সোনামার্গের ঝর্ণাধারায়

ড. আনোয়ারা আলম

শুক্রবার , ১৮ জানুয়ারি, ২০১৯ at ৪:০৫ পূর্বাহ্ণ
80

রাতে বেশ ভালো ঘুম, শরীর ও মন ঝরঝরে। হোটেলের ডিলক্স রুমের আরামদায়ক পরিবেশ সাংসারিক ঝামেলা নেই-‘আহ! এভাবে যদি বাকী জীবন কাটাতে পারতাম!”। যাযাবরের মতো ভ্রমণ দেশে বিদেশে আর অবকাশে গান আর বইয়ের মাঝে। যদিও এটিতো কেবলি দুরাশা বা স্বপ্ন।
হোটেলের ডিলাক্স রুম-ব্যাংকক বা কলকাতার হোটেলের মতে বাথরুমে বাথটাব ছাড়া আনুষঙ্গিক সব সুবিধা আছে। যদিও কোন শহরেই বারান্দা পাইনি, যেখানে দাঁড়ালে হয়তো ভোর বা রাতের সৌন্দর্য দেখা যেতো। রিসিপশনের কর্মকর্তা সুদর্শন তরুণ-ব্যবহারে অত্যন্ত অমায়িক এবং আলাপী। বেয়ারাদের মাঝেও বিনয়। সকাল ও রাতের খাবার হোটেলের সৌজন্যে। রাতের খাবারে ছিল টমেটো স্যুপ, কাশ্মিরী কালোজিরা চাউলের ভাত,লুচি ও নান। তিন রকমের ভেজ-আইটেম কোন আমিষ নেই-ডেজাটে পেলাম স্বাদহীন ফিরণী।
রফিক আসবেন নয়টায়, সুতরাং তৈরি হয়েই ডাইনিং হলে ব্রেকফাস্ট এ। পেলাম পাউরুটি, সেদ্ধ ডিম, জেলী ও বাটার। সাথে গরম দুধ ও কর্ণফ্ল্যক্স। সাজানো ছিল চা এবং কফি দুটোই। আজকের গন্তব্য স্থল “সোনামার্গ”।
সকাল ৯টায় সোনামার্গের পথে। শ্রী-নগর-লাদাখ মহাসড়কের পাশে যার অবস্থান। প্রায় ৯০ কিলোমিটারের যাত্রা পথে চারপাশের নয়নাভিরাম প্রকৃতি। যাওয়ার পথে রাস্তার ডানপাশে আকাশে হেলান দিয়ে মেঘের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে থাকা সুউচ্চ পাহাড়ের সারি। পাহাড় থেকে আসা ঝর্ণার পানির স্রোত পাথরের লুড়ির সাথে মাখামাখিতে কোথাও হালকা কোথাও তীব্র গতিতে অনির্দিষ্ট ঠিকানায়। বাম দিকে ঘরবাড়ি-দোকানপাট- রেস্টুরেন্ট বিস্তৃত ধানক্ষেত, মনের মাঝে উঁকি দিয়ে যায়, পার্বত্য চট্টগ্রাম যাওয়ার পথের দৃশ্য।
ঘণ্টা দুই পরে খানিকক্ষণের বিরতিতে পথের ধারের একটা ধারায় অর্থাৎ রেস্টুরেন্টে। আকারে বেশ বড়ো এক পাশে কাপড়ের দোকান-অন্যদিকে খাবার তৈরির আয়োজন। সামনের খোলা প্রান্তরে বেশ কয়েকটি তাঁবুর নীচে বসার ব্যবস্থা। মালিকের উষ্ণ অভ্যর্থনা বাংলাদেশি এবং মুসলিম শুনে আরো আন্তরিক। সম্ভবত কারণটা দেশের চাইতে ধর্মই অধিক। ইংরেজি ও হিন্দী তে দক্ষ ইতোমধ্যে বেয়ারা কফি ও নানা সবজীর অর্ডার নিয়ে গেছে। কাপড়ের দোকানের মালিক বেশ কয়েকবার অনুরোধ জানালেন, অগত্যা যেতে হেলো। থরে থরে সাজানো শাল, সিল্কের শাড়ি-থ্রিপিছ সহ আরো নানা পণ্যের বাহারি প্রদর্শনী। প্রথম দিনে জিশানের কাছ থেকে ‘শালের’ ব্যাপারে কিছুটা। ধারণা পেয়েছি গুণগতমান হিসেবে ৫০০ টাকা থেকে লাখের ওপর। পাস্‌পিনা আসল কাশ্মিরী, ঠিক ঢাকাই মসলিনের মতো। হাতের মুঠোতে যত বেশি ততই উষ্ণতা এবং দামও । বিক্রেতা বাংলাদেশ শুনেই জানালেন প্রতি বছর আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় ঢাকায় তাদের দোকান থাকে। সামনে শালের স্তুপ, কিন্তু মাথায় ঘুরছে “পাসপিনা” যার নাম প্রথম শুনেছি। শেষ পর্যন্ত তাকে নিরাশ করে গাড়িতে গন্তব্য স্থানের উদ্দেশ্যে।
