স্মৃতির আলেখ্যে আজিমপুর ও অন্যান্য প্রসঙ্গ

মোহাম্মদ মিফতাহুল ইসলাম

শুক্রবার , ১৮ মে, ২০১৮ at ৫:৫৩ পূর্বাহ্ণ
93

বোধ বিশ্বাস অভিজ্ঞতার সঞ্চয়নে অতিক্রান্ত যে মানবজীবন তার স্মৃতির ভেলায় বহু ঘটনা উপঘটনার বিষম আবর্তে সন্তরণ। সেই সাথে সমাজ শিক্ষা সংস্কৃতির নানান আবহ তাতে আবর্তিত হয়। যেহেতু চিরস্থির নয় জীবননদের নীর সেহেতু সে মানবতরী স্বদেশের বিচিত্র সৌন্দর্য অবলোকনে তার সাথে থাকা আবেগ অনুভুতির মনোময় আলাপন তথা বিচিত্র ভাবঅনুভাবে মত্ত, এবং সৃজনের সেই চালচিত্র তার মানস সরোবরে সুচিন্তিত লিখনীর শিল্প চেতনায় অন্তরীন। প্রখ্যাত লেখক ও মরমী গবেষক সৈয়দ আহমদুল হকের সুযোগ্য সন্তান এবং বিশিষ্ট চিকিৎসক এ জে এম শামসুদ্দিনের সহধর্মিনী নীলুফার শামসুদ্দিন এর জন্ম ১৯৪৭ সালের ৪ এপ্রিল চট্টগ্রামের রাঙ্গুনীয়া উপজেলার কাউখালী গ্রামে। শৈশবের স্মৃতিগাঁথায় স্মরণের আবরণে তাঁর লিখিত গ্রন্থ ‘আজিমপুর ও অন্যান্য প্রসঙ্গ’ সম্পর্কে যা বলেন -“আজিমপুর ও অন্যান্য প্রসঙ্গ বইটি মূলত আজাদীতে আমার বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত লেখাগুলোর একটি সমন্বিত রূপ। দেশের রাজনৈতিক সমস্যা অর্থনৈতিক সমস্যা ও সামাজিক সমস্যা আমার ভাবনাকে আলোড়িত করে। তাই মনের ভাবনাগুলোকে মুক্ত বিহঙ্গের মত ডানা মেলে আকাশে উড়তে দিয়েছি, অবশেষে যা সাদা কাগজের পাতায় কালির আখরে ভেসে উঠেছে। তবে এসব লেখায় লেখক হিসাবে ঘাটতি থাকতেই পারে কিন্তু একজন দেশপ্রেমিক হিসেবে আমার গর্ব অমূলক নয়”।

স্মৃতির আলেখ্য নামকরণে তিনি আজিমপুরের বিভিন্ন ঘটনাবলী নিয়ে তিন পর্বে ছোট ছোট করে বর্ণনা করেছেন যা সত্যি সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যাদানের সরল এক উপস্থাপন দক্ষতা। ছোট ছোট বাক্যবিন্যাস আর সাবলীল শব্দগুচ্ছ বিশদ বিবরণের আলোচ্য অংশকেও সংক্ষেপে আলোকপাত করার বিরল সাযুজ্য রাখে। এ প্রসঙ্গে ইংরেজ সাহিত্যিক শেক্সপীয়রের একটি লেখা এখানে প্রণিধানযোগ্য: ঈরণশর্ধহ ধ্রর্ দণ ্রমলফ মত ষর্ধ (ঔটবফর্ণ) অর্থাৎ (সংক্ষিপ্ততা)স্বল্পভাষিতাই সুবুদ্ধির লক্ষণ

বিলক্ষণ এই গ্রন্থের প্রায় প্রতিটি লেখায় তার সার্থক অনুরণন ঘটেছে, এবং তাতে বিভিন্ন ঘটনাবলী ছাড়াও ভ্রমণ সাহিত্যের মতো ব্যপক অনুভূতিগুলো একটি নির্দিষ্ট রেখায় সংক্ষিপ্তাকারে ব্যক্ত করার দারুণ এক সঙ্গতি লেখার মধ্যে প্রতিভাত হয়ে উঠে।

বলা যেতে পারে, লেখার মধ্যে এরূপ সঙ্গতি (ডমভতমরবর্ধহ) বইয়ের কলেবর বৃদ্ধি না করেই যেন আকর্ষণপ্রিয়তার এক চিরন্তন আবেদন গ্রাহ্য করে এবং ঐতিহাসিক তথ্যনির্ভর অনেক কিছুই তাতে উঠে এসেছে গল্পচ্ছলে। কোন রকম সম্প্রসারিত ভাবের ব্যপকতায় বন্দী না হয়ে যেন বিস্তৃত ভাবনার মধ্য হতে পরম আদৃত কিছু শব্দযোজনায় বাক্যালাপের সারসংক্ষেপ।

