১৯৮৩’ র মধ্য ফেব্রুয়ারির ছাত্র আন্দোলন ও চট্টগ্রামের ছাত্র সমাজের ভূমিকা

জামশেদুল আলম চৌধুরী

শনিবার , ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ at ৫:০১ পূর্বাহ্ণ
42

১৯৮২ সালের ২৪শে মার্চ নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আব্দুর সাত্তারকে বন্দুকের নলের মুখে সরিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করলো তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল এরশাদ। সারদেশে সামরিক শাসন জারি করে জাতীয় সংসদ ভেঙে দিয়ে সকল প্রকার রাজনৈতিক তৎপরতা নিষিদ্ধ ঘোষণা করল। সামরিক আইন জারি করার তিন মাস পর আমরা চট্টগ্রামের তৎকালীন বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতৃবৃন্দরা একে অপরের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করলাম এবং সিদ্ধান্ত নিলাম ঢাকায় কেন্দ্রীয়ভাবে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে কোন কর্মসূচি গ্রহণ করলে চট্টগ্রামে আমরা তা পালন করব। জুলাই মাসের শেষের দিকে আমরা ঢাকার সাথে যোগাযোগ করি তৎকালীন কেন্দ্রীয় ছাত্রনেতৃবৃন্দের সাথে। ইতোমধ্যে সামরিক সরকার মজিদ খানকে দিয়ে একটি শিক্ষানীতি ঘোষণা করল। এই শিক্ষানীতি ছিল কুখ্যাত হামিদুর রহমানের শিক্ষানীতির কার্বণ কপি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসমাজ গর্জে উঠল, সর্বপ্রথম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে মিছিল করে মজিদ খানের শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাল। তিনজন ছাত্রকে সাদা পোশাকধারী পুলিশ ক্যাম্পাস থেকে রাতের অন্ধকারে তুলে নিয়ে গিয়ে সামরিক আদালতে বিচার করে প্রত্যেককে তিন বছর করে কারাদণ্ড দিল। এর প্রতিবাদে সর্বপ্রথম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৪টি ছাত্র সংগঠন ঐক্যবদ্ধ হলো এবং ঢাকার নির্দেশে চট্টগ্রামে আমরা ১৪টি ছাত্রসংগঠন গঠন করার জন্য ৮৩’ র ৫ই আগস্ট ফিরিঙ্গীবাজারের হোটেল কর্ণফুলীর ছাদের উপর এক গোপন বৈঠকে মিলিত হলাম। সেই দিনের বৈঠকে তৎকালীন ছাত্র নেতৃবৃন্দ যারা উপস্থিত ছিলেন তারা হলেন: বাংলাদেশ ছাত্রলীগের আ.জ.ম নাছির, খোরশেদ আলম সুজন, নুরুল হুদা, (জালাল-জাহাঙ্গীরের), হাসান মাহমুদ শামসের, ছাত্রলীগ (ফজলু- চুন্নু) আ.ক.ম শামসুজ্জামান, এম.এ মান্নান, বশির উদ্দিন মাহমুদ এবং আমি নিজে, বাসদ ছাত্রলীগের বেলাল চৌধুরী, মোহন ও সেলিম, ছাত্র ইউনিয়নের হারুনুর রহিম এবং মনোয়ার আহমেদ, জাসদ ছাত্রলীগের সোলেমান খান ও আব্দুর রহমান প্রমুখ। কর্ণফুলী হোটেলের ছাদে চট্টগ্রামের ১৪টি ছাত্র সংগঠন ঐক্যবদ্ধ হলো, পরবর্তীতে আমরা চট্টগ্রাম স্টেডিয়াম এবং বিভিন্ন সিনেমা হলে গোপনে মিলিত হয়ে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করতাম। ইতোমধ্যে ঢাকা থেকে কেন্দ্রীয় ১৪টি ছাত্র সংগঠনের পক্ষ থেকে একটি সার্কুলার আমরা পাই, তাতে মজিদ খানের শিক্ষানীতি বাতিল এবং দণ্ডপ্রাপ্ত তিনজন ছাত্রের মুক্তির দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলার লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের সারাদেশে গোপনে কর্মসূচি দেওয়া হয়। চট্টগ্রামে আসলেন তৎকালীন ছাত্রলীগ (ফজলু-চুন্নু) কেন্দ্রীয় কমিটির দপ্তর সম্পাদক ও পরবর্তীতে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও ডাকসু ভি.