বাতিল হচ্ছে চসিকের সড়ক আলোকায়ন প্রকল্প

২৬০ কোটি টাকার এ প্রকল্পে ভারতীয় ঋণ সহায়তা আছে ২১৪ কোটি ৪৬ লাখ টাকা

মোরশেদ তালুকদার | মঙ্গলবার , ১০ ডিসেম্বর, ২০২৪ at ৬:৪৬ পূর্বাহ্ণ

নগরের সড়ক আলোকায়নে গৃহীত ভারতীয় ঋণ সহায়তার একটি প্রকল্প বাতিল করা হচ্ছে। ২৬০ কোটি ৮৯ লাখ ৮৭ হাজার টাকার প্রকল্পটির কার্যক্রম বন্ধ রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে অর্থনেতিক সম্পর্ক বিভাগে (ইআরডি) নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক) এ প্রকল্প গ্রহণ করে। প্রকল্প বাস্তবায়নে চসিকের সঙ্গে গত ৬ জুলাই ভারতীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘শাপার্জি পালনজি অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেড’র চুক্তি স্বাক্ষর হয়।

চসিক সূত্রে জানা গেছে, ‘মর্ডানাইজেশন অব সিটি স্ট্রিট লাইট সিস্টেম অ্যাট ডিফারেন্স এরিয়া আন্ডার চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন’ শীর্ষক প্রকল্পটিতে বাংলাদেশ সরকারের মাধ্যমে এলওসি(লাইন অব ক্রেডিট) এর আওতায় ঋণ হিসেবে দেয়া ভারতের অর্থের পরিমাণ ধার্য ছিল ২১৪ কোটি ৪৬ লাখ ৮২ হাজার টাকা। অবশিষ্ট ১৭ দশমিক ৮০ শতাংশ বা ৪৬ কোটি ৪৩ লাখ ৫ হাজার টাকা বাংলাদেশ সরকার দেয়ার কথা।

ইআরডি সূত্রে জানা গেছে, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে এ পর্যন্ত ৭৩৬ কোটি মার্কিন ডলারের তিনটি ঋণচুক্তি হয়। যা লাইন অব ক্রেডিট (এলওসি) নামে পরিচিত। চুক্তি অনুযায়ী ঋণের অর্থ দিবে ভারতের এক্সিম ব্যাংক। এর মধ্যে ২০১০ সালের আগস্টে ৮৬ কোটি মার্কিন ডলারের প্রথম এলওসি চুক্তি হয়। এছাড়া ২০১৬ সালের মার্চে ২০০ কোটি ডলার দ্বিতীয় এবং ২০১৭ সালের মার্চে ৪৫০ কোটি ডলারের তৃতীয় এলওসি চুক্তি হয়। তিনটি চুক্তির বিপরীতে গত সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত ১৮৪ কোটি ডলার ছাড় হয়েছে। এদিকে জ্বালানি দক্ষতা উন্নয়নে পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদারের লক্ষ্যে বাংলাদেশের ‘টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ’ এবং ভারতের ‘এনার্জি ইফিসিয়েন্সি সার্ভিস লিমিটেড (ইইসিএল)’ এর সঙ্গে ২০১৭ সালে একটি সমঝোতা চুক্তি হয়। এর প্রেক্ষিতেই ‘মর্ডানাইজেশন অব সিটি স্ট্রিট লাইট সিস্টেম অ্যাট ডিফারেন্স এরিয়া আন্ডার চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন’ প্রকল্পটি গ্রহণ করে চসিক। যেখানে এলওসি তৃতীয় চুক্তির আওতায় ভারতীয় এঙ্মি ব্যাংক অর্থায়ন করার কথা।

জানা গেছে, তিনটি এলওসি চুক্তির বিপরীতে চসিকেরটিসহ দেশে মোট ৪০টি প্রকল্প নেয়া হয়। এর মধ্যে চলমান আছে ৮টি প্রকল্প। গত জুলাই মাসে বৈষম্যবিরোধী ছাত্রজনতার আন্দোলন শুরু হলে নিরাপত্তাজনিত কারণে প্রকল্পের ভারতীয় ঠিকাদার এবং প্রকল্প সংশ্লিষ্ট অন্যান্য লোকজন নিজ দেশে চলে যান। এরপর থমকে যায় প্রকল্পের কাজ। ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। ব্যতিক্রম ছিল না চসিকের আলোকায়ন প্রকল্পটিও।

