হল্যান্ড থেকে

বিকাশ চৌধুরী বড়ুয়া | শনিবার , ১৩ আগস্ট, ২০২২ at ৮:১২ পূর্বাহ্ণ

প্রতিভা মুৎসুদ্দি ছিলেন রণদা প্রসাদ সাহার অত্যন্ত স্নেহভাজন। রণদা প্রসাদের সন্তানেরা তাকে ডাকতেন ‘বড় পিসীমা’। তিনি সাহা পরিবারের কেবল একজন সদস্য নন, তিনি অন্যতম। তার উপরেই ভারতেশ্বরী হোমসের ভার দিয়েছিলেন দানবীর রণদা প্রসাদ সাহা। বর্তমানে চাকরি থেকে অবসর নিলেও তিনি এখনো কুমুদিনী ট্রাস্টের তিন পরিচালকের একজন। ট্রাস্টের যে কোন বিষয়ে তার ‘সই’ লাগে। তার সাথে যখন আলাপ হচ্ছিল তখন তিনি জানান, ‘এখন তো আমি আর বাইরে যেতে পারি না। তারা সব ঠিকঠাক করে ফাইল বাসায় নিয়ে আসে, আমি দেখে সই করে দেই।’ আর পি সাহা ও তার সন্তানের হত্যা প্রসঙ্গে সাক্ষী দিতে গিয়ে প্রতিভা মুৎসুদ্দি বলেছিলেন, “স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হবার পর সে সময়কার পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক গভর্নর আব্দুল মোনায়েম খান কুমুদিনী ট্রাস্টকে ‘শত্রু’ হিসাবে গণ্য করতে থাকেন।” কুমুদিনী ট্রাস্টের বর্তমান পরিচালক, কর্ণধার আর পি সাহার নাতি (ভবানী সাহার ছেলে) রাজীব সাহার বয়স তখন আড়াই বছর, যখন তার বাবা ও ঠাকুরদাকে পাক সেনা ও তাদের স্থানীয় দোসররা তুলে নিয়ে যায়। তার মা শ্রীমতীর বয়স তখন মাত্র ঊনিশ। পরিবারের সেই দুঃসময়ে এগিয়ে আসেন আর পি সাহার মেয়ে জয়া পাতি, বাবার ব্যবসা ও পরিবারের বিশাল সাম্রাজ্যের হাল ধরতে। আর সেই দুঃসময়ে কাছের যে ক’জন তাদের আগলে রেখেছিলেন তাদের অন্যতম এই প্রতিভা মুৎসুদ্দি। ‘বড়মা সাহা পরিবারের জন্যে সবকিছু,’ এক সাক্ষাৎকারে এমনই মন্তব্য করেন রাজীব সাহা। আর পি সাহা ও ছেলে ভবানী সাহাকে তুলে নেবার পর আর পি সাহার দুই মেয়ে ও প্রতিভা মুৎসুদ্দি তাদের খবরের জন্য বিভিন্ন সরকারি এজেন্সি ও কূটনীতিবিদের সাথে দেখা করা সহ এমন কোন জায়গা বাকি রাখেননি যেখানে তারা যাননি। তারা এমন কী কলকাতায় ইন্ডিয়ান আর্মি ইস্টার্ন কমান্ডের সাথেও দেখা করেন বলে জানা যায়। কোন সন্ধান মেলেনি। শোনা যায় হত্যা করার পর তাদের দেহ ছুঁড়ে দেয়া হয় শীতলক্ষ্যায়, যদিও বা এর কোন সত্যতা পাওয়া যায়নি এই পর্যন্ত। একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় অনেক হত্যার মত দানবীর রণদা প্রসাদ সাহা ও তার সন্তান ভবানী সাহা হত্যার বিচার হয়নি অনেক বছর। দীর্ঘ ৪৮ বছর প্রতীক্ষার পর ২০১৯ সালের জুন মাসে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) রাজাকার মাহবুবুর রহমানকে তাদের অপহরণ ও হত্যা করার অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দেয়। একাত্তরে টাঙ্গাইল ও নারায়ণগঞ্জ এলাকায় নানা অপরাধে জড়িত থাকার প্রমাণ মেলে মাহবুবুর রহমান ও তার বাবা মাওলানা ওয়াদুদ এবং তার ভাই রাজাকার মোহাম্মদ আব্দুল মান্নানের বিরুদ্ধে। শেষের দুজন বিচার চলাকালীন সময়ে মারা যায়। আর পি সাহা ও ভবানী সাহাকে অপহরণ ও হত্যা ছাড়া মাহবুবুর রহমানকে একাত্তর সালে মির্জাপুর এলাকায় আরো ৫৫ জন ব্যক্তিকে অপহরণ ও হত্যা করার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। যেদিন এই রায় ঘোষণা করা হয়, সেদিন শ্রীমতি অর্থাৎ ভবানী সাহার মায়ের চোখে ছিল অশ্রু। রাজাকার মাহবুবুর রহমান রায় ঘোষণার আগেই ২০২০ সালে মারা যায়। তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল ২০১৫ সালের নভেম্বর মাসে। রায় ঘোষণার দিন আর পি সাহার নাতি রাজীব সাহা তার তিন মেয়ে ও একমাত্র ছেলেকে নিয়ে আদালতে উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলেন, “আমি চেয়েছিলাম তারা এই পরিবারের ও এই দেশের ইতিহাস দেখুক ও বুঝুক।”
২) আমাদের ‘চৌধুরী’ পরিবারে একজন ছিলেন, তাকে আমরা সবাই ‘বড়মা’ বলে ডাকতাম। তিনি ছিলেন নিঃসন্তান বড় জেঠার স্ত্রী। বড়মাকে আমরা ভয় পেতাম না, সমীহ করতাম, কিন্তু বড় জেঠাকে যাকে বলে একেবারে বাঘের-মত ভয় পেতাম। গ্রামে কোন অনুষ্ঠানে বেড়াতে গেলে তাকে প্রণাম করে দূরে-দূরে থাকতাম। তিনি ডানে গেলে আমরা বাঁয়ে যেতাম, যাতে তার মুখোমুখি না হতে হয়। বাবা ও বাকি দুই জেঠাকেও দেখেছি বড় জেঠাকে অতি সমীহ করে চলতে। তাকে ডাকতেন ‘বদ্দা’ (বড়দা)। তাকে কখনো হাসতে দেখিনি। সব সময় তার মেজাজ থাকতো সপ্তমে চড়ে। যখনকার কথা বলছি সেই বয়সে বড়মা চোখে খুব একটা ভালো দেখতেন না। মনে পড়ে বাবা একবার তাকে শহরে এনে অপারেশনের ব্যবস্থা করেছিলেন। ছিলেন আমাদের বাসায়। তখন আমি অনেক ছোট। আজ অনেক বছর পর আমার-বড়মার কথা মনে এলো মির্জাপুরে এসে আর এক ‘বড়মার’ মুখোমুখি হয়ে। বড়মা, কর্তামা- এমন ডাকে একটা ‘শ্রদ্ধা শ্রদ্ধা’ ভাব মিশে আছে। ‘কর্তামা’- মনে হতেই মনে পড়ে অমিতের কর্তামার না-দেখা মুখখানি। প্রথম দেখায় অমিতের মুখে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লাবণ্যের কর্তামার বর্ণনা এমনি করে দিয়েছিলেন- “মাতৃভাবে প্রসন্ন চোখ; হাসিটি স্নিগ্ধ। মোটা থান চাদরে মাথা বেষ্টন করে সমস্ত দেহ সমবৃত। পায়ে জুতো নেই, দুটি পা নির্মল সুন্দর। অমিত তার পায়ে হাত দিয়ে যখন প্রণাম করলে ওর শিরে শিরে যেন দেবীর প্রসাদের ধারা বয়ে গেল।” আমার সাথে যখন সাহা পরিবারের (রায় বাহাদুর রণদা প্রসাদ সাহা) ‘বড়মার’ দেখা, তখন তার পায়ে কোন জুতো ছিল না। চোখে চশমা, ‘মেক্সি’ পড়া, গলার কাছে আলতো করে ওড়নার মত একটি সাদা