উন্নয়নশীল দেশের মানব সম্পদের বিকাশ ও ফেসবুক সংস্কৃতি

রিজোয়ান মাহমুদ | শুক্রবার , ২৮ অক্টোবর, ২০২২ at ৬:১৩ পূর্বাহ্ণ

আমরা কি শেষ পর্যন্ত নিজেদের সংস্কৃতি সভ্যতাকে হারিয়ে ফেলছি? কিংবা ভুলে যাচ্ছি আমাদের পূর্বপুরুষের ফেলে যাওয়া জীবন – যাপন ব্যবস্থাপনা? প্রকৃত সত্য হলো যন্ত্র অথবা ডিভাইস আমাদের আবেগ অনুভূতিকে বন্দী করছে ক্রমশ। ফলে, যে কোনোভাবে আমরা যন্ত্র থেকে পালাতে পারছি না। এভাবেই ক্রমশঃ নিঃসঙ্গ হচ্ছি সমাজ ভাবনা থেকে। যৌথ ভাবনা চিন্তাকে বেত্রাঘাত করে একক ভাবনায় গা ভাসিয়ে দিচ্ছি। এ থেকে জন্ম নিচ্ছে স্বার্থপরতা স্বার্থান্ধতা সর্বোপরি বৈপরীত্যেবোধে ঢুকে যাচ্ছি। এটিও একধরনের পলায়নপর দৃষ্টিভঙ্গি, এলিয়েনেশন। বিশ্ব আধুনিকতা আমাদের শিখিয়েছে কী করে নিঃসঙ্গ হতে হয়। কী করে যৌথ চিন্তা পরিহার করে কেবলমাত্র নিজের জন্য ভাবতে হয়। একটু পেছনে ফিরলে দেখা যাবে আমাদের এই উপমহাদেশের গ্রামীণ চিত্র – জীবন ব্যবস্থা – নদী উপকূলবর্তী মানুষের সংসার ধর্ম ও তাদের সংস্কৃতি। জেলেদের হাওর – বাউরে মাছ ধরা, মাঝির নৌকা বাওয়া, খরগ্রোতা নদীতে কিংবা পাহাড়ি মানুষের কঠিন জীবন ধারণ। ঝড়-ঝঞ্ঝা অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে এই উপমহাদেশে যুথবদ্ধ মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে বাঁচতে শিখেছে। যখন উপশহর, আধা গ্রাম ও আধা নগর ছিল তখনও আমাদের উপলব্ধি ও অনুভূতি এত বেশি যন্ত্রস্থ ছিলনা। নগর আধুনিকতায় আমাদের চর্চিত জ্ঞান ও প্রাপ্তি আশাব্যঞ্জক নয়, ফলে উনিশ শতকের বুদ্ধিবৃত্তিক যে আধুনিকতা তা আমরা পরিহার করে নকল পোশাকিভদ্র আধুনিকতার পেছনে ছুটছি ক্রমশ।

আমরা স্কুলে যেতাম, স্কুলে বড়সড় একটা খেলার মাঠ ছিল, লাইব্রেরি ছিল, স্কুল শেষে আমরা খেলতে যেতাম। কিন্তু দুর্ভাগ্য আধুনিকতা ও অতি আধুনিকতার ছোঁয়ায় আজ সে চিত্র পাল্টে গেছে। স্কুল ওঠে এসেছে জমিদারের পাঁচ তলার দশ বাই চৌদ্দ ফুটের এক বদ্ধঘরে। ইউনিভারসিটি চলে এসেছে শহরের মাঝখানে কোনো বিশাল শপিংমলে কিংবা যানবাহনের দাহ্যপদার্থ বিক্রি হয় ,এমন জায়গার ওপরে। এই স্কুল কলেজ ইউনিভার্সিটিতে যারা পড়ে এবং যারা পড়ায় তারাও বোধকরি অনেকটা ইনকিউবিটরে উৎপাদিত মুরগির মতো নড়াচড়া করতে পারে না। চৌহদ্দির এক চিলতে জায়গার এদিকে ওদিক ঘোরাফেরা ব্যতীত অন্য কিছুই করার থাকে না। এটিই আমাদের যন্ত্রস্থ জীবন। এই যন্ত্রজীবনে নতুন যন্ত্রের উদ্ভাবন নিয়ে ছেলেমেয়েদের নির্দিষ্ট কোনো গবেষণা নেই , ইচ্ছাও নেই। আমাদের দেশে আমদানিকৃত যন্ত্রের শুধু অপারেটিং শেখানো হয়। মানব কল্যানে লাগে ব্যবহৃত যন্ত্রের বিপরীতে অন্য যন্ত্র আবিষ্কার করার কোনো পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। কারখানা ও প্রশিক্ষণ নেই। সে-ই অবকাঠামো তৈরি হয় নি এখনো।

