হালকা প্রকৌশল শিল্প বিকাশে সহায়ক নীতি প্রণয়ন করুন

শুক্রবার , ২২ নভেম্বর, ২০১৯ at ৪:০৭ পূর্বাহ্ণ
16

বগুড়ার তৈরি কৃষি যন্ত্রাংশ উত্তরাঞ্চলের চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্নস্থানে যাচ্ছে এখন। মূলধনি যন্ত্র,বাইসাইকেল ও নির্মাণ উপকরণ তৈরি হচ্ছে ঢাকা গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে। খুলনা-বরিশালে তৈরি হয় কারখানার যন্ত্রাংশ আর চট্টগ্রামে জাহাজ ভাঙা শিল্পের উপকরণ। বেসরকারি উদ্যোগে বিচ্ছিন্নভাবে গড়ে ওঠা এসব হালকা প্রকৌশল শিল্প প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ৬৬ লাখ মানুষের জীবিকা জড়িয়ে আছে। যদিও বিশেষ নীতি সুবিধা না থাকায় কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি থেকে পিছিয়ে রয়েছে সব শিল্পের ‘মা’ খ্যাত এ হালকা প্রকৌশল। দেশে হালকা প্রকৌশল শিল্প বাজারের আকার ৩১০ কোটি ডলার।এ তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার (ইউএসএ আইডি) এক প্রতিবেদনে। বাংলাদেশ নিয়ে ‘কমপ্রিহেন সিভ প্রাইভেট সেক্টর অ্যাসেসমেন্ট’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর ৩৫ কোটি ৬০ লাখ ডলারের হালকা প্রকৌশল পণ্য রফতানি হয়। বর্তমানে এ খাতে কর্মসংস্থান হচ্ছে আট লাখ মানুষের। ২০২৩ সালে বাংলাদেশের হালকা প্রকৌশলপণ্য বাজারের আকার হবে ১ হাজার ২০৬ কোটি ডলারের। সরকারের অগ্রাধিকার থাকলেও ক্ষুদ্র-মাঝারি (এসএমই) শ্রেণির এ হালকা প্রকৌশল শিল্পে প্রয়োজনীয় বিশেষ নীতি সুবিধার ঘাটতি রয়েছে। পত্রিকান্তরে সম্প্রতি এ খবর প্রকাশিত হয়।

