সৌন্দর্যের সাতকাহন

শনিবার , ৩০ নভেম্বর, ২০১৯ at ৫:০১ পূর্বাহ্ণ

সৌন্দর্য বিষয়টা আমি হয়তো কম বুঝি বা অনেকক্ষেত্রে বুঝিই না। এই সৌন্দর্য বলতে আসলে মানুষের চেহারা বিষয়ক গতানুগতিক সৌন্দর্যের কথা বলছি। খুব করে মনে আছে, যখন ক্লাস থ্রি বা ফোরে পড়তাম, একদিন কোনো একটা প্রয়োজনে আব্বু স্কুলে গিয়েছিল আমার ক্লাস টিচারের সাথে কথা বলার জন্যে। তখন আমার যে ঘনিষ্ঠ বান্ধবী ছিল স্কুলে, সে অতি বিস্ময়ের সাথে প্রথম দেখাতেই আমার বাবাকে নিয়ে মন্তব্য করেছিল, ‘আল্লাহ, মিলি তোর বাবা এত কালো কেন? আমি এটা শুনে এতই বিব্রত আর আহত হয়েছিলাম যে, তার এই প্রশ্নের উত্তর কি দিব ভেবে লজ্জায় এড়িয়ে যাচ্ছিলাম। মানে, আমার বাবাকে কেউ এত কালো বলাতে আমার খুব লজ্জা লাগছিল। খুবই অস্বস্তিকর ব্যাপার আরকি। মনে মনে যে একটু খারাপ লাগেনি, তাও কিন্তু না, কিন্তু এই প্রশ্নের উত্তরই বা কি হতে পারে? অথচ তার আগ পর্যন্ত আমার কখনো মনেই হয়নি, আমার বাবার গায়ের রং কালো। বা কালো রং হলেও এটা যে প্রশ্ন করার মতো বিষয় হতে পারে, সেটাও ছোট মাথায় তখন প্রথমবার ঢুকেছিল। এই যে ক্লাস থ্রি-ফোরের বাচ্চার মাথায় কালো মানুষ-সাদা মানুষ ভাবনা ঢুকে যায়, এগুলোর জন্যে নিশ্চয় প্রাথমিকভাবে পরিবারগুলো দায়ী? আমি এমন ছোট বাচ্চাও কিন্তু দেখেছি, যে কিনা কালো রং এর মানুষের কোলে যেতে চায়নি, এই শিক্ষাগুলো পরিবারে নিশ্চয় দীর্ঘদিন ধরে চর্চা হয়ে আসছে? বড় হওয়ার পর, যখন অনেককে বলতে শুনেছি, মেয়ে বাবার রঙ পেয়েছে, তখন তো একবার বলেই ফেলেছিলাম ‘আমার বাপ কালো, তাই আমিও কালো। কোন সমস্যা?’ যদিও লোকে আমায় শ্যামবর্ণ বলে, কিন্তু আমার বাবা আসলে কুচকুচে কালো ছিলেন। একবার তো আমার মা এক মহিলাকে বিরক্ত হয়ে বলেই ফেলেছিলেন, ‘আমার মেয়ে কুচকুচে কালো, আপনার পছন্দ হবে না।’ সেদিন আমার মায়ের সেন্স অব হিউমার দেখে তাজ্জব বনে গিয়েছিলাম, আর দুজনের সে কি হাসাহাসি এটা নিয়ে। যদিও আমি কখনো আমার পরিবারে, বাপ-চাচার বংশের কোনো আত্মীয়কে আমার চেহারা নিয়ে কখনোই কোনো মন্তব্য করতে শুনিনি, কিন্তু আমার চাচাতো ভাই-বোন বা ফুপাতো ভাই বোন যারা আছে, তারা আসলে সবাই ফর্সা। এমনকি আমার যারা বোন আছে বংশে, তারা প্রচলিত সৌন্দর্যের সংজ্ঞায় খুবই সুন্দরী, সুশ্রী শিক্ষিত তরুণী। আমার সেইসব বোনদের জন্যে অনেক ছেলেই হাহাকার করে পটাতে না পেরে। এমনকি এক বোনকে তার বিশ্ববিদ্যালয়ের বয়স্ক শিক্ষক পর্যন্ত উত্ত্যক্ত করেছিল তার সুন্দর চেহারার কারণে! তিনি একজন বয়স্ক লোক, ঘরে বিবাহযোগ্য সন্তান-স্ত্রী সবই আছে, তাও তিনি পিছু ছাড়ছিলেন না। পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান এর কাছে প্রমাণ সহ কমপ্লেইন করে কিছুটা নিস্তার পাওয়া গিয়েছিল। যদিও সেই শিক্ষকের শাস্তি ছিল এক ডিপার্টমেন্ট থেকে অন্য ডিপার্টমেন্টে ট্রান্সফার করা। তিনি যে অন্য কোন ছাত্রীকে পুনরায় বিরক্ত করবেন না, নাম্বার বেশি দেওয়ার লোভ দেখিয়ে, তার কোনো নিশ্চয়তা আছে? আমার দাদা, চাচা, ফুফু সবাই দেখতে সুন্দর, গায়ের রং টাও তাদের উজ্জ্বল। শুধু আমার বাবা কালো ছিলেন, কারণ তার মা, মানে আমার দাদীও কালো ছিলেন। এইযে কালো, সাদা রং দিয়ে মানুষকে বিচার করা, এই শিক্ষা তো শ্বেতাঙ্গদের। আমাদের বাঙালিরা অন্তত ব্রিটিশ, আমেরিকানদের মতো রেসিস্ট না বলেই মনে করি। অন্তত এই বাঙালির ইতিহাসে কালো মানুষদের দাস বানানোর ইতিহাস নেই। অথচ এক সময় তো কালো মানুষদের হাতে -পায়ে শিকল বেঁধে পশুর মতো করে রাখা হতো, খাটানো হতো, কারণ অপরাধ একটাই ছিল, তাদের রং কালো। এইরকম চরম বর্ণবাদী মানসিকতার ইতিহাস বাঙালির না থাকলেও এইদেশে অনেক মানুষ যে আসলে শুধুমাত্র রং দিয়ে এখনো মানুষের সৌন্দর্য যাচাই করতে বসে যায়, যোগ্যতা বাদ দিয়ে, তা আসলে খুবই হতাশাজনক। আমি হয়তো এসব কারণেই বুঝি না, আসলে কে দেখতে সুন্দর বা অসুন্দর। খুব পেটানো শরীর এর, কোনো সুদর্শন যুবক যখন ইনবক্সে তার বিশেষ অঙ্গের ছবি দিয়ে রাখে, তাকে দ্বিতীয়বার দেখলে আমার বমি করতে ইচ্ছে করে। আবার অন্ধকার রাস্তায় আমার খুব ভালো বন্ধু যখন নিরাপত্তার কথা ভেবে, আমার হাত আগলে ধরে সাবধানে এগুতে থাকে, তখন আমার মাথায় থাকে না, সে কালো নাকি সাদা, মোটা নাকি পাতলা, বা লম্বা নাকি বেঁটে। এই বন্ধু মানে বিশেষ বন্ধুও না। স্রেফ বন্ধু। আজকাল মানুষকে কতকিছু ক্লারিফাই করে বলতে হয়, বন্ধু বললেও মানুষ বিশেষ গন্ধ খুঁজে। অথচ সেই বন্ধুটি যেমন ছেলে হতে পারে, তেমনি মেয়ে হলেও কিন্তু কোনো অসুবিধা থাকার কথা না। একজন মানুষ তো তখনই সুন্দর, যখন তার চিন্তা, ব্যক্তিত্ব, কাজ সুন্দর। এছাড়া সৌন্দর্যের আর কি কোনো সংজ্ঞা হওয়া উচিত? এইসব তো সব আপেক্ষিক ব্যাপার স্যাপার। মানে আমার কাছে গোলাপ ফুল সুন্দর লাগে, এখন যদি আপনার কাছে গোলাপ বাদ দিয়ে রজনীগন্ধা বা অন্য ফুল সুন্দর লেগে যায়, তাহলে কি দুটোই একত্রে সুন্দর বা অসুন্দর হয়? নাকি যে যার মতো করে সুন্দর? মানে গোলাপ তার রং, গন্ধের জন্যে যেমন সুন্দর, তেমনি রজনীগন্ধাও তার ভিন্ন রং, ভিন্ন গন্ধের জন্যে সুন্দর। এইভাবেই প্রতিটা মানুষ যে যেমন, সে সেভাবেই কি সুন্দর না? অভিনেত্রী সোনম কাপুর একবার এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, নিখুঁত সৌন্দর্য বলে কিছু নেই। সবটাই আসলে মেকআপের কারসাজি। ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোর আগে তাদেরকে সৌন্দর্যের দেবী সাজার জন্যে কয়েক ঘন্টা আয়নার সামনে বসে থাকতে হয়। এরপরেই না আমরা বলি, আহা কি সুন্দর! এইভাবে সৌন্দর্য বিষয়টাই আসলে সমাজের তৈরি করে দেওয়া একটা ধারণা ছাড়া আর কিছুই মনে হয় না। এই ধারণার পিছে ছুটেই আমরা কালো মানেই অসুন্দর আর সাদা মানেই সুন্দর ধরে নেই। কালো মেয়েদের বিয়ে দিতে তাই আজও যৌতুকের পরিমাণটা একটু হলেও বেশি লাগে। এমনকি কালো ছেলেদের ক্ষেত্রেও ভোগান্তির অনেক গল্প আছে। বিয়ের বাজারে ছেলে যদি একটু বেশিই কালো হয় তাহলে কিন্তু সেটাও ঠাট্টা তামাশার বিষয়বস্তু হয়ে যায় ক্ষেত্রবিশেষে। এ তো গেলো কালো সাদার কথা। সৌন্দর্যের মাপকাঠিতে মোটা মানুষদেরও কিন্তু ভোগান্তি কোনো অংশে কম না। সামাজিকভাবে ছেলে-মেয়ে নির্বিশেষে মোটাদের নিয়ে বিদ্রুপ করা সামাজিকভাবে স্বীকৃত একটা বিষয় বলা যায়। যদিও সম্পর্কের খাতিরে অনেক সময় পরিচিত বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়দের নিয়ে আমরা একটু মজা করতেই পারি, কিন্তু তারও কিন্তু একটা লিমিটেশন থাকে, সেটাই আমরা ভুলে যাই। মজা করা কখন যেন তাচ্ছিল্য করা বা ব্যঙ্গ-বিদ্রুপে পরিণত হয়ে যায়, আমরা হয়ত বুঝতেই পারিনা। অথচ আমরা এটা ভাবি না যে, অনেকে হরমোন সমস্যার কারণে মোটা হয়ে যায়, বিশেষ করে যারা থাইরয়েড বা পিসিওএস এর রোগী তাদের জন্যে ওজন কম রাখা যুদ্ধ জয় করার মতোই কঠিন বিষয়। এছাড়াও জেনেটিক কিছু কারণেও মানুষ অত্যধিক ওজনের সমস্যায় ভোগে। এখন যদি এরকম কোনো মানুষকে আপনি চালের বস্তা বা আটার বস্তা ডেকে বডি শেমিং করেন, তাহলে সুবিবেচনা বোধ এর অভাব আসলে কার? এটা আমাদের ভাবা উচিত। অথচ আফ্রিকার অনেক দেশে কিন্তু যে মেয়ে যত বেশি মোটা, তাকে তত বেশি সুন্দরী মনে করা হয়। আবার বলিউড বা হলিউডের সুন্দরের দাঁড়িপাল্লায় কিন্তু মেয়েদের জন্যে জিরো ফিগার, আর ছেলেদের জন্যে বডি বিল্ডার না হলে, তাকে সুন্দর বলা যাবে না! আমাদের দেশের মা খালা, দাদী-নানিরা আবার এঞ্জেলিনা জোলি, কারিনাদের দেখলে মন্তব্য করতে ভুল করেনা’ ‘গায়ে একটু গোশত না থাকলে ভালো লাগে নাকি’ এই যে গায়ে একটু গোশত থাকা মানে কিন্তু অত্যধিক মোটাকে তারা বোঝায় না, বরং কিছুটা নাদুসনুদুস শরীরকেই বোঝায়। আমাদের দেশের সিনেমা জগতে একসময় ময়ুরী, মুনমুন