গণতন্ত্র অন্ধকারে মারা যায়-(ডেমোক্রেসি ডাইস ইন ডার্কনেস) ব্যাপক বিতর্কিত, আলোচনা–সমালোচনার মধ্য দিয়ে সংবাদপত্রের এ স্লোগানটি আমেরিকার পলিটিক্যাল এন্ড সোস্যাল ডেমোক্রেসির জন্য আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়ায়। এটি জনপ্রিয় আমেরিকান সংবাদপত্র দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের অফিসিয়াল স্লোগান। ৫শ স্লোগানের মধ্যে এ স্লোগানটি বাছাই করা হয়েছিল।
কাগজটির ১৪৬ বছরের ইতিহাসে এটি অফিসিয়ালি কোনো স্লোগান ছিল না। ২০১৭ সালে সংবাদপত্রের ওয়েবসাইটে স্লোগানটি চালু করে প্রিন্ট কপিতে যুক্ত করার সাথে সাথে পৃথিবীর পূর্ব–পশ্চিম হৈ–চৈ শুরু হয়েছিল। স্লোগানটি নিয়ে পৃথিবীর নানা সংবাদ সংস্থা এবং বিভিন্ন মিডিয়া ব্যক্তিত্ব থেকে – ইতিবাচক এবং নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। স্লোগানটি নিয়ে টুইটারে নানা আলোচনা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, এমনকি চীনের পিপলস ডেইলি সংবাদপত্র থেকেও টুইট করা হয়েছিল।
অথচ পৃথিবীব্যাপী গণতন্ত্রের ফেরিওয়ালা আমেরিকার প্রথম সারির সংবাদ মাধ্যমে এ শ্লোগান নিয়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে কোনো বাধা এখনো পর্যন্ত পায়নি পত্রিকাটি। কাজই বলা যায়, সংবাদমাধ্যম ওয়াচ ডগের বা নজরদারির। আমেরিকার মূলধারার সংবাদ মাধ্যম এ কাজ করে থাকে। সে কারণে সমপ্রতি যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের বিদ্রোহী রিপাবলিকান প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার কেভিন ম্যাকার্থি ভোটাভুটিতে ষ্পিকার পদ থেকে সরে দাঁড়ান। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এই প্রথম এমন ঘটনা ঘটল। সংবাদপত্রে বর্তমান প্রেসিডেন্ট জো–বাইডেন এর ছেলে হান্টার বাইডেনের নানা অভিযোগের খবর ছাপা হচ্ছে। প্রায় প্রতিদিন সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ট ট্টাম্পকে নানা বৈধ–অবৈধ বিষয় নিয়ে আদালতে হাজিরা দিয়ে প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। সংবাদ মাধ্যম এখন আগের চেয়ে অনেক সক্রিয়। এ সক্রিয়তা কিন্তু তাদের আগেও ছিল। সাবেক প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনের অভিশংসন বা ইমপিচমেন্টর সময় একই ধরণের ভূমিকা রেখেছিল তারা। সংবাদ মাধ্যমের এই ভূমিকার কারণও ঐতিহাসিক।
১৯৭১ সালে আমেরিকার সংবিধানের প্রথম সংশোধনীতে জনগণের বাক স্বাধীনতার অধিকারকে সুরক্ষা দেওয়া হয়। আজ থেকে ২৩২ বছর আগ থেকে আমেরিকার দূরদর্শী নেতারা বুঝেছিলেন, মানুষের বাকস্বাধীনতা কত গুরুত্বপূর্ণ। তারই প্রতিধ্বনি শোনা গিয়েছিল আমেরিকার তৃতীয় প্রেসিডেন্ট টমাস জেফারসনের কণ্ঠে। প্রেসিডেন্ট জেফারসন বলেছিলেন–সংবাদপত্রহীন সরকার আর সরকারবিহীন সংবাদপত্র–দুটোর একটা বেছে নিতে হলে তিনি সরকারবিহীন সংবাদপত্রকে বেছে নেবেন। ১৭৮৭ সালে ব্রিটেনের হাউস অব কমন্সে বিতর্ক অংশ নিয়ে টমাস কার্লাইল সংবাদপত্রকে ফোর্থ এস্টেট –রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলে উল্লেখ করেছিলেন। আর তাই এখনো সংবাদপত্র ছাড়া গণতন্ত্র নিরর্থক। এ কথাটি যে দেশ যত তাড়াতাড়ি বুঝেন ততই মঙ্গল।
৭০ এর দশকের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি রাজনৈতিক কেলেঙ্কারি। ‘ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি’ নির্বাচন প্রচারাভিযান চলাকালে ১৭ জুন, ১৯৭২ সালে ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান দল ও প্রশাসনের ৫ ব্যক্তি ওয়াশিংটন ডিসির ওয়াটার গেইট ভবনস্থ বিরোধী ডেমোক্র্যাট দলের সদর দফতরে আড়িপাতার যন্ত্র বসায় এবং নিঙনের প্রশাসন কেলেঙ্কারিটি ধামা–চাপা দেওয়ার চেষ্টা করে। এ ঘটনার ফলে তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রপতি রিচার্ড নিক্সন ৯ আগস্ট ১৯৭৪ সালে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। কেলেঙ্কারির ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগের ঘটনা এটি ছিল প্রথম। এই ঘটনায় বিচার ও দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর মোট ৪৩ জন ব্যক্তিকে কারাগারে প্রেরণ করা হয়; যাদের মধ্যে কয়েক ডজন ছিলেন নিক্সন প্রশাসনের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা।
