কাল আজকাল

কামরুল হাসান বাদল

বৃহস্পতিবার , ১৪ মার্চ, ২০১৯ at ৬:৪৪ পূর্বাহ্ণ
17

নগরজুড়েই হাটবাজার কেন
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন থেকে বড়জোর ২শ গজের দূরত্ব হবে কদম মুবারক মসজিদ গেট। এটি কদম মুবারক বাই লেন নামে পরিচিত। লেনের মূলেই গেটটি। মূলত মসজিদ গেট হিসেবেই এটি তৈরি করা হয়েছে। সিটি করপোরেশনের এত কাছে হওয়ার পরও এই লেনটির অবস্থা সবসময় ভালো থাকে না। অধিকাংশ সময় লেনটি থাকে ভাঙাচোরা। নালার স্ল্যাবগুলো ভাঙা থাকে। সড়কের ওপর দিয়ে নালার পানি উপচে পড়ার দৃশ্যটি নিত্য নৈমিত্তিক।
এ গেটটির পূর্বপাশটি গত কিছুদিন ধরে ডাস্টবিন হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে প্রতিরাতে এটি পরিস্কার করা হয়। কিন্তু সন্ধ্যার পর থেকে ওখানে ময়লা জমতে থাকায় পথচারী স্থানীয় লোকজন এবং আশপাশের ব্যবসায়ীদের বিড়ম্বনা পোহাতে হয়। মাস দুয়েক থেকে দেখা যাচ্ছে সে ডাস্টবিনের পাশেই দুটি মাছের দোকান গড়ে উঠেছে। বিকেলের পর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত ওখানে মাছ বিক্রি হচ্ছে। এবং সে মাছ কাটাও হচ্ছে। রাতে যখন সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা গাড়ি নিয়ে ময়লা তুলে নিতে আসে তখন মাছ বিক্রেতারা সরে গিয়ে জায়গা করে দেয়। এবং ময়লা তুলে নেওয়ার পরপর সে জায়গায় আবার মাছ বিক্রি শুরু করে।
এ দৃশ্য শহরে নতুন নয়। এভাবে মাছ মুরগি সবজি বিক্রির দৃশ্য দুর্লভ নয়। নগরবাসী মাত্রই জানেন এখন নগরজুড়েই হাটবাজার। অলি-গলি থেকে প্রধান সড়কের ফুটপাত এবং সড়কের অংশ কাঁচাবাজারের ভ্যানগাড়িতে জ্যাম থাকে। কিছু এলাকায় বিকেলের পর থেকে বাজার বসা শুরু হয়ে যায় আর কিছু এলাকায় সকাল থেকেই বেচা-কেনা চলে। কিছু এলাকাতো রীতিমতো বাজারে পরিণত হয়ে গেছে।
সম্প্রতি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এমন ৩৭টি অবৈধ বাজার চিহ্নিত করেছে। বাজারগুলো হলো কাঠগড় সড়ক জহুরুল হক ঘাঁটি, স্টিলমিল, বেপারীপাড়া, টিএন্ডটি কলোনি, মাদারবাড়ি দারোগাহাট, চট্টগ্রাম সিটি কলেজ, মেমন হাসপাতাল, সিরাজউদ্দৌলা সড়ক, চকবাজার ধনিরপুল হতে ফুলতলা, পুরাতন চান্দগাঁও থানার পাঠাইন্যাগোদা জামাল খান সড়ক, ডিসি হিল, অক্সিজেন মোড়, দেওয়ানহাট ব্রিজ সংলগ্ন, মিয়াখান নগরীর বৌ বাজার, জামাইবাজার, আতুরার ডিপো, ঈদগা রাস্তার মাথা, চালিতাতলী বাজার, রাজখালী ব্রিজ, পাহাড়তলী ঝাউতলা, মুরাদপুর ১নং রেলগেট সংলগ্ন, আশেকানে আউলিয়া ডিগ্রি কলেজ, ফতেয়াবাদ আমান বাজার, ফইল্যাতলী, সিইপিজেড মোড়, বন্দরটিলা, আমিন জুট মিল, আকবর শাহ মাজার, একে খান রোড, বান্ডেল রোড, নয়াহাট-কুয়াইশ, কাঠগড় মুসলিমাবাদ, নাজিরপাড়া এবং দেওয়ানবাজার মোড়ের রাস্তার ওপরে বসা এমন কাচাবাজার।
