২৪ অক্টোবর

সালমা বিনতে শফিক

শনিবার , ১২ অক্টোবর, ২০১৯ at ৪:১৬ পূর্বাহ্ণ
44

গেল বছর চব্বিশ অক্টোবরে নুসরাত ছিল। বলছি সোনাগাজীর নুসরাতের কথা। একনামে সবাই চেনে ওকে। কারণ ও আর নেই এখন এই পৃথিবীর কোথাও। আসছে চব্বিশ অক্টোবরে ওর হত্যা মামলার রায় ঘোষিত হতে যাচ্ছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে দ্রুত বিচার আইনের আওতায় আসায় ছ’মাসের মাথায় শেষ হতে যাচ্ছে নুসরাত হত্যার বিচারিক প্রক্রিয়া। নিঃসন্দেহে কালজয়ী একটা রায় দেবেন মাননীয় আদালত।
গেল বছর এমন দিনে কি করতো নুসরাত? খাতা ভরে কবিতা লিখত, সেজেগুজে ঘুরে বেড়াতো, উচ্চমাধ্যমিকের জন্য পড়া করত… আর- নিশ্চয় এ বছর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় অবতীর্ণ হওয়ার স্বপ্ন দেখত। ওর বন্ধুরা হয়তো এতদিনে ভর্তি পরীক্ষার ফরম কিনে দুয়ারে খিল দিয়ে পড়া মুখস্থ করছে। আমাদের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৪ অক্টোবরের তিনদিন পরই শুরু হতে যাচ্ছে ভর্তিযুদ্ধ। সারাদেশ হতে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকসহ হাজার হাজার মানুষ ছুটে আসবে পাহাড় ঘেরা সবুজ সেই ক্যাম্পাসের পানে। থৈ থৈ জনসমুদ্রে নুসরাতেরও যোগ দেয়ার কথা ছিল মা কিংবা বাবা কিংবা ভাইয়ের হাত ধরে। বাড়ি থেকে দু’তিন ঘণ্টা দুরের চবি ক্যাম্পাস হয়তো তার পছন্দের তালিকার শীর্ষে ছিল।
ওদের বাড়িতে না গিয়েও বুঝতে পারি ওর জীবনটা ছিল রাজকুমারীর মতো। আঁধার ঘরে ঠিক যেন চাঁদের আলো। তিন ভাইয়ের একমাত্র বোন হলে যা হয় আর কি। বাপের চোখের মনি, মায়ের সোনার খনি, ভাইদের বড় আদরের; পুরো পরিবারকে এক সুতোয় গেঁথে রাখত, না দেখেই সেকথা বলে দেওয়া যায়। গেল ছ’মাস কেমন করে একেকটা রাত দিন পাড়ি দিয়েছেন তাঁরা, সেটা কিন্তু না দেখে বলা যাবেনা, কল্পনাও করা যাবেনা। শ্রীদেবী অভিনীত মম্‌ (মা) ছবিটা দেখে কিছুটা আন্দাজ করা যায় শিরীন আক্তারের ব্যথা। তনুর মা (আনোয়ারা বেগম), রূপা’র মা, শতশত শিশুকন্যার শতশত মা- কত আর ভাবা যায়!
শেষ জীবনে বলিউডের রাণী শ্রীদেবী জীবন থেকে নেওয়া সাধারণ গল্পের ওপর ভিত্তি করে কিছু অসাধারণ কাজ করেছিলেন, মম্‌ তার মধ্যে সেরা। ‘ঈশ্বর সবখানে সবসময় থাকেন না বলেই তিনি ‘মা’ কে সৃষ্টি করেছেন সন্তানের সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য’- কথাটা মনের ভেতর গেঁথে গিয়ে আসন গেঁড়ে বসে থাকলেও শেষ বিচারে মা’কে আইন হাতে তুলে নিতে হয়, হন্তারকের ভুমিকায় নামতে হয়, অনেকটা সুপার মমস্টাইলে। প্রচলিত আইন ও বিচার ব্যবস্থা নিয়ে অসহায়ত্ব প্রকাশ করেন স্বয়ং আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য। পুরো উপমহাদেশের বিচার ব্যবস্থার স্বাভাবিক চিত্র ‘মম্‌’ ছায়াছবিতে ফুটে উঠেছে, কোন সন্দেহ নেই। সেকারণে গৎবাঁধা চলচ্চিত্রের মতো হ্যাপি এন্ডিং আসেনা শেষ দৃশ্যে।
২৪ অক্টোবর হ্যাপি এন্ডিং নিয়ে আসবে আমাদের সমাজ ও জাতীয় জীবনে সে আশা কোন অপ্রকৃতস্থ নাগরিকও করেনা। কিন্তু আইনের ফাঁকফোকর গলে হত্যাকাণ্ডে নিয়োজিত একদল অমানুষ বেকসুর খালাস পেয়ে বের হয়ে আসলে আমাদের জাতীয় জীবনের সব অর্জন- পতাকা, মানচিত্র, সার্বভৌমত্ব, উন্নয়ন, সাফল্যগাঁথা মিথ্যে হয়ে যাবে। প্রচলিত কোন ব্যবস্থার প্রতিই সাধারণ মানুষ আর আস্থা রাখতে পারবেনা।
আমরা তাকিয়ে আছি চব্বিশ অক্টোবরের দিকে। শিরীন আক্তারও তাকিয়ে আছেন। হত্যাকারীদের সাজা নিশ্চিত হলে উল্লসিত হবে সবাই। শিরীন আক্তার? তিনি কি সামিল হবেন বিজয়োল্লাসে? রূপা তনু শত শিশু কন্যার মায়ের দীর্ঘশ্বাসে ভারী আকাশে ২৪ অক্টোবর নতুন সূর্য উঠবে কি?

x