পি বর্তমানে সংসদ সদস্য সুলতান মোহাম্মদ মনসুর ও বাসদ ছাত্রলীগের মারুফ চিনু নেতৃবৃন্দ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম শহরে কয়েকটি গোপন বৈঠক করে আন্দোলনের বিস্তারিত কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করলেন। পরবর্তী সময়ে তৎকালীন ডাকসুর জি.এস ও পরে পতিত স্বৈরাচারের মন্ত্রী জিয়াউদ্দিন বাবলু ও রাকসুর তৎকালীন জি.এস জাহাঙ্গীর কবি রানা গোপনে চট্টগ্রামে এসে চট্টগ্রাম শহরে এবং পটিয়ায় কয়েকটি বৈঠকে আন্দোলনের পটভূমি ব্যাখ্যা করে। ইতোমধ্যে ১৭ই সেপ্টেম্বর শিক্ষা দিবসকে কেন্দ্র করে ১৪টি ছাত্র সংগঠন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদে রূপান্তরিত হয়। ১৭ই সেপ্টেম্বর শিক্ষা দিবসে মিছিল করার প্রস্তুতি নিলে পুলিশ, বি.ডি.আর অতর্কিতভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করে লাঠিচার্জ ও টিয়ার গ্যাস মেরে ছাত্র-ছাত্রীদের উপর নির্মম অত্যাচার চালায়। তারপরের দিন পুলিশি নির্যাতনের প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগ্রামী ছাত্রসমাজ তার অতীত গৌরবোজ্জ্বল সংগ্রামী ভূমিকাকে অক্ষুণ্ন রেখে গর্জে উঠল নবগঠিত ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে। চট্টগ্রামেও আমরা ১৮ই সেপ্টেম্বর বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ঢাকার ঘটনার প্রতিবাদে মিছিল সমাবেশ করি। সেদিন এক পর্যায়ে মেডিকেল থেকে মিছিল চকবাজার পর্যন্ত চলে আসে এবং পুলিশের সাথে সংঘর্ষ হয়। বস্তুত, ৮৩’ র ১৭ই সেপ্টেম্বরের পর ক্রমশ সামরিক শাসন বিরোধী ছাত্র আন্দোলন দ্রুত গতিতে দানা বেঁধে উঠতে লাগল এবং সামরিক শাসক এরশাদের ভিত কেঁপে উঠল। তারপর আন্দোলনের দ্বিতীয় স্তর হিসেবে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ছাত্রদের দাবী-দাওয়াকে সামনে রেখে মজিদ খানের শিক্ষানীতি বাতিল ও সামরিক আইন প্রত্যাহারসহ বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে মধুর ক্যান্টিনে সাংবাদিক সম্মেলন করে ১০ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করল। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে সারাদেশে স্বাক্ষর অভিযান শুরু হলো মজিদ খানের শিক্ষানীতি বাতিলের দাবিতে। চট্টগ্রামে আমরা সফলভাবে সেদিন শুভপুর থেকে টেকনাফ পর্যন্ত ছাত্রদের স্বাক্ষর সংগ্রহ করি। ইতোমধ্যে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ সারাদেশের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করে আন্দোলনকে একটি চেইন অফ কমান্ডের মধ্যে নিয়ে আসে। ৩রা নভেম্বর ঢাকার রাজপথে প্রথম সামরিক আইনবিরোধী মিছিল হয়, ৮ই নভেম্বর অনুরূপ একটি মিছিলের প্রস্তুতি নেওয়ার সময় সামরিক বাহিনী ও পুলিশ যৌথভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে এবং এলোপাতাড়ি লাঠিচার্জ করে। তাদের অত্যাচার থেকে সেদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মচারী পর্যন্ত রেহাই পায়নি। মারাত্মকভাবে আহত হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত শিক্ষক নুরুল আমীন পাটোয়ারী, গ্রেপ্তার হলেন শিক্ষিকা মাহমুদা ইসলাম। এই ঘটনার প্রতিবাদে চট্টগ্রামে আমরা চট্টগ্রাম কলেজে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে মিছিল ও সমাবেশ করি, ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ইতোমধ্যে ১০ দফা বাস্তবায়নের জন্য ৮৩’র ১১ই জানুয়ারি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সামনে অবস্থান, ধর্মঘট ও স্মারকলিপি প্রদানের কর্মসূচি ঘোষণা করে। পরে বিশেষ কারণে ১১ই জানুয়ারির কর্মসূচি পরিবর্তন করে ১৪ই ফেব্রুয়ারি কর্মসূচি গ্রহণ করে। সামরিক জান্তার রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে ১৪ই ফেব্রুয়ারির কর্মসূচিকে সফল করার জন্য ঢাকার এবং তার আশেপাশের এলাকাকে ব্যাপকভাবে সংগঠিত করা হল। ১৪ই ফেব্রুয়ারি ২০ হাজারেরও উপরে ছাত্র-ছাত্রী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে মিছিল নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় অভিমুখে অগ্রসর হচ্ছিল, স্লোগান ছিল “সামরিক বাহিনী ব্যারাকে যাও, গণতন্ত্র ফিরিয়ে দাও”, “মজিদ খানের শিক্ষানীতি বাতিল কর”, “১০ দফা মানতে হবে”। অতর্কিতভাবে পুলিশ মিছিলের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল, এলোপাতাড়ি গুলি চালালো ঢাকায়, কালো পিচ ঢালা রাজপথ রক্তে রঞ্জিত হলো। শহীদ হলেন মোজাম্মেল, কাঞ্চন, জাফর, জয়নাল, দিপালী সাহাসহ আরো অনেকে। অনেক লাশ সরকার গুম করে ফেলল, বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা থেকে লাশ ছিনিয়ে নিতে গিয়ে গণনির্যাতন চালাল পুলিশ। জাতীয় নেতৃবৃন্দ সেদিন প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় গিয়ে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সাথে একাত্বতা ঘোষণা করল। বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করল, লুট করা হলো ছাত্রাবাস, লাঞ্ছিত হলো ছাত্রী বোনেরা, কালো কাপড়ে চোখ বেঁধে গ্রেপ্তার করা হলো জাতীয় নেতৃবৃন্দ ও ছাত্র নেতৃবৃন্দকে, সারাদেশে বিদ্যুৎ গতিতে ঢাকায় মিছিলে ছাত্র হত্যার কথা ছড়িয়ে পড়ে। আমি তখন ছাত্রলীগ (ফজলু- চুন্নু) মহানগর শাখার সাধারন সম্পাদক ও সরকারি হাজী মুহাম্মদ মহসীন কলেজ ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি। মহসীন কলেজ বাণী অর্চনা সংসদের আলোচনা সভায় অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার জন্য দক্ষিণ জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু সাহেবের বাসায় ১৪ই ফেব্রুয়ারি ২টার সময় কলেজের কয়েকজন ছাত্রকে নিয়ে আমি যাই। বাবু ভাইয়ের কাছে শুনলাম ঢাকায় গুলিতে অনেক ছাত্র নিহত হয়েছে। ইতোমধ্যে আমরা চট্টগ্রামের ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দরা একত্রিত হলাম, রাজনৈতিক দলের অপরাপর নেতৃবৃন্দের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলাম। তৎকালীন নগর আওয়ামী লীগের আহবায়ক মরহুম সিরাজুল হক মিয়ার বাসায় গিয়ে উনার সাথে আলাপ করলাম এবং ঢাকায় টেলিফোন করে বিস্তারিত খবর নিয়ে নগর আওয়ামী লীগের তৎকালীন যুগ্ম-আহবায়ক প্রয়াত মেয়র এ.বি.এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলাম। উল্লেখ্য, হুলিয়া থাকার কারণে তখন মহিউদ্দিন ভাই প্রায় আত্মগোপন অবস্থায় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতেন। উনার সাথে যোগাযোগ করতে না পেরে আমরা চট্টগ্রাম ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দরা কে.সি.দে রোডস্থ মৈত্রী সমিতির অফিসে সন্ধ্যায় একত্রিত হলাম এবং সন্ধ্যা ৬টায় প্রথম সামরিক আইন অমান্য করে মিছিল করলাম। মিছিল কে.সি.