এ ঘটনাটি শুরু হয়েছিল ৫ জন ব্যক্তিকে গ্রেফতারের মাধ্যমে; যারা ১৭ জুন ১৯৭২ সালে ওয়াটার গেইট ভবনস্থ বিরোধী ডেমোক্র্যাট দলের সদর দফতরে চুরি করে প্রবেশ করেছিল। ফেডারেল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই) প্রেসিডেন্ট নিক্সন এর প্রচারণার কাজে নিয়োজিত সরকারি প্রতিষ্ঠানের পুনরায় নির্বাচনের জন্য গঠিত কমিটির সংশ্লিষ্টতা খুঁজে পায়। ১৯৭৩ সালের জুলাইয়ে সিনেট ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি তদন্ত কমিটির সাবেক সদস্যরা রাষ্ট্রপতির কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রমাণসহ তথ্য উপস্থাপন করেন; এতে উল্লেখ করা হয় যে, রাষ্ট্রপতি নিক্সনের অফিসে একটি টেপরেকর্ডার ছিল যা দিয়ে তিনি অনেক কথোপকথন রেকর্ড করে রেখেছিলেন।
এ রেকর্ড থেকে জানা গিয়েছিল রাষ্ট্রপতি নিজে এসব কেলেঙ্কারি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। পরবর্তীতে আদালতের সাথে একটি তিক্ত লড়াইয়ের পর, উচ্চ আদালত রাষ্ট্রপতিকে এসকল টেপ আদালতে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন ও নিক্সন তা মেনে নেন। হাউজ অফ রিপ্রেজেনটিটিভ দ্বারা অভিশংসন ও সিনেট দ্বারা দোষী সাব্যস্ত হওয়ার মুখোমুখী হওয়ার প্রাক্কালে তিনি ৯ই আগস্ট, ১৯৭৪ সালে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন। তবে পরবর্তীতে তাঁর উত্তরসূরী গ্যারাল ফোর্ড ক্ষমতায় এসে পরবর্তীতে তাকে ক্ষমা করে দেন।
ওয়াটার গেট কেলেঙ্কারি গণমাধ্যমে ফাঁস করা সাংবাদিকের নাম কার্ল বার্নস্টেইন। ‘ওয়াটারগেট’ আমেরিকা কাঁপানোর চার দশক পরে, সাংবাদিক বব উডওয়ার্ড কেলেঙ্কারিতে ফিরে আসেন। রিচার্ড নিক্সনের সহকারী আলেকজান্ডার বাটারফিল্ডের সাথে সাংবাদিক বব উডওয়ার্ড এর ৪৬ ঘণ্টা সাক্ষাৎকারে ওভাল অফিসের টেপের অস্তিত্ব প্রকাশ করেছিলেন। যা সাংবাদিক তাঁর ‘দ্য লাস্ট অফ দ্য প্রেসিডেন্ট’স ম্যান’ এ অকথিত গল্প আকারে প্রকাশ করেছিলেন। অনুসন্ধানী প্রতিবেদক বব উডওয়ার্ড ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির মূল রহস্য ফাঁস করে দেন।
২০১৫ সালে একটি কনফারেন্সে ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি সম্পর্কে তাঁর বই ‘দ্য লাস্ট অফ দ্য প্রেসিডেন্টস ম্যান’ সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে সাংবাদিক উডওয়ার্ড বলেন– ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির প্রথম সংশোধনী মামলার রায়ে সার্কিট বিচারক ড্যামন কিথ উল্লেখ করেছিলেন ‘গণতন্ত্র অন্ধকারে মারা যায়’। পোষ্টের নির্বাহী সম্পাদক মার্টিন ব্যারনের সাথে কনফারেন্সে কাগজটি কেনার কারণ সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে বলেছিলেন– “আমি মনে করি, আমরা অনেকেই এটা বিশ্বাস করি, ‘গণতন্ত্র অন্ধকারে মারা যায়’’। কিন্তু আলো আছে তা নিশ্চিত করার জন্য সংবাদপত্রের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
জেলে বন্দী রুশ বিরোধী নেতা আলেক্সি নাভালনি বলেছেন যে, মার্কিন সাংবাদিক বব উডওয়ার্ড এবং কার্ল বার্নস্টেইন তাদের ক্লাসিক বই ‘অল দ্য প্রেসিডেন্টস মেন’ এর একটি অনুলিপিতে একটি ব্যক্তিগত নোট অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। যা তাঁরা তাকে পাঠিয়েছিলেন। নাভালী এব্যাপারে আরো জানতে চেয়ে– নাভালনি সেসময় টুইট করেছিলেন–তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন– তিনি ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি সম্পর্কে আরও জানতে চান। তাই উডওয়ার্ড এবং বার্নস্টেইন এই কেলেঙ্কারির বিষয়ে তাদের অভিজ্ঞতার কথা লিখে– ‘অল দ্য প্রেসিডেন্টস মেন’ এবং ‘দ্য লাস্ট ডেজ’ বই দুটি তাঁকে কারাগারে পাঠিয়েছিলেন। রাশিয়ার নির্যাতিত সাংবাদিক নাভালনিক এখনো রাশিয়ার কারগারে বন্দী। নোটটি পড়ে তাঁকে ধন্যবাদ দিয়ে রাশিয়ান সাংবাদিক আলেক্সি নাভালনি লিখেছিলেন -‘আমরা সেই দিনের অপেক্ষায় রয়েছি –যেদিন আপনি এবং রাশিয়ার সাংবাদিকরা স্বাধীন হবেন এবং আমরা ব্যক্তিগতভাবে এই আলোচনা চালিয়ে যেতে পারব।’
লেখক: প্রবাসী সাংবাদিক, যুক্তরাষ্ট্র।