২৫ মার্চের গণহত্যা : বিশ্বের ইতিহাসে নজিরবিহীন এক নৃশংসতম ঘটনা

মোঃ মোরশেদুল আলম

মঙ্গলবার , ২৪ মার্চ, ২০২০ at ১০:৩৮ পূর্বাহ্ণ
54

আগামীকাল ভয়াল ২৫ মার্চ, জাতীয় গণহত্যা দিবস। বাঙালি জাতির ইতিহাসে এক নৃশংস, ভয়ংকর ও বিভীষিকাময় কালরাত্রি হচ্ছে এই ২৫ মার্চ। একটি স্বতন্ত্র জাতি হিসেবে বাঙালির অস্তিত্বকে পৃথিবীর বুক থেকে চিরতরে মুছে ফেলার জন্য পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের এই দিনে ‘অপারেশন সার্চ লাইট’ নামক নীল নকশা অনুযায়ী নিরস্ত্র বাঙালির উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে অত্যাচার, নির্যাতন, নিপীড়ন, ধর্ষণ, লুণ্ঠন ও গণহত্যা চালায়। একই সাথে বাঙালি ই. পি. আর ও পুলিশ বাহিনীর পক্ষ থেকে প্রতিরোধ আসতে পারে ভেবে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তাদেরকে নির্মূল করার জন্য ব্যাপক আক্রমণ চালায়। সেনানিবাস, সীমান্ত ফাঁড়ি ও পুলিশ লাইনগুলোতে পাকিস্তানি বাহিনী সরাসরি হামলা চালিয়ে অস্ত্রাগারগুলো দখল করে নেয়। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানি সৈন্যদের দ্বারা গ্রেফতার হওয়ার পূর্বে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। তাঁর এ আহ্বানে সাড়া দিয়ে পূর্ব বাংলার আপামর জনসাধারণ সর্বশক্তি দিয়ে পাকিস্তানি হায়েনাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধ গড়ে তুলে। বর্তমান নিবন্ধে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তাদের দোসর তথা জামায়েত ইসলামী, মুসলিম লীগ, রাজাকার, আল বদর ও আল শামসের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় যে গণহত্যা চালিয়েছিল; তার একটি বিবরণ তুলে ধরার প্রয়াস চালানো হয়েছে।
গণহত্যার ইংরেজি প্রতিশব্দ ‘Genocide’. গণহত্যা হচ্ছে জাতিগত, বর্ণগত, ধর্মীয় বা নৃতত্ত্বীয় গোষ্ঠী হিসেবে বিবেচিত মানুষজনকে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধ্বংস করার ইচ্ছাকৃত কার্য। ১৯৪৮ সালের ৯ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত রেজ্যুলেশনে ২৬০ (৩) এর অধীনে গণহত্যা বলতে বুঝানো হয়েছে এমন কর্মকাণ্ড যার মাধ্যমে একটি জাতি বা ধর্মীয় সম্প্রদায় বা নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে নিশ্চিহ্ন করার প্রয়াস নেওয়া হয়েছে বা হচ্ছে। According to Encyclopedia Britannica, ‘Genocide, the deliberate and systematic destruction of a group of people because of their ethnicity, nationality, religion or race’.
