এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইম্যান : শুধু মানসম্মত শিক্ষাই নয়, দেয় জীবন চলার পথের দক্ষতাও

একান্ত সাক্ষাৎকারে শেরি ব্লেয়ার

শনিবার , ১৮ মে, ২০১৯ at ১০:৫৫ পূর্বাহ্ণ
432

বাংলাদেশ, কম্বোডিয়া, ভারত, নেপাল, পাকিস্তান ও শ্রীলংকার ১৩০ জন তরুণীকে নিয়ে যে বিশ্ববিদ্যালয় যাত্রা করেছিল ২০০৮ সালে সেই এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইম্যানে এখন পড়াশোনা করছেন বাংলাদেশ, আফগানিস্তান, ভূটান, কম্বোডিয়া, চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, মায়ানমার, নেপাল, পাকিস্তান, প্যালেস্টাইন, শ্রীলংকা, সেনেগাল, সিরিয়া, ভিয়েতনাম ও ইয়েমেনের ৭শয়েরও বেশি শিক্ষার্থী। এ পর্যন্ত শিক্ষা সম্পন্ন করে গেছেন ৮শয়ের অধিক তরুণী। বিশ্ববিদ্যালয়টির লক্ষ্য হলো তাদের শিক্ষার্থীরা যেন শিক্ষা সম্পন্ন করে জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করে নিজ নিজ সমাজে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের স্ত্রী ব্রিটিশ ব্যারিস্টার ও লেখক শেরি ব্লেয়ার ২০১১ সাল থেকে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইম্যান-এর চ্যান্সেলরের দায়িত্ব পালন করছেন। বিশ্ববিদ্যালয়টির লক্ষ্য ও স্বপ্ন সহ নানা চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে দৈনিক আজাদী’র কাছে তুলে ধরেছেন এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইম্যান-এর চ্যান্সেলর শেরি ব্লেয়ার

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন- প্রবীর বড়ুয়া

আজাদী : বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা আপনাকে কী দিয়েছে বলে আপনি মনে করেন?

শেরি ব্লেয়ার : আমি মনে করি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা একটি দরজা খুলে দেয় যা অন্য কোনোভাবে সম্ভব নয়। আমি আরও মনে করি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা একজন শিক্ষার্থীকে এই দরজাগুলোর মধ্য দিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাস গড়ে তুলতে সাহায্য করে। তাছাড়া সার্টিফিকেট, এক্রিডিটেশনও তরুণ গ্র্যাজুয়েটদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইম্যান তার শিক্ষার্থীদের শুধু মানসম্মত শিক্ষাই দেয় না, আরও শিক্ষা দেয় কথা বলায়, জীবন চলার পথের দক্ষতা এমনকি আত্মরক্ষার্থে মার্শাল আর্টও।

আজাদী : আপনি কি মনে করেন যে সার্টিফিকেটের চেয়ে মানসম্মত শিক্ষার গুরুত্ব বেশি?

শেরি ব্লেয়ার : সার্টিফিকেটের পাশাপাশি অবশ্যই মানসম্মত শিক্ষা বিশ্বব্যাপী একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিশেষ করে নিম্নমধ্য আয়ের দেশগুলোর জন্য। আমাদের মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল (এমডিজি)-এর একটি অংশ ছিল বিনামূল্যে প্রাথমিক শিক্ষা যা ইতোমধ্যে পূর্ণ করা হয়েছে। শিক্ষার তৃতীয় স্তরে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে মান সর্বোচ্চ রাখার চেষ্টা করা হয়। আমরা সেজন্য যে সকল শিক্ষার্থী তাদের আগের শিক্ষায় খুব একটা মানসম্মত শিক্ষা পায়নি তাদের খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করি উচ্চমানের শিক্ষা দেয়ার জন্য। বিশেষ করে যে সকল দেশের যে সকল কম্যুনিটিতে তারা মাধ্যমিক পর্যায়ে ভালো মানের শিক্ষা পায়নি তাদের। তাই এই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ভর্তি করানোর সময় শিক্ষার্থী কোন দেশের শুধু তাই দেখা হয় না সেই সাথে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার সাথে তার বেড়ে ওঠার যোগ্যতার বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেয়া হয়। উদাহরণস্বরূপ এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইম্যানে রয়েছে এক্সেস একাডেমি। এখানে যেসব শিক্ষার্থী ইংরেজি, গণিত ইত্যাদি বিষয়ে দুর্বল তাদের সেই দুর্বলতা কাটানোর ব্যাপারে সহায়তা করে বড় ধরনের পরিবর্তন তৈরি করা হয়।

আজাদী : আপনি এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইম্যানের সাথে যুক্ত হলেন কেন?