ইদানীং অপূর্ণ তৃপ্তিতে কিশোর কিশোরী যুবক – যুবতীদের পাশাপাশি বয়স্ক মানুষরা এই অভূতপূর্ব সংস্কৃতিতে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছে। অফিস আদালত কিংবা নিজেদের ব্যবসার কাজ শেষ করে বাড়ি ফিরে ফেইসবুক টুইটারে ব্যস্ত হয়ে পড়ছেন। কেউ বা অফিসে কাজ করতে করতে নির্দ্বিধায় ফেসবুক চালাচ্ছে। ছোট্ট একটা পরিসংখ্যান; ফেসবুকের সিইও মার্ক জাকারবার্গ, পরিচালক ও পরামর্শদাতা এন্ডু ম্যাককলাম ও এডুয়ার্ডো স্যাভেরিন। প্রতিষ্ঠানের সিএফ ও ডেভিড ওয়েহনার। সদর দপ্তর মেনলো পার্ক। ফেসবুক, মেটা প্লাটফর্মসের মালিকানাধীন বিশ্ব – সামাজিক আন্তঃযোগাযোগ ব্যবস্থার একটি ওয়েব সাইট। ৪ ফেব্রুয়ারি ২০০৪ সালে ক্যালিফোর্নিয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। সারাবিশ্বে বর্তমানে ওয়েবসাইটটি ব্যবহার করছেন ২.৯৩ বিলিয়ন সক্রিয় ব্যবহারকারী। পাশাপাশি ইনস্টাগ্রাম-টুইটার ব্যবহারকারীর সংখ্যা হুড়মুড় করে বেড়ে-ই চলেছে। দেশে বর্তমানে ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৫ কোটি ২০ লাখ এবং সর্বোচ্চ ফেসবুক ব্যবহারকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান দশম।

আঠারো শতকের ইউরোপীয় রেনেসাঁস কিংবা উনিশ শতকের রেনেসাঁস এ-ই ভারত বষের্র মানুষদেরও তৈরি করে দিয়েছে যুক্তির কথা বলে ভিন্ন এক জগতের বাস্তবানুগ স্বপ্ন নিয়ে – যেখানে অর্থনৈতিক মুক্তিসহ ব্যাপকভাবে সামাজিক সাংস্কৃতিক মুক্তির বিষয় ছিল জাগরণের মূলমন্ত্র।

অথচ এ-ই নবজাগরণের ভেতর দিয়ে ঢুকে পড়ে যথেচ্ছা পুঁজি। পুঁজির বৈশিষ্ট্য বৈষম্য তৈরি করা। যে ঘরের জানালা দিয়ে সাংস্কৃতিক মুক্তি পুনরুজ্জীবিত হওয়ার কথা ছিল সেখানে এলেবেলে করেছে নব্য পুঁজিবাদ ও বিশ্বায়ন প্রকল্প যার মন্ত্রণাদাতা বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও তাদের কিছু উঠতি অর্থনৈতিক আদিপত্যবাদী সংস্থা। ফেসবুক এখন পর্যন্ত ১১১ টি ভাষায় উপলব্ধ। ইংরেজি আইরিশ সোয়াহিলি হাইতিয় হাউসা হিব্রু পর্যন্ত। ২০১৯ সাল পর্যন্ত অপারেটিং আয় ২৩,৯৮৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, নিট আয় ১৮, ৪৮৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (২০১৯) কর্মচারী সংখ্যা ৪৪,৯৪২, ২০১৯ পর্যন্ত। ফেসবুক পুরো প্রোগ্রামিং কোড অনুযায়ী আমাদের দেশে চলে না। ফেসবুককে সময়ের অপচয় ব্যখ্যা দিয়ে নিরুৎসাহিত ও আংশিক নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। বাংলাদেশ, সিরিয়া, চায়না, ইরানসহ আরো বেশ কয়েকটি দেশে আংশিকভাবে কার্যকর আছে ফেসবুক।

