অপহরণ

ফজলুল হক

শুক্রবার , ১ জুন, ২০১৮ at ৫:৪৮ পূর্বাহ্ণ
57

আমার নাম সূর্য। আমি এই গল্পের নায়ক। এই গল্প লেখক খামখেয়ালী মানুষ। উনি আমাকে সৃষ্টি করেন, মেরে ফেলার জন্য। আমি ত্যাক্তবিরক্ত। মৃত্যুকে আমি ঘৃনা করি। ভয় পাই। রাতে ঘুম হয়না। মৃত্যুর কি প্রয়োজন ছিল? জন্ম ও মৃত্যু এই খেলার প্রয়োজনটা কি? বাগান থেকে হাসনেহেনার সুবাস আসছে। বাগানে অনেক ফুল ফুটেছে। মালতি, গন্ধরাজ, মেহেন্দীর ফুল, গোলাপ, বেলী, টগর, জবা, ক্যাকটাস, রন্‌গনআর বলতে পারতেছিনা, সব মনে আসতেছেনা, অনেক ফুল। ফুলেরপাগল করা গন্ধ। “ফুলের গন্ধে ঘুম আসেনা একলা জেগে রই।” বাথরুমে ঢুকি। মুখে পানির ঝাপটা দিই। বাথরুমেও ফুলের সুগন্ধ। কিছু ফুল রাতে গন্ধ ছড়ায়। কিছু ফুল হাসে। আমার স্ত্রীর ঘুম ভেঙে যায়। বলে, সুর্য? তুমি ঘুমোচ্ছনা কেন? আমি বলি, ফুলের সুবাস পান করছি। জানালা দিয়ে নীচে তাকাই। বাগানকে অন্য রকম লাগছে। বাগান হাসছে। আমার স্ত্রী ঘুম জড়িত কণ্ঠে বলে, নীচে যেয়োনা। বিশাল ডুপ্লেক্স ঘরে আমরা দুজন থাকি। আমার স্ত্রী বলে, সূর্য? তুমি আবার ঘুমের মধ্যে হাঁটছ? হেঁটে নীচে যাচ্ছ? ছাদের উপর পায়ের শব্দ। টুপটাপ, টুপটাপ। চারটা পাখি ছাদে হাঁটছে। টুপটাপ,টুপটাপ। আবার এসেছে পাখি। এরা বাগানে থাকে। চারটা পাখি। কোথা থেকে এরা বাগানে আসে? আমার স্ত্রী বিশ্বাস করে মানুষ মরলে, পাখি হয়ে যায়।

আমি নীচে নামি। বাগানকে অদ্ভুদ মনে হয়। আমি “অলৌকিক”, “অপার্থিব” শব্দ ব্যবহার করতে চাচ্ছিনা। কিন্তু অবস্থা তাই। ফুল গুলো হাসছে। হি হি হি । একি? দেখি কয়েকজন লোক বাগানে পায়চারি করছে। অলৌকিক লোক। তোমরা কারা? একজন এগিয়ে এল, আমি হচ্ছিতুপস্তান, এরা হচ্ছে, পরহামুনে চেক্‌, আদিআব্বা এবং বাসিলিয়া। তোমরা চারজন বন্ধু? হ্যাঁ। এখানে কি করছ? সূর্য, আমরা তোমাকে নিতে এসেছি। কোথায় নেবে? সেটা না গেলে তুমি বুঝবেনা। কতদিনের জন্য যাব? যেখানে যাবে, সেখানে দিনরাত নাই। গেলে আর আসতে পারবেনা। তোমরা কি সেখানে চলে গেছ? হ্যাঁ। কিভাবে গিয়েছ? স্টোরী কি?

তুপস্তান বলে, আমি হিমালয়ের পাদদেশে এক গ্রামের সন্তান। আমি মেষ, ভেড়ার পাল পাহাড়া দিতাম। আমার বাবার ঘোড়ায় চড়ে দিগন্ত বিস্তৃত প্রান্তরে ঘুরতাম। একদিন ভেড়ার পালে হামলা করল বাঘ। সে ভেড়ার সাথে আমাকেও খেয়ে ফেলল।

পরহামুনে চেক্‌ বলল, আমার বাড়ি তেহরানে। আমি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে এক যোদ্ধা। আমি ভিয়েতনামে যুদ্ধ করেছি, মার্কিন সেনা কতল করেছি। ফিলিস্তিনে, লেবাননে, সিরিয়াতে, ইরাকে, লিবিয়াতে আমি মার্কিনীদের মেরেছি। আমি মার্কিন দালালদের ঘৃণা করি। ফিলিস্তিনে এক ড্রোন হামলায় ওরা আমাকে মেরে ফেলে। স্প্রিন্টার ও গুলি লেগেছিল আমার বুকেপিঠে নয়। যোদ্ধা পৃষ্টপ্রদর্শন করেনা।

