স্বর্ণ ব্যবসায়ী হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচন

তিন কারণে তিনজনে মিলে খুন

সোহেল মারমা

রবিবার , ২১ জুলাই, ২০১৯ at ৩:২৯ পূর্বাহ্ণ
328

ইপিজেড থানাধীন বন্দরটিলা এলাকায় মনিশ্রী জুয়েলার্সের মালিক সঞ্জয় ধর হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচন করেছে পুলিশ। ২১ জুন মধ্যরাত নাগাদ নিজ দোকানের ভেতর খুন হন সঞ্জয় ধর। এক সময়ের কর্মচারী পরবর্তীতে স্বর্ণ ব্যবসায়ী হিসেবে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠার পাশাপাশি পাওনা টাকা ফেরতের জের ধরে প্রতিপক্ষের হাতে প্রাণ দিতে হয় সঞ্জয়কে। হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মূল পরিকল্পনাকারীসহ জড়িত তিন আসামীকে গ্রেপ্তারের পর এসব তথ্য পেয়েছে পুলিশ। ওই ঘটনায় নিহতের স্ত্রী রেখা ধর ইপিজেড থানায় অজ্ঞাতনামা আসামীদের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেন। নিহত সঞ্জয় কক্সবাজার জেলার রামু উপজেলার বনিকপাড়ার মৃত সুধারামের ছেলে।
পুলিশ বলছে, হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তিনজন জড়িত। এরা হলেন, বিকাশ কান্তি মল্লিক প্রকাশ তপন মল্লিক (৫২), শফিউল উমাম বাদশা (৩৭) ও ডা. বিশ্বজিৎ নামে এক ওষুধ দোকানি। ওই তিনজন মিলে রাতে দোকানের ভেতর থাকা সঞ্জয় ধরকে ছুরিকাঘাতের মাধ্যমে হত্যা করে। পরে প্রমাণ লাপাত্তা করতে দোকানে থাকা সিসিটিভি ক্যামেরা ভাঙচুরের পাশাপাশি ক্যামেরার সরঞ্জাম নিয়ে পালিয়ে যায় খুনীরা। মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা ইপিজেড থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মুহাম্মদ ওসমান গনি গতকাল আজাদীকে বলেন, হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে ছিল বন্দরটিলা এলাকার আরেক স্বর্ণ ব্যবসায়ী নিউ মল্লিক জুয়েলার্সের মালিক তপন মল্লিক। পাঁচ বছর আগে সঞ্জয় ধর ওই জুয়েলার্সের দোকানটিতে ম্যানেজার হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন। তিনি দীর্ঘদিন ওই দোকানে কাজ করেন। ২০১৫ সালে তপন মল্লিকের জুয়েলার্স ছেড়ে একই এলাকায় নিজেই একটি স্বর্ণের দোকান খুলেন সঞ্জয়। মনিশ্রী জুয়েলার্স নামে ওই দোকানটি ব্যবসায় সফলতা লাভ করে।
ওসমান গনি জানান, মল্লিক জুয়েলার্সের ম্যানেজার থাকাকালীন সঞ্জয় ধরই মূলত পুরো ব্যবসা দেখাশোনা করতেন। সেই সুবাদে ওখানকার ক্রেতাদের সাথে সঞ্জয় ধরের একটি ভালো সম্পর্ক গড়ে উঠে। সঞ্জয় নিজের দোকান খোলার পর ওই ক্রেতাদের একটা অংশ তার দোকানে চলে যায়। ফলে তপন মল্লিকের ব্যবসায় ধস নামে। এটা নিয়ে সঞ্জয়ের ওপর প্রচুর ক্ষোভ জমে তার। অন্যদিকে শফিউল উমাম বাদশা নামে এক কাপড় ব্যবসায়ী সঞ্জয়ের কাছ থেকে এক লাখ টাকা ধার নিয়েছিল। অবশ্য নিহতের স্ত্রী দাবি করছে বাদশা ধাপে ধাপে সঞ্জয়ের কাছ থেকে কয়েক লক্ষ টাকা ধার নিয়েছিল। তদন্ত