সংসদ বিলুপ্তিসহ ১০ দফা বিএনপির

ঢাকায় সমাবেশ ১৩ ডিসেম্বর মিছিল-সমাবেশ ২৪ ডিসেম্বর গণমিছিল

আজাদী ডেস্ক | রবিবার , ১১ ডিসেম্বর, ২০২২ at ৮:১০ পূর্বাহ্ণ

 

কথার লড়াই থেকে সহিংসতার পর বিএনপির ১০ ডিসেম্বরের সমাবেশ নিয়ে উত্তেজনার পারদ চড়লেও গোলযোগহীনভাবেই তা শেষ হলো। গতকাল রাজধানীর গোলাপবাগের এই সমাবেশ থেকে সরকার হটাতে জাতীয় সংসদ বিলুপ্তিসহ ১০ দফা ঘোষণা করেছে দলটি। এই দাবিগুলো তারা আগেও জানিয়ে আসছিল। তবে সমাবেশ থেকে বিএনপির সংসদ সদস্যদের পদত্যাগের ঘোষণা আসে। আর ১০ দফা দাবি আদায়ে যুগপৎ আন্দোলনের কর্মসূচি হিসেবে আগামী ২৪ ডিসেম্বর গণমিছিল করবে বিএনপি। ঢাকাসহ সারা দেশে এই মিছিল হবে।

মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বন্দি থাকায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন ১০ দফা ঘোষণা করে বলেন, এই ১০ দফা গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের দফা। এই দাবি জনগণের দাবি, এটা মানুষের দাবি। আমরা এদেশের সকল জনগণকে এই ১০ দফা দাবির সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে আগামী ২৪ ডিসেম্বর গণমিছিলের

কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছি। খবর বিডিনিউজের।

সংসদ নির্বাচনের এক বছর আগে বিভাগীয় শহরগুলোতে সমাবেশের পর ১০ ডিসেম্বর ঢাকায় সমাবেশের কর্মসূচি গত অক্টোবরে দিয়েছিল বিএনপি। এই কর্মসূচি থেকে সরকার পতনের চূড়ান্ত কর্মসূচি দেওয়া হবেএমন ঘোষণার পর দলটির কোনো কোনো নেতা এমনও বলেছিলেন, ১০ ডিসেম্বরের পর দেশ বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নির্দেশে চলবে।

তা নিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতাদের নিয়ে শুরু হয় বিএনপি নেতাদের কথার লড়াই। এরপর ঢাকার সমাবেশস্থল নিয়ে বাঁধে গোল। বিএনপি নয়াপল্টনে দলীয় কার্যালয়ে সমাবেশটি করতে চাইলেও বাধা হয়ে দাঁড়ায় পুলিশ। এর মধ্যে গত বুধবার নয়াপল্টনে দলীয় কার্যালয়ের সামনে জড়ো হওয়া বিএনপিকর্মীদের ওপর চড়াও হয় পুলিশ। তখন সংঘর্ষে নিহত হয় একজন, আহত হয় অনেকে।

এরপর পুলিশ তল্লাশি চালাতে ঢুকে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে, সেখান থেকে কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতাসহ কয়েকশ নেতাকর্মীকে ধরে নিয়ে যায়। পরদিন বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করা হয় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল এবং স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসকে। এর মধ্যেই সমাবেশের স্থান নিয়ে নাটকীয়তা চলতে থাকে। শেষে আগের দিন সায়েদাবাদের পাশের গোলাপবাগ মাঠটিতে বিএনপিকে সমাবেশের অনুমতি দেওয়া হয়।

অনুমতি পাওয়ার পরপরই বিএনপির নেতাকর্মীরা সিটি করপোরেশনের সেই মাঠে জড়ো হতে থাকেন, অনেকে রাতও কাটান সেখানেই। গতকাল সকাল থেকে আরও মিছিল আসতে থাকে; তারপর দুপুরে সমাবেশে বক্তৃতা শুরু হয়ে বিকালে তা শেষ হয়।

