বনবিট কার্যালয়ের কাছেই পাহাড় কেটে মাটি লুট

চকরিয়ার বানিয়ারছড়া স্টেশনের অদূরে আমতলীর পূর্বাংশে ঘটনা

ছোটন কান্তি নাথ, চকরিয়া | শনিবার , ১৬ মার্চ, ২০২৪ at ৪:৩৫ পূর্বাহ্ণ

চকরিয়ায় প্রায় এক একর আয়তনের একটি বিশাল পাহাড় সাবাড় করে প্রতিনিয়িত মাটি লুট করছে সংঘবদ্ধ পাহাড়খেকো চক্র। বনবিট কার্যালয়ের একেবারে নাকের ডগায় পরিবেশ বিধ্বংসী এমন কর্মকাণ্ড সংঘটিত হলেও রহস্যজনক কারণে একেবারে নীরবতা পালন করছেন বনবিভাগ। এতে সংঘবদ্ধ পাহাড়খেকো চক্রটি ওই পাহাড়ের চারিদিকে কালো পলিথিনের বেড়া দিয়ে এক্সকেভেটর ব্যবহার করে বিশাল এই পাহাড়টি সাবাড় করে চলেছে।

চট্টগ্রামকক্সবাজার মহাসড়কের চকরিয়ার বানিয়ারছড়া স্টেশনের অদূরে আমতলী নামক স্থানের পূর্বাংশে এই বিশাল পাহাড়টির অবস্থান। ওই এলাকাটি মহেশখালীয়া পাড়া নামেও পরিচিত। সেখানে ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল সংঘটিত মহাপ্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় হ্যারিকেন উপকূলে আঘাত হানার পর থেকে বনভূমিতে জনবসতি গড়ে উঠতে শুরু করে। বর্তমানে সেখানে ঘূর্ণিঝড়ে বাড়িঘর হারানো মহেশখালী উপজেলার শত শত বাসিন্দা বসতি স্থাপন করে পরিবার নিয়ে রয়েছেন। এজন্য সেই স্থানটি এখন মহেশখালী পাড়া হিসেবে পরিচিত এবং সেই বনভূমিটি চকরিয়া উপজেলার বরইতলী বনবিটের অধীনস্থ। তবে বনবিভাগ দাবি করেছে, সাবাড় করে ফেলা পাহাড়টি সংরক্ষিত বনভূমির হলেও তা নিজের বিটের আওতাধীন নয়। তাই প্রথমদিকে পাহাড় সাবাড়ের খবর পেয়ে অভিযান চালিয়ে পরিবেশ বিধ্বংসী কর্মকাণ্ড বন্ধ করে দেওয়া হয়। কিন্তু সেই বনভূমি পার্বত্য বান্দরবানের লামা উপজেলার ফাইতং অংশ হওয়ায় দাপ্তরিকভাবে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না। এমনটিই দাবি করেছে চট্টগ্রাম দক্ষিণ বনবিভাগের চুনতি রেঞ্জের অধীনস্থ বরইতলী বনবিট কর্মকর্তা হাসান উজজামান।

সরেজমিন পাহাড় সাবাড়ের এমন দৃশ্য ধারণের পর বরইতলী বনবিট কর্মকর্তার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের বিট কার্যালয়ে জনবল রয়েছে আমিসহ মাত্র তিনজন। এরপরও কার্যালয়ের অদূরে পাহাড় সাবাড়ের খবর পাওয়া মাত্রই সেখানে গিয়ে পাহাড় কাটা বন্ধ করা হয়। এরপর ট্রেসম্যাপ দেখে নিশ্চিত হই পাহাড়ের ওই অংশটি পার্বত্য বান্দরবানের লামার ফাইতংয়ের অংশ। তাই ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও পাহাড় খেকোদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি।

প্রায় ২০ ফুট উঁচু বিশাল আয়তনের এই পাহাড় তাহলে কারা কাটছে? এমন প্রশ্ন করা হলে বিট কর্মকর্তা বলেন, তিনি খবর নিয়ে জানতে পেরেছেন লামা উপজেলার ফাইতং ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী একাধিক নেতার নেতৃত্বে পাহাড় সাবাড় করে ড্রাম্পার ট্রাকভর্তি করে মাটি অন্যত্র বিক্রি করা হচ্ছে। তবে প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতাদের একজনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি দাবি করেন, পাহাড় সাবাড় করার মতো পরিবেশ বিধ্বংসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তিনিসহ আওয়ামী লীগের কেউই জড়িত নয়। তাহলে কারা পাহাড়টি সাবাড় করছেন, সেই প্রশ্নের কোনো সদুত্তর তিনি দেননি।

বানিয়ারছড়ার স্থানীয় প্রবীণ একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা হয় সাবাড় করা পাহাড়টির প্রকৃত অবস্থান তথা কোন উপজেলায় পড়েছে তা নিয়ে। এ সময় তারা সবাই দাবি করেছেন, যে পাহাড়টি এক্সকেভেটর দিয়ে কেটে সাবাড়ের পর ডাম্প ট্রাকভর্তি করে মাটি লুট করা হচ্ছে তা চকরিয়া উপজেলার বরইতলী ইউনিয়নেরই অংশ। সেটি মহেশখালী পাড়া হিসেবে পরিচিত।

তারা আরও বলেন, কোনো অবস্থাতেই বনভূমিসহ মহেশখালী পাড়াটি পার্বত্য বান্দরবানের লামা উপজেলার ফাইতং ইউনিয়নের অংশ নয়। শুধুমাত্র প্রভাবশালীদের সঙ্গে পেরে উঠবে না জেনে অথবা অনৈতিক সুবিধা নিয়ে পাহাড় সাবাড়ের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। তাই প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে বিশাল পাহাড়টি সাবাড় করে ফেলা হচ্ছে।

এ ব্যাপারে বরইতলী বনবিটের নিয়ন্ত্রণকারী রেঞ্জ চুনতির রেঞ্জ কর্মকর্তার দায়িত্বপ্রাপ্ত ফরেস্টার সৈয়দ আবু জাকারিয়ার বক্তব্য নেওয়ার জন্য তার ব্যবহৃত মোবাইল নাম্বারে অসংখ্যবার যোগাযোগ করা হয়। কিন্তু তিনি ফোন না ধরায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। একইভাবে বক্তব্য নেওয়ার জন্য যোগাযোগ করা হয় চট্টগ্রাম দক্ষিণ বনবিভাগের বিভাগীয় বনকর্মকর্তা (ডিএফও) আবদুল্লাহ আল মামুনের সঙ্গে। কিন্তু তার ব্যবহৃত মোবাইল নাম্বারে একাধিকবার কল দেওয়া হলে তিনিও ফোন ধরেননি।

পূর্ববর্তী নিবন্ধফোন আসেনি, মুক্তিপণও দাবি করা হয়নি
পরবর্তী নিবন্ধসকালে এক দাম, ইফতারের আগে আরেক দাম