১২শ লোকের ভাষা

রেজাউল করিম

বুধবার , ২০ নভেম্বর, ২০১৯ at ৩:৩৪ পূর্বাহ্ণ
29

মাত্র হাজার ১২শ লোকের ভাষার এতদিন অনেকে জানতই না। সে ভাষার নাম হচ্ছে কোরো। তাদের বাস অরুণাচল প্রদেশের দুর্গম অরণ্যে। বিজ্ঞান এতদিন এই ভাষার খবর জানতই না। খবর পেয়ে বিজ্ঞানীরা উচ্চকিত, বিস্মিতও।
জাপানকে সূর্যোদয়ের দেশ বলা হয়। কিন্তু ভারতেও একটি সূর্যোদয়ের দেশ রয়েছে। সেটি হচ্ছে অরুণাচল। অরুণাচলের অর্থ হচ্ছে সূর্যোদয়ের দেশ। অরুণাচল হচ্ছে উত্তর-পূর্ব ভারতে অবস্থিত ভারতের ২৯ টির মধ্য একটি অঙ্গরাজ্য। এর দক্ষিণে ভারতের অঙ্গরাজ্য আসাম, পশ্চিমে ভুটান, উত্তর ও উত্তর-পূর্বে চীন, পূর্বে মিয়ানমার। এর রাজধানী ইটানগর। অরুণাচল প্রদেশের আয়তন ৮৩,৭৪৩ বর্গকিলোমিটার, যা পার্বত্য চট্টগ্রাম হতে প্রায় সাত গুণ বড়। কিন্তু জনসংখ্যা পার্বত্য চট্টগ্রামের তুলনায় খুবই কম। অবশ্য, বাঙালিদের বাদ দিলে পার্বত্য চট্টগ্রামের ১৩ টি আদিবাসীদের জনসংখ্যা অরুণাচলের জনসংখ্যার আনুপাতিক হার সমান হত। কিন্তু এ সূর্যোদয়ের দেশে চাকমা জনগোষ্ঠীও রয়েছে।
অরুণাচল প্রদেশ। চীনের সীমান্তবর্তী উত্তর পূর্ব ভারতের পাহাড় জঙ্গলে ঘেরা একটি রাজ্য। সেখানেই কয়েকশ বছর ধরে বাস করছে কিছু তিব্বতি বার্মিজ পরিবার। যাদের মুখের ভাষা এই কোরো। যে ভাষার খবর বিজ্ঞানের কাছে নতুন। তিব্বতি বার্মিজ গোষ্ঠীভূক্ত ভাষা হলেও এই ভাষার সঙ্গে বিজ্ঞানের জানাশোনা ভাষাগুলোর কোথাও কোনো মিল নেই। মনে হতে পারে যেন এ ভাষা আসছে মহাকাশের অন্য কোনো গ্রহ থেকে। তেমনই বলছেন গবেষণাকারী ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের গবেষকরা। তাঁরা কোরো ভাষা রেকর্ড করে বারবার চালিয়েও এমন কোনো সূত্র আবিষ্কার করতে ব্যর্থ হয়েছেন, যে সূত্র কিনা চেনা ভাষাগুলোর সঙ্গে এই ভাষার কোথাও কোনো মিলের সম্ভাবনা দেখাতে পারে। গবেষকরা বলছেন, বিশ্বে মোট ৬৯০৯ টি ভাষার সন্ধান মিলেছে এ পর্যন্ত। মানুষের মুখের যে ভাষাগুলির মধ্যে কোথাও না কোথাও এমন কিছু আছে যা একে অপরকে চেনাতে সাহায্য করে। কোরোর কিন্তু সেসব কিছুই নেই। এমনকি যে তিব্বতি বার্মিজ গোষ্ঠীতে এই ভাষা পড়ছে, সেই গোষ্ঠীতে কমবেশি দেড়শ ভাষা আছে। তাদের কারও সঙ্গেও নাকি কোরোর কোনো মিল নেই।
তবে কোরো কিন্তু অবলুপ্তির পথে। গবেষকরা এ ভাষার খবর পাওয়ামাত্র একে বিলুপ্তমান ভাষার তালিকায় ফেলেছেন। কোরো কোনো দিন কাগজে বা পুঁথির পাতায়, কোথাও লেখা হয়নি। ভারতের অরুণাচল প্রদেশের একটি বিশেষ গোষ্ঠীর গভীর অরণ্যবাসী একদল মানুষ মুখের ভাষা হিসেবে এই ভাষাকে ব্যবহার করে। তাদের মোট সংখ্যা ৮শ থেকে ১২শর বেশি নয়। তাই কোরোর খবর জানার পর গবেষকরা এখন একে বাঁচাতেও চাইছেন।
অরুণাচলের প্রাচীন ইতিহাস সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায়নি। ১৬শ শতকে আসামের রাজারা এর কিছু অংশ দখলে নিয়েছিল। ১৮২৬ সালে আসাম ব্রিটিশ ভারতের অংশে পরিণত হয়, কিন্তু ১৮৮০-র দশকের আগ পর্যন্ত অরুণাচল প্রদেশকে ব্রিটিশ শাসনের অধীনে আনার প্রচেষ্টা নেওয়া হয়নি। ১৯১২ সালে অঞ্চলটি আসামের একটি প্রশাাসনিক অঞ্চলে পরিণত হয় এবং এর নাম দেয়া হয় নর্থ ইস্টার্ন ফ্রন্টিয়ার ট্র্যাক্ট। ১৯৫৪ সালে এটির নাম বদলে নর্থ ইস্ট ফ্রন্টিয়ার এজেন্সি রাখা হয়। ১৯১৩ সাল থেকেই উত্তরে তিব্বতের এর সীমান্ত নিয়ে বিবাদ রয়েছে। ব্রিটিশরা হিমালয়ের শীর্ষরেখাকে সীমান্ত হিসেবে প্রস্তাব করেছিল, কিন্তু চীনারা তা প্রত্যাখ্যান করে। এই প্রস্তাবটিতে রেখাটি ম্যাকমাহন রেখা নামে পরিচিত এবং বর্তমানে এটিই কার্যত ভারত চীন সীমান্ত হিসেবে স্বীকৃত।
অরুণাচলে ১শয়েরও বেশি ছোট ছোট জনগোষ্ঠী রয়েছে। এদের মধ্য আদি, আকা, আপাতানি, ধাফলা (নিশি/ নিশিনা / বানানি ), তাগিন, গালো, খাম্পতি, বুগুণ (খাওয়া), মিশ্মি , মমবা (মনপা), আনী নাগা, শেরদুকপেন ও সিংফো জনগোষ্ঠী সংখ্যাগরিষ্ঠ।
১০১ টির মধ্য ৩৭ টি জনগোষ্ঠী প্রকৃতি পূজারি। প্রদেশের তিনটি জেলায় চাকমাদের বসতি। পাপুমপারে ১০ টি, লোহিত ৩ টি, চংলং জেলার ১১ টি গ্রামে তাদের বসতি। গ্রামের নামগুলির মধ্য পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা গ্রামের গন্ধ পাওয়া যায়। যেমন : শান্তিপুর, বিজয়পুর ও মিলনপুর ইত্যাদি। কোরো ভাষা রক্ষায় বিজ্ঞানীরা নতুনভাবে ভাবতে শুরু করেছেন।

x