৩৬ বছরে শব্দায়ন

সুনীল বড়ুয়া : রামু

সোমবার , ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ at ৫:৩৮ পূর্বাহ্ণ
42

১৯৮৫ সালের ১ ফেব্রুয়ারি। মূলত আবৃত্তি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসাবে যাত্রা শুরু করেছিল শব্দায়ন আবৃত্তি একাডেমি। সেই যাত্রার আজ ৩৬ বছর।
আবৃত্তি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ শুরু করলেও বর্তমানে শব্দায়নের কাজের পরিধি বেড়েছে বহু গুণে।
বাংলা ভাষার বিশুদ্ধ উচ্চারণ চর্চা, ব্যাকরণ,বাংলা বানান, কবিতা আবৃত্তির নানা কৌশল, অনুষ্ঠান উপস্থাপনাসহ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের বাচিক শিল্পের বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষাদান চালিয়ে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। শুধু তাই নয়, সুস্থ সংস্কৃতি চর্চার পাশাপাশি আলোকিত ও মানবিক মানুষ গড়ার কাজ করছে শব্দায়ন। বলা যায় এটি এখন কক্সবাজার তথা দক্ষিণ চট্টগ্রামের আলোকিত একটি প্রতিষ্ঠান বলা যায়।
‘১৯৮৫ সালের ১ ফেব্রুয়ারি শব্দায়নের জন্ম। তখন সারা দেশে আবৃত্তি সংগঠন ছিল হাতেগোনা দু’একটি। সেই থেকে শব্দায়নই বিশুদ্ধ উচ্চারণ, বাচিক শিল্প ও আবৃত্তির ওপরও নিয়মিত কাজ করে আসছে। সুস্থ সংস্কৃতি চর্চার পাশাপাশি মানবিক মানুষ গড়ার কাজ করছে শব্দায়ন। এভাবেই নিজের প্রতিষ্ঠানের কথা তুলে ধরলেন প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক আবৃত্তিকার ও নাট্যজন জসীম উদ্দিন বকুল।
তিনি বলেন,শব্দায়নের দীর্ঘ সাংস্কৃতিক জীবনে চট্টগ্রাম, রাজধানী ঢাকা, এমনকি ভারতের কোলকাতার সাংস্কৃতিক অংগনের সাথেও শব্দায়নের সাংস্কৃতিক সখ্যতা গড়ে ওঠে। পশ্চিম বঙ্গের পত্রিকায় প্রকাশিত হয় শব্দায়নকে নিয়ে গৌরবগাথা। আপনাদের অকুন্ঠ সমর্থন, সহযোগিতা, ভালবাসা পেয়েছে বলেই শব্দায়ন এখনো স্বগৌরবে টিকে আছে। সেই সাথে বেড়েছে এখন কাজের পরিধিও।
গত ১ ফেব্রুয়ারি কক্সবাজার শহরের আনন্দ মাল্টিমিডিয়া স্কুল প্রাঙ্গণে নানা আয়োজনে এ প্রতিষ্ঠানটি ৩৬তম জন্মদিন উদযাপন করা হল। ‘আজি জন্মেছি বাংলায়,আমি বাংলায় কথা বলি’ শীর্ষক এ অনুষ্ঠানে ছিলো পিঠা উৎসব,আবৃত্তি আর কথামালার আয়োজন। যেখানে কক্সবাজারের সুধীজনদের কন্ঠে বাজে বাচিক শিল্পের পথিকৃৎ এই প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘ যাত্রায় সফলতার জয়গান।
শুধু পিঠা উৎসব বললে কম হয়ে যায়,কারণ পিঠার বৈচিত্র্যতা ছিল মুগ্ধ হবার মতো। প্রতিষ্ঠানের বয়সের সাথে সংগতি রেখে উৎসবে ছিল ৩৬ প্রকারের পিঠা যা সংখ্যায় বলা হলে আড়াই হাজারেরও বেশি। পিঠা গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্য যেমন বহন করেছে,সেইসব পিঠায় ছিলো আবার আধুনিকতার ছাপও। বলা যায় পিঠার বৈচিত্র্যে বিনামূল্যে রসনা বিলাসে মুগ্ধ উপস্থিত সুধীজনেরা।
শব্দায়নের পরিচালক জসীম উদ্দিন বকুলের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানের অতিথি ছিলেন কক্সবাজার জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মোহাম্মদ ইকবাল হোসাইন, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সোমেশ্বর চক্রবর্তী, বিশিষ্ট আইনজীবী কবি আবুল কালাম আজাদ,বিশিষ্ট সঙ্গীত শিল্পী প্রবীর বড়ুয়া, নাট্যজন ও আবৃত্তিকার কাউসার চৌধুরী,অধ্যাপক মকবুল আহমেদ, দৈনিক কক্সবাজার-এর পরিচালনা সম্পাদক মোহাম্মদ মুজিবুল ইসলাম,কক্সবাজার বেতারের সংগীত প্রযোজক বশিরুল ইসলাম,দৈনিক সমুদ্রকন্ঠের সম্পাদক মঈনুল হাসান পলাশ,অধ্যাপক দিলওয়ার চৌধুরী,নাট্যজন বাবুল পাল, এড. প্রতিভা দাশ, অধ্যাপক নীলোৎপল বড়ুয়া, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী দেলোয়ার হোসেন,রেডিও এনাউন্সারস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মো. শহীদুল ইসলাম,অধ্যাপক শরমিন সিদ্দিকা লিমা, অধ্যাপক পারিয়েল সামিহা শারিকা, আনন্দ মাল্টিমিডিয়া স্কুলের পরিচালক আবু বক্কর সিদ্দিক,অধ্যক্ষ মো. হেলাল উদ্দিন প্রমুখ।এছাড়াও অভিভাবকদের পক্ষ থেকে বক্তব্য দেন ইসলামিক ফাউন্ডেশন,কক্সবাজার-এর উপ পরিচালক ফাহমিদা বেগম। অনুষ্ঠান সঞ্চালনায় ছিলেন, সহকারী পরিচালক মিনহাজ চৌধুরী।
অনুষ্ঠানে কথামালার আয়োজনে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. ইকবাল হোসাইন বলেন,অনুষ্ঠানে না আসলে জানতাম না,কক্সবাজারের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের এই অবদানের কথা। আবৃত্তি চর্চা,শুদ্ধ উচ্চারণের পাশাপাশি বাচিক শিল্পের প্রসারে ৩৬ বছর ধরে কাজ করে যাচ্ছে শব্দায়ন।
তিনি বলেন,কক্সবাজারে আছি দেড় বছর, কিন্তু এত সুন্দর আয়োজন,এত বৈচিত্র্যতা চোখে পড়েনি, সত্যিই আমি মুগ্ধ।
কবি আবুল কালাম আজাদ বলেন, আজ-কাল মানুষ সুকুমার শিল্প চর্চার দিকে ঝুঁকছে না। ঝুঁকছে অসুস্থ বিনোদনের দিকে। ফলে শব্দায়নের মতো সুস্থ ধারার সংস্কৃতি চর্চা অব্যাহত রাখা দিন দিন দূরুহ হয়ে ওঠছে।
এমন পরিস্থিতি মোকাবেলা করে শব্দায়ন ৩৫টি বছর পার করেছে,সেটি কম গৌরবের বিষয় নয়।
অধ্যাপক সোমেশ্বর চক্রবর্তী বলেন, কক্সবাজারে প্রমিত বাংলা শিক্ষায় শব্দায়ন আজ একটি আলোকিত প্রতিষ্ঠান। শব্দায়নের অনেক শিক্ষার্থী আজ স্ব স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত।
তিনি বলেন,বিদেশী সংস্কৃতির প্রভাবে সুস্থ সংস্কৃতির প্রতি মানুষের মনস্কতা দিন দিন দুর্বল হচ্ছে। মানুষ ঝুঁকছে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির দিকে। ফলে শব্দায়নের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো পৃষ্ঠপোষক হারাচ্ছে। অথচ আমাদের উচিৎ মূল শিক্ষার বাইরে মেধা ও মনন চর্চারত শব্দায়নের মতো এসব পাদপীঠকে বাঁচিয়ে রাখা।
শব্দায়নের কথা
শব্দায়নের সহকারী পরিচালক অধ্যাপক রোমেনা আকতার ও মিনহাজ চৌধুরী জানান, বর্তমানে শব্দায়নের শিশু কিশোর ও জ্যেষ্ঠ বিভাগে শিক্ষার্থী রয়েছে প্রায় ১২০ জন। বর্তমানে সপ্তাহের প্রতি বৃহস্পতিবার শিশু-কিশোর বিভাগে কেজি, প্রথম-দ্বিতীয়, তৃতীয়-পঞ্চম,৬ষ্ঠ-অষ্টম চার শ্রেণিতে নির্ধারিত সিলেবাসের উপর এবং প্রতি শুক্রবার জ্যেষ্ঠ বিভাগে ( উচ্চ মাধ্যমিক থেকে স্নাতকোত্তর) পর্যায় পর্যন্ত প্রমিত উচ্চারণ,বাংলা বানান, আবৃত্তি,অনুষ্ঠান উপস্থাপনা এবং বাচিক শিল্পের বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়।
তারা জানান,,এছাড়াও শিক্ষার্থীদের মান যাচাইয়ের জন্য বিষয় ভিত্তিক পরীক্ষা,বর্ষসমাপনী পরীক্ষা এবং আবৃত্তি প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। মূলত বাংলাভাষাকে শুদ্ধভাবে বলা,লিখা এবং প্রয়োগের পাশাপাশি একটি শিশুর শিশু বয়স থেকেই যেন তার ভেতরে ভাষাগত ও উচ্চারণে শুদ্ধতা তৈরি হয়,সেজন্যই শব্দায়নের এ উদ্যোগ।
শুরুর কথা
অসামপ্রদায়িক, প্রগতিকামী, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী শব্দায়ন কর্মীরা। এদেশের স্বাধীনতা ও সংস্কৃতিকে জনজীবনে ফলপ্রসূ করার মাধ্যমে অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে জাতীয় সংস্কৃতির সঠিক বিকাশের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষেই আরো দশটি সাধারণ সংগঠনের মতই শব্দায়নের জন্ম হয় অত্যন্ত দীনহীনভাবে।
জসীম উদ্দিন বকুল ও নজরুল ইসলাম বকসী কয়েকজন তরুণের প্রত্যয়ে সামান্য কয়েকটি বই, বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ শাহ জাহানের এক হাজার টাকা অনুদান এবং অধ্যাপক ইস্কান্দরের দেয়া প্রথম পাঠ নিয়ে ১৯৮৫ সালের ১ ফেব্রুয়ারি কক্সবাজার পাবলিক থেকে শব্দায়নের যাত্রা শুরু হয়। দেশের প্রখ্যাত আবৃত্তিকার দম্পতি কাজী আরিফ ও প্রজ্ঞালাবণীর একান্ত আগ্রহ, উৎসাহ এবং ইচ্ছায় কক্সবাজারে শব্দায়ন প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। শব্দায়নের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠজন হিসেবে শুরু থেকে সহযোগিতা দিয়ে আসছেন কক্সবাজার পৌরসভার সাবেক জনপ্রিয় চেয়ারম্যান, সংস্কৃতি অংগনের বিপ্লবী পুরুষ নুরুল আবছার। এছাড়াও আরো উল্লেখ করতে হয়, রায়হান উদ্দিন, খোরশেদ আলমের কথা।