১০ হাজার টাকায় সিজার এক হাজার টাকায় নরমাল ডেলিভারি

চসিকের আরবান হেলথ কেয়ার প্রকল্প

মোরশেদ তালুকদার

শুক্রবার , ১৫ নভেম্বর, ২০১৯ at ৩:২০ পূর্বাহ্ণ
1767

বর্তমানে চট্টগ্রাম শহরে বেসরকারি কোন হাসপাতাল বা ক্লিনিকে নরমাল ডেলিভারির জন্য প্রসূতির পরিবার গড়ে খরচ করে ১৫ হাজার টাকা। আবার সিজার হলে কমপক্ষে ৩০ হাজার টাকা গুনতে হয়। যা নিম্ন আয়ের লোকজনের জন্য কষ্টসাধ্য। তবে আগামী জানুয়ারি মাস থেকে নরমাল ডেলিভারিতে মাত্র এক হাজার টাকা এবং সিজারে খরচ (ওষুধসহ সংশ্লিষ্ট সব ব্যয় খাত মিলিয়ে) হবে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা। নগরীর ১৫টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং তিনটি মাতৃসদন হাসপাতালে এ সুযোগ মিলবে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন পরিচালিত ১০টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও দুইটি মাতৃসদন হাসপাতাল থাকবে। বাকি স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো চসিকের পরামর্শে এনজিও প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করবে।
চসিক সূত্রে জানা গেছে, আরবান প্রাইমারি হেলথ কেয়ার প্রকল্পের আওতায় প্রসূতি মায়েদের জন্য কম খরচে স্বাস্থ্যসেবার কার্যক্রমটি চালু করা হচ্ছে। একই প্রকল্পের আওতায় গরীব ও নিম্ন আয়ের লোকজনও স্বল্পমূল্যে স্বাস্থ্যসেবা পাবেন। পাশাপাশি প্রকল্পের আওতায় মোট সার্ভিসের ৩০ শতাংশ বাধ্যতামূলক ফ্রি স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হবে। এর সুফল পাবেন গরীব রোগীরা। জ্বর, সর্দি, কাঁশি, ত্বকের চিকিৎসায় ওষুধ সরবরাহ ও প্রয়োজনীয় রোগ নির্ণয়ে এই ছাড় দেওয়া হবে। একইসঙ্গে স্থানীয় কাউন্সিলরদের মাধ্যমে ‘রেড কার্ড’ (স্বাস্থ্যসেবা গ্রহীতাকে বিশেষ কার্ড) বিতরণ করা হবে এবং কার্ডধারীদের নরমাল ডেলিভারি এবং ওষুধ ফ্রি প্রদান করা হবে।
জানা গেছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ২০১৮ সালের ২৫ অক্টোবর বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ঋণচুক্তি, অনুদানচুক্তি ও প্রকল্প চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছিল। চসিক এ প্রকল্প চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিল। চুক্তি অনুযায়ী এডিবি বাংলাদেশকে ১১২ মিলিয়ন ডলার সহায়তা করবে। এর মধ্যে ১১০ মিলিয়ন ডলার ঋণ হিসেবে আর ২ দুই মিলিয়ন ডলার হচ্ছে অনুদান। এদিকে চট্টগ্রাম শহরে প্রকল্পটির কার্যক্রম শুরুর বিষয়ে গত বুধবার স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে একটি সভা হয়। সভায় চসিকের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ আলী প্রতিনিধিত্ব করেন।
সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে, চট্টগ্রামে তিনটি প্যাকেজে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে। এরমধ্যে দুটি প্যাকেজ (১ ও ৩) চসিক এবং বাকি একটি প্যাকেজ (২) এনজিওর মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হবে। প্রতি প্যাকেজে পাঁচটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং একটি মাতৃসদন হাসপতাল অন্তর্ভুক্ত। ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৩ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয়েছে।
