আমার শৈশব কালে লেখাপড়ার হাতে-খড়ি আরম্ভ হয়েছিল আমার এলাকার গ্রাম্য পাঠশালায়। পাঠশালাটির নাম ছিটিয়া পাড়া সরকারি ফ্রি প্রাইমারি স্কুল দক্ষিণ সুলতানপুর, রাউজান, চট্টগ্রাম। ইতিহাস সাক্ষী দেয় বিদ্যালয়টি যে মহানুভব ব্যক্তি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তিনি হলেন আমাদের পাড়ার সমাজের বিত্তশালী বিদ্যানুরাগী মরহুম জনাব আব্দুল হাকিম চৌধুরী। সে সময়ে আমাদের এলাকায় এবং এর চারদিকে বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে কোনও প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিল না। ঐ বিদ্যালয়ে আমার ছাত্র জীবনের অধ্যয়নকাল ছিল সম্ভবত ১৯৫০ থেকে ১৯৫৪ ইংরেজি পর্যন্ত।
আমার ধারণা মতে সম্ভবত বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল আরো অনেক পূর্বে এবং তখন ওই বিদ্যালয়ে লেখাপড়া শিখেছিলেন এরূপ অনেকেই ইতোমধ্যে বয়োবৃদ্ধ হয়ে পরলোকগমন করেছেন। এতে প্রতীয়মান হয় আমাদের এলাকায় তখনকার সময়ে একটি আদর্শ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অভাবে কচি শিশুদের লেখাপড়া শিখার অসুবিধা, শিশুদের লেখাপড়ায় অনগ্রসরতা ও অনক্ষরতা ইত্যাদি সমস্যা তিনি সম্যক উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন বিধায় সম্পূর্ণ নিজ উদ্যোগে, নিজ খরচে, নিজের খাসজমিতে বিদ্যালয় ভবনটি নির্মাণ করেছিলেন। আমি বিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে পর্যবেক্ষণ করেছি আমাদের নিজপাড়া ছাড়াও, আমাদের এলাকার চারদিকের কয়েক বর্গমাইল এলাকার পাড়া-মহল্লার মুসলিম, হিন্দু ও বৌদ্ধ ছাত্রগণ দলে দলে এই বিদ্যালয়ে এসে অধ্যয়ন করত।
এতেই বোঝা যায় তার জ্বালানো জ্ঞানবর্তিকা কত বিস্তীর্ণ, যোজন-যোজন এলাকা ব্যাপী জ্ঞানের আলোকচ্ছটা ছড়িয়েছে। যখন মানুষ বর্ণমালার ধারণা জ্ঞানই রাখতনা, নিরক্ষরতার অন্ধকারে হাবুডুবু খাচ্ছিল, ঠিক সেই সংকটময় সময়ে তিনি নিজ এলাকায় জ্ঞান প্রদীপ জ্বালানোর লক্ষ্যে যে দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছিলেন তা সত্যিই প্রশংসনীয়। তিনি ছিলেন এলাকার একজন উদার মনের হৃদয়গ্রাহী, হৃদয়মান ও দানশীল ব্যক্তি, একজন জ্ঞানচক্ষু দার্শনিক। নিজ এলাকায় মসজিদ, পাঠশালা প্রতিষ্ঠা করা ছাড়াও, তিনি নিজ উদ্যোগে ও নিজ খরচে নিজ বাড়ির সম্মুখে খোলা প্রাঙ্গণে একটি সরাইখানা পরিচালনা করতেন। তিনি একজন সমাজহিতৈষী ও সমাজসেবকও ছিলেন। প্রতি বৎসর ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার সময়ে তিনি সমাজের লোকদের প্রাণ ভরে খাওয়াতেন, আপ্যায়ন করাতেন।
এমনও দেখেছি মৌসুমওয়ারী বিভিন্ন ফলমূল, শীতে কমলা, চিড়া, মুড়ি ও নাডু ইত্যাদি পাড়া- মহল্লায় প্রত্যেকের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতেন। এ দানশীল কীর্তিমান মানবিক গুণাবলী সম্পন্ন ব্যক্তিটির সামাজিক গঠন মূলক কাজের স্মরণে এলাকার লোকদের মনে চিরকাল চিরদিন অমর অম্লান হয়ে থাকুক এ কামনা করিতেছি। তিনি এলাকার একজন উজ্জ্বল নক্ষত্র, সমুচ্চ সমুজ্জ্বল মিনার বাতিঘর আলোকবর্তিকা হিসাবে এলাকার লোকদের হৃদয়ে জ্বলজ্বল করতে থাকুক এই কামনা করছি।
সমাজের গুণী জ্ঞানী প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিদের সমাদর করা ও কদর করা আমাদের উচিত । শৈশবে যখন একাকী দূর-দূরান্তে চলাফেরা করা আমার পক্ষে সম্পূর্ণ দুরূহ ছিল, সেই সংকটময় সময়ে যদি বিদ্যালয়টি আমার বাড়ির সহজ নাগালের মধ্যে পাওয়া না যেত, তাহলে শিক্ষার দ্বারপ্রান্তে উপনীত হওয়া আমার পক্ষে খুবই কষ্টসাধ্য হত। কারণ তখন পল্লী বাংলার রাস্তাঘাট, যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল খুবই অনুন্নত। গ্রাম্য আঁকাবাঁকা সরচ রাস্তাগুলো বর্ষায় থাকতো হাঁটুগাড়া কর্দমাক্ত ও পিচ্ছিল। রাস্তায় মধ্যে মধ্যে থাকতো ভাঙা, পানিতে ভরপুর, খানাখন্দে পরিপূর্ণ। তার উপর থাকতো নড়বড়ে বাঁশের সাঁকো।
বর্ষায় প্লাবণে এসব গ্রাম্য রাস্তা ভেসে যেত তীব্র স্রোতের টানে-হাঁটু কোমর অবধি পানিতে, সময়ে বুক বরাবর পানিতে। তখন চলাচল করতে হতো খুবই বিপজ্জনকভাবে। একমাত্র এই বিদ্যালয়টি তখনকার দিনে অত্র এলাকার বিস্তীর্ণ অঞ্চল ব্যাপী শিক্ষার আলো বিকিরণ করতেছিল। তাই আমি বিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা মরহুম জনাব আব্দুল হাকিম চৌধুরীর বদান্যতা, মহানুভবতা, সামাজিক মর্যাদা ও দূরদর্শিতার মর্ম উপলব্ধি করে তার এই কীর্তির ভূয়সী প্রশংসা করিতেছি আমার এই জীবন সায়াহ্নে এসে। পরিশেষে বিদ্যালয়টির উৎসর্গীকৃত শিক্ষাব্রত প্রতিষ্ঠাতা দানবীর জনাব আব্দুল হাকিম চৌধুরী পারলৌকিক আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি এবং শিক্ষার জ্ঞান বিকিরণের লক্ষ্যে তাঁর আত্মত্যাগ শ্রদ্ধা ও ভক্তি সহকারে স্মরণ করছি। এরূপ বিদ্যানুরাগী মহৎ একজন ব্যক্তি আমাদের মধ্যে পেয়ে আমরা গর্বিত।
লেখক : প্রবীণ লেখক, সমাজকর্মী।