বলাবাহুল্য, অতীত দিনের সোনালী রোদ্দুর যেমন অনুভবে সিক্ত ভাবুকের হৃদয়ে অনাবিল পরশ জাগায় তেমনি এক উচ্ছ্বসিত ভাবের গীতিময়তায় আনন্দ বেদনার স্মৃতি রোমন্থন করে। স্মৃতির রোদ্দুরে সেই প্রোজ্জ্বল মুহূর্তগুলো স্মৃতির পাতায় আজো অবিস্মরণীয় আনা ফ্রাঙ্কের বিখ্যাত ডায়রীর মতো। স্মৃতির মুকুরে নিমগ্ন সে পাঠ উপলব্ধির বিপুল গভীরতায় গদ্যের লালিত ছন্দে দোলায়িত ঐতিহাসিক আর সমকালীন বিষয়গুলোর প্রতি দৃষ্টি নিবন্ধ রেখে। আর সেই উদাহরণটা লেখিকার কথা দিয়েই বলতে চাই: ‘হিউয়েনসাঙ ও ইবনে বতুতার মত মস্তবড় পরিব্রাজক না হয়েও দুটি কিশোরী ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থান ঘুরে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিল তার ঐতিহাসিক সত্যতা ও উপলব্ধি পাঠকের উদ্দেশ্যে স্মৃতির ঝুড়ি উপুড় করে বিলিয়ে দিয়ে তৃপ্ত হতে চাই’।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, স্মৃতিচারণমূলক যে কোন লেখায় লেখকের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও আবেগঘন উপলব্ধি থাকা স্বাভাবিক। তাছাড়া, স্মৃতির পঞ্চবাতায়নে আলোক উজ্জ্বল সম্ভাবনার কথা লিখে রাখা কিংবা সমাজরাষ্ট্রের ব্যপক সংগতিঅসংগতি তুলে ধরাও বাঞ্চনীয়। সেই নিরিখে স্বদেশপ্রেমের নিমিত্ত আপন দেশের ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের ভৌগলিক সীমারেখায় অশান্ত বিষয়গুলোকেও লিপিবদ্ধ করার প্রয়াসী হয়েছেন আশাব্যঞ্জক মনোবৃত্তে।

অতি সরল কথন ও লেখিকার সরলতম আবেগ তাঁর শৈশবকৈশোরের মধুমাখা স্মৃতির দিনপঞ্জিকা হৃদয়গ্রাহী সৌন্দর্য চেতনার অনুগামী। তাই তার স্মৃতির আলেখ্যে পাঠক হৃদয় দোলা দিতে কিছু প্রবন্ধনিবন্ধের সন্নিবেশে ফেলে আসা দিনগুলোকে স্মৃতি অমলিন করে রাখতে গ্রন্থনবদ্ধ প্রয়াস। এই গ্রন্থটিতে লেখিকার সেই ভাবনাগোচর সরল অভিব্যক্তি আর প্রাঞ্জলতার অপূর্ব সম্মিলন সত্যি প্রশংসার দাবিদার।

যা আরো বলার তা হলো, সহজাত সরস উপস্থাপনার সরল এই ভঙ্গিমায় লেখিকার মনিকোটায় দর্শনীয় স্থানসমূহের সুন্দর বর্ণনা উঠে এসেছে। যে কারনে স্মৃতির আলেখ্যে গ্রন্থখানি সুখপাঠ্য হিসেবে বিবেচিত হয়ে পঠনপাঠনের প্রয়োজনীয়তাকে অনুধাবনযোগ্য করে তোলে। পাঠকের প্রতি এ ধরনের গ্রন্থ স্মৃতি অম্লান মুহূর্তের একটি রেখাচিত্র বলা যায়। কল্পনাপ্রবণ অনুসঙ্গের বাস্তব রূপায়ণ যেমন স্মৃতির রেখায় মূর্ত হয়ে উঠে তেমনি প্রতিটি নিবন্ধের পরতে পরতে আলোকচিত্রসম একটি মহৎ ভাবনার চালচিত্র পাঠক সম্মুখে দাড় করায়। শুধু তাই নয়, সৃজনমননের চালচিত্রে পাঠকের পাঠের অভিজ্ঞতাকে আলোড়িত করার মতো কিছু উদ্ধৃতি ও কবিতার বাণী সত্যি একটি সুখময় পাঠ্যের আস্বাদ এনে দিতে বাধ্য। এ বাধ্যবাধকতার প্রাণবন্ত উপস্থাপন কিংবা বর্ণনাশৈলী চমৎকার আবহ সৃষ্টি করে বৈকি বরং পাঠকের জন্য তা সামান্যতম বিরক্তির কারণ হবে বলে আমি অন্তত মনে করি না।