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও দলের স্থায়ী কমিটির পক্ষ থেকে এই ১০ দফা উপস্থাপন করার কথা জানিয়ে খন্দকার মোশাররফ বলেন, এই দফাগুলো নিয়ে যুগপৎ আন্দোলনকারী বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মতামত ও সম্মতি নেওয়া হয়েছে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে এই ১০ দফার প্রতি একাত্মতা ঘোষণার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা আশা করি, এই দফার সাথে তারাও একাত্মতা ঘোষণা করবেন। তারা আগামী দিনে এই ১০ দফা আদায়ের লক্ষ্যে প্রতিটি আন্দোলন কর্মসূচি আমরা যুগপৎভাবে পালন করব। এই সরকারকে বিদায় দেওয়ার জন্য ধৈর্য সহকারে আপনারা আমাদের এই আন্দোলন কর্মসূচিকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন।

বিএনপির মহাসচিব ফখরুল, স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসহ গ্রেপ্তার নেতাকর্মীদের মুক্তি এবং পুলিশের হামলায় একজন নিহত হওয়ার প্রতিবাদে আগামী ১৩ ডিসেম্বর ঢাকাসহ সব মহানগরী ও বিভাগীয় সদরে বিক্ষোভ মিছিলসমাবেশের কর্মসূচিও ঘোষণা করেন তিনি।

গোলাপবাগ মাঠ ছাড়িয়ে মাঠ ছাড়িয়ে সায়েদাবাদ, কমলাপুর স্টেডিয়াম পর্যন্ত পুরো সড়কে ছড়িয়েছিল সমাবেশের বিস্তৃতি। সমবেত নেতাকর্মীরা মুহুর্মুহু স্লোগানে মাতিয়ে রেখেছিলেন সমাবেশস্থল। তাদের হাতে ছিল নানা প্ল্যাকার্ড, সমাবেশ মাঠে বেশ কিছু বেলুনও ওড়ানো হয়।

সমাবেশকে ঘিরে সায়েদাবাদ বাসস্ট্যান্ডসহ বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক পুলিশ, র‌্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন ছিল। সাঁজোয়া যান, জল কামান, প্রিজন ভ্যানসহ বিভিন্ন যান রাখা ছিল বিভিন্ন মোড়ে।

নয়াপল্টনের বিএনপির কার্যালয় এদিন পুলিশ অবরুদ্ধ করে রেখেছিল। আবার ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের নেতারা অবস্থান নিয়ে সমাবেশমুখী মানুষদের বাধা দিয়েছে বলেও বিএনপির নেতাকর্মীদের অভিযোগ। সারা ঢাকায় গণপরিবহনও ছিল কার্যত বন্ধ।

সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে খন্দকার মোশাররফ দমনপীড়নের চিত্র তুলে ধরে বলেন, অতীতে ৯টি সমাবেশ করেছি, সেগুলোতে সরকার বাধার সৃষ্টি করেছে। ওই সমাবেশে পরিবহন ধর্মঘট দিয়ে আমাদের নেতাকর্মীরা যাতে সমাবেশে উপস্থিত না হতে পারে তার ব্যবস্থা করেছে। কিন্তু সরকারের এত বাধাবিপত্তি সত্ত্বেও মানুষ নদী সাঁতরিয়ে, ভেলাতে পার হয়ে, সাইকেলে, হেঁটে ওইসব সমাবেশগুলোকে সফল করেছে। আজকেও সরকার এই সমাবেশকে বাধা দিতে চেয়েছিল। কিন্তু ঢাকা বিভাগের সাধারণ মানুষ এই সমাবেশে অংশ নিয়ে সরকারের রক্তচক্ষুর জবাব দিয়েছে। সারা দেশের জনগণ বার্তা দিয়েছে, এই সরকারকে আর ক্ষমতায় দেখতে চায় না, অনতিবিলম্বে এই সরকারের বিদায় দেখতে চায়।

স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় সমাবেশে বলেন, তারা (সরকার) বলে, নয়াপল্টনের সড়কে যদি বিএনপিকে সমাবেশ করতে দেয়, তাহলে নাকি জনদুর্ভোগ হবে। অথচ পাঁচদিন যাবত পল্টনের রাস্তা দিয়ে মানুষ যেতে দেয় না, গাড়ি চলে না, দোকানপাট, বিপণি বিতান, মার্কেট বন্ধ। এই দুর্ভোগ কে সৃষ্টি করল? আমরা আগে বলেছি, আমরা কোনো কাজ রাতে করি না, দিনে করি। আমরা কোনো কাজ গোপনে করি না, প্রকাশ্যে করি। আমরা বলেছি ১০ তারিখে সমাবেশ থেকে বলব, আপনারা কোন পথে যাবেন, আর যদি না যান আপনাকে তাড়ানোর জন্য, বিদায় দেওয়ার জন্য আমরা সক্রিয়সচেষ্ট হব।

সমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক আমানউল্লাহ আমান বলেন, এই শান্তিপূর্ণ সমাবেশ সফল করে আপনারা আজকে সরকারকে সমুচিত জবাব দিয়েছেন। এজন্য আপনাদের অভিনন্দন জানাই, সালাম জানাই। একই সঙ্গে বলতে চাই, স্থায়ী কমিটির সিদ্ধান্ত জানাতে চাই, এই সমাবেশ শেষ হওয়ার পর আপনারা যার যার বাড়িতে চলে যাবেন।

ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সদস্য সচিব রফিকুল আলম মজনু ও উত্তরের সদস্য সচিব আমিনুল হকের সঞ্চালনায় সমাবেশে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য জমির উদ্দিন সরকার, আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমানসহ নেতৃবৃন্দ বক্তব্য দেন।

গোলাপবাগে বিএনপি, মোড়ে মোড়ে আওয়ামী লীগ : রাজধানীর সায়েদাবাদের গোলাপবাগে বিএনপির সমাবেশের দিন ঢাকার মোড়ে মোড়ে অবস্থানে ছিল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। বিএনপির নাশকতার যে কোনো চেষ্টা প্রতিরোধ করতেই এই অবস্থান বলে ক্ষমতাসীন দলটির নেতাদের দাবি। তবে বিএনপির কর্মীরা অভিযোগ করেছেন, তাদের সমাবেশে যেতে বাধা দিতেই এই কর্মসূচি নিয়ে নামে ক্ষমতাসীন দলটি।

বিএনপির সমাবেশের দিন ‘খেলা হবে’ স্লোগানে উত্তেজনার পারদ তোলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ১০ ডিসেম্বর নেতাকর্মীদের সতর্ক থাকতে বলেছিলেন। সেই নির্দেশনায় গতকাল সকাল থেকে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় মিছিল বের করেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী। বিভিন্ন মোড় ও গলির মুখে তাদের লাঠিসোঁটা নিয়েও অবস্থান দেখা যায়। তারা বিভিন্নজনকে তল্লাশিও করছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমন তল্লাশিতে ৫ জনকে ধরে পুলিশে তুলে দেয় ছাত্রলীগ।

দুপুরে বিভিন্ন এলাকা থেকে খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে জড়ো হতে থাকেন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা। সেখানে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া সকাল থেকেই বসে ছিলেন।

তিনি সাংবাদিকদের বলেন, আপনারা জানেন আজ ১০ ডিসেম্বর, বিজয়ের মাস। বিএনপি ও স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি ঐক্যবদ্ধভাবে এই মাসের পবিত্রতা নষ্ট করার চেষ্টা করছে। আপনাদের দোয়ায় শেখ হাসিনার সঠিক সিদ্ধান্তে তাদের এই ষড়যন্ত্র ভেস্তে গেছে। তারা বলেছে, ১০ ডিসেম্বর তারা নাকি ঢাকা শহর দখল করবে। আজ খালেদা জিয়া সরকার দখল করবে। এই পরিকল্পনা নিয়ে তারা সন্ত্রাসী কায়দায় এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল। ঢাকাবাসীসহ সারা বাংলাদেশের মানুষ তাদের এই স্বপ্ন চুরমার করে দিয়েছে।

যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, কৃষক লীগের শীর্ষ নেতারা বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে এলেও ঢাকা মহানগর উত্তর দক্ষিণ শাখা ঢাকার বিভিন্ন গুরুত্ব পূর্ণ স্থানে অবস্থান নিয়ে ছিলেন।

পূর্ববর্তী নিবন্ধপাকিস্তানের পরাজয় ঠেকাতে মরিয়া যুক্তরাষ্ট্র
পরবর্তী নিবন্ধবোয়ালখালী আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে সমঝোতায় সভাপতি-সম্পাদক নির্বাচিত