হারিয়ে যাচ্ছে রূপকথার লস্কর উজির দিঘি

মীর আসলাম, রাউজান

বৃহস্পতিবার , ৫ ডিসেম্বর, ২০১৯ at ১০:৪৮ পূর্বাহ্ণ

ইতিহাসের পাতা থেকে একে একে খসে পড়ছে প্রাচীণ সভ্যতার অনেক নিদর্শন। সংরক্ষণ ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহাসিক বহু স্থান আর স্থাপনা। রাউজানের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে মোগল আমলের অনেক স্মৃতি চিহ্ন। এদেশের মহাপ্রতাপশালী রাজা-বাদশা, শাসক-শোষকদের স্মৃতিবিজরিত অনেক স্মৃতিচিহ্ন ইতিমধ্যেপূর্বে মুচে গেছে। ঐতিহাসিক যেসব নিদর্শন এখনো টিকে আছে সেগুলোও এখন হারিয়ে যাওয়ার মধ্যে রয়েছে। হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি চিহ্নের সাথে এই প্রজন্মের কাছে অজ্ঞাত থেকে যাচ্ছে মোগল, ব্রিট্রিশ আমলের ইতিহাস খ্যাত রাউজানের প্রতাপশালী উজির নাজির, লস্কর, জমিদারের নামধাম।
সেকালের লোক সাহিত্যের আলোচিত দম্পতি মলকাবানু-মনুমিয়ার স্মৃতি বিজরিত জমিদার বাড়ির স্মৃতিচিহ্ন যুগের ঘুর্ণিমান চাকায় পিষ্ট হয়ে হারিয়ে গেছে। এরকম আরো অনেক খ্যাতিমান জমিদারের রেখে যাওয়া স্মৃতি চিহ্ন এখান থেকে যুগে যুগে মুছে গেছে। একই ভাবে ঢাকা পড়েছে কর্ণফুলী নদীর ক্ষমতাধর জল মানবী ইছামতির ক্ষমতা খর্বকারী আধ্যাতিক ক্ষমতাধর নোয়াপাড়ার ছানী খোন্দকারের নাম-কাহিনী। নোয়াপাড়া গ্রামের চার’শ বছর আগে মোগল সম্রাট বাদশা আলমগীরের স্মৃতি বিজরিত একটি মসজিদের স্মৃতি চিহ্ন মুছে যেতে চলেছে। আধুনিকতার জোয়ারে এই মসজিদের বাইরের অবয়বে আগের সেই অবকাঠামো ঢাকা পড়ে গেছে। একই ভাবে এ যুগের লেভেলে হারিয়ে যাওয়ায় অপেক্ষায় আছে প্রাচীণ ইতিহাস খ্যাত রাউজানের সাহাব-বিবি ও মৌস্যবিবি মসজিদ। হারিয়ে যাওয়ার তালিকা থেকে বাদ যাচ্ছে না মোগল বাদশাহি আমলের ঐতিহাসিক পুকুর দিঘীও। অবৈধদখলদারদের উৎপাতে দিন দিন সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে প্রাচীণ প্রায় সব পুকুর দিঘীর আয়তন।
পা্রচীনদের কাছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম শুনেছে আদি সমাজ সভ্যতার সাথে সর্ম্পকিত এসব পুকুর দিঘী খনন সম্পর্কে অনেক কাহিনী। আধুনিক যুগের এই প্রজন্মের কাছে সেকালের কাহিনীকে কাল্পনিক বলে উড়িয়ে দিতেও শুনা যায়। সৌভাগ্যের বিষয় হচ্ছে হারিয়ে যাওয়ার এই যুগে এখনো মরমর অবস্থায় ঠিকে রয়েছে রাউজানে কয়েকটি ঐতিহাসিক স্থান ও স্থাপনা। এর মধ্যে রয়েছে সপ্তদশ শতাব্দীর আরকান রাজা শ্রী থিরী থু-ধর্মা সমর সচিব আশরাফ খানের স্মৃতি বিজরিত কদলপুর লস্কর উজির দিঘী। কাপ্তাই সড়ক পথের পাহাড়তলী চৌমুহনী থেকে উত্তরমুখি হাফেজ বজলুর রহমান সড়ক পথে প্রায় আড়াই কিলোমিটার দুরত্বে এই দিঘীর অবস্থান। এখন যেসব প্রবীনদের বয়স আশি নব্বইয়ের কোটায়, সেসব প্রবীণরা বলেন তারা বাপ-দাদার কাছ থেকে শুনেছেন লস্কর উজির দিঘী নিয়ে হরেক রকম রূপকথা। প্রাচীণ কালে এই দিঘী থেকে অলৌকিক ভাবে পাওয়া যেতো বিয়ে শাদির জন্য ব্যবহৃত সকল প্রকার হাড়ি পাতিলসহ খানাপিনার সব উপকরণ । রূপকথা এই দিঘীটি সম্পর্কে জানা যায়, বর্তমানে এটি সরকারের নিয়ন্ত্রনে রয়েছে। বার্ষিক খাজনায় স্থানীয় প্রশাসন এটি মাছ চাষের জন্য ইজারা প্রদান করেন। এই দিঘীর দক্ষিণ পশ্চিম কোণায় রয়েছে হযরত মিয়া শাহ নামের এক বুজুর্গ ব্যক্তির মাজার। দিঘীর পাড়ে স্থাপিত হয়েছে একটি মসজিদ ও কবরস্থান। স্থানীয় প্রবীণদের মতে দিঘীটি মাছ চাষের আওতায় থাকলেও কোনো সময় এটি পূর্ণাঙ্গভাবে সেচ দেয়া যায় না। চাষিরা কিছু পানি কমিয়ে মাছ ধরে থাকে মাত্র। তবে দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি দিঘীর পাড় দখলে রেখে বিভিন্ন ভাবে ভোগ দখল করছে। এলাকার সচেতন মহলের আশংকা এসব দখলদারগণ সুযোগ পেলে দিঘীটি খিলে খেতে চেষ্টা করবে। সকলের প্রত্যাশা আশরাফ খানের স্মৃতি বিজরিত প্রাচীন এই দিঘীটি যাতে বিলুপ্ত না হয় সেদিকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নজর দেবেন ।

x