আমার কাছে সবসময় মনে হয়েছে ফেসবুক সারাবিশ্বে একটা আগ্রাসী বুর্জোয়া ক্লাব সংগঠন। ফেসবুক সরাসরি তার কর্মচারীদের অর্থনৈতিকভাবে হয়তো শোষণ করে না। কিন্তু তার বিপরীতে বিশ্বের কোটি কোটি শিশু তরুণ – তরুণী যুবক বৃদ্ধ এমন কি জ্ঞানী ও সৃজনশীল মানুষদের মেধা ও মূল্যবান সময়ের অপচয় ঘটাচ্ছে। হতে পারে এটি উচ্চতর বুর্জোয়া কৌশল।

ফেসবুক খুললেই চোখে পড়ে তরুণ তরুণী যুবক যুবতী এমন কি বয়সী মানুষের বিভিন্ন পোজের ছবি, বাহারি মন্তব্য। কমোডিটি সোসাইটি যেন হামলে পড়ছে। ফেসবুক জুড়ে নব্য কবি সাহিত্যিকদের উৎপাত বেড়ে গেছে। প্রতিদিন নতুন নতুন স্ট্যাটাস, তাৎক্ষণিক মন্তব্য প্রাপ্তির অস্থিরতা এবং নতুন আরেকটা স্ট্যাটাসের জন্য পরবর্তী প্রস্তুতি গ্রহণ। ফেসবুক ওপেন করলেই অর্ধেক জুড়ে রাখে নব্য কবি গল্পকার ঔপন্যাসিক কণ্ঠশিল্পী, চিত্রকর, নৃত্যশিল্পী এবং কিছু মোসাহেবির দল। মধ্যবয়সী সুন্দরী নারীরাও কম যান না। বিভিন্ন পোজের ছবি আপলোড দিয়ে নাওয়া – খাওয়া ছেড়ে ফেসবুক হাতে বসে থাকে সুন্দর প্রশংসামূলক মন্তব্য পাওয়ার আশায়। তাৎক্ষণিক নেশা ধরা মন্তব্য থেকে জন্ম নিচ্ছে সামাজিক অবক্ষয়। ফেসবুক ম্যাসেঞ্জারে শুরু হয় নিত্য নতুন প্রেম, পরকীয়া সম্পর্কের প্রেম, পরে ব্ল্যাকমেইল। কয়েক সপ্তাহ প্রেম করে প্রেমিককে দেখা করতে বলা, এরপর চক্রের অন্য সদস্য মিলে আটকে রাখা, মারধর ও ভয়ভীতি দেখিয়ে প্রায় উলঙ্গ করে ছবি ভিডিও ধারণ করে আপলোড দেবার ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় নিত্য ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন কি ফেসবুক খুব সহজভাবে এন্টি স্যোসাল কাজে ভয়ঙ্কররূপে ব্যবহৃত হচ্ছে। মাঝে মধ্যে দেখা যায় হ্যাকাররা অন্যের ই-মেইল কিংবা পাসওয়ার্ড চুরি করে একজনের একটি সুন্দর ছবির সাথে জুড়ে দিচ্ছে নগ্ন অথবা অর্ধনগ্ন কোনো নারীর ছবি। কোনো কোনো জায়গায় দেখা যায় পর্নোগল্প ও ছবি ছাপিয়ে তরুণ ও কিশোর মনে অনৈতিক মনোজগত সৃষ্টি করে সমূহ অবক্ষয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এটিই এখনকার সময়ে স্যোসাল হারমনি নষ্ট করাকে সমর্থন করছে। আমি কোনভাবে ফেসবুক, টুইটার ইন্সটাগ্রামের বিপক্ষে নই। কিন্তু যথেচ্ছ খারাপ ব্যবহারে শঙ্কিত। আমার বা আমাদের অনেকের কথা ফেসবুক তরুণ প্রজন্মের কাছে শিক্ষণীয় করে তোলা যায় কি-না ব্যাপক পরীক্ষা নিরীক্ষা দরকার। কেউ একজন ফেসবুক খুললেই যেন দেখতে পায়, তার ওয়ালে এসে গেছে ইতিহাস ঐতিহ্য সংস্কৃতির উজ্জ্বল একটি দেশের ছবি। কোনো দেশের নয়ন স্নিগ্ধ ছবি, সাংস্কৃতিক ইতিহাস, নির্মল সবুজ খেলার মাঠ, নদী ও সাগর তীরবর্তী মানুষের জীবন যাপন, সংগ্রামী ইতিহাস অথবা নান্দনিক শিক্ষণীয় কোন উৎসের সন্ধান।