কাপড় জড়ানো। সদ্য স্নান সেরে এসেছেন। তখন প্রায় দুটো। আড়াইটায় তিনি দুপুরের খাবার খান। এসেছিলেন হুইল চেয়ারে বসে। আমরা অর্থাৎ আমি, সুমনা ও প্রতিষ্ঠা অপেক্ষা করছিলাম তার ড্রয়িং রুমে। ড্রয়িং রুমের দেয়ালে অনেক ছবি, তার নানা কর্মব্যস্ততার। একপাশে একটি বইয়ের আলমিরা, তার পাশে ছোট্ট একটি সেলফ, তাতে বেশ কটি ফটো স্ট্যান্ড। দরোজা ও জানালার রং হলদে, তাতে ঝুলছে কিছুটা হালকা নীল-রংয়ের পর্দা। দরোজায় পুরানো ধাঁচের হুক, যা ইদানিং খুব একটা চোখে পড়ে না। এর আগে যখন তার সাথে দেখা করার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলাম তখন জানানো হলো যে বয়সের কারণে এখন তিনি বাইরের কারো সাথে আর তেমন দেখা-সাক্ষাৎ করেন না। বয়সের পাশাপাশি কোরোনাও একটি ফেক্টর এই বাঁধা-নিষেধে। প্রতিষ্ঠা, যার কথা আগের সংখ্যায় লিখেছিলাম (সম্পর্কে আমার ভাগ্নে-বউ) প্রতিভা মুৎসুদ্দির ছাত্রী। ভারতেশ্বরী হোমসের পুকুর-ধরে যে রাস্তাটি এগিয়ে গেছে তার পাশাপাশি বেশ ক’টি বাসা। রাস্তার মুখে এক মহিলা গার্ড দাঁড়িয়ে। অচেনা কেউ গেলে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করছেন। এই বাসার একটিতে থাকেন বড়মা অর্থাৎ প্রতিভা মুৎসুদ্দি এবং আর পি সাহার নাতি কুমুদিনী ট্রাস্টের পরিচালক রাজীব সাহা। আমরা বাইরে অপেক্ষা করি, প্রতিষ্ঠা ভেতরে গিয়ে জিজ্ঞেস করে জানতে চায় তার মামা এসেছেন হল্যান্ড থেকে, দেখা করতে চান, সম্ভব কিনা। তাকে জানানো হলো, এখন স্নান করছেন, দুটোর দিকে এসো। তখন দুপুর একটা। আমরা ভারতেশ্বরী হোমসের বিশাল দৃষ্টিনন্দন এলাকার এদিক-ওদিক ঘুরে দুটো নাগাদ ফিরে আসি। পায়ের স্যান্ডেল দরোজার সামনে খুলে ভেতরে প্রবেশ করি। কিছুক্ষণ পর এক মহিলা, খুব সম্ভবতঃ হোমসের নার্স, হুইল চেয়ারে বসিয়ে নিয়ে এলো প্রতিভা মুৎসুদ্দিকে। তাকে হাত দিয়ে প্রণাম করে, ‘আপনার পা ছুঁয়ে কি প্রণাম করতে পারি’ বলে তার পা ছুঁই। তিনি আমার মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করলেন। দাঁড়িয়ে ছিলাম। সামনের সোফা দেখিয়ে বসতে বললেন। জানতে চাইলেন কোথা থেকে এসেছি, কতদিন ধরে সেখানে আছি কী করি ইত্যাদি ইত্যাদি। প্রতিষ্ঠাকে দেখিয়ে বলেন, ‘খুব ভালো ছাত্রী। ওর ভাইও খুব ভালো। ওর মা, আভা মাঝে মধ্যে এটা-ওটা রান্না করে নিয়ে আসে।’