এ অবস্থায় গত ১০ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ে ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক শেষে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘ভারতীয় লাইন অব ক্রেডিটের আওতায় চলমান প্রকল্পগুলো গুরুত্বপূর্ণ। দেশের স্বার্থের কথা বিবেচনায় রেখেই সেগুলো হাতে নেওয়া হয়েছিল। এসব প্রকল্প বন্ধ হবে না’।

এদিকে নিজেদের থমকে থাকা প্রকল্পটির বিষয়ে গত ৩ ডিসেম্বর মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত চেয়েছে চসিক। এদিন চসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ মুহম্মদ তৌহিদুল ইসলাম স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব বরাবর দেয়া একটি পত্রে বলেন, চুক্তিপত্র স্বাক্ষর হলেও প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে দেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ভারতীয় নমনীয় ঋণের মাধ্যমে প্রকল্প কাজ বাস্তবায়ন আদৌ সম্ভব হবে কিনা, প্রকল্প কাজ সুষ্ঠু বাস্তবায়ন ও প্রকল্পের ভবিষ্যৎ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনাও চাওয়া হয় ওই পত্রে।

একইদিন চসিকের দেয়া পৃথক আরেকটি পত্রে বলা হয়, প্রকল্প পরিচালক চসিকের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (বিদ্যুৎ) ঝুলন কুমার দাশকে (সাময়িক বরখাস্ত) রংপুর সিটি কর্পোরেশনে বদলি করা হয়েছে। প্রকল্প পরিচালক না থাকায় প্রকল্প কাজ বাস্তবায়নে বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে। তাই একজন প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দিতে বলা হয়।

এদিকে চসিকের পত্র দেয়ার আগের দিন ২ ডিসেম্বর প্রকল্পটির বিষয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের উপসচিব খোন্দকার ফরহাদ আহমদ স্বাক্ষরিত একটি পত্র দেয়া হয় ইআরডি সচিব বরাবর। এতে বলা হয়, ‘বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রকল্পটির কার্যক্রম গ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। যথাযথ কর্তৃপক্ষ কর্তৃক গ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত হওয়ায় প্রকল্পের কার্যক্রম বন্ধ রাখার বিষয়ে পরবর্তী ব্যবস্থাগ্রহণ করতে করতে বলা হয় ওই পত্রে। বিষয়টি নিশ্চিত করে চসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ মুহম্মদ তৌহিদুল ইসলাম আজাদীকে বলেন, প্রকল্পটি বাতিল হচ্ছে।

চসিক সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পটির আওতায় নগরের ৪১ ওয়ার্ডে পাঁচ মিটারের বেশি প্রশস্ত সড়কে ৪০, ৬০, ১০০ ও ২৫০ ওয়াটের ২০ হাজার ৬০০টি এলইডি বাতি, ২০ হাজার ২৬৭টি জিআই পোল এবং ৫০৭টি কন্ট্রোল সুইচবঙ বসানোর কথা। এছাড়া হাইড্রোলিক বীম লিফটার ও ইলেকট্রিক্যাল ইক্যুপমেন্ট সংগ্রহ করার কথা।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০১৯ সালের ৯ জুলাই একনেকে প্রকল্পটি অনুমোদন হয়। প্রকল্পের ভারতীয় ঋণের অর্থ থাকায় ঠিকাদার নিয়োগসহ বিভিন্ন ধাপে দেশটির চূড়ান্ত অনুমোদনের প্রয়োজন ছিল; যা চলতি বছর পাওয়া যায়। এরপর গত ২১ মে বাংলাদেশের সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিপরিষদ সভায়ও অনুমোদন হয়। এর প্রেক্ষিতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চসিকের চুক্তি হয়। বিভিন্ন সময়ে মোট তিনবার প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়। শুরুতে মেয়াদ ছিল ২০১৯ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত। সর্বশেষ ইআরডি, আইএমওডি পরিকল্প কমিশনের সম্মতিতে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়। চলতি ২০২৪২০২৫ অর্থবছরে প্রকল্পের আওতায় প্রতি ওয়ার্ডে আনুমানিক পাঁচ কিলোমিটার করে ২০৫ কিলোমিটার সড়কে আলোকায়নের কাজ সম্পাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা ছিল।

পূর্ববর্তী নিবন্ধহদিস নেই ১৬৩টি অস্ত্র ও ১৮ হাজারের বেশি গুলির
পরবর্তী নিবন্ধসয়াবিন তেলের দাম বাড়লো ৮ টাকা