৫ দফা দাবি ও ৯ লক্ষ্য ঘোষণা বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের

স্বাধীনতার পক্ষের সবাইকে যুক্ত হবার আহ্বান ড. কামালের

অজাদী ডেস্ক

রবিবার , ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ at ৫:১১ পূর্বাহ্ণ
177

বর্তমান সংসদ ভেঙে দিয়ে একটি নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার এবং নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনসহ ৫ দফা দাবিনামা উত্থাপন করে ‘বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের’ ঘোষণা দিয়েছেন যুক্তফ্রন্ট ও গণফোরামের নেতারা। একের পর এক আলোচনা, বৈঠক শেষে যুক্তফ্রন্ট ও গণফোরাম গতকাল জাতীয় প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এই পাঁচটি দাবি ও নয়টি লক্ষ্য নিয়ে আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য এ ঐক্যের ঘোষণা দিয়েছে। একইসঙ্গে এই ‘বৃহত্তর ঐক্য’ প্রক্রিয়ায় ‘স্বাধীনতার পক্ষের সব শক্তিকে’ যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন গণফোরামের সভাপতি ও জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার আহ্বায়ক ড. কামাল হোসেন। তিনি বলেছেন, আমরা প্রত্যেক পাড়ায় পাড়ায়, ঘরে ঘরে ঐক্য করার আহ্বান জানাচ্ছি। দেশে ‘প্রকৃত গণতন্ত্র’ ফিরিয়ে আনার জন্য সবাইকে পাহারা দিতে হবে, যেন কেউ কালো টাকার প্রভাব খাটাতে না পারে। যুক্তফ্রন্টের চেয়ারম্যান ও বিকল্পধারা সভাপতি এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী বাড়ি থেকে রওনা হলেও অসুস্থতার কারণে এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে পারেননি বলে যুক্তফ্রন্টের সদস্য সচিব মাহমুদুর রহমান মান্না জানান। বিকল্প ধারার সাংগঠনিক সম্পাদক ওমর ফারুক ছিলেন সংবাদ সম্মেলনে।

আওয়ামী লীগ ও বিএনপি জোটের বাইরে তৃতীয় একটি রাজনৈতিক শক্তির উত্থানের লক্ষ্যে বি চৌধুরী, মান্না ও আ স ম রব গঠিত যুক্তফ্রন্টের সঙ্গে সমপ্রতি যুক্ত হয়ে ‘জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া’র ঘোষণা দেন ড. কামাল হোসেন। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন গণ স্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, জেএসডির সভাপতি আ স ম আব্দুর রব, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না, জেএসডির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মালেক রতন, গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, ও ‘জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া’র সদস্য সচিব আ ব ম মোস্তফা আমিন।

পাঁচ দফা দাবিগুলো হচ্ছে :

. আসন্ন ১১শ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সকলের জন্য সমান সুযোগ সুবিধা এবং লেভেলে প্লেইং ফিল্ড নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পূর্বেই বর্তমান সংসদ ভেঙে দিয়ে রাজনৈতিক দলসমূহের সঙ্গে আলাপআলোচনার মাধ্যমে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার গঠন করতে হবে। নির্বাচনকালীন সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিগণ নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না।

. অবাধসুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বাকস্বাধীনতা, ব্যক্তি, সংবাদপত্র, টেলিভিশন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও সকল রাজনৈতিক দলের সভাসমাবেশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে, এবং আলাপ আলোচনার মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের নিয়ে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করতে হবে।

. কোটা সংস্কার এবং নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী ছাত্রছাত্রীসহ সকল রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে আনীত মিথ্যা মামলাসমূহ প্রত্যাহার করতে হবে, এবং গ্রেফতারকৃতদের মুক্তি দিতে হবে। এখন থেকে নির্বাচন শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করা যাবে না।

. নির্বাচনের এক মাস পূর্ব থেকে নির্বাচনের পর ১০ দিন পর্যন্ত মোট ৪০ দিন প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতাসহ সেনা মোতায়েন করতে হবে। এবং আইন শৃঙ্খলা বাহিনী নিয়োজিত ও নিয়ন্ত্রণ করার পূর্ণ ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের উপর ন্যস্ত করতে হবে।

. নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের চিন্তা ও পরিকল্পনা বাদ দিতে হবে।

