সরকার দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় রূপান্তর ঘটাচ্ছে উল্লেখ করে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেছেন, একেবারে প্রাক্প্রাথমিক থেকে উচ্চতর পর্যন্ত এই রূপান্তর শুরু হয়েছে। আমরা চাই, প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে অবশ্যই ভাষা, আইটি, উদ্যোক্তা হওয়া শেখাতে হবে। স্পেশাল কোর্স দিতে হবে। সেগুলোর চর্চা করতে হবে ছাত্রাবস্থায়। তারা চাকরিদাতাকে বলবে না সুযোগ দেন। তারা দক্ষ জনশক্তি হয়ে বের হবে, যাতে চাকরিদাতারাই তাদের খোঁজ করেন।
গতকাল শনিবার বিকালে নগরীর টাইগারপাস নেভি কনভেনশন হলে চট্টগ্রাম বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজি (সিবিইউএফটি) নামের বিশেষায়িত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। শিক্ষামন্ত্রী বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, বঙ্গবন্ধু কন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। তিনি বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় গড়া শুরু করেছিলেন বলেই আমাদের ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজি বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছে, মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছে, এভিয়েশন বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছে, আমাদের ডিজিটাল ইউনিভার্সিটি হয়েছে, ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস হয়েছে, অনেকগুলো কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছে। যার ধারাবাহিকতায় চট্টগ্রামে বিজিএমইএ ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। আমরা উচ্চ শিক্ষার পথে এগিয়ে যাচ্ছি। সিবিইউএফটি ট্রাস্টি বোর্ডের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান নাসিরউদ্দিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, ইউজিসি সদস্য প্রফেসর ড. বিশ্বজিৎ চন্দ, পরিচালক মো. ওমর ফারুক ও এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন। গেস্ট অব অনার ছিলেন বিজিএমইএ সভাপতি ফারুক হাসান। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন বিজিএমইএর প্রথম সহসভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম। জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে শুরু হয় অনুষ্ঠান। পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত করেন আবু বকর।
ডা. দীপু মনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী ডিজিটাল বাংলাদেশ করবেন বলেছিলেন, করেছেন। বাবার মতো সব কথা রাখেন। তিনি বলেছেন স্মার্ট বাংলাদেশ করবেন। আমরা যেন সেই স্মার্ট বাংলাদেশের জন্য স্মার্ট নাগরিক তৈরি করতে পারি। যারা হবে সৎ, দক্ষ, সহমর্মী, পরমতসহিষ্ণু,অসাম্প্রদায়িক। যারা যেকোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সাহস নিয়ে এগিয়ে যাবে এবং প্রোঅ্যাকটিভ হবে।
তিনি বলেন, আজকের এই বিশ্ববিদ্যালয় একটি ডিপ্লোমা ইনস্টিটিউট হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিল। এরপর স্নাতক কোর্স। সব শেষে বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে যাত্রা শুরু করল। আমাদের বিজিএমইএর একটি ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজি বিশ্ববিদ্যালয় আছে ঢাকায়। এটি দ্বিতীয়। চট্টগ্রামের মতো জায়গায় এটি স্থাপিত হয়েছে, যেটি খুবই যৌক্তিক। আমাদের ক্রমবিকাশমান এ শিল্পে দক্ষ জনশক্তি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে দিতে পারছি না, দুঃখজনক হলেও সত্য। বিভিন্ন দেশ থেকে আসছে। আমরা সেখানে দক্ষ, যোগ্য জনবল আমাদের দেশেই তৈরি করতে চাই। সেটি সম্ভব। সেজন্যই বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি হচ্ছে। এ বিশ্ববিদ্যালয় এ শিল্পের যে জায়গায় আছে সেখান থেকে আরো উপরে যেতে সহযোগিতা করবে। দক্ষ জনবলের অভাব পূরণ করবে। আপনাদের কোর্স ডিজাইন হবে এ কর্মজগতের প্রয়োজন অনুযায়ী। আপনারাই ইন্টার্নশিপের সুযোগ দেবেন।
অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল ইনস্টিটিউট থাকাকালীন এখানে যেসব সার্টিফিকেট কোর্স চালু ছিল সেগুলো বন্ধ না করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, যেসব কোর্স আরএমজি সেক্টরে কাজে লেগেছে, একটি জনগোষ্ঠীকে দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত করেছে, সেগুলো চালু থাকলে দেশের উপকার হবে।
তিনি বলেন, সবাইকে বিএ পাস করাতে গিয়ে একটি অদক্ষ গ্র্যাজুয়েট সমাজ আমরা তৈরি করছি; যাদের মধ্যে সুনির্দিষ্ট দক্ষতা আমরা দেখছি না। এর ফলে তাদেরকে অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে তাদের সম্পৃক্ত করতে পারছি না। একটি ছেলে যখন বিএ পাস করে ফেলে তখন আর তার পা মাটিতে পড়তে চায় না। একটি একাডেমিক অ্যারোগেন্স তার ভিতরে কাজ করতে থাকে। যেটা উন্নত বিশ্বে খুব একটা চোখে পড়ে না। তিনি ইংল্যান্ডে নিজের উচ্চ শিক্ষার বিভিন্ন অভিজ্ঞতাও বর্ণনা করেন।
