২০ হাজার টাকা দেনা শোধে বন্ধুর গলায় ছুরি

জবানবন্দিতে লোমহর্ষক বর্ণনা

সবুর শুভ

বুধবার , ৩১ জুলাই, ২০১৯ at ১০:১৪ পূর্বাহ্ণ
806

২০ হাজার টাকার দেনা শোধ করার জন্যই বন্ধু সাব্বির উদ্দিন ইকনের গলায় ছুরি চালান সিএনজি টেক্সি চালক তনয় বড়ুয়া প্রকাশ তনা! ছুরিটি ছিল ২০ টাকা দামের। জম্মদিনের কেক কাটার কথা বলে এ ছুরি কিনেন তিনি। সেই ছুরিতেই প্রাণসংহার হয় বন্ধু ইকনের। গত সোমবার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনের আদালতে তনার লোমহর্ষক জবানবন্দি থেকে উল্লেখিত কথাগুলো উঠে এসেছে। সম্প্রতি ফটিকছড়িতে এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। প্রায় ৫০ মিনিটের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে তনা জানান, তিনি সিএনজি চালক। ফটিকছড়ির সুন্দরপুর এলাকায় পিসির বাড়িতে থাকেন। মাত্র ৬ মাস বয়সে তার বাবা মারা যায়; মা আবার বিয়ে করেন। গত দেড় বছর ধরে তিনি ইয়াবা সেবন করেন। বন্ধু ইকন ছিল তার পিসির প্রতিবেশী। তিনিও ইয়াবা সেবন করতেন।
সংসারের অভাব, ব্যক্তিগত প্রয়োজন ও ইয়াবা সেবনের জন্য বন্ধুদের কাছ থেকে ১০ হাজার এবং সিএনজি মালিকের কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা লোন নেন তিনি। সেই টাকার জন্য বন্ধুরা তাকে চাপ দিচ্ছিল। এ সময় বন্ধু সাব্বির উদ্দিন ইকনের দামী মোবাইলের দিকে নজর পড়ে তনার। সেটি বিক্রি করে দেনা পরিশোধের পথ খুঁজতে থাকেন তিনি।
১২ পৃষ্ঠার জবানবন্দিতে বলা হয়, ২৫ জুলাই সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ইকনকে অনেকবার কল দেন তনা। তাদের দুজনের একসাথে ইয়াবা খেতে যাওয়ার কথা ছিল। উল্লেখিত দিন সুন্দরপুর ও পাইন্দং স্কুলের মধ্যে ফুটবল খেলা চলছিল। এক প্রতিবেশীর কথায় খেলোয়াড়দের সিএনজিতে করে মাঠে পৌঁছে দেন তনা। এরপর পূর্বের কথামতো ইকন খেলার মাঠে আসে। খেলা শেষে খেলোয়াড়দের গন্তব্যে নামিয়ে দিয়ে দুই বন্ধু তনা ও ইকন নাজিরহাট বাজারে গ্যাস নিতে যান। ফেরার পথে পূর্ব পরিকল্পনা মতো জম্মদিনের কেক কাটার কথা বলে বাজার থেকে ধারালো একটি ছুরি কিনে নেন তিনি। এ সময় ইকন সিএনজি থেকে নেমে যান।
তনা জবানবন্দিতে বলেন, ‘সিএনজিতে ইকনকে না দেখে আমি পাগল হয়ে যাই। এরপর সে একটি টিভি নিয়ে সিএনজিতে উঠে। আমি বলি, টিভিটি কোথাও রাখতে। ইকন বলে সমস্যা নেই। পরিকল্পনামতো নতুন মসজিদের দিকে যাই। সিএনজিটি বিজিবি ক্যাম্পের সামনে রাখি। দুজন কারবালার টিলার নিচে আকাশি গাছের বাগানে ইয়াবা সেবনের জন্য বসি। ইকন জিনিসপত্র বের করে ইয়াবা বানাতে থাকে। আমি পেছন দিক থেকে তার চুলের মুঠি ধরি। সে আমার দিকে তাকালে আমি চুল ছেড়ে দেই। ২-১ মিনিট পর আমার জিন্স প্যান্টের পকেট থেকে ছুরিটি বের করে তার গলায় পোঁচ বসাই। ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে সে আমার ডান গালে ঘুষি মারে। আমি তাকে ধরে মাটিতে ফেলে দেই। বুকের ওপর চেপে বসি। গলায় আরেক পোঁচ লাগাই। একহাতে মুখ চেপে রাখি যাতে আওয়াজ বের না হয়। ইকন নিস্তেজ হলে ছুরিটি ছুঁড়ে ফেলি। আমার পরনের গেঞ্জিতে রক্ত লাগলে সেটি খুলে হাতে নিই। রক্তমাখা প্যান্টটিও মুড়িয়ে নিই। এরপর সিএনজি র্স্টাট দিয়ে কিছুদূর গিয়ে টিভিটি ফেলে দেই।’
জবানবন্দির তথ্য অনুযায়ী, রাত সাড়ে ৮টা থেকে ৯টার মধ্যে তনা ধুরং নদীতে গোসল করেন। এ সময় গেঞ্জি ও প্যান্ট নদীতে ভাসিয়ে দেন তিনি। রাত সাড়ে ১০টার দিকে ইকনের মা তার পিসির বাড়িতে এসে ছেলের খোঁজ চান। এরপর কিছুই হয়নি ভাব নিয়ে দিনযাপন করতে থাকে তনা। ইকনকে মেরে ফেলার পর তার সিমটি ভেঙে ফেলা হয় এবং মোবাইলটি তোষকের নিচে লুকিয়ে রাখেন তনা। আর এই মোবাইলের সূত্র ধরেই বেরিয়ে আসে হত্যাকাণ্ডের পুরো ঘটনা।
জবানবন্দিতে আরও বলা হয়, পরদিন দুপুর ১২টার দিকে তনা ইকনের বাবাকে ফোনে জানায়, টিভিটির খোঁজ পাওয়া গেছে। এ সময় তনা, ইকনের বাবা ও ইকনের বন্ধু সাইমনসহ ভিকটিমকে খুঁজতে থাকে। এক পর্যায়ে তনা ও সাইমুন মিলে ঘটনাস্থলের দিকে যায়। সাইমন চিৎকার দিয়ে বলে ইকনের লাশ পাওয়া গেছে। এরপর পুলিশ আসে; এলাকায় ফিরে স্বাভাবিকভাবে চলতে থাকে হত্যাকারী।
গত ২৭ জুলাই রাতে পুলিশ তনাকে গ্রেপ্তার করে। এরপর কারবালার টিলার নিচে আকাশি গাছের বাগান থেকে ছুরি, পাইন্দং আর্দশ গ্রামের রাস্তার পাশ থেকে টিভি এবং তনার শোবার ঘর থেকে ইকনের মোবাইলটি উদ্ধার করে তারা। সোমবার বিচারকের সামনে হাজির করলে ফৌজদারি কার্যবিধি ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়ে হত্যাকাণ্ডের কথা বর্ণনা করেন তনা। এরপর তাকে কারাগারে পাঠিয়ে দেয়া হয়।
গতকাল মঙ্গলবার ফটিকছড়ি থানায় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (হাটহাজারী সার্কেল) মুহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মাসুম এক সংবাদ সম্মেলনে ইকন হত্যার রহস্য উদঘাটনের কথা জানান। এ বিষয়ে আজাদীর ফটিকছড়ি প্রতিনিধি এস এম আকাশ জানান, মোবাইল ট্রাকিংয়ের মাধ্যমে তনাকে গ্রেপ্তার করে ফটিকছড়ি থানা পুলিশ।
জানা গেছে, সাব্বির উদ্দিন ইকন বিবিরহাটস্থ চৌধুরী ভবনের বাসিন্দা মুহাম্মদ সাহাব উদ্দিনের ছেলে। বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনের কাছে ছেলের কোনো খোঁজ না পাওয়ায় পিতা সাহাব উদ্দিন ফটিকছড়ি থানায় একটি নিখোঁজ ডায়েরি করেন। লাশ উদ্ধারের পর হত্যা মামলা দায়ের হয় থানায়। ফটিকছড়ি থানার ওসি মোহাম্মদ বাবুল আকতার বলেন, এ ঘটনায় অজ্ঞাতদের আসামি করে মামলা করেছেন ইকনের বাবা। এখন ইকন হত্যার সাথে আর কেউ জড়িত কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

x