সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে আইনের যথাযথ প্রয়োগই কাম্য

মঙ্গলবার , ৫ নভেম্বর, ২০১৯ at ৫:০৮ পূর্বাহ্ণ
33

নতুন ‘সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮’ কার্যকর হয়েছে গত ১ নভেম্বর থেকে। বহুল আলোচিত এই আইনটি প্রণয়নের এক বছরেরও বেশি সময় পর এটি বাস্তবায়ন শুরু হলো। পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের বাধার মুখে এতদিন আইনটি বাস্তবায়নে যায়নি সরকার। ২২ অক্টোবর আইনটি কার্যকরের তারিখ ঘোষণা করে গেজেট জারি করে সরকার। নতুন আইনে কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। সড়কে আইন লঙ্ঘন করলে নতুন আইনে সাজা দেয়া হবে। নতুন সড়ক পরিবহন আইনে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির দায়ে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর শাস্তির বিধান রয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ‘দণ্ডবিধির ৩০৪বি ধারায় যা-ই থাকুক না কেন, কোনো ব্যক্তির বেপরোয়া বা অবহেলাজনিত মোটরযান চালনার কারণে সংঘটিত কোনো দুর্ঘটনায় কোনো ব্যক্তি গুরুতরভাবে আহত বা নিহত হলে চালক সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে।’ একই সঙ্গে এটি জামিন অযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে। এ ছাড়া নতুন আইনে বেপরোয়া যানবাহন পরিচালনার মাধ্যমে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটালে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান তিন বছর। নতুন আইনের বিভিন্ন ধারা লঙ্ঘনের দায়ে জরিমানার পরিমাণও বাড়বে। বর্তমান আইনে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানিতে চালকের সর্বোচ্চ শাস্তি নির্ধারিত আছে তিন বছর। এটি জামিনযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়।
নতুন আইনে ট্রাফিক সংকেত ভঙ্গের জরিমানা ৫০০ থেকে বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ১০ হাজার, হেলমেট না পরলে জরিমানা ২০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা করা হয়েছে। সিটবেল্ট না বাঁধলে, মোবাইল ফোনে কথা বললে চালকের সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা জরিমানা দিতে হবে। নতুন আইনে চালকদের লাইসেন্স পেতে অষ্টম শ্রেণি, সহকারীকে পঞ্চম শ্রেণি পাস হতে হবে। ড্রাইভিং লাইসেন্সের বিপরীতে ১২ পয়েন্ট রাখা হয়েছে। আইন ভঙ্গে জেল-জরিমানা ছাড়াও লাইসেন্সের পয়েন্ট কাটা যাবে। পুরো ১২ পয়েন্ট কাটা গেলে লাইসেন্স বাতিল। চালক ও তার সহকারীকে নিয়োগপত্র দেয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। গণপরিবহনে ভাড়ার চার্ট প্রদর্শন না করলে বা অতিরিক্ত ভাড়া দাবি কিংবা আদায় করলে এক মাসের জেল বা ১০ হাজার টাকা জরিমানা এমনকি চালকের ১ পয়েন্ট কাটা যাবে।
উল্লেখ্য যে, শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের পর গত বছর ১৯ সেপ্টেম্বর সংসদে সড়ক পরিবহন আইন পাস করা হয়। ওই বছর ৮ অক্টোবর এর গেজেট জারি করা হয়। তবে আইনে বলা হয়, সরকার আইনটি কার্যকরের তারিখ ঠিক করে এর প্রজ্ঞাপন জারি করবে। এ সুযোগে পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলো আইন পরিবর্তনের দাবিতে টানা ৪৮ ঘণ্টা ধর্মঘট পালন করে। সভা, সেমিনার ও স্মারকলিপির মাধ্যমে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির দায়ে সাজা কমানোর জন্য সরকারকে চাপ দিতে থাকে। আইনটি কার্যকরের বিষয়ে মতামত দেওয়ার জন্য গত ফেব্রুয়ারিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করে সরকার।
নিরাপদ সড়ক চাই-এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, ‘নতুন আইনে সাজা বা অনেক বিষয় আমাদের চাওয়া অনুযায়ী হয়নি। তারপরও যা আছে তা অতীতের চেয়ে অনেক ভালো।’ তিনি বলেন, অতীতে মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলো আন্দোলন করে আইনকে দুর্বল করে দিয়েছে। সরকার সাহস করে সড়ক দুর্ঘটনার দায়ে সাজা বাড়িয়েছে। পরবর্তী সময়ে যাতে এটা পরিবর্তন না হয়ে যায়, সেটাই আশা করছেন তিনি।
কাগজে-কলমে সারা দেশে নতুন সড়ক পরিবহন আইন কার্যকর হলেও আইনের পূর্ণ বাস্তবায়নে আরো সময় লাগবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁরা বলেন, যারা আইনটি প্রয়োগ করবেন, ট্রাফিক পুলিশের সেই কর্মকর্তাদের অনেকেই এখনও আইনটি সম্পর্কে অবগত নন। এই আইনের বিধি-বিধান সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা নেই চালক-পথচারীদেরও। এদিকে নতুন আইনে প্রথম সাতদিন কোনো মামলা হবে না বলে জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তারপরও নতুন সড়ক পরিবহন আইনকে স্বাগত জানিয়েছেন দেশের জনগণ। এটি বাস্তবায়নে কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছা জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন তাঁরা। এতে সড়ক নিরাপদ হওয়ার পাশাপাশি শৃঙ্খলা আসতে পারে পরিবহন খাতে। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে আইনের যথাযথ প্রয়োগই কাম্য।

x