সিটি করপোরেশন চিহ্নিত করেনি এমন বহু অবৈধ বাজার এখনো নগরে বিদ্যমান আছে। বর্তমানে মানুষের কর্মব্যস্ততা বেড়েছে। জীবনযাপনেও পরিবর্তন এসেছে। শহর দিনদিন প্রশস্ত হচ্ছে। শহরে জনসংখ্যা বাড়ছে। সবকিছু মিলিয়ে বর্তমান সময়কে ৩০/৪০ কিংবা ৫০ বছর আগের পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করা যায় না। সে সময় মানুষের জীবনযাত্রা বর্তমানের মতো এতটা ব্যস্ত ও কর্মময় ছিল না। মানুষ সকালে স্থানীয় কাঁচাবাজারে যেতো। এবং প্রয়োজনীয় পণ্য ক্রয় করতো। এর জন্য শহরে কিছু কাঁচাবাজার ছিল। যেমন বক্সিরহাট, বহদ্দারহাট, চকবাজার, কর্ণফুলী মার্কেট, কাজির দেউড়ি বাজারসহ শহরের বিভিন্ন স্থানে স্থায়ী বাজার ছিল। বাজারগুলো মূলত সিটি করপোরেশন কর্তৃক পরিচালিত হতো। বাজারগুলো ইজারা দেওয়ার মাধ্যমে সিটি করপোরেশন প্রচুর রাজস্বও আদায় করতো।
সময়ের সাথে সাথে মানুষের জীবনেরও পরিবর্তন ঘটেছে। এখন আর সকালে থলে নিয়ে বাজার করার সময়ও মানুষের নেই। সন্তানদের স্কুলে পৌঁছে দিয়ে নিজের কর্মক্ষেত্রে যেতেই গলদঘর্ম হতে হচ্ছে অধিকাংশকে। ফলে বাজারের জন্য আলাদা সময় বের করা এখন অনেকের জন্য কঠিন। ফলে বিকেল, সন্ধ্যা কিংবা রাতে বাসা বা বাড়ি ফেরার সময় পথ বা ফুটপাত থেকে কেনাকাটা করে ফেরা দৈনন্দিন জীবনযাপনের অংশ হয়ে উঠেছে। এতে অনেকের সুবিধা হচ্ছে বটে কিন্তু তাতে শহরজুড়ে একপ্রকার অনিয়ম আর অব্যবস্থাপনা তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে বিত্তবানরা যাচ্ছেন নতুন গড়ে ওঠা সুপারস্টোরে। যেখানে সবকিছু এক ছাদের নিচেই পাওয়া যায়।
বিশ্বের সব আধুনিক শহরে কাঁচাবাজার বা কিচেনমার্কেট আলাদাভাবে এবং স্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরি করা হয়। জনস্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে তারা এমন ব্যবস্থা করে থাকেন। সড়কের পাশে কখনো প্রকাশ্যে মাছ-মাংস মুরগি বিক্রি হয় না, কাটাকাটিও হয় না। সেসব নগরে নির্দিষ্ট স্থান ছাড়া পশু জবাই নিষিদ্ধ। তারপরও ওসব দেশে ফুটপাতে খাবার বা ফলমূল-শাক-সবজি বিক্রি হলেও তাদের একটি সুবিধা হলো পরিবেশগত। তাদের নগরীতে এত ধুলিবালু নেই ফলে সে খাদ্যগুলো দূষিত হওয়ার সম্ভাবনাও কম। আমাদের দেশে সড়কজুড়ে থাকে ময়লা-আবর্জনা। সড়কের পাশে উন্মুক্ত নালা। বাতাসে প্রচুর ধুলোবালি এবং সঙ্গে আছে নানারকম রোগজীবাণু। এর সমস্ত কিছুই জমা হচ্ছে মাছ-সবজি-ফলের ওপর। বিক্রেতারা কিছুক্ষণ পরপর তার ওপর পানি ছিটান তাতে ধুলিবালি আরও গাঢ় হয়ে বসে শাক-সবজির ওপর। এতে মানুষের স্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়ছে। অন্যদিকে এই বাজারের বর্জ্য, মাছের পানি, কাটা মাছের বর্জ্য ইত্যাদির কারণে আশেপাশের পরিবেশও অস্বাস্থ্যকর হয়ে ওঠে। স্থানীয় ব্যবসায়ী এবং বাসিন্দারা এই পরিবেশ দূষণের শিকার হচ্ছেন।
জামালখান সড়ক ও বৌদ্ধ মন্দিরের সামনে প্রতিদিন সকালে এমন বাজার বসে। সেখানেও মাছ বিক্রি হয়। তা কাটাও হয়। তবে সকাল ৯ টার পরে সে বাজার তুলে দেওয়া হয় এবং পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা সঙ্গে সঙ্গে সে স্থান ধুয়ে ব্লিচিং পাউডার ছিটিয়ে দেন। ফলে সকাল দশটার পর থেকে আর কারো বোঝার উপায় থাকে না যে এখানে এক ঘন্টা আগেও বাজার ছিল। এটি সম্ভব হয়েছে সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার কারণে।
