সোনার মানুষ চাই

সালমা বিনতে শফিক

মঙ্গলবার , ২৯ অক্টোবর, ২০১৯ at ১০:১৬ পূর্বাহ্ণ
24

দেশের বেশীর ভাগ গণবিশ্ববিদ্যালয়ের অসংখ্য ছেলেমেয়ে এবার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ার প্রথম পর্যায়ে লিখিত পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছে। ইতোমধ্যে সে পরীক্ষার ফলাফলও প্রকাশিত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া ছেলেমেয়েরা যদি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পত্র হাতে নিয়ে নিজ নিজ জন্মভিটায় ফিরে যায়, তাহলেতো দেশটা সোনার দেশ হয়ে যাবে। আমরা যারা এই স্বপ্ন দেখছি, তারা বোকার স্বর্গে বাস করছি। কারণ আমাদের মেধাবী ছেলেমেয়েরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়ে নিজগ্রামে ফিরে যাবার আশায় এত যুদ্ধ করে বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসেনি। তাহলে কেন এই শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় অংশগ্রহণ? সবাই জানে তারা ‘প্রঙি’ দিচ্ছে; তারা নকল, তারা সব ছদ্মবেশী।
লক্ষাধিক ছেলেমেয়ের মাঝ থেকে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বেছে নেই মেধাবী কয়েক হাজার। যত শান দেবে ততই খাঁটি সোনা হবে ওরা, বদলে দেবে দেশটাকে। দশের সেবায় খাটবে প্রাণ দিয়ে। কিন্তু অনেকে সেবায় মন দিয়ে ফেলছে এখনই, তৈরি হবার আগেই। পাড়া গাঁয়ের কিংবা নগরের কোন মহাবিদ্যালয়ের চৌকাঠ পেরুনো ‘আমড়া কাঠের ঢেঁকি’ সম প্রতিযোগীর হয়ে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে চাকরি পাইয়ে দিতে তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসছে, বিরাট অংকের টাকার বিনিময়ে।
এটা কোন নতুন খবর নয়, গোপন কথাতো নয়ই। ঘটনাটাও এবছর নতুন করে ঘটেনি। তাই পাঠক চমকে উঠছেন না। আমার কাছে নতুন মনে হচ্ছে, কারণ আমি সবে জানতে পারলাম; আঁতকে উঠলাম, যদিও সরকারী বেসরকারী পর্যায়ে কর্মসংস্থান প্রক্রিয়ায় অর্থ আদান প্রদানের খবর একেবারে অজানা ছিলনা। আজ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অর্থের বিনিময়ে অংশগ্রহণের খবর শুনে কলম না ধরে চুপচাপ বসে বসে নিজের কাজে মন দিতে পারছিলামনা।
ভাবছি আমি – এমন একটা সরকারী গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা! ছবিসহ প্রবেশপত্র থাকবে, যথাস্থানে সবকিছু যাচাই বাছাই হবে, এমনইতো হবার কথা। দু’চার জনতো নয়, হাজার হাজার ছদ্মবেশী কিংবা নকল পরীক্ষার্থী। কর্তাব্যক্তিগণ ধরতেই পারছেননা। লিখিত পরীক্ষার পুলসিরাত পার হবার পর আসে সাক্ষাৎকার পর্ব। একই প্রবেশপত্র দু’জায়গায় ব্যবহার করার কথা। দুই পরীক্ষার বিরতিতে ছবি বদলের কোন সুযোগ থাকার কথা না। তাছাড়া যিনি লিখিত পরীক্ষায় অংশ নিতে সাহস পাননা, মৌখিক পর্ব তিনি পাড়ি দেন কি করে? কর্তাব্যক্তিগণের চোখে ধুলো দিয়ে পার পেয়ে যান হাজার হাজার নকল মানুষ, যারা শিক্ষক হিসেবে আবির্ভূত হন কোমলমতি শিশুদের পাঠদান করতে। চোখে ধুলো দিতেও ব্যাপক অর্থের আনাগোনা হয়। কোনকিছুই নাকি কারও অজানা নয়।
