হৃদরোগ ও প্রতিরোধ

ডা. মোহাম্মদ ফজলে মারুফ

শনিবার , ২ নভেম্বর, ২০১৯ at ৪:২২ পূর্বাহ্ণ
156

আমাদের শরীরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হৃদপিণ্ডকে সুস্থ রাখা খুবই জরুরি। হৃদরোগ প্রতিরোধ করার জন্য আমাদের এটি করতে হবে। হৃদরোগ প্রতিরোধ করা অর্থাৎ হৃদপিণ্ডকে সবল ও সুস্থ রাখার জন্য নিচের বিষয়গুলো মনে রাখতে হবে।
হৃদরোগ বলতে সাধারণত হৃদপিণ্ড, রক্তবাহী ধমনী ও শিরা, মস্তিষ্ক সম্পর্কিত রোগকে বুঝায়। হৃদরোগের অনেক কারণের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ একটি। বয়সের সাথে হৃদপিণ্ড ও ধমনীর গঠনগত পরিবর্তনও হৃদরোগের জন্য অনেকাংশে দায়ী। পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, তামাক জাতীয় দ্রব্য বর্জনের মাধ্যমে হৃদরোগ অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব।

হৃদরোগের ধরন

হৃদরোগ বিভিন্ন রকমের হতে পারে। যেমন: জন্মগত হৃদরোগ, করোনারি হৃদরোগ, হার্ট ফেইলিউর, কার্ডিও-মায়োপ্যাথি, উচ্চ রক্তচাপজনিত হৃদরোগ, কোর পালমোনাল (হৃদপিণ্ডের ডান পাশ অচল হয়ে যাওয়া এবং শ্বাসপ্রশ্বাসে সমস্যা হওয়া), সেরেব্রোভাস্কুলার রোগ (মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহকারী রক্তবাহিকার অসুখ, যেমন- স্ট্রোক), প্রান্তিক ধমনীর রোগ, রিউম্যাটিক হৃদরোগ (বাতজ্বরের কারণে হৃদপেশী ও ভালভ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া) ইত্যাদি।

হৃদরোগের কারণ

অনেক কারণে হৃদরোগ হতে পারে। যেমন: বয়স, লিঙ্গ, ধূমপান, অতিরিক্ত এলকোহল গ্রহণ, পারিবারিক ইতিহাস, স্থূলতা, কম শারীরিক পরিশ্রম, খাবারে অসচেতনতা, উচ্চ রক্তচাপ, উচ্চ লিপিড, ডায়াবেটিস ইত্যাদি। জীবনযাপনে কিছু পরিবর্তন, নিয়মিত হাঁটাচলা বা শারীরিক পরিশ্রম, খাবারে সচেতন হলে এবং ঊচ্চ রক্তচাপ, উচ্চ লিপিড, ডায়াবেটিস ইত্যাদি রোগ প্রতিরোধের মাধ্যমে হৃদরোগের ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো যেতে পারে।

কোন বয়স হৃদরোগের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ

হৃদরোগ সব বয়সেই হতে পারে তবে সাধারণত বয়স্ক ব্যক্তিদেরই এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। সাধারণভাবে বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে সিরাম কোলেস্টেরলের মাত্রাও বাড়ে। সাধারণত বয়স ৬৫ বছরের বেশি হলে তারা যদি হৃদরোগে আক্রান্ত হন তাদের মধ্যে ৮২ শতাংশই মারা যান। আবার ৫৫ বছর বয়সের পরে স্ট্রোক করার সম্ভাবনাও বেড়ে যায় দ্বিগুণ।
হৃদরোগের ঝুঁকিতে যারা

প্রজননে সক্ষম নারীর তুলনায় পুরুষদের হৃদরোগ হওয়ার ঝুঁকি বেশি। প্রজননের সময়ের পরে, নারী ও পুরুষের হৃদরোগ হওয়ার সম্ভাবনা সমান। যদি কোনো নারীর ডায়াবেটিস থাকে, তার হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত পুরুষের চেয়ে বেশি। মধ্যবয়সী মানুষের ক্ষেত্রে, করোনারি হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা নারীদের তুলনায় পুরুষদের প্রায় ৫ গুণ বেশি। হৃদরোগে লিঙ্গ বৈষম্যের কারণ মূলত হরমোনগত পার্থক্য।

