স্থবির মশক নিধন কার্যক্রম

আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ চসিকের ওষুধ ছিটানো

মোরশেদ তালুকদার

মঙ্গলবার , ৩ ডিসেম্বর, ২০১৯ at ৪:৫৬ পূর্বাহ্ণ
49

আনু্‌ষ্ঠানিকতায় যেন ‘সীমাবদ্ধ’ থাকছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মশক নিধন কার্যক্রম। চলতি বছরের ১৫ জুলাই থেকে ১৬ অক্টোবর। এই চারমাসে তিনবার মশক নিধনে ‘ক্রাশ প্রোগ্রাম’ উদ্বোধন করেন সিটি মেয়র। প্রতিটি আনুষ্ঠানিকতার পর কয়েকদিন চসিকের ‘স্প্রে ম্যান’দের মাঠে দৌড়ঝাঁপ করতে দেখা যায়। এরপর বন্ধ থাকে ওষুধ ছিটানো। পূর্বের ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ আনুষ্ঠানিকতার পরও ‘স্থবির’ হয়ে পড়েছে মশক নিধন কার্যক্রম।
চসিকের মশক নিধন কার্যক্রমগুলো পর্যালোচনায় জানা গেছে, গত ১৫ জুলাই এবং ৭ আগস্ট ‘ক্রাশ প্রোগ্রাম’ ঘোষণা দিয়ে মশক নিয়ন্ত্রণে ওষুধ ছিটানোর আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করে তারা। সর্বশেষ গত ১৬ অক্টোবর নগরীর ডিসি হিল এলাকায় মশক নিধন কার্যক্রমের উদ্বোধন করেছিলেন সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন। চসিকের ভাষায় এটি ছিল, ‘নিয়মিত ক্রাশ প্রোগ্রাম’। এ প্রোগ্রামের মধ্য দিয়ে সারাবছরই শহরে ওষুধ ছিটানোর ঘোষণা ছিল চসিকের। তবে নগরবাসীর অভিযোগ, এবারও আনুষ্ঠানিকতার গণ্ডি থেকে বেরুতে পারেনি সংস্থাটি। শহরজুড়ে দিনরাত মশার উপদ্রব বাড়লেও ওষুধ ছিটানো কার্যক্রমে গতি নেই তাদের। অবশ্য বরাবরের মত এবারো অভিযোগ অস্বীকার করেছেন চসিকের পরিচ্ছন্ন কর্মীরা।
এদিকে সরেজমিন পরিদর্শনে নগরের বিভিন্ন নালা-নর্দমার বদ্ধ পানিতে মশা কিলবিল করতে দেখা গেছে। কীটতত্ত্ববিদরা বলেছেন, সেখানে ডিম পারছে মশা। ওষুধ ছিটিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে তা নগরবাসীর জন্য বিপদের কারণ হয়ে উঠবে। গতকাল সকালে নাছিরাবাদ সিএন্ডবি কলোনির সামনের নালায়ও প্রচুর মশা দেখা গেছে। পুরাতন চান্দগাঁও থানা এলাকার নালায়ও মশা দেখা গেছে।
সাধারণ মানুষজন বলছেন, মশা কেবল নালায় নয়- বাসা-বাড়ি, অফিস-আদালত কোথাও মশার অত্যাচারে শান্তিতে থাকা যাচ্ছে না। দুই নম্বর গেইট এলাকার বাসিন্দা নূর হোসেন বলেন, পত্রিকায় মাঝেমধ্যে দেখি, মশার অত্যাচার থেকে বাঁচাতে সিটি কর্পোরেশনের ক্রাশ প্রোগ্রামের খবর। কিন্তু ওষুধ ছিটাতে দেখি না। বর্তমানেও মশার অত্যাচার মাত্রাতিরিক্ত বেড়েছে। তবু ওষুধ ছিটানোর ব্যাপারে কেন জানি উদাসীন কর্পোরেশন। চকবাজার এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ আবদুল হামিদ বলেন, ‘চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন মশা মারতে ব্যর্থ। তাদের কার্যক্রম চোখে পড়ে না।’ হামজারবাগ এলাকার বাসিন্দা শফিউল আলম বলেন, ‘মশার যন্ত্রণায় দিনের বেলায়ও কয়েল জ্বালিয়ে রাখতে হচ্ছে।’ ডিসি রোডের বাসিন্দা জিয়াউল হাসান বলেন, ‘এত বেশি মশা বেড়েছে মশারির ভেতরও মশার গুন গুন আওয়াজে ঘুমাতে পারছি না।’ মুরাদপুরস্থ মোহাম্মপুর এলাকার বাসিন্দা বখতেয়ার আলম বলেন, বাসার একদম নিকটেই নালা। তাই এ এলাকায় মশার উপদ্রব একটু বেশিই। বর্তমানে এ উপদ্রব আগের চেয়ে হাজার গুন বেড়েছে। কিন্তু সিটি কর্পোশেনের লোকজনকে এখানে মশার ওষুধ ছিটাতে দেখি না।’ মধ্যম হালিশহর ২ নং সাইট এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ জাবেদ বলেন, এলাকার প্রতিটি নালা নর্দমা আবর্জনায় ভরপুর, মশা কিলবিল করছে। দিনের বেলায়ও মশার উপদ্রব। কিন্তু কখনো কাউকে দেখিনি মশার ওষুধ ছিটাতে।
এদিকে স্থানীয় সরকার আইন ‘স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) আইন, ২০০৯ এর তৃতীয় তফসিল এর এক নং অনুচ্ছেদে ‘জনস্বাস্থ্য’ বিষয়ে যে ক্ষমতা তার আলোকে মশক নিধনে ব্যবস্থা নিতে পারে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক)। তাছাড়া নগরীতে চসিকই মশক নিধনে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিল তার জন্মলগ্ন থেকেই। এ খাতে প্রতিবছর বরাদ্দও থাকে সংস্থাটির। চলতি অর্থ বছরেও ছয় কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। ফলে নগরীতে মশার উৎপাত বৃদ্ধির দায় এড়ানোর সুযোগ নেই সংস্থাটির।
এ বিষয়ে চসিকের উপপ্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা মো. মোরশেদুল আলম চৌধুরী দৈনিক আজাদীকে বলেন, ‘মশক নিয়ন্ত্রণে আমরা খুব চেষ্টা করছি। প্রত্যেকদিন আমরা ওষুধ ছিটাচ্ছি। প্রতিটি ওয়ার্ডকে চারটি জোনে ভাগ করে ওষুধ ছিটানোর কাযক্রম চলছে। নালা-নর্দমায় ডিম ধ্বংসকারী লার্ভিসাইট ছিটানো হচ্ছে। কাউন্সিলরদের তত্ত্বাবধানেও চলছে এ কার্যক্রম।’
‘আপনি বলছেন, ওষুধ ছিটাচ্ছেন। কিন্তু লোকজন বলছেন, তারা ওষুধ ছিটানোর কার্যক্রম দেখছেন না।’ তাহলে সত্য কোনটা? এমন প্রশ্নে চসিকের এ কর্মকর্তা বলেন, ‘আসলে মানুষজন নিজ নিজ কাজে ব্যস্ত। আমাদের লোক গিয়ে ওষুধ ছিটাচ্ছে। সেটা কি আর সবাই সেভাবে খেয়াল করে। তাছাড়া ফগার মেশিন দিয়ে ওষুধ ছিটানোর সময় আওয়াজ হয় বা বড় ধরনের শব্দ হয়। আর মানুষের ধারণা, শব্দ না হওয়া মানে ওষুধ ছিটাচ্ছে না। কিন্তু এখন যে লার্ভিসাইট ছিটানো হচ্ছে সেটা সাধারণ স্প্রে মেশিন দিয়ে। এটা তো আর আওয়াজ হয় না। তাই চিন্তা করছি, এখন থেকে কোথাও ওষুধ ছিটানোর সময় হ্যান্ড মাইক দিয়ে লোকজনকে জানানো যায় কী না।’
এদিকে কীটতত্ত্ববিদরা বলছেন, সাধারণত শুষ্ক মৌসুমের ছয় মাস তথা নভেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে মশার উপদ্রব বেড়ে যায়। এসময়ে নালা-নর্দমায় জমাট হয়ে থাকা পানিতে ডিম ছাড়ে ‘ফাইলেরিয়া’সহ বিভিন্ন রোগের জীবনুবাহী মশা।

x