এ বিষেয় সিটি মেয়র আ.জ.ম নাছির উদ্দিন দৈনিক আজাদীকে বলেন, আরবান প্রাইমারি হেলথ কেয়ার প্রকল্পের কার্যক্রম চট্টগ্রামে চালু করার জন্য নানাভাবে আমরা চেষ্টা করে আসছিলাম। শেষ পর্যন্ত প্রকল্পটি চট্টগ্রামেও বাস্তবায়িত হবে। ইনশাআল্লাহ, আগামী জানুয়ারি মাস থেকে প্রকল্পের আওতায় স্বল্পমূল্যে চিকিৎসা সেবা পাবেন নগরবাসী। দশটি ওয়ার্ডের ১০টি স্বাস্থকেন্দ্রে সরাসরি আমরা কার্যক্রম পরিচালনা করব এবং আরো পাঁচটি ওয়ার্ডে আমাদের পরামর্শে এনজিও কর্তৃক চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হবে। এর বাইরে প্রকল্পের আওতায় আরো দুটি মাতৃসদন হাসপাতালে আমরা চিকিৎসা সেবা প্রদান করব এবং এনজিও একটি মাতৃসদন হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা দেবে। আমরা প্রাথমিকভাবে মোহরা ওয়ার্ডের ছাফা মোতালেব মাতৃসদন হাসপাতাল এবং বন্দরটিলা মাতৃসদন হাসপাতালকে চূড়ান্ত করেছি। ওয়ার্ড পর্যায়ের স্বাস্থকেন্দ্রগুলো আগামী সপ্তাহে চূড়ান্ত করব। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে নগরবাসী সুফল পাবেন এবং জনগণ উপকৃত হবেন বলেও জানান মেয়র। প্রসঙ্গক্রমে মেয়র বলেন, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এলাকায় এতোদিন প্রকল্পটি বাস্তবায়িত না হলেও আমরা নগরবাসীকে স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত করিনি। নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও নগরীর মাতৃসদন ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর মাধ্যমে নগরবাসীকে সেবা দিয়ে আসছি। প্রতি বছর এ খাতে ভর্তুকি দিচ্ছি। স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রগুলোর মান বৃদ্ধিতে নানা উদ্যোগ নিয়েছি। স্বাস্থ্যনীতিমালা প্রণয়ন করেছি।
চসিকের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ আলী দৈনিক আজাদীকে বলেন, গত বুধবার ঢাকায় প্রকল্প সংক্রান্ত মিটিং হয়েছে। সেখানে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের আওতায় প্রকল্প বাস্তবায়নে সবকিছু চূড়ান্ত হয়েছে। আগামী মঙ্গলবার বা বুধবার প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা চট্টগ্রামে আসবেন। ওইদিন কোন কোন ওয়ার্ডে বা কোন কোন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আমরা প্রকল্পের কার্যক্রম বাস্তবায়ন করবো তা চূড়ান্ত হবে।
এদিকে চসিকের স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আরবান প্রাইমারি হেলথ কেয়ার প্রকল্প’র কার্যক্রম এর আগে ২০০১ সাল থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছর করে দুই মেয়াদে চট্টগ্রামসহ দেশের ৮টি সিটি কর্পোরেশনে বাস্তবায়িত হয়েছিল। তবে তৃতীয় মেয়াদে ওই প্রকল্প থেকে নিজেদের সরিয়ে নেয় চসিক। বর্তমান মেয়র নতুন করে ওই প্রকল্পের আওতায় নগরীতে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানে উদ্যোগ নেন। এর অংশ হিসেবেই প্রকল্পের চতুর্থ মেয়াদে চসিক পরিচালিত স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসাসেবা প্রদান করা হবে। সর্বপ্রথম ১৯৯৮ সালে আরবান হেলথ কেয়ার প্রকল্পের আওতায় অবকাঠামোগতভাবে নগরীতে পাঁচটি মাতৃসদন ও ৪৩টি নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্রে অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়। পরবর্তীতে ২০০১ সালের জানুয়ারি থেকে এসব স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। এর মধ্যে চসিকের অধীনে ছিল ২টি মাতৃসদন ও ৩৬টি নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্র। দুই মেয়াদে এ প্রকল্প শেষ হয় ২০১২ সালের ৩১ ডিসেম্বর।

x