সোনামার্গ এলাকার কাছাকাছিতে সামনে কেবলি পাহাড় আর পাহাড়, আকাশের কোল ঘেঁষে। সোনামার্গের উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৯৩০০ ফুট মূল আকর্ষণ। থাজিওয়স হিমবাহ। এছাড়াও আছে গঙ্গাবাল, কিশান সার, নারালেক বালতাল। এখানে আসার পথে চোখে পড়েছে “জাজিলা পাসের” সাইনবোর্ড। যা কাশ্মীর আর লাদাখকে একসাথে যুক্ত করেছে। ১৫ কিলোমিটার দূরে বালতাল অমরনাথ যাত্রার বেস ক্যাম্প। ওখানে এখন যাচ্ছে লাখ লাখ দর্শনাথী। যে কারণে নিরাপত্তার মাত্রাও বাড়ানো হয়েছে। রফিক তো বেশ কয়েকবার অমরনাথের গল্প বললেন। অবশেষে ঢুকে গেলাম ‘সোনা মার্গে’। অদ্ভুত প্রকৃতির সাজত চারদিক যেন প্রকৃতির সোনালী রঙ্গ দিয়ে মোড়ানো-চারদিকে ভারী সুন্দর সব কটেজ। দারুণ নান্দনিক পাইন কাঠের বারান্দা। অনুভবে বারান্দায় দাঁড়ালেই সারাক্ষণ সঙ্গ দেবে পাহাড় আর পাহাড়। এখন মাঝখানে সমতল ভ্যালীতে আমরা-অনেকগুলো গাড়ি পার্কিং এ লোকজনের ভীড়। এরি মধ্যে প্রায় অর্ধশত ঘোড়ার অপেক্ষায়-পাশে মালিক বা চালক দরদাম হচ্ছে-কেউ কেউ উঠেও পড়েছেন যাচ্ছেন জিরো পয়েন্টে। যেখানে শুনলাম শীত গ্রীম্ম দুই ঋতুতেই ঠাণ্ডার আমেজ। কিন্তু ওখানে যেতে হলে অবশ্যই ঘোড়া! এ বয়সে ঘোড়ায়! যাওয়ার জন্য গাড়ি কি নেই। উত্তর নেই। রফিকের বরং অন্যদিকে চলে গেলেন উদাসী ভাবে। বুঝে নিলাম হয়তোবা অলিখিত সমঝোতা আছে।
অতঃপর সাহসের সাথে ঘোড়াই বাহন “রাজু ও বাদল” নামের ঘোড়া দুটোর সহিস অল্প বয়সী- ইংরেজি হিন্দীতে তুখোড়। ঘোড়া প্রতি দুই হাজার রুপি মানে মোট চারহাজার রুপি।
কাশ্মিরের বসন্তকাল এবং আপেল সময়ের কালে এখানকার অনেকজন ‘ঘোড়া’ নিয়ে ব্যবসা করেন। অমরনাথ খেলার সময় (এখন সেই সময়) সাইন বোর্ড অথরিটি সূত্রে-৪০ হাজার ঘোড়ার তালিকা আছে বললেও স্থানীয় সূত্রে জানাগেল মেলা দুই ঋতুতে প্রায় লক্ষাধিক ঘোড়া চলাচল করে। ঘোড়া প্রতি খরচ দৈনিক পাঁচশত রুপি। প্রধান খাবার ‘ছোলা’ এ ছাড়া রক্ষণাবেক্ষণের আনুসঙ্গিক খরচও আছে। ঘোড়ার মালিকই কখনো সহিসের ভূমিকায় পর্যটকদের নিয়ে যান-আবার যারা ধনী মালিক-তাঁরা সহিস রাখেন দৈনিক ভাতায়। সোনামার্গের ঘোড়ার তরুণ সহিস নিজেই মালিক-তাই তাঁর উচ্ছ্বাসও বেশি। বাংলাদেশের ক্রিকেটার সাকিব-মুশফিক এবং মাশরাফির ভক্তও সে।
বাহ! তুর্কী সিরিয়াল সুলতান কোসেমের প্রিসেস ফারিয়াকে যখন সুলতান মুরাদ ঘোড়ায় তুলে নিল, তখন ব্যাপারটা কঠিন মনে হয়েছিল। কিন্তু এখন তো বেশ লাগছে। জিরো পয়েণ্টের রাস্তা পাহাড় কেটে করা আর যেতে হবে প্রায় ৭ কিলোমিটার। আঁকাবাঁকা সর্পিল রাস্তার বাম পাশে আকাশ ছোঁয়া পাহাড়ের দেয়াল, অন্য পাশে গাড়ির খাদ বা ঘন ও গভীর অরণ্য। কখনো বা পাহাড় থেকে গড়িয়ে পড়ছে ছোট ছোট পাথর। পাