৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ : বাঙালির পরাধীনতা মুক্তির সনদ

শনিবার , ৭ মার্চ, ২০২০ at ১০:১৩ পূর্বাহ্ণ
87

আজ ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ। বাঙালি জাতির হাজার বছরের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় দিন। ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’-জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের এই দিনে বজ্রকণ্ঠে এই উচ্চারণ করেছিলেন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ঐতিহাসিক ভাষণে। সেদিনই এ দেশের মানুষ বুঝে গিয়েছিল পাকিস্তানের পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্তির সময় এসেছে। বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণটিই বাঙালির পরাধীনতা মুক্তির সনদ।
এই ভাষণের মাধ্যমে মুক্তিকামী বাঙালি জাতিকে মুক্তির বাণী শুনিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ৭ই মার্চের সেই ভাষণেরই সফল পরিণতি স্বাধীন বাংলাদেশ। রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ আর বহু ত্যাগের বিনিময়ে আমরা ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করি। পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে ছিনিয়ে আনি মহান স্বাধীনতা, বাঙালি জাতি পায় মুক্তির কাঙ্ক্ষিত স্বাদ। প্রতিষ্ঠা পায় স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশ। বাঙালির বীরত্বপূর্ণ সংগ্রাম ও সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে জাতির পিতার এই ভাষণের দিকনির্দেশনাই ছিল সে সময় বজ্রকঠিন জাতীয় ঐক্যের মূলমন্ত্র। কালজয়ী এই ভাষণ বিশ্বের শোষিত, বঞ্চিত ও মুক্তিকামী মানুষকে সব সময় প্রেরণা যুগিয়ে যাবে।
৪৯ বছরেও সেই ভাষণের আবেদন এতটুকু কমেনি। বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণ অনেক ভাষায় অনুবাদ হয়েছে। গবেষণা হয়েছে। পাঠ্যপুস্তকেও ঠাঁই পেয়েছে। এ ভাষণকে বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয় জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো।
অন্যদিকে, ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে, বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণকে পাঠ্য পুস্তকে প্রকাশ এবং শিক্ষার্থীদের কাছে তা তুলে ধরা উচিত বলে পর্যবেক্ষণ দিয়েছে হাইকোর্ট।
৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর রাজনৈতিক চিন্তাধারার পরিচয় দিয়েছেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলেন, রণকৌশলের দিক থেকেও এই ভাষণ অসাধারণ। এই বক্তৃতা এখনো মানুষকে শিহরিত করে। ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণটি পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ একটি ভাষণ। বলা যায়, বিশ্বের ১০টি ভাষণের অন্যতম। কালজয়ী ঐতিহাসিক ভাষণটি বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের জ্ঞানদীপ্ত প্রজ্ঞার ফসল। মাত্র ১৮ মিনিটের এই ভাষণ ছিলো বাঙালির মুক্তিসংগ্রামে অমোঘ নির্দেশনা এবং জেগে ওঠার মন্ত্র। মহাকাব্যিক এই ভাষণে একটি কথাও কম ছিলো না, বেশি ছিলো না। সেদিনের উত্তাল জনতরঙ্গে সময় ও পরিস্থিতি বিবেচনায় যা অনিবার্য তা-ই বঙ্গবন্ধুর বজ্রকণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছিল।
গবেষকরা বলছেন, বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর সর্বজনীনতা এবং মানবিকতা। যে-কোনো নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর জন্য এই ভাষণ সব সময়ই আবেদন সৃষ্টিকারী। এই ভাষণে গণতন্ত্র, আত্মনিয়ন্ত্রণ, স্বাধিকার, মানবতা এবং সব মানুষের কথা বলা হয়েছে। ফলে এই ভাষণ দেশ-কালের গণ্ডি ছাড়িয়ে সর্বজনীন হয়েছে। আর একজন মানুষ একটি অলিখিত বক্তৃতা দিয়েছেন, যেখানে স্বল্প সময়ে কোনো পুনরুক্তি ছাড়াই একটি জাতির স্বপ্ন, সংগ্রাম আর ভবিষ্যতের দিক নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি বিশ্বাসের জায়গা থেকে কথা বলেছেন। সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য ভাষায় কথা বলেছেন। সবচেয়ে বড় কথা, বঙ্গবন্ধু সাধারণ মানুষের চাওয়া-পাওয়া বুঝতে পেরেছেন। তাঁরা যা চেয়েছেন, বঙ্গবন্ধু তা-ই তাঁদের কাছে তুলে ধরেছেন। ফলে এই ভাষণটি একটি জাতির প্রত্যাশার আয়নায় পরিণত হয়। এই ভাষণই একটি জাতিকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্বুদ্ধ করেছে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালেও এই ভাষণ প্রেরণা যুগিয়েছে। আর এতবছর পরও মানুষ তাঁর ভাষণ তন্ময় হয়ে শোনেন।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ কেবল আমাদের নয়, বিশ্ববাসীর জন্যই প্রেরণার চিরন্তন উৎস হয়ে থাকবে। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে দীর্ঘ নয় মাস সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা অর্জন করি স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। একটি ভাষণ কীভাবে গোটা জাতিকে জাগিয়ে তোলে, স্বাধীনতার জন্য মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে উৎসাহিত করে, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ তার অনন্য উদাহরণ। জাতির পিতার ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণকে বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে ইউনেস্কোর স্বীকৃতি মুক্তিযুদ্ধের অসামপ্রদায়িক চেতনা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধেরই স্বীকৃতি। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে, জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতা বাংলাদেশের সংবিধানের এই চার মূলনীতি বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণে সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। ভাষণে বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতীয়তাবাদের কথাই বলেছেন। তিনি বাংলার মানুষের অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক মুক্তির কথা বলেছেন। তাঁর বক্তৃতায় বাঙালি জাতির ওপর তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের নির্যাতনের করুণ বর্ণনা দিয়েছেন। একইসঙ্গে বঙ্গবন্ধু তাঁর ভাষণে বাঙালি জাতির গণতান্ত্রিক অধিকারের দাবি তুলেছেন। বঙ্গবন্ধুর ভাষণে শোষণমুক্ত সমাজতন্ত্রের প্রতিফলনও আমরা দেখতে পাই। তিনি তাঁর বক্তব্যে একদিকে যেমন বাঙালি জাতির অর্থনৈতিক মুক্তির দাবি জানিয়েছেন, তেমনি অসহযোগ আন্দোলনে শ্রমজীবী গরিব মানুষের কথা উল্লেখ করেছেন।
বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ যুগে যুগে বাঙালি জাতিকে শক্তি ও সাহস যোগাবে। আমাদের মহান নেতার এই ঐতিহাসিক ভাষণ বাঙালি জাতির ইতিহাসে চিরন্তন ও সর্বজনীন হয়ে থাকবে।