এর মতো নায়িকারা দাপটের সাথে কাজ করেছে, কারণ তাদের একটা দর্শকশ্রেণি ছিল বাজারে, এই বাজারের দর্শকরা হলো সমাজের নিম্নস্তরের মানুষ রিকশাওয়ালা, চাওয়ালা এরকম মানুষ। যাদের কাছে আসলে মোটা, থলথলে শরীর এর মুনমুন, ময়ুরীরাই যতটা সুন্দর, পাঠকাঠির মতো জিরো ফিগারের নায়িকারা ততটা সুন্দর না তাদের কাছে। সমাজ, রাষ্ট্র, শিক্ষা ভেদে সৌন্দর্যবোধ- এর ধারণা অনেক ক্ষেত্রেই ভিন্ন হলেও পুঁজিবাদের কল্যাণে আজও কিন্তু সারাবিশ্বেই ফেয়ারনেস ক্রিম এর রমরমা ব্যবসা টিকে আছে! আমি যদি বলি পুঁজিবাদই আসলে সৌন্দর্য্যের সংজ্ঞা ঠিক করে দিয়ে রেখেছে, সেটা কি খুব বেশি ভুল বলা হবে? এমনকি আমাদের দেশের কালো বা শ্যামবর্ণের মেয়েদের কৃষ্ণকলি আখ্যা দিয়ে, তার মুখে ফেয়ারনেস ক্রিমের স্তর বসিয়ে টিভি বিজ্ঞাপনগুলো আসলে করছে কারা? এগুলো ভাবার বিষয়। কালো গোলাপকে সবচেয়ে সুন্দর ফুল বলা হয়। এমনকি কালো গোলাপ কিছুটা রেয়ারও বটে, অথচ আমাদের দেশে সেই কালো মানুষকে নিয়েই কটাক্ষ করা হয়। ইউরোপীয় স্বর্ণকেশী নারীদের আবেদন পুরুষদের কাছে সবসময়ই ছিল, আছে এবং থাকবে। তেমনি আমাদের দেশে কেশবতী কন্যা বলতে এক মাথা কালো, লম্বা চুল মেয়েকেই বোঝানো হয়, প্রশংসা করা হয়, আমি নিজেও অনেক মানুষের কাছে আমার লম্বা, কালো ঝরঝরে চুলের প্রশংসা শুনেছি। এমনকি একদিন রাস্তায় শ্যাম্পু করে চুল খুলে হাঁটার সময়, এক অপরিচিত বাইকওয়ালা মন্তব্য করেই ফেলেছিল, ‘নাইস হেয়ার, ডোন্ট মাইন্ড প্লিজ।’প্রতিউত্তরে মুচকি হাসি দিয়ে চলে এসেছিলাম আমি। একজন মানুষ দেখতে কেমন হবে, তার উপর তার হাত থাকে না, যদি ক্ষমতা থাকতো মানুষের, তাহলে বোধহয় সবাই যে যার মতো করে নিজেকে সুন্দর বানিয়ে নিত। চেহারা তো অর্জন এর বিষয় না, মানে কোনো পরিশ্রম করে বা বিশেষ যোগ্যতা দিয়ে কেউ বিশেষ চেহারা পায়না। তাহলে এই ২০১৯ এ এসেও কেন শুধুমাত্র বাহ্যিক রূপ দিয়ে মানুষ কে যাচাই করা হবে? এটা কথা বলার মতো বিষয়ই বা কেন হবে? আমরা অন্তত সবাই একটা কথা বিশ্বাস করি যে, মানুষ বাঁচে তার কর্মে। মানুষের সৌন্দর্যবোধ ও আসলে কর্মের মধ্যেই নিহিত। একজন মানুষ কে কতটা উন্নত শিক্ষাও রুচির অধিকারী, কার কাজ কেমন, ব্যক্তিত্ব কেমন, চিন্তাধারা, জীবনবোধ কেমন, সমাজ নিয়ে ভাবনা কেমন, এসব দিয়েই তো একজন প্রকৃত সুন্দর মানুষের চেহারা সামনে আসে। প্রতিটা মানুষের মধ্যেই সুবোধ আর কুবোধের সহাবস্থান। শিক্ষা, সংস্কৃতি, উন্নত জীবনাচরণ, উন্নত কর্ম দিয়ে যে যত বেশি কুবোধকে পরাজয় করতে পারবে, সেই আসলে তত বেশি সুন্দর।

x