১৯৭১ সালের ২৫ থেকে ২৮ মার্চ ঢাকা শহরে প্রথম ধাপের হামলা সম্পর্কে বলা হয়, ‘১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে শুরু হওয়া অপারেশন সার্চলাইট এবং পরবর্তী নয় মাস যে গণহত্যা চালানো হয় পূর্ব পাকিস্তানের হিন্দুরা তার একটা অন্যতম লক্ষ্যে পরিণত হয়। পাকিস্তানি সৈন্যরা পুরনো ঢাকার তাঁতীবাজার, শাঁখারীবাজার, নবাবপুর, ইংলিশ রোড, বাবুবাজার, নয়াবাজার, কোর্ট হাউজ পাড়া, গোয়ালনগর এলাকায় গণহত্যা চালায় ২৬ মার্চ বিকাল থেকে রাত পর্যন্ত। ২৭ মার্চ দুপুরে তারা আক্রমণ করে নবাবপুর থেকে ইংলিশ রোডের মধ্যবর্তী এলাকা। রাস্তার দুদিকে তারা আগুন ধরিয়ে দেয় এবং পলায়নরত নারী-পুরুষ ও বৃদ্ধদের নির্বিচারে হত্যা করে। আগুন ছড়িয়ে যায় ইংলিশ রোড থেকে সুইপার কলোনী পর্যন্ত, সদরঘাট বাস স্টপেজের চারদিকে, কলেজিয়েট হাইস্কুল, জগন্নাথ কলেজ, সদরঘাট গির্জা, নবাবপুর রোডের সর্বত্র, ক্যাথলিক মিশনের বাইরে ও ভিতরে এবং আদালত প্রাঙ্গণে। গণহত্যার শিকার হওয়া মানুষের মৃতদেহগুলো বিক্ষিপ্ত অবস্থায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে কয়েকদিন। পরে ঢাকা পৌরসভার সুইপারদের সহায়তায় ২৮ মার্চ থেকে ট্রাকে করে মৃতদেহগুলো স্বামীবাগ আউটকল, ধলপুর ময়লা ডিপো এবং ওয়ারী আউটকলে নেওয়া হয়। সেখানে পূর্ব থেকে করে রাখা বড় বড় গর্তে লাশগুলো ফেলে মাটি দেওয়া হয়। রাজারবাগ পুলিশ লাইনের উপর আক্রমণ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ও পুরনো ঢাকায় নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা করার জন্য ৩২ পাঞ্জাব রেজিমেন্টের অধিনায়ক লে. কর্নেল তাজ মোহাম্মদ খানকে পাকিস্তানের সামরিক খেতাব ‘সিতারা-ই-জুররত’ উপাধিতে ভূষিত করা হয় এবং ব্রিগেডিয়ার পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকা মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই মন্তব্য করেছিল, “এই গৃহযুদ্ধ পাকিস্তানের অভ্যন্ত্যরীণ ব্যাপার হলেও গেরিলা যুদ্ধের রূপ পরিগ্রহ করলে বিপদজনক আন্তর্জাতিক পরিণতির সৃষ্টি করবে। এই পরিস্থিতিতে বিশ্বের রাষ্ট্রবর্গের উচিত তাঁরা প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াকে আহ্বান জানাবেন যেন মানবতা ও শুভ বুদ্ধির ভিত্তিতে তিনি রক্তপাত বন্ধ করেন এবং জনগণের নির্বাচিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে ক্ষমতা ফিরিয়ে দেন।”
ওয়াশিংটন পোস্ট এক সম্পাদকীয় নিবন্ধে স্বদেশের নাগরিক হত্যার জন্যে ইয়াহিয়াকে দায়ী করে। সে সময়ের অবরুদ্ধ পরিস্থিতি সম্পর্কে লন্ডনভিত্তিক দ্য সানডে টাইমস পত্রিকার পাকিস্তান সংবাদদাতা এন্থনী ম্যাসকারেনহাস এর বর্ণনা থেকেও ধারণা পাওয়া যায়। এ পত্রিকায় বাংলাদেশের গণহত্যার ওপর তাঁর লেখা বিস্তারিত রিপোর্ট ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের ১৩ জুন ‘Genocide: Full Report’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়। প্রকাশিত এ রিপোর্টের বলা হয়, মার্চের শেষ দিকে যখন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর দুই ডিভিশন সৈন্য ‘বাঙালি বিদ্রোহীদের’ দমন করার জন্য পূর্ব পাকিস্তানে পাঠানো হয়, তখন তা গোপন রাখা হয়। মার্চ মাসের শেষদিক থেকে পশ্চিম পাকিস্তানের সৈন্যবাহিনী পূর্ব পাকিস্তানের হাজার হাজার বেসামরিক অধিবাসীকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। ইয়াহিয়ার সামরিক সরকারের পক্ষে এ ভয়ঙ্কর সংবাদ চাপা দেওয়া সম্ভব হয়নি। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর অতর্কিত বর্বর আক্রমণের উদ্দেশ্য ছিল বাংলার মানুষকে হত্যা ও নির্যাতন করে তাদের মধ্যে ভীতি সঞ্চারের মাধ্যমে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের প্রতি জোরপূর্বক আনুগত্য স্বীকার করিয়ে নেওয়া এবং এর মাধ্যমে দেশের একটি বড় অংশকে দেশ থেকে পলায়নে বাধ্য করা। তাদের দলিলপত্র ও লেখনীতে ‘আমাদের কোন মানুষ প্রয়োজন নাই, শুধু জমি প্রয়োজন’, ‘সবুজ দেশটাকে আমরা লাল রংয়ে রূপান্তরিত করব’ ইত্যাদি বিষয়ের প্রমাণ পাওয়া যায়। বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসররা এ গণহত্যা চালায়। কয়েকটি উল্লেখযোগ্য পদ্ধতি হল: বয়লারে ও ফার্নেসে জীবন্ত নিক্ষেপ করে, ধানভাঙা ঢেঁকির গর্তে মাথা রেখে ঢেঁকিতে পাড়া দিয়ে মাথার খুলি ভেঙে চুরমার করা, নির্যাতন শেষে কুয়ায় নিক্ষেপ করা, জবাই করা, সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে গুলি করা এবং বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা। জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলামী, পি.ডি.পি প্রভৃতি দল ইসলাম ধর্ম ও পাকিস্তান রাষ্ট্র রক্ষার নামে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে সক্রিয় সহযোগিতা করে। এ দলগুলো শান্তি কমিটি, রাজাকার, আলবদর, আলশামস ইত্যাদি বাহিনী গঠনের মাধ্যমে বাঙালিদের ওপর অত্যাচার, নির্যাতন, নিপীড়ন, অগ্নিসংযোগ, লুণ্ঠন, গণহত্যা, ধর্ষণ ইত্যাদি অপকর্ম পরিচালনা করে। গণহত্যার ফলে দেশের বেশ কয়েকটি গ্রামের নারীরা বিধবা হয়ে পড়েন। এসব গ্রাম বিধবা পল্লী হিসেবে পরিচিত। কয়েকটি বিধবা পল্লীর নাম নিচে উল্লেখ করা হল: ১। শেরপুর জেলার বানিয়াপাড়া, সূর্যদি, আন্ধারিয়া গ্রাম। ২৪ নভেম্বর এসব গ্রামের প্রায় ১৫০ জন মানুষকে একসাথে হত্যা করা হয়। সেদিন প্রায় ৫০ জন নারী বিধবা হন। এ গ্রামগুলো এখন বিধবা পল্লী হিসেবে পরিচিত। ২) ২৬ জুলাই শেরপুর জেলার সোহাগপুর গ্রামের ১৮৭ জন নিরীহ মানুষ গণহত্যার শিকার হয়েছিলেন। ফলে সেখানের প্রায় ৫৪জন নারী বিধবা হয়েছিলেন। গ্রামটিও বিধবা পল্লী হিসেবে পরিচিত। ৩) ঠাকুরগাঁও জেলার চকহলদি, জাঠিভাঙ্গা, জগন্নাথপুর, সিঙ্গিয়া, চণ্ডীপুর, আলমপুর, বাসুদেবপুর, গৌরীপুর, মিলনপুর, খামারভোপলা, ঢাবঢুবসহ মোট ১২টি গ্রামের কয়েক হাজার নরনারী, শিশু, বৃদ্ধ ২২ এপ্রিল সকাল বেলা মৃত্যুভয়ে ভারতের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। এ সংবাদটি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নিকট পৌঁছালে ২৩ এপ্রিল গণহত্যা চালানো হয়। ঐদিন ৩৫০ জন নারী বিধবা হন। এদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন চকহলদি গ্রামের। তাই গ্রামটি