স্বাধীনতার সুফল, কুফল

ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

মঙ্গলবার , ২৬ মার্চ, ২০১৯ at ৬:৪৫ পূর্বাহ্ণ


আমরা আরো একটি স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করতে যাচ্ছি, ইতিমধ্যে আমাদের অগ্রগতির মাইলফলকে উন্নতির নানা চিহ্ন উৎকীর্ণ হয়েছে। চিহ্নগুলো অস্পষ্টও নয়। দালানকোঠা প্রচুর উঠেছে, প্রতিনিয়ত উঠছে। ইন্টারনেট, মোবাইল ফোনের ব্যবহার দাঁড়িয়েছে আকাশচুম্বী। ভোগ-উপভোগের সীমাপরিসীমা নেই। বিদেশ থেকে বাংলাদেশীদের পাঠানো টাকার পরিমাণ বেড়েছে। কেবল যে তৈরি পোশাক তা নয়, ওষুধপত্রও আমরা রপ্তানি করছি। খাদ্য উৎপাদন স্থবির হয়ে থাকে নি। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের সূচকও খারাপ নয়।
কিন্তু যে প্রশ্নটা বারবার আসে, আসা দরকার, এলে ভালো, সেটা হলো এসব উন্নতিতে জীবনযাত্রার গুণগত মান কতটা বাড়লো। বলাই বাহুল্য, পরিমাণের বৃদ্ধি মানেই যে গুণের বৃদ্ধি এমনটা ভাববার কোনো কারণ নেই। মাথাপিছু আয়ের হিসাব দিয়েও উন্নতির উৎকর্ষ বোঝানো যাবে না। ধরা যাক বিদ্যুতের সরবরাহ, সেটা যদি না বেড়ে থাকে তাহলে উন্নতির হাঁকডাক অর্থহীন শোনাবে, শোনাচ্ছেও। কর্মসংস্থানের একেবারে অপরিহার্য ক্ষেত্রে অগ্রগতি যে সামান্যই ঘটেছে সেটাও একটি ভ্রূকুটি বটে। পানির সঙ্কট বাড়ছে। পয়ঃনিষ্কাশনের ব্যবস্থা অপ্রতুল।
নাগরিক নিরাপত্তার প্রশ্নে বলা চলে, মেয়েরা তো বটেই ছেলেরাও নিরাপদে চলাফেরা করতে পারছে না। নিরাপত্তা বিধানে নিয়োজিত বাহিনীসমূহের সদস্যদেরকে নিজের বাড়ির দরজায় দেখলে কোনো নাগরিকই বলতে পারবেন না যে তিনি নিরাপদ বোধ করছেন। শিশু বেড়ে ওঠে অবহেলায়, প্রবীণদের অবজ্ঞা চলে নিরন্তর। এসবই নিষ্ঠুর সামাজিক বাস্তবতা।
বড় একটা জিজ্ঞাস্য এটা যে, বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রবাহ নিবিড়ভাবে নির্ভর করে যে চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর তা কী সত্যি সত্যি বিদেশিদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে? গেলে আমাদের অবস্থাটা কী দাঁড়াবে? খুলনার মংলা বন্দরকে উন্নত করলে দেশের অর্থনীতির প্রভূত উপকার হতো, অথচ সেই বন্দরকে ম্রিয়মান করে রাখা হচ্ছে। কাজটা যে শুভবুদ্ধির পরিচায়ক এমন তো বলা যাবে না। বন্দর নিয়ে চিন্তা করাটা একেবারেই অত্যাবশ্যকীয়।
উন্নতির বিদ্যমান ধারাপ্রবাহটি যে মোটেই মানবিক নয় তার নিশ্চিত প্রমাণ হলো এই উন্নতির প্রকোপে নদীর দুর্দশা। প্রায় সব নদীরই এপাড় ওপাড় দখল হয়ে গেছে, কোনো কোনটি শুকিয়ে গেছে, আর কিছু কিছু নদীর পানি অচিন্ত্যনীয় রূপে দূষিত। যেমন ঢাকা শহরের চারটি নদী-বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, বালু ও তুরাগ তো উন্নতির বর্জ্য বহন করে মৃত্যুশয্যায় শায়িত হয় নি, বলা হচ্ছে যে তারা মারাই গেছে।
