হেগে বাংলাদেশের প্রাপ্তি কী

চাপে পড়েছে মিয়ানমার

ইকবাল হোসেন

রবিবার , ১৫ ডিসেম্বর, ২০১৯ at ৫:০১ পূর্বাহ্ণ

রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে দীর্ঘ ৪০-৪৫ বছর পর অনেকটায় বেকায়দায় পড়েছে মিয়ানমার। আফ্রিকান দেশ গাম্বিয়া আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) মামলার অন্তবর্তীকালীন শুনানিতে নতুন করে রোহিঙ্গা গণহত্যা বন্ধ ও বিচারকার্য চলাকালে জেনোসাইড সংঘঠিত হওয়ার তথ্য উপাত্ত বিনষ্ট না করার আদেশ চেয়েছে প্রসিকিউশন।
তবে আইসিজে-তে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা গণহত্যা মামলাতে বাংলাদেশের বিস্তর প্রাপ্তির কথা বলছেন বিশ্লেষকরা। বিশ্লেষকরা বলছেন, রোহিঙ্গা সংকট অনেক পুরোনো। এই দীর্ঘ সময়ে আন্তর্জাতিক কূটনীতির নানা বাস্তবতার কারণে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব হয়নি। চীন-রাশিয়ার কারণে মিয়ানমার অনেকটা বুক ফুলিয়েই রোহিঙ্গা গণহত্যা চালিয়ে পার পেতে বসেছিল। প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রেও রয়েছে দেশটির অনীহা। কিন্তু আইসিজে-তে গাম্বিয়ার মামলার পর বেকায়দায় পড়েছে মিয়ানমার। যে কারণে অনেকটা বাধ্য হয়েই আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য আদালতে হাজির হতে হয়েছে সামরিক জান্তা প্রভাবিত দেশটি।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক, সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর (অব.) এমদাদুল ইসলাম দৈনিক আজাদীকে বলেন, ‘গাম্বিয়া আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) থেকে একটি সাময়িক আদেশ চেয়েছে। রোহিঙ্গাদের উপর যে গণহত্যা চলছে সেটা বন্ধ করার জন্য মিয়ানমারকে যেন আদেশ দেয়া হয়। দ্বিতীয়ত, এই বিচারকার্য চলাকালে আরাকানে যে গণহত্যা সংগঠিত হয়েছে সেখানে তথ্য-উপাত্ত যাতে নষ্ট না করে, এজন্য মিয়ানমারকে আদেশ প্রদান করা হয়। এগুলো প্রভিশনাল (সাময়িক) আদেশ চেয়েছেন তারা। আরাকান স্টেটে বর্তমানেও ৬ লক্ষের উপরে রোহিঙ্গা রয়েছে।’
এ সাবেক সেনা কর্মকর্তা বলেন, ‘আইসিজে’র সামনে প্রথম দিনের শুনানিতে গাম্বিয়ার আইনমন্ত্রী আবু বকর তামবাদুসহ উনার সাথে থাকা লিগ্যাল এঙপার্টরা আরাকানে রোহিঙ্গা গণহত্যার সপক্ষে অনেক তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করেছেন। দ্বিতীয় দিন শুনানিতে আত্মপক্ষ সমর্থন করে মিয়ানমারের পক্ষে সু চি বলেছেন, এখানে গণহত্যা সংগঠিত হয়নি। রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের দ্বারা তাদের সেনাবাহিনী আক্রান্ত হয়েছে বলে আদালতকে জানিয়েছেন সু চি। আরসা’র বিরুদ্ধে অপারেশন পরিচালনা করার ক্ষেত্রে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী কোথাও কোথাও অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করার বিষয়টি আদালতের সামনে স্বীকার করেছেন। সেনাবাহিনীর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের কারণে রোহিঙ্গারা দলে দলে পালিয়ে গেছেন। তাদের ভাষ্য পালিয়ে যাওয়া মানে গণহত্যা নয়।’
এই নিরাপত্তা বিশ্লেষক বলেছেন, ‘এখন রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে দেয়ার বিষয়ে আদালত প্রাথমিকভাবে কোন আদেশ দেবেন বলে মনে হয় না। তবে পূর্ণাঙ্গ শুনানিতে বিষয়টি উঠে আসবে। তখন সবগুলো বিষয়ে শুনানি হবে। আইসিজে এর রোহিঙ্গার বিষয়ে পুরো বিচার প্রক্রিয়া শেষ হতে কমপক্ষে দুই বছর সময় লাগতে পারে।’
জানা যায়, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট রাখাইনের কয়েকটি তল্লাশি চৌকিতে বিদ্রোহীদের হামলার পর পরিকল্পিতভাবে রোহিঙ্গা নিধন অভিযান শুরু করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। ব্যাপক ধর্ষণ, নির্যাতন ও গণহত্যার মুখে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। ওই ঘটনার প্রায় দুই বছর পর গত ১১ নভেম্বর আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা গণহত্যার অভিযোগ এনে মামলা দায়ের করেন আফ্রিকান দেশ গাম্বিয়া। গাম্বিমার আইনমন্ত্রী আবু বকর তামবাদু মামলার প্রসিকিউশনের পক্ষে লড়ছেন। মামলায় লড়তে