বিশেষায়িত শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরে শিক্ষা উপমন্ত্রী বলেন, কারিগরি শিক্ষা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম। পুঁথিগত শিক্ষার সাথে প্রায়োগিক শিক্ষা বা লাইফ স্কিল থাকা খুবই জরুরি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কারিগরি শিক্ষাকে সাধারণ শিক্ষার মধ্যে ছড়িয়ে দেয়ারও নির্দেশনা দিয়েছেন। কর্মমুখী শিক্ষা বেকারত্বের নিদারুণ অভিশাপ থেকে দেশকে মুক্ত করতে সক্ষম। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও দারিদ্র বিমোচনে বিশেষায়িত শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই প্রতিষ্ঠান সামনের দিনগুলোতে আরএমজি সেক্টরের বিকাশ এবং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
চট্টগ্রাম বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজির ট্রাস্টি বোর্ডের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান নাসিরউদ্দিন চৌধুরী বলেন, আমাদের পোশাক শিল্প প্রতিযোগিতা করছে উন্নত দেশের সঙ্গে। উন্নত প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মেলাতে দক্ষ জনগোষ্ঠী তৈরিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই। এ স্বপ্নযাত্রা চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চাহিদা পূরণে আমাদের এগিয়ে রাখবে। আগামী মার্চের প্রথম দিন থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রম শুরুর আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, এই বিশ্ববিদ্যালয়ে কোয়ালিটি নিয়ে আমরা কোনো আপোষ করব না। ভর্তিতে কোনো তদবির চলবে না। মেধাবী এবং যোগ্যরা এখানে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাবে। শুরুতে চারটি বিভাগে ৩৫ জন করে শিক্ষার্থী ভর্তির অনুমোদন দিয়েছে ইউজিসি। প্রথম সেমিস্টারে মোট ১৪০ জন উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাবে। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে একটি স্থায়ী ক্যাম্পাস গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে ট্রাস্টি বোর্ডের।
উল্লেখ্য, ২০০২ সালের ২৭ অক্টোবর বিজিএমইএ ইনস্টিটিউট অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজি (বিআইএফটি) নামে প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে ডিপ্লোমা কোর্স চালু করে। ২০ বছরে প্রায় ৫ হাজার শিক্ষার্থী ডিপ্লোমা এবং অ্যাপারেল মার্সেন্ডাইজিংয়ে সার্টিফিকেট কোর্স করে দেশে–বিদেশে পোশাক শিল্পে অবদান রাখছে।
চাহিদা বাড়ায় ২০১৩ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে সিবিআইএফটি চালু করে দক্ষ জনবল তৈরি করে পোশাক শিল্পে নিয়োগের ব্যবস্থা করা হয়। ইতোমধ্যে ৫ শতাধিক শিক্ষার্থী স্নাতক ডিগ্রি লাভ করে বিদেশি জনশক্তির স্থলাভিষিক্ত হয়েছে। পোশাক শিল্পে বিদেশি এঙপার্টিজ নির্ভরতা, চতুর্থ শিল্প বিপ্লব, ফ্যাশন ওয়ার্ল্ডে প্রতিনিয়ত তথ্যপ্রযুক্তির আধুনিকায়ন ইত্যাদি বিষয় মাথায় রেখে ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজির এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য হয়ে পড়ে। এরই ধারাবাহিকতায় চট্টগ্রামের মন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রীর সাবেক মুখ্য সচিবের সহায়তায় ২০২২ সালের ২৪ আগস্ট ১০৬তম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে সিবিইউএফটির অনুমোদন দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। গত ১ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়টিতে চারটি বিভাগ চালুর অনুমোদন দেয় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। দুটি অনুষদে বিভক্ত এসব বিভাগ।
ক্লথিং ও ফ্যাশন টেকনোলজি অনুষদের অধীনে টেঙটাইল অ্যান্ড ক্লথিং টেকনোলজি (টিসিটি), ফ্যাশন ডিজাইন অ্যান্ড টেকনোলজি (এফডিটি) বিভাগ থেকে বিএসসি কোর্স, ফ্যাশন অ্যান্ড অ্যাপারেল ডিজাইন অনুষদে অ্যাপারেল মার্সেন্ডাইজিং অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট (এএমএম) এবং ফ্যাশন ডিজাইন (এফডি) বিভাগে ব্যাচেলর ডিগ্রি দেওয়া হবে।
আগামী জুলাই–ডিসেম্বর সেশনে টেঙটাইল ম্যানুফেকচারিং অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (এফটিএমই) অনুষদ চালুর পরিকল্পনা আছে। এর অধীনে টেঙটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং (টিই) ও টেঙটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট (টিইএম) বিভাগের বিএসসি ডিগ্রি নিতে পারবেন শিক্ষার্থীরা।