অন্য সবকিছুর মতো উন্নতিরও একটা দর্শন থাকে। বাংলাদেশে উন্নতির যে দর্শনটি প্রতিষ্ঠা পেয়েছে সেটি হলো অন্যসব বিবেচনাকে পদদলিত করে ব্যক্তিকে বড় করে তোলার। একজন বড় হবে নয়জনকে দাবিয়ে দিয়ে, নীতি এটাই। কিন্তু এর ফলে ওই একজনের উন্নতি যে মোটেই নিরাপদ হচ্ছে না, এমনকি সেটাও বিবেচনার মধ্যে আসছে না। উন্নয়নে-আহত ওই নয়জনের কারণে উন্নতিকে ঘরে বাইরে পাহারাদারের ব্যবস্থা করতে হচ্ছে। বস্তি উচ্ছেদ করেও কূল পাওয়া যাচ্ছে না, আবার নতুন বস্তি বসছে। পরিবেশ অদূষিত থাকছে না, প্রতিনিয়ত নোংরা হচ্ছে। উন্নতদের পক্ষে এসব সহ্য করা কঠিন হতো যদি তাদের বিবেক না-থাকুক অন্তত কিছুটা চক্ষুলজ্জা থাকতো।
সর্বত্র তৎপরতা চলছে রাষ্ট্রীয় সম্পত্তিকে ব্যক্তি-মালিকানায় তুলে দেবার। ব্যক্তি-মালিকানায় সবকিছু ভালো চলে এমনটা প্রচার করা হচ্ছে। কিন্তু ব্যক্তি মালিকানা আসলে যে কী জিনিস সে নিয়ে তো আমরা যখন অনুন্নত ছিলাম তখনো অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছি। সেটা হলো নিজের ঘরবাড়ি পরিষ্কার করে আবর্জনাগুলো প্রতিবেশীর আঙ্গিনায় নিক্ষেপ করা, আর প্রতিবেশী যদি নিজের চেয়ে ধনী হয় তবে আবর্জনা রাস্তায় ফেলে দিয়ে আসা। ব্যক্তিমালিকানা ওই কাজটাই বেশ পরিচ্ছন্নভাবে সম্পন্ন করছে, নিজেকে সুশ্রী করে বর্জ্যগুলোকে ফেলছে রাস্তা অথবা নদীতে।
এই ধরনের উন্নতির পরিণতি ভয়াবহ হতে বাধ্য। যাঁরা দেশের ভবিষ্যত নিয়ে ভাবেন এবং নিজেদেরকে দেশপ্রেমিক বলে বিবেচনা করেন তাঁদের জন্য তাই একটি প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে উন্নতির এই ধ্বংসাত্মক ধারার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো; এবং উন্নতি যাতে সামাজিক হয়, সমষ্টির স্বার্থে লাগে, ব্যক্তির মুক্তি যাতে সমষ্টির শত্রুতার পরিবর্তে সহযোগিতা লাভ করে, সেটা নিশ্চিত করা।
একথা কিছুতেই ভুললে চলবে না যে মানুষের মনুষ্যত্ব বিকশিত হয় সামাজিকতা ও মননশীলতার একত্র অনুশীলনে। সেটা না-ঘটলে মানুষ আর মানুষ থাকে না, বন্য প্রাণিতে পরিণত হয়। আমাদের এই জনপদ জঙ্গলে পরিণত হোক এটা নিশ্চয়ই আমরা চাইবো না। সামাজিকতা ও মননশীলতা বৃদ্ধির প্রধান উপায় হচ্ছে সাংস্কৃতিক কাজকে জোরদার করা। পাড়ায়-মহল্লায় গ্রন্থাগার ও পাঠাগার চাই। দরকার খেলার মাঠ, প্রয়োজন নাটক, বিতর্ক, গান, নৃত্য, পত্রিকাপ্রকাশ, প্রদর্শনীসহ বহু ধরনের আয়োজন। সেই সঙ্গে আবশ্যক হচ্ছে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং টেলিভিশনে অবাধ আলোচনা। বাস্তবে যা দেখা যাচ্ছে তা হলো বৈষয়িক উন্নতি যত বাড়ছে ব্যক্তির সামাজিকতা ও মননশীলতার জগতটা ততই সঙ্কুচিত হয়ে আসছে। ছোট হয়ে যাচ্ছে পৃথিবী। ব্যাপারটা মোটেই উপেক্ষণীয় নয়।

