পদ্মা সেতু : গৌরবের প্রতীক

আ.ফ.ম. মোদাচ্ছের আলী | রবিবার , ৫ জুন, ২০২২ at ৫:৫৮ পূর্বাহ্ণ


‘সর্বনাশা পদ্মা নদী/ তোর কাছে শুধাই/বল আমারে তোর কিরে আর / কুল কিনারা নাই….পাড়ির আশায় তাড়াতাড়ি /সকাল বেলা ধরলাম পাড়ি/ আমার দিন যে গেল সন্ধ্যা হলো/ তবু না কুল পাই’। আব্দুল লতিফ এর লেখা ও সুরকৃত এবং মরমি কণ্ঠ শিল্পী আব্দুল আলীম গীত এই বিখ্যাত গানটি সবুজ শ্যামল নদীমাতৃক বাংলার পদ্মা নদীর বিশালতা ও এর দুই পাড়ের মানুষের দুর্ভোগের কথা জানান দেয়, যে দুর্ভোগ এখন ঘুচতে যাচ্ছে। ২৫ জুন এই খরস্রোতা নদীর উপর দেশের অর্থায়নে নির্মিত পদ্মা বহুমুখী সেতু উদ্বোধন করতে যাচ্ছেন বঙ্গবন্ধু কন্যা। বিশ্বের ১১তম দীর্ঘ এই সেতুর পুরো নাম ‘পদ্মা বহুমুখী সেতু’। পানি প্রবাহের দিক থেকে এই খরস্রোতা নদীতে প্রতিসেকেণ্ডে এক লক্ষ চল্লিশ হাজার ঘনমিটার পানি প্রবাহিত হয়। বিশ্বের খরস্রোতা নদী আমাজনের পরই দ্বিতীয় খরস্রোতা নদীর নাম পদ্মা।

মুন্সিগঞ্জের মাওয়াকে জাজিরা প্রান্তের সাথে যুক্ত করা অবহেলিত জনপদ উন্নয়নের সেতু এই পদ্মা সেতু। দেশের সবচেয়ে বড় অবকাঠামোর নাম পদ্মা বহুমুখী সেতু। এই সেতু নির্মাণের জন্য পাথর আনা হয়েছে ভারতের ঝাড়খণ্ড থেকে যার একেকটির ওজন এক টন। সেতুকে ভুমিকম্প থেকে রক্ষা করতে ফিকশন পেণ্ডুলাম বেয়ারিং ব্যবহার করা হয়েছে যা রিক্টার স্কেলে ৯ মাত্রার ভূমিকম্পে ও টিকে থাকবে। বিশ্বের কোনো সেতুতে এতো শক্তিশালী বেয়ারিং ব্যবহার করা হয়নি। দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার সাথে সংযোগকারী এই সেতু নির্মাণের ইতিহাস একদিকে বেদনার অন্যদিকে চ্যালেঞ্জিং যা পাঠক জানেন তবুও এই ইতিহাস বলতেই হবে যা পরে বলছি।

পদ্মা সেতু নির্মাণের জন্য ৯১৮ হেক্টর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। পানির স্তর থেকে এই অত্যাধুনিক সেতুর উচ্চতা ৬০ ফুট। পাইলিং এর সময় নদীর গভীরে মাটি খুঁজে পেতে বেগ পেতে হয়, ফলে অত্যাধুনিক স্ক্রীন গ্রাউন্ডিং ব্যবহার করা হয়। সেতুটি কংক্রিট ও স্টিলের তৈরি। সেতুর নকশা তৈরি করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মাল্টিন্যাশনাল ইঞ্জিনিয়ারিং ফার্ম অঊঈঙগ.নির্মাণ প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন কোম্পানি। ৫ ভাগে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ পরিচালনা করা হয়। মূল সেতু, নদী শাসন, সংযোগ সড়ক, নির্মাণ অবকাঠামো, টোল প্লাজা। নদী শাসন এর কাজ করেছে চীনের সিনো হাইড্রো কর্পোরেশন, সবগ্যোগ সড়কের কাজ করেছে বাংলাদেশের আব্দুল মোনেম লিমিটেড। নদী শাসন এর আনুমানিক ব্যয় ৮৯৭২.৩৮ কোটি টাকা, সংযোগ সড়কের আনুমানিক ব্যয় ১৪৯৯.৫১১ কোটি টাকা, ভূমি অধিগ্রহণ, নিরাপত্তা, বেতন, পরিবেশ, যানবাহন, পরামর্শক বেতন, ভ্যাট ইত্যাদির আনুমানিক ব্যয় ৭৬৫৮.৪৬ কোটি টাকা। মূল সেতুর চুক্তিমূল্য ১২৪৯৮ কোটি টাকা। বৃহৎ এই সেতুর নির্মাণ কাজে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা দেয়ার জন্য সেনাবাহিনীর ৯৯ কোম্পানি ব্রিগেড কাজ করেছে এবং সেতু উদ্বোধন এর তিন মাস পূর্বেই নির্মাণ করা হয়েছে শেখ রাসেল সেনানিবাস। বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে এর ফোর্সেস গোল হচ্ছে সমন্বিত ব্যবস্থা, এয়ার ডিফেন্স এবং যেকোনো হুমকি মোকাবেলার তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা। তাছাড়া এই সেনানিবাস নির্মাণের ফলে সেতুর দুই পাড়ের সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও জোরদার হবে। প্রতিদিন গড়ে ১২০০০ হাজার যানবাহন এই সেতু দিয়ে চলাচল করতে পারবে যা দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আনবে, দারিদ্রতার হার কমাবে ১.৯ শতাংশ, জিডিপি বাড়বে ১.২৩শতাংশ। যুগান্তকারী পরিবর্তন হবে দুই পাড়ের মানুষের জীবনমান। দ্বিতল এই সেতুর উপরের তলায় চার লাইনের সড়ক এবং নিচের তলায় থাকবে রেললাইন। সেতুর ৪১ টি স্প্যান চীনের হুবেই প্রদেশ থেকে জাহাজে করে আনা হয়েছে। সেতুর দৈর্ঘ ৬.১৫ কিলোমিটার, প্রস্থ চার লেইনে ৭২ ফুট, পিলার ৪২ টি দুই প্রান্তের সংযোগ সড়ক ১৪ কিলোমিটার, পাইলিং গভীরতা ৩৮৩ ফুট, ভায়াডাক্ট পিলার ৮১ টি। এই সেতুর নির্মাণ কাজ শুরু হয় ২০১৪ সালের ৭ ডিসেম্বর। ২০১৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর শরীয়তপুরের জাজিরা প্রান্তের ৩৭ ও ৩৮ নম্বর পিলারের উপর বসে সেতুর প্রথম স্প্যান। প্রমত্ত পদ্মার বুকে মাথা উঁচু করে নিজকে জানান দেয় স্বপ্নের পদ্মা সেতু। ২০২০ সালের ১০ ডিসেম্বর স্থাপিত হয় ৪১ তম বা সর্বশেষ স্প্যান। যদিও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সেতুটির ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন ২০০১ সালের ৪ জুলাই। এর মধ্যবর্তী ইতিহাস বঙ্গবন্ধু কন্যার সাহস ও লড়াইয়ের।

পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ তখনো শুরু হয়নি। অর্থ বরাদ্দ হয়নি। ২০০৬-২০০৭ সালে প্রকল্পের সাথে যুক্ত কিছু লোকের নামে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে দাতা সংস্থা বিশ্ব ব্যাংক। এই অভিযোগে বিশ্ব ব্যাংক তার প্রতিশ্রুতি প্রত্যাহার করে এবং অন্যান্য দাতারা সেটি অনুসরণ করে। এই মিথ্যা অভিযোগের প্রেক্ষিতে ততকালীন যোগাযোগ মন্ত্রী আবুল হোসেনকে অব্যাহতি দেয়া হয়, পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনে তাঁকে মনোনয়ন পর্যন্ত দেয়া হয়নি। সচিব মোশাররফ হোসেন জেলে যান। বিশ্ব ব্যাংকের অভিযোগ এর প্রেক্ষিতে কানাডার আদালতে এই তথাকথিত দুর্নীতির মামলা হয়। ২০১৭ সালে মামলাটির অভিযোগ মিথ্যা বলে কানাডিয়ান আদালত রায় প্রদান করেন। টরেন্টো স্টার এর রিপোর্ট অনুযায়ী রায়ের আদেশে বিচারক লেখেন’ অভিযুক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যে তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছিল তা জল্পনা, গুজব আর জনশ্রুতি ছাড়া কিছুই না’। (সূত্রঃ প্রথম আলো) ইতিমধ্যেই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা তাঁর অমিত সাহস এবং প্রত্যয় নিয়ে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ করার ঘোষণা দেন। ষড়যন্ত্রকারীরা থেমে থাকেনি। ২০১৯ সালে গুজব ছড়ানো হয় পদ্মা সেতু নির্মাণের জন্য মানুষের মাথা লাগবে।

বিভিন্ন স্থানে ঘটে অপ্রীতিকর ঘটনা। পরে এই ঘটনাকে গুজব ও ভিত্তিহীন উল্লেখ করে সেতু নির্মাণ কতৃপক্ষ ৯ জুলাই ২০১৯ তারিখে গণমাধ্যমগুলোতে বিজ্ঞপ্তি পাঠায়। সব বাধা পেরিয়ে উদ্বোধনের অপেক্ষায় স্বপ্নের পদ্মা সেতু। এই সেতু উদ্বোধনের ফলে দেশের মোট এলাকার ২৯ শতাংশ অঞ্চল জুড়ে তিনকোটির বেশি মানুষ প্রত্যক্ষভাবে উপকৃত হবে। দেশীয় অর্থায়নে নির্মিত পদ্মা সেতু সাফল্য নয় আমাদের গৌরবের প্রতীক। ফরিদা পারভিন গীত সেই কালজয়ী গানের কথা আজ বার বার মনে পড়ছে ‘এই পদ্মা এই মেঘনা / এই যমুনা সুরমা তটে/ আমার রাখাল মন গান গেয়ে যায়/ কত আনন্দ বেদনা বিরহ সংকটে’। জয়তু বঙ্গবন্ধু কন্যা।

লেখক : শিশুসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, গবেষক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধদেশ হতে দেশান্তরে
পরবর্তী নিবন্ধস্কুলছাত্রীকে নিজঘরে হাত-পা বেঁধে ধর্ষণ