শিক্ষার্থীরা হলো শিক্ষকের মানস সন্তান। শিক্ষকের সাথে শিক্ষার্থীদের সম্পর্ক পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, আস্থা ও বন্ধুত্বের ওপর প্রতিষ্ঠিত। শিক্ষক হলেন সকল প্রেরণার উৎস, পথপ্রদর্শক ও সহায়ক। শিক্ষার্থীর মানসিক বিকাশ, চারিত্রিক দৃঢ়তা ও বুদ্ধিবৃত্তি বিকাশের হাতিয়ার হলেন শিক্ষক। দেশ ও জাতির বিনির্মাণের এইসব কারিগর ও আলোর দিশারিরা নিজেদের ব্যক্তিজীবন নিয়ে মোটেও তেমন ভাবেন না। যতটা ভাবেন তার শিক্ষার্থীদের নিয়ে। শিক্ষার্থীর কাছে শিক্ষক আশা করেন সদাচরণ ও সৎ স্বভাব। শিক্ষার্থী যখন সাফল্যের সাথে জীবন গঠনে এগিয়ে যায় তখন সবচেয়ে খুশি হন তার শিক্ষক। শিক্ষকের অন্তঃকরণ থেকেই শিক্ষার্থীর জন্য আশীর্বাদ থাকে, প্রার্থনা থাকে। অপরদিকে শিক্ষার্থীর অমার্জনীয় ও সভ্যতা বিবর্জিত ব্যবহার শিক্ষকের মনে চরম আঘাত হানে। শিক্ষার্থীর দুর্বিনীত আচরণ শিক্ষককে নিদারুণ হতাশা ও কষ্টে ভোগায়। যে শিক্ষক একজন শিক্ষার্থীর হাতে কলম তুলে দিয়েছেন, সময়ের বিপরীত স্রোতে সেই ছাত্র নিজ হাতে শিক্ষককে জুতোর মালা পরিয়েছে। এই হল সভ্যজগতের এক কলঙ্কিত অধ্যায়।
বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে কলেজ, মাধ্যমিক স্কুল, নিম্ন মাধ্যমিক এমনকি গলির মুখে অবস্থিত স্কুলের অবুঝ ছাত্রটিও এক নতুন খেলায় মেতে উঠেছিল। শিক্ষকের অবমাননা, জোরপূর্বক শিক্ষককে পদত্যাগে বাধ্য করা, টেনে হিঁচড়ে শিক্ষককে আসন থেকে তুলে দেওয়া, হেনস্থা করা– এ যেন এক শিক্ষাবিমুখ অন্ধকার জগত গঠনের পাঁয়তারা। কাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন, ‘আঘাত করার একটা সীমা আছে। সেটাকে অতিক্রম করলে আঘাত অসুন্দর হয়ে আসে আর তক্ষুণিই তার নাম হয় অবমাননা’। লজ্জায় অপমানে মৃত্যুবরণ করা সেইসব শিক্ষকের মৃত্যুর দায় কে নেবে? এই জাতি কীভাবে শোধ করবে শিক্ষকের ঋণ? পিতৃস্নেহে মাতৃস্নেহে লালন করা সেইসব কলঙ্কিত সন্তানরা আজ কোথায়? নিয়ন্ত্রণহীন অভিভাবকদের ফসল এইসব সন্তানেরা দেশ–জাতির কলঙ্ক ও অভিশাপ। আমরা প্রতিনিয়ত নিত্য নতুন ইতিহাসের জন্ম দিয়ে যাচ্ছি। শিক্ষকদের অযাচিত লাঞ্ছনা ও অবমাননার এই নাটক ইতিহাসের নতুন সংযোজন।
পৃথিবীতে কোন জাতিকে ধ্বংস করতে হলে সেই জাতির শিক্ষাব্যবস্থাকে প্রথমে টার্গেট করা হয়। ধ্বংস করার সেই তাগিদ থেকেই যদি শিক্ষকদের অবমাননা করা হয়, তাহলে বলতে হবে ‘পথিক, তুমি পথ হারাইয়াছো’! মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সমৃদ্ধ বাংলাদেশ এবং সচেতন সমাজ এখনো পথ হারায়নি। ক্ষণিকের উল্লাসে মত্ত ছাত্র নামের কলঙ্কিত সেই অমানুষগুলোকে খুঁজে যোগ্য শাস্তির আওতায় আনতে হবে। শিক্ষকদের যথাযোগ্য সম্মানের সাথে সপদে বহাল করতে হবে। অসম্মান, অপমান, লজ্জায় যে সকল শিক্ষক ধুঁকে ধুঁকে মরেছেন, তাদের পরিবারের প্রতি সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। তবে হয়তো মৃত ব্যক্তিদের আত্মা শান্তি পাবে। শিক্ষকরা তাদের ছাত্রদের অভিশাপ দেন না। কিন্তু কষ্ট বা অপমান চরমে পৌঁছে গেলে তা হয়তো বিধাতাও ক্ষমা করতে পারেন না। এদেশের মাটিতে আর শিক্ষার অপমান আমরা চাই না। এদেশের মাটিতে আর একজন শিক্ষকেরও অপমান বা হেনস্তা চাইনা। শুধু চাই শিক্ষকদের সম্মান ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা বিধান। দেশ ও জাতির অগ্রগতিতে শিক্ষার সাথে সাথে শিক্ষক শিক্ষার্থীর সম্পর্কেরও বিরাট ভূমিকা রয়েছে। এই সমাজে শিক্ষক মহৎ সেবা দানে নিয়োজিত। তার এই সেবা অর্থ দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। বাবা মা সন্তানকে জন্ম ও প্রতিপালনের গুরুদাত্ব পালন করেন ঠিকই। কিন্তু সে সন্তানকে শিক্ষিত করার যথার্থ দায়িত্ব পালন করেন শিক্ষক। তাই শিক্ষককে তার যথাযোগ্য মর্যাদা দেয়া হবে, এই আশা পোষণ করি। পরিশেষে ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)’র ভাষায় বলব– ‘শিক্ষক হলেন মানুষের আত্মার চিকিৎসক। শিক্ষক যদি সঠিক হন তবে সমাজ সঠিক পথে পরিচালিত হবে’।
লেখক : শিক্ষক, গল্পকার, সংগীতশিল্পী।