শেরি ব্লেয়ার : আমি বিশ্ববিদ্যালয়টির সাথে যুক্ত হয়েছি কারণ এটির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য আমাকে আকৃষ্ট করেছে। আমি যখন প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়টি দেখতে আসি তখন এটির তরুণ ছাত্রীদের অবাক করা ক্ষমতা ও আশাবাদ আমাকে সত্যিই অবাক করে। আমি দেখতে চাইলাম চট্টগ্রাম তাদের কী শেখায়। আমি দেখলাম এখানে বিভিন্ন দেশের যে তরুণীরা পড়তে আসে তারা শুধু বিশ্ববিদ্যালয়টির মধ্যেই নয় এর বাইরেও চট্টগ্রামের বিশাল জগতে অনেক কিছু শেখে। এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে আসা তরুণীদের মা-বাবারাও তাদের সন্তানদের কারণে সম্মানিত বোধ করতে পারবেন। চট্টগ্রামে এরকম একটি বিশ্ববিদ্যালয় থাকায় চট্টগ্রামও গর্ব করতে পারে বলে আমি মনে করি। মোট কথা বিশ্ববিদ্যালয়টির রয়েছে প্যানএশিয়ান গুণাবলী যা এশিয়ার সংস্কৃতি, ধর্ম, ভাষা, শিল্প, পোশাক, খাবারগুলোর সম্মিলন ঘটিয়েছে।

আজাদী : উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইম্যান অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর চেয়ে কীভাবে ভিন্ন?

শেরি ব্লেয়ার : এ সমাজে এমন অনেকে আছে যারা আর্থিক সামর্থ্য না থাকার কারণে লেখাপড়া ছেড়ে দিয়ে চাকরি করতে বাধ্য হয়েছে। আমরা বিভিন্ন সরকারি কারখানায় গিয়ে ১৬ থেকে ১৮ বছর বয়সী এমন তরুণীদের খুঁজে পেতে চেষ্টা করি যাদের পরিবার জীবিকা নির্বাহের জন্য তাদের লেখাপড়া ত্যাগ করাতে বাধ্য হয়েছিল। ‘পাথওয়েজ টু প্রগ্রেস’ নামে আমাদের একটা প্রোগ্রাম আছে। আমরা তাদের দুই বছরের সেই কোর্সে ভর্তি করিয়ে তাদের ভেতরের ক্ষমতাকে জাগ্রত করার চেষ্টা করি।

আজাদী : আপনি কেন এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইম্যানে বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীদের শিক্ষাগ্রহণের ব্যাপারটি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন?

শেরি ব্লেয়ার : এ বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন দেশের যেসব শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে তারা তাদের পার্থক্যগুলোকে আলাদা করে রাখে। এখানে অধ্যয়নরত মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, হিন্দু এবং অন্য ধর্মাবলম্বী তরুণীরা একসাথে মিলেমিশে থাকে। এভাবে তারা তাদের বৈচিত্র্যকে একসাথে মিশিয়ে নিজেদের অন্তর্নিহিত শক্তিকে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করে। তাদের মধ্যে দেশভিত্তিক, ধর্মভিত্তিক কোনো গ্রুপ নেই। তারা নিজেদের অভিজ্ঞতা, জ্ঞান একে অন্যের সাথে ভাগাভাগি করে এবং শিখে নিজেদের সমৃদ্ধ করে। ভিন্নতার কারণে কোনো ধরনের ভীতি তাদের মধ্যে কাজ করে না। এটি এ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অনন্য গুণ বলে মনে করি আমি। যে কারণে অনেক রক্ষণশীল পরিবারের মা-বাবাও তাদের মেয়েদের এ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করাতে নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।
এখানে এমন অনেক দেশের শিক্ষার্থী আছে যেসব দেশে দ্বন্দ্ব-সংঘাত চলছে কিংবা যুদ্ধবিধ্বস্ত। কিন্তু শিক্ষার্থীরা নিজেদের মধ্যে সেই জিনিসটি বোধ করে না। তারা একে অন্যের সাথে কোনোরকম পার্থক্য অনুভব করে না। শ্রীলংকায় তামিল ও সিংহলীদের মধ্যে সংঘাত শেষ হয়েছে অনেক আগে। আমি দেখেছি এখানকার কিছু শ্রীলংকার ছাত্রী গ্রীষ্মের ছুটিতে দেশে গিয়ে তামিল ও সিংহলীদের জন্য নার্সারি স্কুল চালু করেছে। জাতিগত পার্থক্যকে তারা মিলিয়ে দিয়েছে।
তাছাড়া কক্সবাজারে জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার সাথে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে কাজ করছে এ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করা ৫০ জন তরুণী। মোট কথা এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইম্যানে আমরা তাদের সব ধরনের পার্থক্য ভুলে উদার মানসিকতার শিক্ষাটাই দিতে চাইছি।

আজাদী : আপনার পরিচালিত শেরি ব্লেয়ার ফাউন্ডেশন এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইম্যানে কী ধরনের অবদান রাখে?