আধুনিক প্রযুক্তির অভাবে বাংলাদেশের হালকা প্রকৌশল্ল্ল্লশিল্প মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) কাঙ্ক্ষিত অবদান রাখতে পারছে না। শিল্পায়নের জন্য অগ্রাধিকার খাত হিসেবে বিশ্বব্যাপী যে কয়টি সেক্ট্‌রকে মূল্যায়ন করা হয়, হালকা প্রকৌশল শিল্প তার মধ্যে একটি। আমাদের দেশে বৃহৎ শিল্পের বিকাশ পুরোপুরিভাবে সফলতা না পেলেও এশিয়ার শিল্পোন্নত দেশগুলোতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের মাধ্যমে অর্জিত সাফল্যের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে হালকা প্রকৌশল শিল্পের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। জাপান, চীন, তাইওয়ান, দক্ষিণ কো্‌িরয়ার মতো শিল্পোন্নত সব দেশই শুরুতে হালকা প্রকৌশল খাতে সমৃদ্ধি অর্জন করেছে। একথা সত্য, চীন বৃহৎ শিল্প উন্নয়নের দিকে নজর দিয়েছে। এক্ষেত্রে চীনের ছেড়ে দেওয়া হালকা প্রকৌশল শিল্পের বাজার বাংলাদেশ অধিকার করতে পারে। কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সুবিধা গ্রহণে এগিয়ে আসতে পারে। কৃষি যন্ত্রপাতি থেকে শুরু করে ছোট ছোট মেশিন ও পার্টস তৈরিতে বাংলাদেশের সক্ষমতা রয়েছে। এটি কাজে লাগাতে পর্যাপ্ত মূলধন প্রয়োজন। ব্যাংকগুলো ঋণ দিতে এগিয়ে আসতে পারে। বৃহৎ শিল্পের তুলনায় হালকা প্রকৌশল শিল্পে বিনিয়োগ ব্যাংকের জন্যও অপেক্ষাকৃত কম ঝুঁকিপূর্ণ। তবে ব্যয়ের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে। হালকা প্রকৌশল গড়ে তুলতে সর্বাগ্রে প্রয়োজন সরকারের নীতি-সহায়তা। বাংলাদেশের হালকা প্রকৌশল পণ্যের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর মতো প্রতিবেশী মায়ানমারেও। এখন শুধু প্রয়োজন দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে সুবিধাজনক শুল্ক কাঠামোর আওতায় আনুষ্ঠানিক পথে এ পণ্য রফতানির সুযোগ সৃষ্টি করা। সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিলে প্রচলিত পণ্যের পাশাপাশি হালকা প্রকৌশল পণ্য রফতানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা কঠিন হবে না মোটেই। সরকার উদ্যোগ নিলে বান্ডেল পদ্ধতির মাধ্যমে বিশ্ববাজারে বিশেষ করে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশে খুচরা যন্ত্রাংশ তথা অটোপার্টসের বড় বাজার সৃষ্টি করা সম্ভব। কারণ, বিশ্বখ্যাত-অটোমোবাইল কোম্পানিগুলো সাব-কন্ট্রাক্টিংয়ের মাধ্যমে ছোট ছোট উৎপাদক দিয়ে বিভিন্ন যন্ত্রাংশ তৈরি করে নেয়। এরপর এসব যন্ত্রাংশ সংযোজন করে তৈরি হয় পুরো একটি গাড়ি। এখন যেটা প্রয়োজন সেটা হলো, বিদেশী বড় কোম্পানিগুলোর সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক তৈরি করে দেওয়ার জন্য সরকারের উদ্যোগ নেওয়া। এ সম্পর্ক স্থাপন করে দিতে পারলেই হালকা প্রকৌশল শিল্প বিশ্ববাজারে শক্তিশালী রফতানি খাত হিসেবে আবির্ভূত হতে পারবে। এক্ষেত্রে শধু নগদ সহায়তা নয়, প্রয়োজন বিশ্বের বড় বড় কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়া। দেশে এখনো মৌলিক ইস্পাত শিল্প গড়ে ওঠেনি। হালকা প্রকৌশল শিল্পে যাত্রা থেকেই নানামুখী প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। সরকার, সরকারের বিভিন্ন এজেন্সি উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান বিভিন্নভাবে কাজ করে গেলেও হালকা প্রকৌশল শিল্প যথাযথ বিকশিত হয়নি। জানা গেছে, উৎপাদন ও সরবরাহ স্তর রফতানি সম্ভাবনাময় অবদান, আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা সর্বোপরি দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে অবদান রাখার ক্ষমতা বিবেচনায় এনে কিছু পণ্য ‘সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার খাত’ এবং অন্য পণ্যগুলোকে ‘বিশেষ উন্নয়নমূলক খাত’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। প্রতিবেশী দেশগুলো হালকা প্রকৌশল শিল্পের উন্নয়নে বাস্তবসম্মত ও শিল্প বান্ধব কর ও শুল্ক কাঠামো প্রণয়ন করেছে, বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত তা করতে পারেননি। ব্যবসায়ীরা বলছেন, হালকা প্রকৌশল শিল্পের কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে অবাস্তব শুল্ক আরোপ করে এ খাতের উন্নয়ন ও বিকাশের পথ আরো কঠিন করে রাখা হয়েছে। এ শিল্পের কাঁচামাল দেশে উৎপাদন হয় না আমদানির ওপর নির্ভরশীল। হালকা প্রকৌশল শিল্পে যে মেশিনারি ব্যবহার করা হয়, তা অনেক পুরনো। ফলে বিশ্বমানের পণ্য উৎপাদন করতে না পারায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যোগ্যতার মাপকাঠিতে বাংলাদেশের পণ্য অনেক পিছিয়ে রয়েছে। এদিকে দৃষ্টি দিতে হবে। হালকা প্রকৌশল শিল্প বিকাশে অনেক প্রতিবন্ধকতা থাকলেও বাংলাদেশে এর যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে। এ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ও স্বল্প সুদে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। নারী উদ্যোক্তা উন্নয়নে নীতিমালা ও বাস্তবায়ন কর্মকান্ডে তাদের সম্পৃক্ত ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য ঋণপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে। ঋণ প্রদানেও তাদের অগ্রাধিকার থাকা দরকার।
হালকা প্রকৌশল শিল্প খাতের বিকাশে অবকাঠামোগত উন্নয়ন খুবই প্রয়োজন। এজন্য সঠিক নীতিমালা ও তা বাস্তবায়ন দরকার। উদ্যোক্তাদের উৎপাদিত পণ্যের যথাযথ মান নিশ্চিতকরণের ব্যবস্থাও করা প্রয়োজন। দেশে আমদানি বিকল্প পণ্য উৎপাদনে সহায়তা দেওয়াও দরকার। এ শিল্প খাতের মৌলিক কাঁচামালের আমদানি শুল্ক সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখতে হবে। উদ্যোক্তাদের তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারে উৎসাহিত করতে হবে। ই-কমার্স ও ই-মার্কেট সম্পর্কে বাস্তবসম্মত ধারণা দিতে হবে। উদ্যোক্তাদের টেকনোলজি বেইজড, স্কিল বেইজড ও ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন সংক্রান্ত প্রশিক্ষণও গুরুত্বপূর্ণ। সর্বোপরি এ শিল্প খাতের উন্নয়ন ও বিকাশ ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে গবেষণা ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন।

x