সামপ্রতিক যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক গিল্ড রিসার্চ নামের একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান একটি তথ্য প্রকাশ করেছে। ফেসবুক ও টুইটারে যুবক যুবতী ছাড়াও বুড়োদের আসক্তি মাত্রাতিরিক্তভাবে বেশি। সর্বোচ্চ ৮৫ শতাংশ প্রাপ্ত বয়স্ক ফেসবুক ও টুইটার ব্যবহারকারী প্রবলভাবে আসক্ত। অন্যদিকে তুলনামূলকভাবে ফেসবুক ও টুইটারে টিনএজারদের আসক্তি কম। তাদের মধ্যে শতকরা ৬৯ জন প্রবলভাবে আসক্ত এবং ২০ জন ততটা পছন্দ করেন না। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব মিনিসেটোর অন্য এক গবেষণায় বলা হয়েছে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ব্যবহার ফেসবুক শিশুদের জন্য সহায়ক। ফেসবুক কিংবা টুইটার-কে বাজে কাজে ব্যবহার না করে শিশু ও মানব সমাজের উপযোগী করে তোলাই শ্রেয়। শিক্ষার্থীরা অনলাইন ডিজাইন ও লে আউট বিবিধ নকশা শিখতে পারে। সৃজনশীল মানুষেরা সৃজিত সাহিত্য ও জীবনমুখী চলচ্চিত্র বিনিময় করতে পারে। সব ফেসবুক ব্যবহারকারীকে নিয়ে সম্ভব না হলেও অন্তত ব্যবহারকারী দেশের প্রতিনিধি পর্যায়ে একটি বিশ্ব সম্মেলন বা মত বিনিময়ের আয়োজন করতে পারে। আয়োজক প্রতিষ্ঠান হতে পারে মেটা প্লাটফর্মস কর্তৃপক্ষ অথবা বিশ্বজুড়ে তাদের এজেন্টগণ। সেখানে প্রত্যেক ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতা অভিমত যাচাই-বাছাই করে নতুনভাবে সাজানোর উদ্যোগ গ্রহণ করা। শুধুমাত্র তখনই এর উপযোগিতা একুশ শতকের দক্ষতা অনুশীলনে সম্ভব হবে নচেৎ সামাজিক অবক্ষয় ডেকে আনবে ফেসবুক ও টুইটার। বিশেষ করে দরিদ্র ঋণগ্রস্ত উন্নয়নশীল দেশের মানব সম্পদ বিকাশে।

লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক

পূর্ববর্তী নিবন্ধজুম্‌’আর খুতবা
পরবর্তী নিবন্ধনতুন ‘জঙ্গি’ দলের আরও ৫ সদস্য গ্রেপ্তার