এই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে পারে সিটি করপোরেশন। সারা শহরে সারাদিন বাজার না বসিয়ে এর জন্য স্থান ও সময় নির্দিষ্ট করে দেওয়া উচিত। এবং এ ধরনের সমস্ত বাজারগুলোকে একটি নিয়ম ও ব্যবস্থাপনার অধীনে আনা উচিত। এতে পরিবেশ রক্ষা হতো, শহরের সৌন্দর্য বৃদ্ধি পেতো এবং সিটি করপোরেশনের রাজস্বও বৃদ্ধি পেতো।
দীর্ঘদিন থেকে চলে আসা এ অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে না সিটি করপোরেশন। ফলে দিনদিন এই প্রকোপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রতিদিন নগরের ফুটপাত সড়ক দখল করে বাজারের আয়তন বাড়ছে। এ ধরনের বাজারগুলো অবৈধ হওয়ায় এখান থেকে কোনো প্রকার রাজস্ব পায় না সিটি করপোরেশন। এগুলো নিয়ন্ত্রণ করেন মূলত স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর। স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা আর তাদের এই কাজকে অর্থের বিনিময়ে নির্বিঘ্ন করে দেয় স্থানীয় থানার পুলিশ এবং সিটি করপোরেশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা।
একটি ফুটপাত এবং তৎসংলগ্ন সড়কটি কতভাবে দখল হতে পারে, কতভাবে তার অবৈধ ব্যবহার হতে পারে অনিয়ম কতভাবে হতে পারে তার জন্য দূরে কোথাও যেতে হবে না। কোনো জরিপও করতে হবে না। শুধু একবার দিনের যে কোনো সময় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ভবনের সামনে থেকে চেরাগী পাহাড়ের ফুলের দোকানগুলো পর্যন্ত হেঁটে এলেই তা বোঝা যাবে। ছাগল জবাই থেকে ফুটপাতে গোসল করা, হেন কোনো কর্ম নেই যা সাধিত হয় না এই সামান্য দূরত্বে। মাঝেমধ্যে কোনো কারণে ফুটপাত ও সড়কের অবৈধ দখলগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয় তাতে ঘন্টাখানেক বন্ধ থাকে এবং অভিযানে গরিব দোকানিদের দুয়েকটি ভ্যানগাড়ি ভাঙা হয়। সুদূরপ্রসারী কোনো ফল হয় না। লোক দেখানো এমন অভিযানে সাধারণ মানুষের উল্টো বিড়ম্বনাই হয় শুধু।
কয়েকমাস পূর্বে মেয়র মহোদয় এ বিষয়ে একটি নীতিমালা প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়নের আশ্বাস দিয়েছিলেন। তা যত সহসা বাস্তবায়ন করা যেত তত সুবিধা হতো নগরবাসীর। যদিও এর আগে তিনি নিউমার্কেট এলাকায় স্থান ও সময় নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন হকারদের জন্য। কিছুদিন বেশ ভালোভাবে সে নিয়ম মানা হলেও এখন দেখা যাচ্ছে দুপুরের আগে থেকেই তারা দোকান বসানো শুরু করে দেয়। এ বিষয়ে নজরদারি প্রয়োজন আছে বলে মনে করছি।
পরিকল্পনাহীনভাবে কোনোকিছুই করা সম্ভব নয়। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে আমাদের প্রিয় চট্টগ্রাম শহরটিও গড়ে উঠেছে পরিকল্পনাহীনভাবে। অপরিকল্পিত নগরায়নের অনেক কুফল আমরা ভোগ করছি। ভবিষ্যতে তার জন্য আরও অনেক দাম দিতে হবে। কাজেই দেরি হলেও কাজটি ব্যাপকভাবে শুরু হওয়া দরকার। নগরকে বাসযোগ্য করতে, নগরের সৌন্দর্য ধরে রাখতে এবং নাগরিকদের জীবন ও স্বাস্থ্য রক্ষার্থে সিটি করপোরেশনকেই অগ্রণী ও কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। আর নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে সিটি মেয়র সে দায় এড়াতে পারেন না।
qhbadal@gmail.com

x