দীপালী ভট্টাচার্য্য, শেখ মঈনুল হক চৌধুরী জোসেফ প্রমুখকে। চট্টগ্রামের ভূমিপুত্র না হয়েও মাঝে মধ্যে চমক দেখান পাশা মোস্তফা কামাল, জসিম মেহবুব, হোসাইন আনোয়ার। তালুকদার হালিম ও চক্রপাণি ভট্টাচার্য্য(প্রয়াত) বহুল চর্চা চালিয়ে গেলেও তাদের রচনা ‘ফোয়াইদ্যা কথা ’ পর্যায় ভুক্ত।
অনেককেই দেখা যায় চট্টগ্রামের আঞ্চলিক-ভাষার বিশুদ্ধতা বজায় রাখা নিয়ে উদ্বিগ্ন হতে, বিশেষ করে গীতিকার মহলে বিশুদ্ধতাবাদী আর মিশ্রতাবাদীদের ভেদরেখা সুস্পষ্ট। বিশুদ্ধতা-বাদীরা প্রতিপক্ষের ভাষাকে নাম দিয়েছেন “কাউয়া ভাষা(কাকের ভাষা)”। মিশ্রতা-বাদীদের যুক্তি হলো-মিশ্রণ না ঘটালে সর্বজনবোধ্য হবে না। একথা অনস্বীকার্য যে, গ্রহণ-বর্জনের ধারা বজায় রেখে এই ভাষায় যতক্ষণ পর্যন্ত- ‘আমি হৃদয়ের কথা বলিতে ব্যাকুল শুধাইল না কেউতো ’ এর মতো হৃদয়স্পর্শী পঙক্তি রচনা করা সম্ভব হচ্ছে না ততক্ষণ এই ভাষা কবিতা রচনার পুরোপুরি উপযোগী হয়ে উঠবে না, তবে একেবারে অসম্ভবও যে না, সেটা আমাদের দেখিয়েছেন কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা আর কবি ওমর কায়সার– তাদের বিদগ্ধ কবিতায়। ছড়াকার গল্পকাররা আঞ্চলিক ভাষায় রচনার ক্ষেত্রে সরব হলেও কবিদের নীরবতা চোখে পড়ার মতো। বাংলা, ইংরেজি, আরাকানী, বর্মী, আরবি, হিন্দি, ডাচ সহ অনেক বিদেশী ভাষা তথা উপজাতি/আদিবাসী ভাষা থেকে এই ভাষা অনেক অনেক শব্দ, বাদ-প্রবাদ গ্রহণ করে সমৃদ্ধ হলেও বর্তমান প্রবণতা হচ্ছে মূলভাষা বাংলার সমীপবর্তী হওয়া, এতে দোষের কিছু না থাকলেও নিজেদের আঞ্চলিকত্ব তথা স্বকীয়তা বজায় থাকবে কি না ভাবার বিষয়। একুশের চেতনায় উপলব্ধ বিশ্ব ভাষাদিবসের অঙ্গীকারে প্রতিটি ভাষা-উপভাষাই সমান মূল্যবান।
চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা নিয়ে অনুষ্ঠিত সভা-সেমিনারে আঞ্চলিক বর্ণমালার প্রয়োজনীয়তার কথা প্রায়ই শোনা যায়, হাহাকার শোনা যায় নিজেদের সন্তানরা হিন্দি চ্যানেলের প্রভাবে হিন্দি বলতে শুরু করেছে বলে; তারা বাবা না ডেকে ড্যাডি ডাকতে বেশি আগ্রহী বলে। এতে শঙ্কার কিছু আছে বলে মনে হয় না, পিতাকে তুর্কি ভাষায় বাবা ডাকা আর ইংরেজি ভাষায় ড্যাডি ডাকার মধ্যে কোন ইতর-বিশেষও নেই। হিন্দি, ইংরেজি বা উর্দু যাই হোক নিজের সন্তান যদি অতিরিক্ত একটি ভাষা বা উপভাষা আয়ত্ত্‌ব করতে পারে তবে তা গর্বের বিষয় হওয়া উচিত। ভাষার প্রভাবের উত্‌স নিয়ে চিন্তা ভাবনা করা যায় বটে ভাষার গতিকে কোন কালে রুদ্ধ করে রাখা যায় না; যায়নি। ভাবার বিষয় হলো বাকস্ফুরণের প্রাক্কালে নিজস্ব আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলতে আপনার সন্তানকে আপনি শিখিয়েছেন