আদিআব্বা বলল, আমি হিন্দুস্তানের এক গ্রামের ছেলে। ভীষণ দরিদ্র আমরা। সারাদিন খাটলে দশ রুপী পেতাম। শাইনিং ইন্ডিয়া, ডিজিটাল বাংলাদেশের গ্রামে এখনো মানুষ অনাহারে থাকে। আমার জন্ডিস ধরা পড়ল। আমি ওঝা দেখালাম। ওই চিকিৎসায় আমার মওত হলো। ডাইড উইদ আউট কেয়ার। আমার লিভার পঁচে গিয়েছিল। হেপাটাইটিসবি। আমাদের টাকা ছিলনা। বিজ্ঞান প্রযুক্তি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবাগ্লোবাল ভিলেজ টাকাওয়ালাদের দখলে। এ সমাজের সকল অর্জন কড়ি দিয়ে কেনা যায়। শোষকআমার দুশমন।

বাসিলিয়া বলল, আমার নাম বাসু। সূর্য, তুমি কি কোন বাসুকে মনে করতে পারছ? সূর্য বলে, হ্যাঁ পারছি। একাত্তরের রনাঙ্গনে একটা অপারেশনে যাচ্ছি, আমাদের কমান্ডার বলল, শোন, কুকুর ঘেউ ঘেউ করছে। এলার্ট হও। তারপর দেখা গেল খাঁকি ড্রেস, আমার মনে হলো, এরা আর্মি না, ওয়াচম্যান। কিন্তু তার পেছনে আর্মি ট্রাক দেখা যাচ্ছে, সৈন্যরা নামছে। পাক বাহিনীর কনভয়, হেভী আর্মস। কমান্ডার বলল, ওদের সংখ্যা বেশী। আগে হাইড কর, দ্যান এ্যাটাক। আমাদের কৌশল হচ্ছে, হিট্‌, রান্‌ এন্ড কিল। আমরাতো মরতেই এসেছি। আমরা একটা বাড়িতে ঢুকলাম। বাড়ির লোকেরা দা বল্লম, টেটা নিয়ে প্রস্তুত। এক মেয়ে বল্ল, মেরে মরব। আমরা ছড়িয়ে পড়লাম। আমি রেকি করার জন্য ঘরের দমদমায় উঠলাম। দমদমা হচ্ছে, টিনের ঘরে, ঘর এবং চালের মধ্যখানের ফাঁকা যায়গা। দমদমায় উঠে চালের ফাঁক দিয়ে তাকাতেই দেখি, কয়েকজন সৈন্য বাড়িতে ঢুকে পড়েছে। হঠাৎ পেছনে কোন মানুষের অস্তিত্ব অনুভব করি। কে? এক মেয়ে। এখানে কি করছ? সে বলে, মা বাবা আমাকে এখানে লুকোতে বলেছে। সুন্দরী মেয়ে দেখলে নাপাক পাকসেনা তাকে ধরে নিয়ে যায়। মেয়েটির হাতে বল্লম। এটা কি? সে বলে, এটা বল্লম, মেরে তারপর মরব। তোমার নাম কি? বাসু। কি কর? ক্লাস টেনে পড়ি। বাসুতুমি ভয় পেয়োনা। এটা কি দেখছ? এটা সাবমেশিনগান। এর ম্যাগজিনে ২৭টা গুলি আছে। নাইন এম এম সাইজের। এর সামনে পাকিস্তান কুপোকাৎ। বল, পাকিস্তান মুর্দাবাদ। বাসু চিৎকার করে বলে, পাকিস্তান নিপাত যাক। পাকিস্তান মুর্দাবাদ। পাক কমান্ডার অবাক।’ কার এত সাহস পাকিস্তানকে অবমাননা করে? পাক সেনারা ফায়ার ওপেন করল, ওপরমে কৌন হ্যায়? ঠ্যা ঠ্যাএলোমেলো গুলি আসছে। আমি সূর্য। দেরাদুনে ট্রেনিং নিয়েছি। এসএমজি লোড্‌ করা আছে। চকচকে নতুন অ্যামুনেশন ভরেছি। ব্যারেল ও নলে ফুল থ্রো মেরেছি। ২টা গ্রেনেড সাথে নিয়েছি। বেড়ার ফাঁকে এক মোচওয়ালাকে টার্গেট করে রিপিট ট্রিগার টিপি। অটোতে যাবোনা। মোচুয়া পড়ে যায়। শুরু হয়ে যায় গুলির বন্যা। আমি নীচে নামি। দুটো গ্রেনেড আমাকে চার্জ করতে হয়েছিল নীচে নেমে। তাদের পুরো কনভয় উড়িয়ে দিয়েছিলাম। শালা। পাঞ্জাবী কুত্তার বাচ্চা। বাসুর শরীরে গুলি লেগেছিল। বাসুর ঘাড়ের একটা অংশ উড়ে গিয়েছিল। হাইড আউটে বসে বাসু আমাকে বলেছিল, সুর্য, আমি দেখতে কেমন? আমি বলেছিলাম, অঞ্ঝরী। সে বলেছিল, তাইতো মা আমাকে আড়াল করে রেখেছে। আচ্ছা সূর্য, যদি দেশ স্বাধীন হয়, আমরা বেঁচে থাকি, তুমি কোনদিন আমাকে দেখতে আসবে? আমি বলেছি, আসব। বাসু বলেছিল, প্রমিজ কর। আমি বলেছিলাম, প্রমিজ।বাসুর শরীর থেকে রক্ত ঝরছে।

