হানাদারদের ঠেকাতে সীতাকুণ্ডে সেতু উড়িয়ে দেন মুক্তিযোদ্ধারা

যুদ্ধদিনের কথা

লিটন কুমার চৌধুরী, সীতাকুণ্ড

মঙ্গলবার , ৩ ডিসেম্বর, ২০১৯ at ৪:৫৬ পূর্বাহ্ণ
59

সীতাকুণ্ডের মুরাদপুর ইউনিয়নের বসরতনগর গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা আলিম উল্লাহ। বর্তমানে বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সীতাকুণ্ড উপজেলা কমান্ডের কমান্ডার। তিনি মুক্তিযুদ্ধের সেই দিনগুলো আজো ভুলতে পারেননি। শোনালেন যুদ্ধদিনের কথা। পাক বাহিনী নিষ্ঠুরতার বর্ণনা দিলেন। তিনি দৈনিক আজাদীকে বলেন, ১৯৭১ সালে পড়ছিলাম সীতাকুণ্ড ডিগ্রি কলেজে। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ডাক মনের ভেতর তোলপাড় সৃষ্টি করল। ২৫ মার্চ এলো সেই ভয়ঙ্কর কালোরাত। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নির্বিচারে গণহত্যা চালায়। তাদের এই হত্যাযজ্ঞে মনের আগুন দাবানল হয়ে উঠল। ৯ এপ্রিল যুদ্ধের ট্রেনিং নিতে ভারতের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। সাথে ছিলেন বগাচতরের নুরুল আলম ভূঁইয়া, প্রয়াত আব্দুল মতিন, মহাদেবপুরের শামছুল আলম, নুরুন্নবী, আবুল হাশেম, শহীদ আবু তাহেরসহ ২৬ জন। দেশত্যাগের সময় পকেটে পর্যাপ্ত টাকা ছিল না। রাতে ফেনী নদী এলাকায় পৌঁছলাম। টাকা না থাকায় খাবারও খেতে পারিনি। পরে ওই এলাকার এক চেয়ারম্যান বিষয়টি জানতে পেরে আমাদের খাবারের ব্যবস্থা করেন। ১০ এপ্রিল পৌঁছলাম ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের হরিণা ক্যাম্পে।
কিন্তু সেখানে ট্রেনিংয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা আমাদের অন্তিনগর ক্যাম্পে ট্রেনিংয়ের জন্য পাঠান। ওই ক্যাম্পে কুমার সিংহ বিষ্টু নামে এক ভারতীয় সেনা কর্মকর্তা এক মাস ১০দিন ট্রেনিং দেন। এসময় রাইফেল, এসএলআর, এলএলজি, এন্টি ট্যাংক মাইনসহ বিভিন্ন অস্ত্র-বারুদ ব্যবহার ও গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিই। দেশে যুদ্ধরত আর্মিদের সহযোগী সৈন্য হিসেবে যুদ্ধ করতে ৮ জুন আমাদের ২৬ জনের একটি দলকে দেশে পাঠানো হয়। দেশে প্রবেশ করতেই মুহুরীগঞ্জে পপ্রচণ্ড গোলাগুলির শব্দ শুনি। হানাদার বাহিনীর সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধ চলছিল সেখানে। আমরাও মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করতে এগিয়ে যাই। হানাদাররা তাদের অবস্থান পরিবর্তন করে অন্যদিকে চলে যায়।
তিনি আরো বলেন, সেনাবাহিনীর সদস্যদের সহযোগী হিসেবে গেরিলা যুদ্ধ করেছি। আমরা সীতাকুণ্ডের পন্থিছিলা এলাকায় রাজাকারের কমান্ডার আবুল প্রকাশ আবুল্যা রাজাকারকে গুলি করে হত্যা করি। এর পরেই হানাদার বাহিনীর আগমন ঠেকাতে পৌরসদরের শেখপাড়ায় রেল সেতু উড়িয়ে দিই। একপর্যায়ে সীতাকুণ্ড থানায় আক্রমণ করে ১টি মেশিনগান, ৩০টি রাইফেল ও গুলি লুট করি। পৌরসদরে রেলওয়ে ঢেবারপার রেললাইনে শক্তিশালী মাইন পুঁতে রাখলে পাকিস্তানিদের একটি মালবাহী ট্রেন লাইনচ্যুত হয়। এভাবে আরো বহু অঘটনের মধ্যে দিয়ে ডিসেম্বরে বিজয়ের দেখা মেলে। ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের সংবাদ নিয়ে নতুন সূর্য ওঠে। আমাদের কাছে নির্দেশ আসে অস্ত্র জমা দিতে। স্থানীয় থানা ও ল্যাবরেটরিতে অস্ত্র জমা দিতে থাকে সবাই। আমিও অস্ত্র জমা দিয়ে বিজয় উদযাপন করি।

x