উদাহরণস্বরূপ লেখিকার একটি ভাবোদ্দীপক নিবন্ধ ‘বাবুই পাখি তুমি কয়েছ কথা তাই তোমারেই কই’ তাতে তিনি পবিত্র কোরআনের সত্যিকার ঘটনার উদ্ধৃতি ও এই নিবন্ধের সাথে তার সামঞ্জস্যতা বর্ণনা করেছেন। তাছাড়া, বাবুই পাখির কণ্ঠের সুমধুর ডাক ও মানুষের প্রতি পাখির যে সহমর্মিতা তার দৃষ্টান্ত সমেত পারস্যের মরমী কবি মৌলানা জালাল উদ্দীন রুমীর দুই পাখির প্রসঙ্গও অতি চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন। যেখানে পাখির বেদনা ও বনের পাখির আনন্দ উপল করে রুমীর অনুসরণযোগ্য বাংলার ঋষি কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সোনার তরী’ কবিতার উদাহরণও টেনেছেন যা কিনা পাখিকে রূপকাশ্রয়ী করে মানুষের জীবনবোধের যে দার্শনিক ভাষ্য তারই ইঙ্গিত বহন করে।

পক্ষীকুল যে প্রকৃতির একটি অংশ সেই নিরিখে তাদের যেরূপ উল্লেখযোগ্য ভৃমিকা তাদের জীবন আর আমাদের জীবনে সেরূপ সম্পর্কোচিত সূত্রের একটি সংক্ষেপিত ব্যাখ্যাদান আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতার দুয়েকছত্র পঙতি দিয়ে সমাপন করতে সচেষ্ট হয়েছেন। উপসংহারে লেখিকা কবি নজরুলের গুবাক তরুকে উদ্দেশ্য করে রচিত পংক্তিমালার ভাবকে উপজীব্য করে তার কিছুটা পরিবর্তন সাধন করেছেন সৃষ্টিশীল অনুকরণে (ডরণর্টধশণ ধবর্ধর্টধমভ) এবং তাতে কবির গুবাক তরুর স্থলে বাবুই পাখির উদ্দেশ্যে ব্যক্ত ইচ্ছানুরূপ মন্তব্যটি নিম্নরূপে প্রকাশ পেয়েছে:

আমারে জানাতে তোমারে জানিতে কত কি যে সাধ জাগে/ তোমার তরে লিখেছি এ লেখা/ এইটুকু সান্তনা মোর হোক বা না হোক দেখা’।

উল্লেখ্য, কবি কাজী নজরুল ইসলাম ‘বাতায়ন পাশে গুবাক তরুর সারি’ কবিতাটি চট্টগ্রামে বসেই রচনা করেছেন। অর্থাৎ কবির সাথে লেখিকার রূপকাশ্রয়ী কোন উদাহরণের নিমিত্ত এইটুকু শুধু তফাৎ, বরঞ্চ উভয়ের দরদী ভাব আর প্রকৃতির এই যে অংশ তথা প্রাণীকুল ও উদ্ভিদকূলের (তফটলরট ্‌ তটলভট) মানুষের প্রতি সহমর্মিতার দৃষ্টান্তসূচক ভাবলেশ দুটি আবেগাকুল চিত্তের অভিন্ন রূপ আওভানের মরমী ব্যঞ্জনায় দুটি ভিন্ন বাক্যে রূপ পরিগ্রহ করে।

অধিকন্তু, স্মৃতি আলেখ্যর পর দেশ যারা চালায় অর্থাৎ সে সকল বিত্তবান ও ক্ষমতাবান লোকজন যারা কেবল নিজেদের ভবিষ্যত নিয়ে এতটাই ব্যস্ত তারা তরুণদের কথা সাধারণ মানুষের কথা ভাবার সময় একেবারে পায় না তাদের উদ্দেশ্যে লিখিত ‘তরুণদের প্রাণের আকুতি শুনুন’ ‘রোহিঙ্গাদের দুর্গতি ও সুচির উদাসিনতা’ ‘কাউখালী হতে পারে দৃষ্টিনন্দন পর্যটন কেন্দ্র’ ‘চট্টগ্রাম হতে পারে বিশ্বমানের পর্যটন কেন্দ্র’ ‘ঠেঙ্গারচরে রোহিঙ্গা পুর্নবাসন প্রসঙ্গে’ প্রভৃতি নামে ছোট ছোট নিবন্ধ দ্বারা প্রকাশ করেছেন। নিবন্ধগুলোতে চট্টগ্রামের সমসাময়িক বিষয় আর চট্টগ্রামের সমস্যাসমাধানকল্পে প্রাসঙ্গিক অবতারণা আর কিছুটা আলোকপাত করার মাধ্যমে গ্রন্থখানি একটি তথ্যনির্ভর ঐতিহাসিক ধ্যানধারনার সার্থক প্রতিবিম্ব বলা যায়। শুধু তাই নয়, শুভ কামনা ও শান্তির বার্তাবরনে বিবেকস্পর্শ সমাজহিতৈশী চেতনা সম্বলিত অশান্ত বিষয়গুলোর সংকট উত্তরণকল্পে গ্রন্থচয়নে লেখিকার খানিক দৃষ্টিপাত বললে অত্যুক্তি হবার নয়।

x