প্রতি বছরে স্বাধীনতা দিবস আসে নতুন আশা নিয়ে। মনে করা হয় যে দিন বদলাবে। কিন্তু বদলায় না; এবং বদলায় না যে সেই পুরাতন ও একঘেঁয়ে কাহিনীই নতুন করে বলতে হয়। না-বদলাবার কারণ একটি ব্যাধি, যার দ্বারা আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্র আক্রান্ত। ব্যাধিটির নাম পুঁজিবাদ। এই ব্যাধি থেকে মুক্তির জন্য আমাদের চেষ্টার অবধি নেই। রাজনৈতিক ভাবে আমরা বার বার চেষ্টা করেছি কিন্তু সফল হই নি।
কিন্তু মুক্তি যে আসে নি তা বলবার অপেক্ষা রাখে না। জিনিসপত্রের দাম থেকে শুরু করে জীবনের সকল ক্ষেত্রে নিরাপত্তার অভাব পর্যন্ত সর্বত্রই ব্যর্থতার স্মারকচিহ্নগুলো জ্বল জ্বল করছে। সবকিছুই গা-সওয়া হয়ে যায়। তবে মাঝে মধ্যে দু’একটি ঘটনা ঘটে যাতে আমরা ধাক্কা খাই, চমকে উঠি, পরস্পরকে বলি যে আমরা তো ভালো নেই, কঠিন বিপদের মধ্যে রয়েছি।
কিশোরী আত্মহত্যা করেছে। সে যে আত্মহত্যা করবে সেটা কে জানতো? তার আপনজনেরা জানতেন না, সে নিজেও জানতো না। নতুন বছরে সে নতুন ক্লাসে উঠেছে। বই পেয়েছে। এ বছর বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ করা হয়েছে। নির্বাচিত যে ক’জন শিক্ষার্থীর হাতে মন্ত্রী নিজে আনুষ্ঠানিকভাবে বই তুলে দিয়েছিলেন সে ছিল তাদেরই একজন। যত্ন করে সে তার পাঠ্য বইগুলোতে মলাট দিয়েছে। স্কুলে যাবার জন্য নতুন পোশাক কেনা হয়েছে। সবকিছুই শুভ সূচনা। কিন্তু স্কুল খোলার ঠিক আগের দিন সে আত্মহননের পথ বেছে নিলো।
আত্মহত্যা কেউ এমনি এমনি করে না। যন্ত্রণা কেমন দুঃসহ হলে, হতাশা কতটা গভীরে চলে গেলে, নিঃসঙ্গতা কী পরিমাণে বৃদ্ধি পেলে একজন তরুণ আত্মহত্যা করে, মনে করে যে তার জন্য মৃত্যুই হচ্ছে বাঁচার একমাত্র উপায়, তা বাইরে থেকে বোঝা যাবে না, এমন কী কল্পনা করাও সম্ভব নয়। জানে তা কেবল ভুক্তভোগী। আত্মহত্যার ঘটনা ঘন ঘন ঘটছে; সকলে যে ওই পন্থাকেই বাঁচবার একমাত্র উপায় বলে মনে করে তা নয়, অনেকে দাঁত কামড়ে পড়ে থাকে, জীবনকে কঠিন বোঝা মনে করেও কোনো মতে টিকে থাকে; টিকেই থাকে শুধু, বেঁচে থাকে না। মেয়েরাই আত্মহত্যা করে বেশী, কেননা দুঃখের ঝড়ঝাপটাগুলো তাদেরকেই আক্রমণ করে প্রথমে এবং সহজে। ঘরে এবং ঘরের বাইরে, পথে, কর্মস্থলে, এমন কী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও তাদেরকে নির্যাতনের শিকার হতে হয়। খাদ্যের অভাব হলে বনের বাঘ জনপদে চলে আসে। বনের বাঘের জন্য সেটা স্বাভাবিক, কিন্তু মানুষ যখন ক্ষুধার্ত বাঘে পরিণত হয় তখন সেই অস্বাভাবিকতাটা যে কেমন ভয়ঙ্কর হতে পারে পিংকিদের আত্মহত্যা তারই নিদর্শন বটে।