দে রোড থেকে রেয়াজউদ্দিন বাজার আমতলায় এসে শেষ করে রাত ৮টার সময় মেডিকেলে বসার সিদ্ধান্ত নিলাম। ১৪ই ফেব্রুয়ারি রাত ৯টায় চট্টগ্রাম ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দ সবাই মেডিকেলের পাঁচ তলায় এসে সমবেত হয় এবং পরে কলেজের পিছনের মাঠে পাহাড়ের পাশে রাত ১০টায় আমরা আলোচনা শুরু করি। আলোচনায় সেদিন উপস্থিত ছিলেন তৎকালীন ছাত্র নেতৃবৃন্দের মধ্যে সফর আলী, শেখ মাহমুদ ইছহাক, সাদেক চৌধুরী, মাহবুবুল আলম, খোরশেদ আলম সুজন, আলী আকবর চৌধুরী, শামসুজ্জামান, বোয়ালখালীর সেলিম, মোহাম্মদ ইউনুস, ইমতিয়াজ উদ্দিন পাশা, হাসান মাহমুদ শমসের, হারুনুর রহিম, মনোয়ার আহমেদ, বেলাল চৌধুরী, মোহাম্মদ সেলিম এবং আমি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ছাত্রনেতা গিয়াস উদ্দিন ও সিরাজুদৌলা চৌধুরী রাত ৯টায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যায়। উল্লেখ্য, সেইদিনের আলোচনায় কমিউনিস্ট পার্টির বালাগাত উল্লাহ এবং অশোক সাহা উপস্থিত ছিলেন। রাত ১টার সময় আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম চট্টগ্রাম কলেজে সকাল ১০টায় সমাবেশ করব। সেইখান থেকে মিছিল নিয়ে শহীদ মিনারে প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হবে। রাতে আমরা প্রত্যেকে দায়িত্ব নিয়ে পুলিশের তৎপরতাকে ফাঁকি দিয়ে এই সিদ্ধান্ত চট্টগ্রাম শহরের সমস্ত কলেজ ও স্কুলের ছাত্রাবাসে পৌঁছে দিই। ১৫ই ফেব্রুয়ারি সকাল ৯টা থেকে চট্টগ্রামের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে ছাত্ররা সামরিক আইন ভঙ্গ করে মিছিল নিয়ে বিভিন্ন পথে চট্টগ্রাম কলেজে এসে সমবেত হতে থাকে। সকাল ১০টায় পলিটেকনিকেল কলেজ ও মেডিকেল কলেজের একটি জঙ্গি মিছিল এসে মহসীন কলেজে অবস্থান নেয় এবং পরবর্তীতে তারা মিছিল নিয়ে গণি বেকারীর দিকে অগ্রসর হলে পুলিশের সাথে সংঘর্ষ হয়। উল্লেখ্য, পুলিশ সেইদিন প্রথম ছাত্রদের উপর গরম পানি নিক্ষেপ করে। পলিটেকনিকের ছাত্ররা পুনরায় চট্টগ্রাম কলেজ ক্যাম্পাসে ফিরে আসে। ইতোমধ্যে হাজার দশেক ছাত্র চট্টগ্রাম কলেজে সমবেত হয়েছে। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের জন্য অপেক্ষা করতে থাকি এবং একটি সংক্ষিপ্ত সমাবেশ করি, সমাবেশে মহসীন কলেজের ভি.পি হিসেবে আমি সর্বপ্রথম বক্তৃতা দিই এবং পরে চট্টগ্রাম কলেজের তৎকালীন সময়ে সাবেক ভি.পি জাফর বক্তৃতা দেয়। সর্বশেষ বক্তৃতা দেন ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক নেতা কমিউনিস্ট পার্টির সংগঠক অশোক সাহা। অশোক সাহা ৩৫ মিনিট এক জ্বালাময়ী বক্তৃতা দেয়। তার বক্তৃতায় হাজার হাজার ছাত্র উত্তেজিত হয়ে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে এবং ফুটপাতের স্ল্যাব ভেঙে লোহার রড বের করে নেয়। ১১:৩০মিনিটে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের আসতে দেরি হচ্ছে দেখে মিছিল নিয়ে শহীদ মিনারের দিকে অগ্রসর হই। হাজার দশেক ছাত্রের জঙ্গী মিছিল দেখে পুলিশ পিছু হটে। ১২:১৫ মিনিটে আমরা শহীদ মিনারে উপস্থিত হই এবং সাথে সাথে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দুই হাজারের উপর ছাত্র এসে আমাদের সাথে যোগ দেয়। আমরা নেতৃবৃন্দরা শহীদ মিনারের উপরে উঠে সমাবেশ শুরু করার জন্য মাইকের সামনে দাঁড়াই, তখন সিনেমা প্যালেসের দিক থেকে দুইটি আর্মড ব্যাটেলিয়ানের ট্রাক দ্রুত বেগে শহীদ মিনারের সামনে আসে। উত্তেজিত ছাত্ররা ট্রাক