কর্মকর্তা জানান, সেই টাকা সুদে-আসলে দশ লাখ টাকা দাবি করে সঞ্জয়। সেগুলো সময়মতো পরিশোধ করতে না পারায় বাদশার বিরুদ্ধে একটি চেক প্রতারণা মামলা হয়। ওই মামলায় বাদশা জেলও খেটেছিল। ওইসব টাকার লেনদেনের কারণে কাপড় ব্যবসা ছেড়ে একটি সময় বাদশা টমটম গাড়ি চালাতে শুরু করে। তবে বাদশা দাবি করছে, এরমধ্যে কিছু টাকা নাকি সে পরিশোধ করেছিল। এভাবে বিভিন্ন কারণে সঞ্জয়ের ওপর তার প্রচণ্ড ক্ষোভ চাপে।
এদিকে ৫০ হাজার টাকা ধার নিয়ে সময়মতো পরিশোধ করতে না পারায় সঞ্জয়ের কাছ থেকে নানা কথা-বার্তা ও হেনস্তা হতে হয়েছিল ডা. বিশ্বজিৎকে। ওইসব ক্ষোভ থেকেই তিনজন মিলে খুনের এ খুনের ঘটনাটি ঘটায় বলে জানান পরিদর্শক (তদন্ত) ওসমান গনি। এদিকে খুনের রহস্য উন্মোচনের পাশাপাশি জড়িত আসামীদের গ্রেপ্তারের পর গতকাল এক সংবাদ সম্মেলন করে ইপিজেড থানা পুলিশ।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত নগর পুলিশের উপ কমিশনার (বন্দর) হামিদুল আলম বলেন, এ খুনের ঘটনাটি শুরুর দিকে ক্লু’লেস ছিল। পরবর্তীতে তদন্তে খুব কম সময়ের মধ্যে ওই খুনের সাথে জড়িত সবাইকে চিহ্নিত করার পাশাপাশি তাদেরকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনতে আমরা সক্ষম হয়েছি।
২৪ জুন ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী বিকাশ কান্তি মল্লিক প্রকাশ তপন মল্লিককে গ্রেপ্তার করা হয়। ১৭ ও ১৮ জুলাই হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত বাদশা ও ডা. বিশ্বজিৎকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তপন মল্লিকের সাথে সঞ্জয়ের ব্যবসায়িক দ্বন্ধ এবং বাদশা ও বিশ্বজিতের সাথে টাকার লেনদেন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছিল বলে জানান উপ পুলিশ কমিশনার হামিদুল আলম। খুনের পরিকল্পনাটিও তারা দীর্ঘদিন ধরে করে আসছিল বলে জানান ডিসি।
তিনি বলেন, ঘটনার দিন বিকালে টমটম চালিয়ে যাওয়ার সময় তপন মল্লিকের সাথে প্রথমে দেখা হয় বাদশার। সঞ্জয়কে শেষ করে দেয়ার কথা বলে তখন তপন বাদশাকে রাত ১১টার দিকে দেখা করতে বলে। তার কথামতো গাড়ির পেছনে একটি ছুরি নিয়ে বন্দরটিলায় নিউ মল্লিক জুয়েলার্সে যায় বাদশা। সেখানে পৌছে সে তপন মল্লিক ও বিশ্বজিৎকে দেখে। পরে সবাই মিলে সঞ্জয়কে খুন করার জন্য তার দোকানের দিকে যায়। তখন সঞ্জয় ধরের দোকানের সার্টার অর্ধেক বন্ধ ছিল। পরে সার্টার তুলে প্রথমে বাদশা দোকানে প্রবেশ করে সঞ্জয়ের মুখ চেপে ধরে, তার পেছনে পেছনে তপন ও বিশ্বজিৎও তাকে চেপে ধরে নিচে ফেলে দেয়। একপর্যায়ে সঞ্জয়ের গলা কেটে দেওয়ার পাশাপাশি পেটে ছুরিকাঘাত করে ঘটনাস্থল থেকে চলে যায় তারা।
সংবাদ সম্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, অতিরিক্ত উপ পুলিশ কমিশনার (বন্দর) আরেফিন জুয়েল, সহকারী কমিশনার (বন্দর) কামরুল হাসান ও ওসি নুরুল হুদা, তদন্ত কর্মকর্তা ওসমান গনি।

x