৩) আমার সামনে হুইল চেয়ারে বসে আছেন বাংলাদেশের নারী অগ্রযাত্রায় এগিয়ে থাকা প্রচার-বিমুখ এক শিক্ষাবিদ ও ভাষা সংগ্রামী। বাংলাদেশের নিগৃহিত পিছিয়ে থাকা নারীদের নানা সামাজিক-রাজনৈতিক আন্দোলনে, সংগ্রামে তিনি ছিল সক্রিয়। শিক্ষাক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্যে ২০০২ সালে তিনি ‘একুশে পদক’ লাভ করেন। বাংলা একাডেমি ২০১৭ সালে এই মহিয়সী নারীকে ‘সম্মানসূচক ফেলোশিপ’ প্রদান করে। দেশের বামধারা রাজনীতির সাথে সরাসরি জড়িত ছিলেন ১৯৩৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম জেলার রাউজান উপজেলার মহামুনি পাহাড়তলী গ্রামে জন্ম নেয়া এই নারী। বাবা কিরণ বিকাশ মুৎসুদ্দি সে সময়ের একজন প্রতিষ্ঠিত আইনজীবী। দেশের স্বাধিকার আন্দোলনে প্রতিভা মুৎসুদ্দি ছিলেন সক্রিয়। প্রতিভা মুৎসুদ্দি ১৯৫৬-১৯৫৭ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আজকের রোকেয়া হলের (তৎকালীন উইমেন্স হল) প্রথম নির্বাচিত সহ-সভানেত্রী। ১৯৫৫ সালে স্বাধিকার আন্দোলনের এক মিছিল থেকে তিনি গ্রেফতার হন। যে সময় তার জন্ম সেটি ছিল বৃটিশ-বিরোধী আন্দোলন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, দেশভাগ, ভাষা আন্দোলন। বোধকরি এই সব প্রেক্ষাপট তার জীবনকে, তার চিন্তা-চেতনাকে প্রভাবিত করেছিল। এরই মাঝে তিনি ১৯৫৬ সালে অর্থনীতিতে স্নাতক (সম্মান) ও ১৯৫৯ সালে এম এ পাস করেন। ময়মনসিংহ মহিলা টিচার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে বি এড ডিগ্রি অজর্ন করেন। দানবীর রণদা প্রসাদ সাহার আমন্ত্রণে প্রতিভা মুৎসুদ্দি ১৯৬৩ সালে ভারতেশ্বরী হোমস-এর অর্থনীতি বিভাগে লেকচারার হিসাবে যোগ দেন। তারপর তো তিনি ইতিহাস। তার সাথে আলাপচারিতায় মেতে উঠি। জানালেন কানে কম শোনেন। ‘মেশিন লাগিয়েছি, তাতেও তেমন কাজ হয় না,’ বলেন তিনি। সোফা ছেড়ে তার হুইল চেয়ারের পাশে ফ্লোরে বসে পড়ি। লক্ষ্য করি, তিনি কথা বলতে পছন্দ করেন, তিনি চান শ্রোতা মনযোগ দিয়ে তার কথা শুনুক। শিক্ষকরা বুঝি এমনই হন। তার কথা প্রবল আগ্রহে শুনি আর মনে মনে ভাবি এমন গুণের-আঁধার যিনি, তিনি বসে আছেন অনেকটা আঁধারে। দেশ তার কথা ভুলে গেছে বললেই চলে। আমরা যে বড় বিস্মৃতিপরায়ন জাতি। যাকে মাথায় তুলে রাখার কথা তাকে মাথায় না রেখে, ভুল-জনকে মাথায় নিয়ে নাঁচি। যারা সত্যিকার অর্থে দেশের জন্যে, দশের জন্যে নিবেদিত-প্রাণ তারা থেকে যান নিভৃতে, লোকচক্ষুর অন্তরালে। এই প্রসঙ্গে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর একটি উক্তি মনে এলো- “আমার ঠাকুরদা একবার আমাকে বলেছিলেন পৃথিবীতে দুই ধরনের মানুষ আছে : এক ধরনের মানুষ আছে যারা কাজ করে; আর এক ধরণের মানুষ আছে যারা কেবল বাহবা কুড়ায়। তিনি আমাকে বলেছিলেন প্রথম শ্রেণির মানুষ হতে, তাতে কম প্রতিযোগিতা হয়।” যাকে নিয়ে আমার এই লেখা, অনন্য প্রতিভার অধিকারী প্রতিভা মুৎসুদ্দি যে ‘প্রথম শ্রেণির’ মধ্যে পড়েন তাতে কোন সন্দেহ নেই। তার দীর্ঘায়ু কামনা করি।

লেখক : সাহিত্যিক, কলামিস্ট