শেরি ব্লেয়ার : ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে প্রতিষ্ঠিত আমার এ ফাইন্ডেশনটি বিশ্বব্যাপী নারী উদ্যোক্তাদের নিয়ে কাজ করে থাকে। ফাউন্ডেশনটি তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠা ও সম্প্রসারণে কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সহ প্রশিক্ষণ, নেটওয়ার্কিং ইত্যাদি ব্যাপারে সহযোগিতা করে। আমাদের ‘গ্লোবাল মেনটরিং প্ল্যাটফর্ম’ নামে একটি কর্মসূচি আছে। এ কর্মসূচি আমরা যখন শুরু করি সেই পাইলট প্রকল্পে নিজেদের ব্যবসা শুরু করার ব্যাপারে আগ্রহী যারা যোগ দিয়েছিল সেই নারীদের মধ্যে কেউ কেউ ছিল এ চট্টগ্রামের এবং এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইম্যানের শিক্ষার্থী। আমার শেরি ব্লেয়ার ফাউন্ডেশনে বাংলাদেশে আরো কাজ করতে আগ্রহী। আমরা কিছু প্রকল্পের ব্যাপারে ভাবছি। বর্তমানে আমাদের ‘হারভেঞ্চার’ নামে একটি প্রোগ্রাম আছে। সেই প্রোগ্রামের মাধ্যমে কিছু করতে হলে আমাদের স্থানীয় মোবাইল ফোন অপারেটরদের সহযোগিতার প্রয়োজন হবে যারা এ নারী উদ্যোক্তাদের মোবাইল ফোনের মাধ্যমে তাদের ব্যবসা শুরু ও সম্প্রসারণের ব্যাপারে প্রশিক্ষণ নিতে সাহায্য করবে। এখান থেকে অর্জিত জ্ঞান নারী উদ্যোক্তারা তাদের ব্যবসা উন্নয়নে ব্যবহার করতে পারবে। ক্ষুদ্র ব্যবসার ব্যাপারে নারীরা এর মাধ্যমে উপকৃত হবে বলে আমরা আশা করি এবং এটি আমরা বাংলাদেশে আনতে চাই।

আজাদী : নারীরা বিশ্বব্যাপী কী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে বলে আপনি মনে করেন?

শেরি ব্লেয়ার : আমি মনে করি নারীরা বিশ্বব্যাপী যে সকল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন সেগুলো অনেকটা একইরকম। তবে স্পষ্টতই প্রত্যেক দেশ ও প্রত্যেক সংস্কৃতির নিজস্ব কিছু চ্যালেঞ্জ আছে। চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে একটি হলো নারীরা যেন পুরুষের সমান মর্যাদা পায় সেই সংগ্রাম। দুর্ভাগ্যবশত পৃথিবীতে অনেক স্থান ও ব্যক্তি আছে যারা নারীদের পুরুষদের সমান মর্যাদা দিতে চায় না। একটি পরিবারে ভাইয়েরা যে সুবিধা পায় বোন সেই সুবিধা পায় না। নারীরা যা পারবে তা পারবে না বলে মনে করে তাদেরকে নিরুৎসাহিত করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে তাদের দায়িত্ব হয়ে যায় দ্বিগুণ। যেমন, জীবিকা নির্বাহ করার জন্য দায়িত্বের পাশাপাশি তাদের ওপর থাকে সন্তান লালন-পালনসহ পরিবারের দেখাশোনা করার দায়িত্ব।

আজাদী : এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইম্যানের ব্যাপারে আপনার আশা ও স্বপ্ন কী?

শেরি ব্লেয়ার : আমার এখন স্বপ্ন হলো বিশ্ববিদ্যালয়টির নতুন ক্যাম্পাসটি গড়ে ওঠা। আমি আগেও অনেকবার বাংলাদেশে এসেছি, ক্যাম্পাসটিতে গিয়েছি। নতুন ক্যাম্পাসটিতে গিয়ে দেখেছি এটি সত্যিই দারুণ। এ ব্যাপারে সহযোগিতা করার জন্য আমি বাংলাদেশ সরকারকে ধন্যবাদ জানাই। এ বিশ্ববিদ্যালয়টির মাধ্যমে আমরা বিশ্বকে এ বার্তা দিতে চাই যে এটি একটি আঞ্চলিক বিশ্ববিদ্যালয় যা নারীদের ও তাদের শিক্ষাকে মূল্য দেয়।

x