হালদার পানিতে দূষণের মাত্রা কমছে, তবু উদ্বেগ কাটেনি

বর্জ্য ফেলা দায়ের এক প্রতিষ্ঠান বন্ধ দুটিকে শোকজ

মীর আসলাম, রাউজান

মঙ্গলবার , ২৬ জুন, ২০১৮ at ৫:১৭ পূর্বাহ্ণ
98

দেশের একমাত্র মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হালদা নদীতে কলকারখানার বিষাক্ত বর্জ্য ফেলা বন্ধ করতে অবশেষে উদ্যোগী হয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর। প্রতিষ্ঠানটি গত রোববার নগরীর বায়েজিদ এলাকার ম্যাক পেপার এন্ড বোর্ড মিলটির উৎপাদন পরিবেশ দূষণের দায়ে বন্ধ করে দিয়েছে। কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদান করা হয়েছে হাটহাজারী এলাকার রিচ লেদার ও হাটহাজারী পিকিং প্ল্যান্টকে। প্রতিষ্ঠান দুটির কর্তৃপক্ষকে পরিবেশ অধিদপ্তরে হাজির হয়ে ব্যাখ্যা প্রদান করতে বলা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা অনেকটা নিশ্চিত হয়েছেন শাহ মাদারী, খন্দকিয়া, কাটাখালী, পোড়ালী খাল হয়ে আসা শিল্পকারখানার বর্জ্য হালদার পানি দূষণের অন্যতম কারণ। গতকাল সোমবার নদীর দুই পাড়ের মানুষের সাথে কথা বলে জানা যায়, গত দুইদিন নদী ও সংযুক্ত খাল বিলে মরা মাছ আর দেখা যায়নি। এরমধ্যে উপর থেকে নেমে আসা বৃষ্টির পানির স্রোত কালো পানিকে কিছুটা পরিষ্কার করেছে।

জানতে চাইলে পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক আজাদুর রহমান মল্লিক ও জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোমিনুল হক আজাদীকে বলেন, হালদার পানিতে এরমধ্যে অক্সিজেনের মাত্রা বাড়ছে, কমেছে অ্যামোনিয়ার সংক্রমণ। দূষণের দায়ে বায়েজিদ এলাকার ম্যাক পেপার এন্ড বোর্ড মিলটি বন্ধ করে দেয়া ও রিচ লেদার ও হাটহাজারী পিকিং প্ল্যান্টকে কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদানের কথা আজাদুর রহমান মল্লিক স্বীকার করেন। গত এক সপ্তাহ ধরে প্রতিদিন হালদা পাড়ে পানির দূষণ পর্যবেক্ষণ করে আসছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও হালদা গবেষক ড. মঞ্জুরুল কিবরিয়া। তিনিও হালদায় দূষণের মাত্রা কমেছে বলে জানিয়েছেন। এ নিয়ে হালদা পাড়ের মানুষ ও বিশেষজ্ঞরা সন্তোষ প্রকাশ করলেও দূষণের সব উৎস বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত তাদের উদ্বেগ উৎকণ্ঠা কমছে না বলে জানিয়েছেন।

প্রসঙ্গত, দূষণ থেকে হালদা নদীকে বাঁচানোর আকুতি নিয়ে অনেক দিন ধরে আন্দোলনে আছেন হালদা পাড়ের সর্বস্তরের মানুষসহ বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠন। এই আন্দোলনের অংশ হিসাবে গত শনিবার হালদা পাড় মদুনাঘাটে বিশাল মানববন্ধন করেন তারা। এই মানববন্ধন থেকে অবিলম্বে হালদার পানি দুষণকারীদের চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনার দাবি তোলা হয়। এই মানববন্ধনে যোগ দিয়ে সংহতি প্রকাশ করেনে রাজনীতিক, জনপ্রতিনিধি, সাংবাদিক, আইনজীবী, প্রকৌশলী, চিকিৎসক বুদ্ধিজীবীসহ সর্বরের মানুষ। মানববন্ধনে যোগ দিয়ে ড. মঞ্জুরুল কিবরিয়া আশংকা প্রকাশ করে বলেন, প্রাকৃতিক মৎস্য ভাণ্ডার হালদাকে রক্ষায় অবিলম্বে পদক্ষেপ না নিলে বিশেষায়িত এ নদীটি বুড়িগঙ্গায় পরিণত হবে। এই বিশেষজ্ঞ নগরের বায়োজিদ, কুলগাঁও, নন্দীরহাট এলাকায় অবস্থিত শিল্প কারখানা সমূহের বর্জ্য হালদায় এসে পড়ছে বলে দাবি করেন।

মানববন্ধনে অংশ নিয়ে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের বোর্ড সদস্য জসিম উদ্দিন শাহ বলেছেন, হালদার দূষণ বন্ধের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বহু আগে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল। ওই নির্দেশনা মানা হলে আজকে হালদা নদীর এই ক্ষতি হতো না। তিনি সতর্ক করে দেন, প্রশাসন সম্পূর্ণভাবে শিল্প বর্জ্য হালদায় পড়া বন্ধের উদ্যোগ নিতে ব্যর্থ হলে হালদা পাড়ের মানুষ একত্রিত হয়ে দায়ি শিল্প প্রতিষ্ঠান সমূহকে বন্ধ করে দিতে বাধ্য হবে।

এ প্রসঙ্গে কথা বললে চট্রগাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুর ও পানি সম্পদ কৌশল বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. আয়শা আকতার বলেন, ১৫ বছর ধরে নদীর স্বাস্থ্য বা পরিবেশ রক্ষায় ‘ন্যূনতম প্রবাহ’ নিয়ে গবেষণা করছি। কোন নদীতে সর্বন্নি কতটুকু পানি থাকলে একটি নদীকে বাঁচিয়ে রাখা যেতে পারে তা অনেকাংশে নির্ভর করে পানির গুণগত মানের উপর। তিনি জানান, হালদার পানিতে অক্সিজেনের পরিমাণ এমনভাবে কমে গিয়েছিল যে এই মাত্রায় কয়েক ঘন্টার বেশি মাছ বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। হালদার পানি অত্যধিক কালো হওয়ার কারণ নির্ণয়েও দ্রুত গবেষণা প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন।

x