বিধবা পল্লী হিসেবে পরিচিত। পাকিস্তানি সামরিক জান্তা দীর্ঘ ৯ মাস ধরে সাংবাদিকতা, তথ্যসংগ্রহ ও বিতরণের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। তাই গণহত্যা ও নির্যাতনের অনেক তথ্যই অজানা রয়ে যায়। মহান মুক্তিযুদ্ধে দেশের ২০ জেলায় গণহত্যার সংখ্যা ৫,১২১টি। গণহত্যা-নির্যাতন ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষণা কেন্দ্রের জরিপ অনুযায়ী প্রতিটি গণহত্যায় ৫ থেকে ১ হাজারেরও বেশি মানুষ হত্যার তথ্য পাওয়া গেছে। এ ২০টি জেলা হল: গাইবান্ধা, জামালপুর, নড়াইল, পঞ্চগড়, মৌলভীবাজার, যশোর, লালমনিরহাট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কক্সবাজার, বরিশাল, নীলফামারী, নারায়ণগঞ্জ, বগুড়া, নাটোর, কুড়িগ্রাম, পাবনা, রাজশাহী, সাতক্ষীরা, ভোলা এবং খুলনা। ২০ টি জেলার বধ্যভূমির সংখ্যা ৪০৪, গণকবর ৫০২টি এবং নির্যাতন কেন্দ্র ৫৪৭টি।
পরিশেষে দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম ও যুদ্ধের বদৌলতে বাঙালি জাতি এ যুদ্ধে চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করে। বিশ্বের মানচিত্রে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। বাঙালি অর্জন করে তাদের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার। নয় মাস স্থায়ী এ মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লক্ষেরও অধিক মুক্তিযোদ্ধা পাকিস্তানি হায়েনাদের দ্বারা শহিদ হন। প্রায় ১৪ লক্ষ নারী বিভিন্নভাবে নির্যাতিত, নিগৃহীত এবং স্বামী-পুত্র-কন্যা বা অভিভাবক হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন। অস্ট্রেলিয়া থেকে প্রকাশিত নিউজ ম্যাগাজিন পিক্স-এর তথ্যানুযায়ী মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি সৈন্যদের দ্বারা এদেশের ৩ লক্ষ নারী ধর্ষিতা হয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন পাকিস্তানি সৈন্যবাহিনী এবং তাদের দোসরদের দ্বারা সংঘটিত গণহত্যা, জাতিগত নিপীড়ন এবং হিন্দু বিদ্বেষের কারণে প্রাণভয়ে ও নিরাপত্তার সন্ধানে লাখ লাখ মানুষ পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিয়েছিল। এপ্রিল মাসে শরণার্থীর সংখ্যা ছিল ১,১৯,৫৫৬ জন এবং পরবর্তী মাসগুলোতে তা জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পায়। ফলে ১৫ ডিসেম্বরে শরণার্থীর সংখ্যা ৯৮,৯৯,৩০৫ জনে উন্নীত হয়। ১৯৮১ খ্রিস্টাব্দে সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণার ৩৩তম বার্ষিকী উপলক্ষে জাতিসংঘের এক রিপোর্টে বলা হয় যে, মুক্তিযুদ্ধকালীন পাকিস্তানি সৈন্যরা স্বল্পতম সময়ে ১৫ লাখ মানুষ হত্যা করে। মোহাম্মদ আইয়ুব ও কে. সুব্রামানিয়ান এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘The Killings in Bangladesh were equal to the use of seventy-five Hiroshima type nuclear weapons’. স্বল্পতম সময়ে সর্বাধিক মানুষ নিহত হওয়ার এরূপ নৃশংসতম ঘটনা বিশ্বের ইতিহাসে নজিরবিহীন।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ,
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম।