২৭ বছর আগের সেই মামলার রায় ১৮ এপ্রিল

রাঙ্গুনিয়ায় এসিড সন্ত্রাস

আজাদী প্রতিবেদন

মঙ্গলবার , ১০ এপ্রিল, ২০১৮ at ৪:৩১ পূর্বাহ্ণ
83

২৭ বছর আগের সেই আলোচিত মামলায় যুক্তিতর্ক সম্পন্ন। রায় ঘোষণা আগামী ১৮ এপ্রিল। রাঙ্গুনিয়ায় মুক্তিযোদ্ধা সোবহানের দুই ছেলের চোখে খেজুর কাটা দিয়ে খুঁচিয়ে এসিড ঢেলে দেয়ার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় যুক্তিতর্ক সম্পন্ন হল আদালতে। মামলাটি ৩ মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হাইকোর্ট থেকে আদেশ হওয়ার পর গতকাল সোমবার আসামি ও বাদীপক্ষে যুক্তিতর্ক শেষ হল। পঞ্চম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ স্বপন কুমার সরকার এর আদালতে চাঞ্চল্যকর এ মামলার বিচারকাজ অনুষ্ঠিত হয়। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী এডভোকেট মোহাম্মদ লোকমান হোসেন রায়ে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে বলে জানিয়েছেন। বিচারের বিষয়ে দুই ভিকটিমের ভাই ওয়াকিল আহমেদ বলেন, গত ২৭ বছর ধরে বিচারের আশায় আছি। যুক্তিতর্ক সম্পন্ন হওয়ায় আমরা আসামিদের বিচারের ব্যাপারে আশাবাদী। এদিকে গত ২৫ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্টের তরফে মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তির আদেশ হয়। বিচারপতি হাবিবুল গনির নেতৃত্বে একটি বেঞ্চ এ আদেশ দিয়েছিলেন।

জানা গেছে, পার্শ্ববর্তী হাশেমের সাথে জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে ১৯৯১ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি রাঙ্গুনিয়ার পশ্চিম নিশিন্তাপুর এলাকার বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা (হত্যাকাণ্ডের শিকার) আবদুস সোবহানের দুই ছেলেকে ফিল্মি কায়দায় পাকড়াও করে আইয়ুব বাহিনীর সদস্যরা (আইয়ুবের নেতৃত্বে)। আসামিরা সোবহানের ছেলে কবির আহমেদ ও সবুর আহমেদের হাতপা বেঁধে ফেলে। এরপর খেজুর কাটা দিয়ে খুঁচিয়ে দুই ভাইয়ের চোখ উপড়ে ফেলে। এসিড এনে দুইজনের চোখের মধ্যে ঢেলে দেয়া হয়। এসিডে ঝলছে যাওয়া দুই ভাই ছটফট করতে থাকেন। এঘটনায় দুই ভাইয়ের মধ্যে কবির আহমেদ ইতোমধ্যে মারা গেছেন বিভৎস্য এসিড যন্ত্রণা নিয়ে। এখনো বেঁচে থাকা সবুর আহমেদের অবস্থায় বেশ খারাপ।

মামলার বাদী মোহাম্মদ ফরিদুল আলম জানান, আইয়ুব বাহিনীর হাতে পিতা ও ভাই দুইজনকেই হারিয়েছি। এসিডে ঝলছে দেয়া আরেক ভাইও মৃত্যু যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন। অথচ এতবড় জঘন্য ঘটনার বিচার পাওয়ার প্রত্যাশায় আছি ২৭ বছর ধরে। তিনি আরো বলেন, এতবড় নৃশংসতার ঘটনা বাংলাদেশে আর আছে কিনা আমার জানা নেই। এ ঘটনায় তখন জাতীয় সংসদেও আলোচিত হয়েছিল। আলোচিত এ মামলাটি তদন্ত করে আইয়ুবসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেয়া হয়। এরপর মধ্যে ৩ জন মারা যাওয়ায় তারা মামলার দায় থেকে অব্যাহতি পায় আইনগতভাবেই। আর ১০ আসামির মধ্যে আইয়ুব বাহিনীর আইয়ুবসহ ৫ জন বর্তমানে জামিনে আছেন। বাকী ৫ জন আছেন পলাতক।

এদিকে দুই ছেলের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসীদের এসিড সহিংসতার বিচার চাইতে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধা সোবহানও টার্গেটে পরিণত হয়। একই বছর ১ নভেম্বর রানীরহাট বাজার থেকে বাড়িতে ফেরার পথে মুক্তিযোদ্ধা সোবহানকেও জিপ থেকে নামিয়ে ফেলে আসামিরা। তাকে নিয়ে যাওয়া হয় শিশুতল নামক স্থানের পাহাড়ে। এরপর নিজের হাতে কবর খুঁড়িয়ে এবং হাত কেটে সোবহানকেও হত্যা করা হয় বলে এ সংক্রান্তে দায়ের করা মামলার এজাহারে উল্লেখ রয়েছে।

ঘটনার এক সপ্তাহ পর সোবহানের হাড়গোড় উদ্ধার করে পুলিশ। এ নিয়ে দেশব্যাপী তুমুল সমালোচনার মধ্যে বাঁশখালী থেকে আইয়ুব বাহিনীর প্রধান আইয়ুব আলীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এরপর এ মামলায় ফৌজদারি কার্যবিধি ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়ে ঘটনার সাথে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করে নেয় আইয়ুব আলী। এ মামলায় আইয়ুব আলীসহ অন্যান্য আসামিদের সাজা হয়েছে আদালতে। আর এসিড সন্ত্রাসের মামলায় উভয়পক্ষে যুক্তিতর্ক সম্পন্ন হল গতকাল সোমবার। তথ্য অনুযায়ী, এ মামলায় কারাগারে থাকা আসামি মোহাম্মদ সোলায়মান হাইকোর্টে জামিনের জন্য আবেদন করেন। হাইকোর্টের দ্বৈত বেঞ্চ সোলায়মানকে শর্ত সাপে ে জামিন দেন। জামিনের আদেশে আগামী তিনমাসের মধ্যে চাঞ্চল্যকর এ মামলা নিষ্পত্তি করার জন্য সময়সীমা বেধে দেয়া হয়। এ আদেশের ফলে দীর্ঘ ২৭ বছর আগের এ মামলার বিচার নিষ্পত্তিতে গতি আসে বলে জানালেন রাষ্ট্রপক্ষের কৌসুলী অতিরিক্ত জেলা পিপি এডভোকেট মোহাম্মদ লোকমান হোসেন। এবিষয়ে অতিরিক্ত জেলা পিপি এডভোকেট লোকমান হোসেন জানান, ১৯৯২ সালে মামলার চার্জ গঠনের পর কেটে গেল ২৬ বছর। এরই মধ্যে এসিড নির্মমতার শিকার দুই ভিকটিমও এ মামলায় সাক্ষী দিয়েছেন। সাক্ষী দেয়ার পর একজন মারা গেছেন ইতোমধ্যে।

এডভোকেট লোকমান জানান, ভিকটিম ও প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীসহ মোট ১২ জন এ মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছেন আদালতে। আদালতের কার্যক্রম চলার সময় জামিনে থাকা আসামিদের জামিন বাতিল করার আবেদনও করেন রাষ্ট্রপক্ষের কৌসুলী এডভোকেট লোকমান। বিচারক সেই আবেদনে সাড়া দেননি।

x