জন্মগত হৃদরোগ প্রতিরোধে করণীয়

● গর্ভবতী মায়ের উচ্চরক্তচাপ বা ডায়াবেটিস থাকলে অবশ্যই চিকিৎসা করাতে হবে। ● গর্ভধারণের তিন মাস পর্যন্ত গর্ভবতী মায়ের কোনো ধরনের এক্স-রে বা রেডিয়েশন করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ● ধূমপান ও মদ্যপানের অভ্যাস থাকলে সেটা অবশ্যই ত্যাগ করতে হবে। ● গর্ভবতী অবস্থায় যেকোনো রকম ওষুধ খাওয়ার আগে অবশ্যই অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

অন্যান্য হৃদরোগ প্রতিরোধে করণীয়

কম বয়সী ছেলে বা মেয়ের গলাব্যথাসহ জ্বর হলে তাকে এক সপ্তাহের জন্য পেনিসিলিন ট্যাবলেট দিয়ে চিকিৎসা করলে ভবিষ্যতে হৃদরোগ হওয়ার আশংকা অনেকটা হ্রাস পাবে। আবার স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপনের মাধ্যমেও এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কমানো যায়। হৃদপিণ্ডে রক্ত চলাচলজনিত কারণে হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিতে পারে। এই সমস্যা প্রতিরোধে খাবার এবং জীবনযাপনে কিছু পরিবর্তন আনতে হবে। যেমন: ● প্রতিদিন কমপক্ষে একটি নির্দিষ্ট সময় হাঁটা বা ব্যায়াম অথবা শারীরিক পরিশ্রম করতে হবে। এটা হৃদরোগ প্রতিরোধে খুবই কার্যকরী। ● প্রচুর পরিমাণে ফলমূল, শাকসবজি, তরকারি, টক জাতীয় ফল খেতে হবে। ● লবণ ও চিনি জাতীয় খাবার কম খেতে হবে। ● বাদাম হৃদরোগ প্রতিরোধে উপকারী। বাদামের ভেষজ প্রোটিন, ফলিক এসিড, পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, ফ্লাভোনয়েডস, সেলিনিয়াম ও ভিটামিন-ই হৃদরোগের জন্য খুব উপকারী। ● বেশি ক্যালরি সমৃদ্ধ খাবার কম খাবেন। ● মদ্যপান, জর্দা, তামাক, ধূমপান, এলকোহল গ্রহণ করা চলবে না। ● ফাস্টফুড, টিনজাত ও শুকনো খাবার খাওয়ার অভ্যাস ছাড়তে হবে। ● অতিরিক্ত পরিমাণে চা, কফি এবং কোমলপানীয় বর্জন করতে হবে। ● শরীরে চর্বি জমতে দেয়া যাবে না। এটা হৃদরোগের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ● ৪০ বছরের বেশি বয়সীদের ক্ষেত্রে প্রাণিজ চর্বি খাওয়া যাবে না তবে উদ্ভিজ তেল যেমন: সয়াবিন, সূর্যমুখী, সরিষার তেল ইত্যাদি খাওয়া যাবে। ● সামুদ্রিক মাছ খেতে হবে। ● মানসিক চাপ, টেনশন, অনিদ্রা, ভয়, ক্রোধ, হতাশা, রাগ, প্রতিশোধ প্রবণতা, হিংসা ইত্যাদি বর্জন করতে হবে। ● দাম্পত্য জীবনে সুখী থাকার চেষ্টা করতে এবং ধর্মকর্মে মনোযোগী হতে হবে। ● রক্তের লিপিড প্রোফাইলে সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ওষুধ সেবন করতে হবে। ● উচ্চরক্তচাপ ও ডায়াবেটিস থাকলে তা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। কমপক্ষে সপ্তাহে একদিন রক্তচাপ পরীক্ষা এবং মাসে একবার করে ডায়াবেটিস পরীক্ষা করাতে হবে। ● বুকে ব্যথা থাকলে ইকোকার্ডিওগ্রাম ডপলার এবং হৃদরোগে বিশেষজ্ঞের পরামর্শে এনজিওগ্রাম করে নিশ্চিত হতে হবে হৃদপিণ্ডে ব্লক আছে কি না।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, কার্ডিওভাস্কুলার সার্জন, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ

x