. কামাল হোসেন বলেন, দেশের প্রকৃত মালিক জনগণ। এটা বাস্তবায়ন করতে সুষ্ঠু একটি নির্বাচন দরকার। স্বাধীনতার ৫০ বছরকে সামনে রেখে জাতীয় সংসদে কার্যকর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। যখনই নির্বাচন দেওয়া হয়, তখনই আমাদের সামনে আসতে হয়। নির্বাচন সুষ্ঠু হতে হবে, আমরা আশাবাদী, সন্ত্রাসকালো টাকামুক্ত নির্বাচনে ১৮ বছরের ঊর্ধ্বে সবাই ভোট দিতে পারবেন। এজন্য প্রত্যেক পাড়ায় পাড়ায় পাহারা দিতে হবে। কার্যকর গণতন্ত্র কেবল সংবিধানেই লেখা আছে, কার্যকর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এজন্য আমরা কাজ করছি। প্রকৃত অর্থে যারা জনগণের প্রতিনিধি তারাই দেশ পরিচালনা করবে। আজ থেকে ‘বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যে’র কার্যক্রম শুরু হলো।

এসময় আ স ম আব্দুর রব বলেন, আমরা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গিয়ে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানোর পর সংবাদ সম্মেলন করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সরকার সেখানে যেতে দেয়নি। তারা আমাদের জানিয়েছে, শহীদ মিনারে যাওয়া যাবে না। সেখানে পুলিশ দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। সেজন্য প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করতে হলো।

সংবাদ সম্মেলনে ‘বৃহত্তর ঐক্যে’র পাঁচ দফা দাবি ও নয় দফা লক্ষ্য পাঠ করে শোনান মাহমুদুর রহমান মান্না। তিনি বলেন, একটা অংশ হলো নির্বাচনের আগে আমাদের দাবি সমূহ। অপর অংশে নয়টি লক্ষ্য দেওয়া হয়েছে, যা নির্বাচনের পরে বাস্তবায়ন করা হবে।

৯ দফা লক্ষ্য হলো :

. বাংলাদেশে স্বেচ্ছাচারী শাসন ব্যবস্থা থেকে পরিত্রাণ এক ব্যক্তিকেন্দ্রিক নির্বাহী ক্ষমতা অবসানের লক্ষ্যে সংসদ, সরকার, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য আনা এবং প্রশাসন বিকেন্দ্রীকরণ, ন্যায়পাল নিয়োগ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কার্যকর করা। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদে নির্দলীয়, নিরপেক্ষ ও সৎ যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগের জন্য সাংবিধানিক কমিশন গঠন করা।

. দুর্নীতি দমন কমিশনকে যুগোপযোগী করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সংস্কার নিশ্চিত করা। দুর্নীতিমুক্ত, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন গড়ে তুলে সুশাসন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকারিবেসরকারি পর্যায়ে দুর্নীতি কঠোর হাতে দমন ও দুর্নীতির দায়ে জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনা।

. বিনিয়োগ বৃদ্ধির পরিবেশ সৃষ্টি, বেকারত্বের অবসান ও শিক্ষিত যুব সমাজের সৃজনশীলতা ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধাকে একমাত্র যোগ্যতা হিসেবে বিবেচনা করা।

. কৃষকশ্রমিক ও দরিদ্র মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সরকারি অর্থায়নে সুনিশ্চিত করা।

. জনপ্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, স্থানীয় সরকারসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দুর্নীতি ও দলীয়করণ থেকে মুক্ত করা।

. বাংলাদেশ ব্যাংকসহ আর্থিক প্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা আনা, সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার, সুষম বণ্টন ও জনকল্যাণমুখী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা।

. জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ ও সামপ্রদায়িকতার বিরুদ্ধে জাতীয় ঐকমত্য গঠন এবং প্রতিশোধ, প্রতিহিংসা ও নেতিবাচক রাজনীতির বিপরীতে ইতিবাচক সৃজনশীল এবং কার্যকর ভারসাম্যের রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করা।

. ‘সকল দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’এই নীতির আলোকে পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করা। এর নীতির আলোকে জনস্বার্থ ও জাতীয় নিরাপত্তাকে সমুন্নত রেখে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করা। প্রতিবেশি দেশগুলো সঙ্গে বন্ধুত্ব ও সমতার ভিত্তিতে ব্যবসা বাণিজ্য, যোগাযোগ ও বিনিয়োগ ইত্যাদির ক্ষেত্রে কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়া।

. বিশ্বের সব প্রতিরক্ষা বাহিনীকে আধুনিক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি ও সমর সম্ভারে সুসজ্জিত, সুসংগঠিত ও যুগোপযোগী করা।

জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া ও ড. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্ট সমপ্রতি এক হয়ে কাজ করার ঘোষণা দেয়। এরই অংশ হিসেবে গতকাল শনিবার (১৫ সেপ্টেম্বর) জাতীয় প্রেসক্লাবে এ সংবাদ সম্মেলন ডাকা হয়।

x