যে সকল যুবক মেয়েদেরকে উত্ত্যক্ত করে, দেখা যাবে তাদের অধিকাংশেরই কাজ নেই, কারো কারো কাজ থাকলেও কাজের কাজ নেই। মেয়েদেরকে উত্ত্যক্ত করাকেই তারা বীরত্বপ্রদর্শনের সবচেয়ে সহজ পন্থা বলে মনে করে। তারা ভয় পায় না, কেননা তাদের শাস্তি হয় না। পাড়ায় মহল্লায় স্কুলের সামনে মেয়েরা সন্ত্রস্ত থাকে। অভিভাবকেরা নিজেদেরকে নিতান্ত অসহায় অবস্থায় দেখতে পান। কর্মহীন এই বখাটেদের পেছনে রাজনৈতিক দলের পৃষ্ঠপোষকতা থাকে। এরা দলের কাজে লাগে, দলও এদের কাজে লাগায়। দল বদলাতে এদের যে সময় লাগে তাও নয়। সামাজিক চাপে নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধের আইন বিধিবদ্ধ হয়েছে, কিন্তু সে আইনকে যে আরো বিস্তৃত ও শক্ত করা আবশ্যক মেয়েদের আত্মহত্যার ঘটনা সেই সত্যটাকেই জানিয়ে দেয়। আইনের প্রয়োগকেও কঠোর করা দরকার; সেই সঙ্গে আইনের বিধিগুলোর প্রচার ও তাদের প্রয়োগের দৃষ্টান্ত জনসমক্ষে তুলে ধরাও আবশ্যক।
কিন্তু যে ব্যাধির কারণে নির্যাতন ও আত্মহত্যা ঘটছে সেটা তো কেবল আইনের পরিধির বিস্তার এবং প্রয়োগের নিশ্চয়তা ও যথার্থতা দিয়ে দূর করা যাবে না, ব্যাধিটিকে উৎপাটিত করা চাই। পুঁজিবাদের যে গুণ নেই তা নয়, অবশ্যই আছে। সামন্তবাদের তুলনায় সে অবশ্যই উন্নত। ব্যক্তিকে সে স্বীকার করে, মর্যাদাও দিতে চায়, কিন্তু তার যে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা তাতে ব্যক্তিকে যে নিরাপত্তা দেবে সে-কাজটি সে করতে পারে না। পুঁজিবাদ ব্যক্তিকে বিচ্ছিন্ন ও আত্মকেন্দ্রিক করে, তাকে ভোগবাদী হতে উৎসাহ দেয়। এর ফলে দুর্বল যাদের অবস্থান সেই ব্যক্তিরা-অর্থাৎ দরিদ্র, শিশু ও মেয়েরা-যাদের হাতে বিত্ত ও ক্ষমতা রয়েছে তাদের দ্বারা প্রতিনিয়ত নিষ্পেষিত হয়। আমরা স্বাধীনতা ও মুক্তির কথা অহরহ বলি, কিন্তু সকল মানুষের মুক্তি তো কিছুতেই আসবে না যদি না পুঁজিবাদী ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়ে সেখানে প্রকৃত গণতান্ত্রিক অর্থাৎ সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা না ঘটাই। মুক্তির জন্য আমরা যে সংগ্রাম করি নি তাও নয়, কিন্তু মুক্তির জন্য সমাজব্যবস্থার অত্যাবশ্যক পরিবর্তনের বিষয়টা নিয়ে ভাবতে চাই না।
ব্যবস্থাটা বদলানো যায় নি, যে জন্য আমরা সুস্থ ও স্বাভাবিক থাকতে পারছি না। উন্নতি যা ঘটছে তা অল্প কিছু মানুষের, তারাও যে নিরাপদে রয়েছে তা নয়, আর বেশির ভাগ মানুষই কালাতিপাত করছে বিপদের মধ্যে। ব্যক্তিগত চেষ্টায় আমরা এই ব্যবস্থাকে যে বদলাতে পারবো না তাতে তো কোনো সন্দেহই নেই। এমনকি রাজনৈতিক আন্দোলনের মধ্য দিয়েও সেটা অর্জন সম্ভব হচ্ছে না। হবেও না। যা প্রয়োজন তা হলো সমষ্টিগত, ধারাবাহিক এবং সুস্পষ্ট লক্ষ্যাভিসারী রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন। সেটা না করতে পারলে আমরা বাঁচার মতো বাঁচতে পারবো না; আত্মহত্যার প্রবণতা অব্যাহত থাকবে। এবং সবাই আধমরা হয়েই থাকবো, এখন যেমনটা রয়েছি।
ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

x