দুইটির উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং ইট-পাটকেল মারে। রাইফেল ক্লাবের সামনে গিয়ে ট্রাক দুইটি থামে এবং তারপরেই শহীদ মিনারের দিকে গুলি চালাতে আরম্ভ করে। সবাই দিক-বিদিক জ্ঞান শূন্য হয়ে ছুটতে থাকে। আমি এবং মনোয়ার আহমেদ তখনো মাইক স্ট্যান্ডের সামনে দাঁড়ানো। প্রথমে মনে করলাম টিয়ার গ্যাস ছুঁড়ছে, কারণ আমার জীবনে তখন আমি সর্বপ্রথম গুলির মুখে পড়লাম। পরে বুঝতে পারলাম গুলি হচ্ছে, তখন লাফ দিয়ে শহীদ মিনারের নিচে বাগানের মধ্যে দেয়ালের পাশে শুয়ে পড়লাম। গুলি বন্ধ হলে রাস্তায় এসে দেখি অনেক ছাত্র রক্তাক্ত অবস্থায় দৌঁড়াচ্ছে। হাসমত আলী শালকরের সামনে দেখলাম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মোজাম্মেল পড়ে আছে, গুলিতে তার মাথার খুলি উড়ে গেছে। পুলিশ আহত মোজাম্মেলকে ছিনিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল। চট্টগ্রামের বীর ছাত্র
জনতা পুলিশের গুলির মুখে মোজাম্মেলকে একটি ট্যাক্সিতে তুলে দেয়। দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের নেতা এম.এ. জাফর, তৎকালীন ছাত্রনেতা গিয়াসউদ্দিন ও রাশেদ মনোয়ার আহত মোজাম্মেলকে চট্টগ্রাম মেডিকেলে নিয়ে যায়। গুলি করার পরেও চট্টগ্রামের হাজার হাজার ছাত্র আবারো একত্রিত হয়ে আরো ব্যাপক জঙ্গিত্ব ধারণ করে, মিছিল নিয়ে সিরাজুদৌলা রোড ধরে মেডিকেলে এসে দুপুর ২টায় সমবেত হয়। মেডিকেলে এসে দেখি হাজার হাজার ছাত্র মেডিকেল হাসপাতাল চত্বরে সমবেত হয়। ইতোমধ্যে ডাক্তারদের সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে মোজাম্মেল শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে। কলেজের সামনে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয় এবং ১৬ই ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামে হরতাল ঘোষণা করা হয়। মেডিকেলের সমাবেশে বক্তৃতা দেন অশোক সাহা, খোরশেদ আলম সুজন, ডাক্তার সাখাওয়াত হোসেন জীবন ও ডাক্তার আইনুল হক। পরে বিকাল ৪টায় মোজাম্মেল এর লাশ নিয়ে আমরা মিছিল নিয়ে কলেজ ক্যাম্পাস থেকে রাস্তায় বের হই। পুলিশ লাশ ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে এবং মিছিলে টিয়ার গ্যাস মারে। আমরা মেডিকেল ক্যাম্পাসে মোজাম্মেল এর লাশের কফিন নিয়ে ঢুকে পড়ি। পরবর্তীতে পুলিশ সন্ধ্যার সময় সাড়াশি আক্রমণ করে মেডিকেল এলাকা থেকে লাশ ছিনিয়ে নিয়ে যায়। এইদিকে ১৬ই ফেব্রুয়ারির হরতালের সমর্থনে সমগ্র চট্টগ্রাম শহরের পাড়ায় মহল্লায় আমরা ঝটিকা মিছিল করি। ১৬ তারিখ চট্টগ্রামে আংশিক হরতাল পালিত হয়েছিল। ঐদিন রাত্রে পুলিশ আমাদের অনেকের বাসা তল্লাশি করে গ্রেপ্তারের জন্য। গ্রেপ্তার এড়ানোর জন্য আমরা আত্মগোপন অবস্থায় থেকে আন্দোলন পরিচালনা করি এবং দ্রুত গতিতে সামরিক জান্তা বিরোধী আন্দোলন সংগঠিত করি। তার পরবর্তী ইতিহাস মধ্য ফেব্রুয়ারির আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় নব্বই এ সামরিক জান্তা এরশাদের পতন। ৮৩’র মধ্য ফেব্রুয়ারির আন্দোলনে চট্টগ্রামের বীর ছাত্রসমাজ যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে তা বাংলাদেশের ছাত্র গণআন্দোলনের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

লেখক : সাবেক ছাত্রনেতা ও সাবেক ভি.পি,
সরকারি হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজ-চট্টগ্রাম।