বাসিলিয়া বলল, তুমি কি আর কখনো আমার কথা ভেবেছিলে? সূর্য বলে, ঘাড় বাঁকা কর। এই যে তোমার ঘাড়ে গুলির দাগ। বাসিলিয়াবাসু? তুমি আমার লাল সূর্য। আমি যখন আকাশের পানে তাকাই তোমার কথা মনে পড়ে। কেন আমি আকাশের তারা দেখি? কেউ জানেনা।

বাসিলিয়া বলে, তোমাকে নিয়ে যাব। কি ভাবে মরতে চাও? ক্রসফায়ারে না, জলাবদ্ধতার পানিতে ডুবে? এখন পাক সেনা নাই। তবুও এদেশে বা সারা বিশ্বে স্বাভাবিক মৃত্যুর নিশ্চয়তা নাই। বৃষ্টি হলে, শহর ডুবে যাবে। পানির স্রোতে সব ভেসে যাবে। তুমি জলাবদ্ধতার গলা জলে ঝাঁপ দিতে পার। অথবা বন্দুক যুদ্ধে মৃত্যু বরণ করতে পার। প্রতিবাদী হওয়ার বিপদ আছে। ক্রসফায়ারের ঝুঁকি আছে। যে ভাবে মর, মরতে তো হবেই। আমরা তোমাকে না নিয়ে যাবোনা। মৃত্যু একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, যা তোমাকে অন্য জগতে নিয়ে যেতে পারে। বাঘমানুষ খায়, কারণ সে পশু। মার্কিনীরা মানুষ মারে, শোষকরা মানুষের আয় ছিনিয়ে নেয়। মানুষ রোগে শোকে অনাহারে মরে। শোষকমানুষের সামর্থ খেয়ে ফেলে। মার্কিনীরাও শোষকরা কি পশু? পুরো শহর বর্ষার পানিতে ভাসেযারা শহর চালায়তারা কি মানুষ নয়? মানুষকে বিনা বিচারে মারা হয়যারা মারে, তারা কি মানুষ নয়? এসব প্রশ্নের উত্তর জানা নাই।

বাসিলিয়া ও সূর্য একে অপরের হাত ধরে। বাসু? হুঁ? এসব কি হচ্ছে? তুপস্তান, আদিআব্বা, পরহামুনে চেক্‌ এক আশ্চর্য্য বাহনে উঠে যায়। ওই খানে উঠতে বাসিলিয়া পা বাড়ায়। বাসুর এক হাত সূর্য শক্ত কেের ধরে রেখেছে। কিছু একটা হাতড়াচ্ছে সূর্যের আরেক হাত। এই হাত ছাড়িবনা। সূর্য বলে। সূর্য উপরে উঠে যাচ্ছে। বাসু কখনো সূর্যের হাত ছাড়বেনা। বাসুর রক্ত লেগে আছে, সবুজের মাঝে লাল বৃত্ত হয়ে। বাসু আছে আমাদের পতাকায়। একাত্তরে বাসুর রক্তে লাল হয়েছে এদেশের মাটি। সে লাল বৃত্তের ভেতরে লুকানো আছে নাইন এম এম সাব মেশিনগান, পিইকে এক্সপ্লোসিভ, ডেটনেটর লাগানো একটিভ গ্রেনেড।সূর্য উপরের দিকে উঠে যাচ্ছে। সূর্যের স্ত্রী ছাদে টুপটাপপায়ের শব্দ শুনতে পাচ্ছে। ছাদে পাঁচটি পাখি হাঁটছেটুপটাপ, টুপটাপ। সূর্যের স্ত্রী দেখে বিছানা খালি। সূর্য কোথায়? ছাদে পাঁচটি পাখির পায়ের শব্দ শোনা যায়টুপটাপ, টুপটাপ। সূর্য কোথায়? তাকে কারা জানি নিয়ে গেছে। কারা নিয়ে গেছে? পরের দিন সূর্যের স্ত্রী থানায় যায়, জিডি করতে। পত্রিকা সংবাদ ছাপে “সূর্য নিখোঁজ” সূর্যের স্ত্রীর সন্দেহের তালিকায় আছে, চারটি পাখি।

লেখক : সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ, অধ্যক্ষ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ

x