কি না। গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, একুশ বছর বয়সের মধ্যে মাদকাসক্ত না হলে পরবর্তীতে কেউ মাদকে গভীর ভাবে আসক্ত হতে পারে না, ভাষার প্রভাবটাও এ’রকম– একটা সময়ের পর আয়ত্ত করা যায়, আত্মস্থ করা যায় না। সাহিত্য রচনা, সিডি-ক্যাসেট বা সভা-সেমিনার কোন ভাষা বা উপভাষাকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে না কারণ– “ভাষা মানুষের মুখ থেকে কলমের ডগায় যায়, কলমের আগা থেকে মানুষের মুখে নয়।”
বৃহত্তর বাংলা ভূখণ্ডের আঞ্চলিক-ভাষাগুলি যে বাংলা ভাষার উপভাষা এবং বাংলাভাষা যে উপভাষাগুলোর নির্যাস তা স্বীকার না করে উপায় নেই। এই অবস্থায় পৃথক বর্ণমালার প্রয়োজন আছে কি না আরও ভাবা প্রয়োজন, স্বীকার করি পৃথক বর্ণমালার অভাবে চাটগাঁ ভাষার অনেক শব্দই মূল উচ্চারণের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে না (উদাহরণ হিসাবে সংখ্যা-বাচক শব্দসহ যে সব শব্দের শেষে‘উয়া’ প্রত্যয়টি যোগ করতে হয় সেসবের উল্লেখ করা যায়)। আবার একথাও মনে রাখা প্রয়োজন যে, কোন ভাষা-গোষ্ঠীর সব উচ্চারণকে ধারণ করার মতো কোন বর্ণমালা আর হৃদয়ের সব ভাবকে ধারণ করার মতো শব্দসম্ভার এখনো কোনও ভাষায় তৈরী হয়নি। তা ছাড়াও পৃথক বর্ণমালা আমাদের প্রিয় ভাষাটির উচ্চারণগম্যতা তথা বোধগম্যতার পরিসরকেও সংকুচিত করে দিতে পারে। ত্রিপুরা ভাষার ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা আমাদের প্রয়োজন বোধের (পৃথক বর্ণমালা) বিপরীত চিত্র দেখতে পাই, বোড়ো ভাষাভাষি ত্রিপুরাদের রাজন্য-বর্গের ইতিহাস গ্রন্থ ‘রাজমালায়’ বর্ণিত আছে-‘পূর্বে রাজমালা ছিল ত্রিপুরা ভাষাতে/পয়ার গাঁথিল সব সকলে বুঝিতে।’ ভেবে দেখা প্রয়োজন- ‘সকলে না বুঝিতে’ আমরা গণ্ডিবদ্ধ হব কি না।
শুধু কালের গর্ভে বিলুপ্ত আরাকান রাজসভা নয়, ত্রিপুরা রাজসভা, মনিপুর রাজসভা তথা সাহিত্য, বিষ্ণুপ্রিয়া সাহিত্য, পৃথক বর্ণমালা থাকা সত্ত্বেও চাকমা সাহিত্য যখন এগিয়ে চলছে বাংলা বর্ণমালায় (যদিও ইদানীং ত্রিপুরা মনিপুরীরা নিজস্ব বর্ণমালা সৃষ্টির জন্য সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে) তখন বাংলা বর্ণমালার হাত ধরে চাটগাঁ ভাষার সাহিত্যের পথ চলাতে বড় কোন প্রতিবন্ধকতা থাকার কথা না। চর্যা-কবিতার জন্মলগ্নে বাংলা বর্ণমালার জন্ম হয়েছিল কি না তা তর্ক-সাপেক্ষ, যে কোন কারণে হোক– জীবন্ত নেওয়ারী হরফে চর্যাপদের কবিতা গুলো লিপিবদ্ধ করা হয়েছিল বলে হাজর বছর পরে এসে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে বাংলাভাষায় রচিত হিরকখনি।
উপভাষার চেয়ে মূল-ভাষার আয়ুস্কাল বেশি হওয়ার সম্ভাবনাই অধিক।

x