স্কুল শিক্ষার্থীদের মধ্যে কেন আত্মহত্যা প্রবণতা?

নগরীতে এক সপ্তাহে ২ শিক্ষার্থীসহ ৫ আত্নহননের ঘটনা

সবুর শুভ

রবিবার , ৩ মার্চ, ২০১৯ at ৬:১৮ পূর্বাহ্ণ
73

‘আত্মহত্যা’। মানে নিজেকে নিজেকে হত্যা করা কিংবা আত্মঘাতি হওয়া। এ আত্মহত্যা যেন এখন অপ্রতিরোধ্য। তরুণ-তরুণীদের মধ্যে এ প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। দারিদ্র্য, পারিবারিক কলহ, প্রেম-সংক্রান্ত জটিলতা, পড়াশুনার চাপ ও অভিমানের কারণে ঘটছে আত্মহননের ঘটনা। গত এক সপ্তাহে শুধু নগরীতেই এ ধরনের আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে ৫টি, যারমধ্যে ২ জন স্কুলের গণ্ডিও পেরোয়নি। সচেতন মহল প্রশ্ন রাখছেন- কি হয়েছে তরুণ-তরুণী ও স্কুল শিক্ষার্থীদের? এ ভয়ানক সামাজিক সমস্যার উত্তরণ কোন পথে? এ ব্যাপারে মনোচিকিৎসক মোহিত কামাল বলেন, অন্যান্য রোগের মতো এর মধ্যেও জেনেটিক কারণ থাকতে পারে। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের এ বিষয়ে সচেতন করতে হবে। মসজিদ-মন্দিরে যুক্তি-ব্যাখ্যা দিয়ে বোঝাতে হবে কোনো ধর্মই আত্মহত্যাকে অনুমোদন করে না।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, প্রতি বছর বিশ্বে ১০ লাখ মানুষ আত্মহত্যা করে। প্রতি ৪০ সেকেন্ডে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে একটি। আশঙ্কা করা হচ্ছে, ২০২০ সালে এই সংখ্যা প্রতি ২০ সেকেন্ডে একজনে পৌঁছাবে। গত ৪৫ বছরে আত্মহত্যার ঘটনা ৬০ শতাংশ বেড়েছে। বিশ্বে বর্তমানে ১৫ থেকে ৪৪ বছর বয়সী মানুষের মৃত্যুর প্রধান তিনটি কারণের একটি হলো আত্মহত্যা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানসিক চাপ, হতাশা, অবসাদ, অভিমান, দারিদ্রতা, মাদকাসক্ত ও হেনস্থার শিকার হয়ে মানুষ আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে। আবার আর্থ-সামাজিক সমস্যা ও পারিবারিক সংকটের কারণেও অনেকে আত্মহত্যা করে। প্রতিবছর সারা বিশ্বে যে সব কারণে মানুষের মৃত্যু ঘটে তার মধ্যে ‘আত্মহত্যা’ ত্রয়োদশতম প্রধান কারণ। গত এক সপ্তাহে নগরীতে সংঘটিত হয়েছে ৫টি আত্মহত্যার ঘটনা। এরমধ্যে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি বিকেল ৪টায় আন্দরকিল্লার ভাড়া বাসায় আত্মহত্যা করেন সুজয় মজুমদার নামে ২৬ বছরের যুবক। প্রেমঘটিত কারণে এ আত্মহননের ঘটনা বলে জানায় পুলিশ। অকালে ঝরে যায় সম্ভাবনাময় এ যুবক। ২৬ ফেব্রুয়ারি ঘটে আরো মর্মান্তিক ঘটনা। নগরীর পাঁচলাইশ থানার নাজিরপাড়া শ্যামলী আবাসিক এলাকার বাসায় দুপুর ১টায় আত্মহননের পথ বেছে নেয় স্কুল শিক্ষার্থী আবরার মাহমুদ (১৩)। বাকলিয়া সরকারি স্কুলের ৭ম শ্রেণির এ শিক্ষার্থী নিজেকে শেষ করে দেয় পরিবারের সদস্যদের সাথে স্রেফ অভিমান করেই। এ ঘটনার পর শোকে পাথর হয়ে যান পরিবারের সদস্যরা। এতটুকুন ছেলে অভিমানের কারণে আত্মঘাতি হবে ভাবতেই পারেননি কেউ।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি পাঁচলাইশ আতুরার ডিপোস্থ হাজী মোহাম্মদ আলী কলোনিতে প্রেমঘটিত ব্যাপারে অভিমান থেকে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয় পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী জেসমিন আক্তার (১২)। পরিবারের সদস্যরা বুঝেই উঠতে পারেনি তার প্রেমের বিষয়টি। জেসমিনের আত্মহননের ঘটনায় শোকে পাথর হয়ে যান পরিবারের সদস্যরা।
গতকাল শনিবার ষোলশহর দয়া কলোনিতে আত্মহত্যা করেন ২৪ বছরের যুবক সোহেল। সকালে কাজে যান সোহেল। দুপুর ২টার দিকে বাসায় এসেই আত্মহত্যা করেন তিনি। ২ মাস আগে তার স্ত্রী বাপের বাড়িতে গিয়ে আর আসেননি বলে জানায় পুলিশ।
এদিকে গত ১ মার্চ নাছমিন আক্তার (১৭) নামে এক যুবতী আত্মহত্যা করেছেন আমবাগান ফ্লোরা পাস রোড এলাকার বাসায়। রাত সাড়ে ১০টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। পরিবারের সদস্যদের সাথে অভিমানের কারণে এ ঘটনা বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি ও ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষক মাওলানা মোহাম্মদ নুর হোসাইন জানান, আত্মহত্যা করা ‘মহাপাপ’ ইসলাম ধর্মে। মানুষ না বুঝে নিজে নিজেকে হত্যা করে থাকে। ইসলামে নিরপরাধ মানুষহত্যা নিষিদ্ধ। আত্মহত্যাও নিষিদ্ধ। কারণ ধর্ম মতে, মানুষ প্রাণের মালিক নিজে নয়। জীবন ও মৃত্যুর মালিক যিনি সৃষ্টি করেছেন তিনিই। ধর্মীয়ভাবে সচেতনতার বিষয়টি গুরুত্ব দিলে এক্ষেত্রে সমাধান আসতে পারে বলেও মনে করেন তিনি।
একেরপর এক এ আত্মহত্যার ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রামের মহানগর পিপি অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ ফখরুদ্দিন চৌধুরী বলেন, বিভিন্ন কারণে জীবনের প্রতি অনীহার ফল হচ্ছে আত্মহত্যা। এক্ষেত্রে জীবনের প্রতি অনীহার কারণগুলো জেনে পরিবারের সদস্যদের সচেতনভাবে অগ্রসর হওয়া উচিৎ। তিনি আইনগত দিক থেকে বলেন, আত্মহত্যার প্ররোচনা দিলে আইনগত ব্যবস্থা রয়েছে। পরিবারের সদস্যসহ সংশ্লিষ্টদের সচেতনতা এ সংকট থেকে উত্তরণের অন্যতম উপায় বলে মনে করেন এ আইনজীবী।
আত্মহত্যা নিয়ে কাজ করা ‘ইপসা’ নামের একটি বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার কর্মকর্তা শহীদুল ইসলাম বলেন, আত্মহত্যার ব্যাপারে সার্বিকভাবে সর্তক হওয়া এবং সর্তক করার কোন বিকল্প নেই। ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক চ্যানেলে নিয়মিত সচেতনতামূলক প্রচার-প্রচারণায়ও এক্ষেত্রে সমাধান আসতে পারে।

x