গাম্বিয়াকে তথ্য-প্রমাণ দিয়ে সহায়তা করছে বাংলাদেশ, কানাডা ও নেদারল্যান্ডস। অন্যদিকে এই মামলা লড়তে মিয়ানমারের পক্ষে আদালতে হাজির হয়েছেন সেই দেশের স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চি। নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে অবস্থিত ওই আদালতে গত ১০ ডিসেম্বর রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার সেনাবাহিনীর চালানো গণধর্ষণ ও গণহত্যার বিস্তারিত তথ্য-প্রমাণ তুলে ধরেন বাদী। পরের দিন আত্মপক্ষ সমর্থন করে বক্তব্য রাখেন সু চি। ১২ ডিসেম্বর যুক্তিতর্ক খন্ডন করেন দুই পক্ষই। বর্তমানে রায়ের অপেক্ষায় রয়েছে।
গাম্বিয়ার মামলাটিতে বাংলাদেশের প্রাপ্তি নিয়ে দৈনিক আজাদীর সাথে কথা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসেনের সাথে। তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মামলাটা যাওয়া এবং এটার মাধ্যমে প্রথমবারের মতো মিয়ানমারের নেত্রী সু চিকে আদালতে যেতে বাধ্য হয়েছে। রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে মিয়ানমার অতীতে আন্তর্জাতিকভাবে চাপে থাকলেও তারা এ চাপ অগ্রাহ্য করে আসছিল।’
নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য চীনের কারণে মিয়ানমারকে অতীতে সেভাবে চাপে ফেলা সম্ভব হয়নি মনে করেন এ শিক্ষক। তিনি বলেন, ‘আইসিজে জাতিসংঘের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ সংস্থা। গাম্বিয়ার এই মামলার কারণে সেখানে সু চি যেতে বাধ্য হয়েছে। সেখানেও মিয়ানমার নেত্রী যেই বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন, তা অত্যন্ত দুর্বল। অনেকটাই তারা অপরাধ স্বীকার করার মতো বক্তব্য দিয়েছেন। কারণ গণহত্যার অভিযোগ অস্বীকার করতে গিয়ে তারা যেসব অপরাধ স্বীকার করেছেন তাতে তাদের বিরাট দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের শুনানিতে মিয়ানমার আত্মপক্ষ সমর্থন করতে গিয়ে মানতাবিরোধী অপরাধের কথাও স্বীকার করেছে। তাদের সামরিক বাহিনী শক্তি প্রয়োগ করেছে সেটাও স্বীকার করেছে। পাশাপাশি তারা মিথ্যাচার করেছে, আদালতে গাম্বিয়ার পক্ষ থেকে সেসবের প্রতিবাদও করা হয়েছে। ফলে সামগ্রিকভাবে মিয়ানমার সারাবিশ্বের কাছে চরম অপমান ও লজ্জার মধ্যে পড়েছে। তাদের নৈতিক পরাজয় ঘটেছে।’
এই আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক বলেন, ‘এখন এই চাপে পড়ে তাদের সমর্থনকারী চীন কিংবা রাশিয়া রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে তাদের উপর আরো চাপ প্রয়োগ করতে পারে। হয়তো বা এক্ষেত্রে মিয়ানমার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে আরো আন্তরিক হওয়ার সম্ভাবনা আছে। সামগ্রিকভাবে মিয়ানমারের যতই পরাজয় হচ্ছে, সেটাই হচ্ছে বাংলাদেশের প্রাপ্তি। এর মাধ্যমে মিয়ানমার চাপে পড়েছে। মিয়ানমারের সমর্থনকারীরাও নৈতিক সংকটের মধ্যে রয়েছে।’
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক এবিএম আবু নোমান বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ওআইসিতে গিয়ে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আবেগঘন বক্তব্য দিয়েছেন। এতে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়েছে। এর ফলে গাম্বিয়া রোহিঙ্গা গণহত্যা নিয়ে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলা করেছে।’
আইনের এই শিক্ষক মনে করেন, এটা বাংলাদেশের অনেক বড় প্রাপ্তি। গাম্বিয়া তাদের বক্তব্য দিয়েছেন, তাতে গণহত্যার বিষয়টি ফুটে উঠেছে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রাপ্তি হচ্ছে- মিয়ানমার তাদের বক্তব্যে হুমকি দিয়েছে। তারা বলেছেন, এই মামলার কারণে চলমান প্রত্যাবাসন বিঘ্নিত হতে পারে। এতে মিয়ানমারের উদ্দেশ্য ফুটে উঠেছে। বুঝা যায়, তাদের উদ্দেশ্য ভাল নয়। আমরা অনেকটা আশাবাদী। মিয়ানমারের নৈতিক পরাজয় ঘটছে। মূলকথা হচ্ছে, আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মিয়ানমার দোষী সাব্যস্ত হলে আন্তর্জাতিকভাবে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এটাই বাংলাদেশের প্রাপ্তি।’

x