এটা বলার অপেক্ষা রাখেনা যে দেশ গঠনে, জাতি গঠনে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের চেয়ে, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের ভূমিকা অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ। কেবল কর্মের সংস্থান হওয়া, আর বেকার সমস্যা দুর হওয়াটাই কি বড় কথা! লক্ষ লক্ষ টাকা আকাশে বাতাসে ছড়িয়ে ছিটিয়ে যিনি শিক্ষকের আসনে বসে গিয়েছেন কিংবা বসতে যাচ্ছেন, কি শিক্ষা দেবেন তিনি আমাদের মাটির আত্মজদের! আকাশে বাতাসে উড়তে থাকা টাকার থলে যাদের ঘরে প্রবেশ করছে তারাই বা কিভাবে আত্মস্থ করবেন এই অযাচিত দান! আর চালুনির মতো ছেঁকে ছেঁকে যে মেধাবীদের বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের অন্তর্ভুক্ত করা হল, বয়স কুড়ি পেরুতে না পেরুতে তারা একদিকে অর্ধলক্ষ, ক্ষেত্র বিশেষে আরও বেশী টাকার বিনিময়ে নিজের অর্জিত শিক্ষা বিক্রি করে (কেউ কেউ একাধিক বার করে), আর অন্যদিকে নিজেকে ধীরে ধীরে তৈরি করে বড় কোন চাকরির জন্য। এমন যখন সময়, তখন আমরা একে কি বলব! শিক্ষা, নৈতিকতা, মূল্যবোধ, যাবতীয় অর্জন- সব কিছুকে কি কেবলই অন্তঃসারশূন্য বলে মনে হয়না?
আজকাল সমাজের উঁচু তলার মানুষদের ছেলেমেয়েরা আর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়তে যায়না। সেকারণেই বোধ করি আমরা খুব একটা গা করিনা এসব খবর শুনে। শুধু উঁচু তলা বলছি কেন, উচ্চ মধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত কারও সন্তান পা রাখেনা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আঙিনায়। দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, আমার সন্তানকে ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠাতে পারিনি। আমি এক খণ্ডকালীন গৃহকর্মীকে চিনি যার ছেলেমেয়েরা কিন্ডার গারটেনে ভর্তি হয়েছে। কেমন সেই কিন্ডার গারটেন দেখার সুযোগ হয়নি। ‘ছিন্নমুল’ আবাসিক এলাকার শিশুরা যায় সেই স্কুলে। সেখানে বেতন দিতে হয়, বই খাতা কিনতে হয়, স্কুলের পোশাক বানাতে হয়। সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মতো ‘ফ্রি’ নয় কিছু। মফস্বল শহরগুলোতে এমনকি গ্রামে গ্রামেও এখন সুন্দর সুন্দর নাম নিয়ে গজিয়ে উঠেছে অ-নেক কিন্ডার গারটেন।
আঠারো কোটি জনগোষ্ঠীর দেশ আমাদের। সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যাবার মতো শিশুর অভাব নেই, সত্য। কিন্তু সেই শিশুদের দেখভালের জন্য, শিক্ষাদানের জন্য আমরা কাদের নিযুক্ত করছি?
আমরা কি ভুলে গিয়েছি- সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠ নিয়েইতো দেশ বাঁচিয়েছেন, বিপ্লব করেছেন, দুনিয়া কাঁপিয়েছেন বাংলা মায়ের কত শত দামাল ছেলে! যে শিক্ষক তাদের প্রথম পাঠ দিয়েছেন, যে শিক্ষকগণ একে একে খুলে দিয়েছেন আলোর জানালা তাঁদের কথা ভোলার নয়। তাঁদের শূন্যস্থান পূরণে আমরা কি করছি, কিভাবে করছি- এখনই ভাবতে হবে। শুধরাতে হবে এখনই।
স্বাধীনতার শতবর্ষ পূর্তিতে আমরা কেউ থাকবনা। এবছরের শুরুতে যে শিশুরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে তারাই সগৌরবে পালন করবে সেই মহান উৎসব। ‘ওই আসনতলের মাটির পরে লুটিয়ে’ রবে ওরাই। কিন্ডার প্রজন্ম থাকবেনা পড়ে পোড়া (!) দেশটায়। আমরা কি আমাদের মাটির সন্তানদের সেই মহোৎসব পালনের পথ তৈরি করে দেবোনা?
শেষ করছি অনেক দিন আগে শোনা একটা গানের কলি দিয়ে; রেনেসাঁ ব্যান্ডের গান। নব্বইয়ের দশকে বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল। কলিম শরাফি একবার বাংলাদেশ টেলিভিশনে ‘জলসা’ নামের এক অনুষ্ঠানে শাস্ত্রীয় ও ব্যান্ডসঙ্গীতের তারকাদেরকে একসঙ্গে নিয়ে গানটি পরিবেশন করেছিলেন- “আজ যে শিশু, পৃথিবীর আলোয় এসেছে, আমরা তার তরে একটি সাজানো বাগান চাই”।
– সেই সাজানো বাগান পরিচর্যা করার জন্য কিছু সোনার মানুষও যে চাই।

x