হিয়া : সহজিয়া কবিতার মুগ্ধস্রোত

ইলিয়াস বাবর

শুক্রবার , ১২ জুলাই, ২০১৯ at ১০:৪৮ পূর্বাহ্ণ
37

অমর একুশে গ্রন্থমেলার সবচেয়ে বড় সুবিধা সব শ্রেণীর পাঠক পরিচিত হতে পারে নতুন নতুন সব বইয়ের সাথে। বই মানে অমৃত অক্ষরে ভর করা কিছু নতুনতর চেতনাপুঞ্জের সাথে, মৌলিক জিজ্ঞাসায় ভাস্বর কবিতা আর জীবনবোধে টইটম্বুর গল্প। এই পাঠবোধ পুরো এক বছর নয়, পাঠকের পাঠসঞ্চয়ে জেগে থাকে অনন্তকাল। এখানে সাহিত্যের অপরাপর ক্ষেত্রের চেয়ে কবিতার প্রভাব বেশি। কবিতার দুর্মর শক্তির নানা ব্যাখ্যা আছে, বিশ্লেষণের অবকাশ আছে, রস আস্বাদনের নানা রকমফের আছে; তবুও কবিতা জেগে থাকে তার সার্বভৌম সত্ত্‌বার জোরে। দিনকে দিন আমাদের কবিতায়, একইসাথে বিশ্বকবিতায় বাঁকবদল হচ্ছে; এই স্রোতে, এই সাধনায় বাংলা কবিতার সংশ্লেষ একেবারে ক্ষুদ্র নয়। অমর একুশে গ্রন্থমেলা রূপবদলের এই হাওয়ার সাথে আমাদের পরিচয় করে দেয়, কবিতার গতানুগতিক চর্চায় মন বেজার করি কখনো, কখনোবা নয়া-ভাষ্যে চকমক করে ওঠে পাঠকের অন্তর। কবি আকেল হায়দারের “হিয়া” কাব্যগ্রন্থটিকে আমরা দ্বিতীয় শ্রেণীভুক্ত করতে চাই। তার প্রেক্ষিতে বলতে চাই নানা কথা। বর্তমান বাংলাকবিতা নিয়ে পাঠকের বড় অভিযোগ সম্ভবত এর ভাষা-বিন্যাস ও শব্দপ্রয়োগের অবিশ্বাস্য স্বাধীনতা নিয়ে– শব্দ-দখলের নামে বেহিসেবী-কাঠিন্য, মুক্তগদ্যকে কবিতার কাতারে তোলার আপ্রাণ চেষ্টা এবং রস ও ছন্দের অজ্ঞনতাহেতু শব্দজঞ্জালে নিজেকে জারিত রাখা। স্বকালের কতিপয় ব্যতিক্রমের ভেতর আকেল হায়দার নিজেকে ভিন্নভাবে প্রতিস্থাপন করেন কবিতায়। “হিয়া” কাব্যগ্রন্থের পঞ্চাশটি কবিতার মূল সুর বিধৃত আছে মানুষের প্রেম, বিশ্বাস, আধ্যাত্মিকতা ও পরিপার্শ্বকে নিয়ে। খুব সহজ, খুব বেশি কমিউনিকেটিভ কাব্যভাষায় আকেল হায়দার গড়ে তোলেন কবিতার ইমারত। “ছায়াসঙ্গী” কবিতাটি পাঠ করা যাক– “এই যে আপনি–/ আমি কি আপনার অন্য সত্তা/ নাকি অন্য সত্তার আমি/ নাকি কেউ কাউকে চিনি না!/ নির্ঘুম রাত, চোখের মহাশূন্যে/ অস্তগামী চাঁদের ফিরে যাওয়া দেখে/ মনে হলো/ কেউ একজন পাশাপাশি হাঁটছে এখনো!” অথবা “… অযুত লোকে কোলাহলে/ কোথায় পাব/ তারে এখন–/ কোন সে গ্রহে জলে স্থলে!” দুটো কবিতার মূল সুর ঈশ্বরপ্রেম; ঈশ্বরকে খোঁজার প্রাণান্তকর চেষ্টায় কবি শব্দকে অবলম্বন করে গড়ে নেন কবিতার শরীর। অথচ কোন কোন পাঠক বিভ্রমে পড়তে পারেন, এ তো ঈশ্বর নয়, প্রেমিকাকেই খুঁজছেন কবি! কবি আকেল হায়দার শব্দমায়ার কুহুকে পাঠককে ঘুরিয়ে আনেন সহজিয়া বোধের দুনিয়ায়। “হিয়া” এমনতরো কাব্য-ঘ্রাণে ভরপুর, যা একই সাথে আনন্দ ও সাধনার যৌথসৌধ নির্মাণে পাঠককে সাহায্য করে।
প্রেমের কবিতা রচনায় কবি আকেল হায়দার আশ্রয় খোঁজেন স্মৃতিসঞ্চয়ে, নিখাদ স্নিগ্ধ অনুভূতির ভেতর প্রেমের প্রকাশকে সমৃদ্ধ করে প্রকৃতিবন্দনা। প্রকৃতিকে সাথে নিয়ে কবির মানবী-প্রেম– এই সময়ের কবিদের থেকে খানিকটা আলাদা করে আকেল হায়দারকে। এখানে চিরায়ত বাংলা কবিতার মূল সুরটির সাক্ষাৎ ঘটে, ওদিকে আধুনিক অথচ মিহি একটা স্বর খেলে যায় কবিতায়! “আমি কখনো তোমাকে দূরে রাখি না” কবিতার কিছুটা পড়া যাক– “আবেগের কাছে পরাভূত হই/ আসমুদ্র ভালোবেসে নত হই/ আহত সৈনিক তখন পর্যুদস্ত হয়/ রাশি রাশি বিতর্কের কথাসমুদ্রে।… হৃদপিণ্ডের ধুকপুক শব্দে যে ভায়োলিন বাজে–/ সেখানে অবিরাম কেবল তোমার ধ্বনি ওঠে।” প্রেমে অম্ল-মধুর খুনসুটি, জয়-পরাজয়ের নানা চিত্রে ভরপুর কবিতা অনেক আছে “হিয়া”র শরীর জুড়ে। কখনোবা মানবজীবনের সমগ্র আফসোসকে কবি ধরে রাখেন এভাবে– “সব কথা শেষে পুনশ্চ থাকে যদি–/ শেষ দেখা ফের দেখা কেন নয়?” প্রেমিককূলের এমন আর্তি, এমন শোকের সাথে চিরকালের সম্পর্ক আমাদের তবুও কবিতা পলে পলে জাগিয়ে তোলেন অতীত স্মৃতির মন্থন। “অভয়মিত্র ঘাট” কবিতা থেকে– ” মুঠো মুঠো সান্নিধ্য বীজ/ জমিয়েছিলাম পরস্পর/ শস্য মৌসুম এলে বুনব বলে!/ আজ আমরা নেই/ নৌকাগুলো সব ফাঁকা/ অভয়মিত্র ঘাট, নিঃসঙ্গ একা।” মূলত মানুষ জীবনের আয়ু খেয়ে রেখে আসে একেকটি নিঃসঙ্গ মুহূর্ত, যা পড়ে থাকে ধুলোর সাথে, বৃষ্টির সাথে এবং আলোর সাথে। অভয়মিত্র ঘাটকে বালুকাবেলা ধরে এগুলে আমরাও নস্টালজিক হই, আহ্‌ জীবন!
“জলের ফিলসফি”, “নিসর্গের ভূগোল”, “ভালোবাসতে দাও”, “ঋতুচক্র”, “শরতের রঙপেন্সিল” প্রভৃতি কবিতা পাঠে আমাদের এই মনে হয়, এখানে শুয়ে আছে শান্ত নদী– যে বয়ে চলেছে অনাদিকাল ধরে, একা অথচ দুই তীরের মনুষ্যজীবনের নীরব সাক্ষী হয়ে। নিটোল শব্দ নির্বাচনে আকেল হায়দারের যে সংযম তা অভাবনীয়। ছন্দের বৈভবে, বিষয়-বৈচিত্র্যে, জলহাওয়ার আশ্চর্য মিশেলে আকেল হায়দারের কবিতা দারুণ রেখাপাত করে পাঠকের অন্তরে। বিশ্বসাহিত্যের পাঠ, নিজস্ব বীক্ষণ, প্রকৃতি মগ্নতা “হিয়া” কে করে তোলে আলাদা কিসিমের কাব্যপ্রতিভূর প্রতিনিধি হিসাবে। “বর্ণকথা” ও আরো কিছু কবিতায় কবির গদ্যছন্দ প্রীতির দেখা আমরা পাই, কল্পনা আর ভবিতব্যের চিহ্ন দেখতে পাই কবিতার স্তবকে স্তবকে।
জীবনকে নানা কৌণিক দিক দিয়ে দেখার চোখ কবি আকেল হায়দার রপ্ত করেন তার বোধের বিস্তৃত কাব্যরুচি দিয়েই। ১৯৮০ সালে চট্টগ্রামে জন্ম নেয়া কবি আকেল হায়দার কবিতায় এক ধরনের ঋষিজ ভাব বজায় রাখতে পছন্দ করেন। গ্রন্থের নাম নির্বাচনেও কবি পরিচয় দেন তার নির্মেদ রুচির। এই জটিল সময়ে এমন শুভপ্রয়াসকে আমাদের অভিনন্দন। পরিচ্ছন্ন চিন্তা আর শব্দ সহযোগে আকেল হায়দারের কবিতা হয়ে ওঠে সুখপাঠ্য; টীকা টিপ্পনীর বালাই নেই তার কবিতায়, নেই অহেতুক জোরাজুরি। প্রেম আর প্রেমের জারিজুরিই কবি আকেল হায়দারের কবিতা। মানুষের জয়গান গাওয়ার মানবিক দলিল নির্মাণে কবিদের যে ভূমিকা তা আকেল হায়দার দারুণভাবে উপভোগ করেন বলেই মনে হয় আমাদের, অন্তত “হিয়া” পাঠের পর। প্রিয় পাঠক, এবার আপনার পালা– চলুন তবে পাঠ নেয়া যাক “হিয়া”!
[হিয়া :আকেল হায়দার। প্রচ্ছদ: নিয়াজ চৌধুরী তুলি। প্রকাশক: ঐতিহ্য। মূল্য: ১৪০ টাকা। প্রকাশকাল: গ্রন্থমেলা ২০১৯]

x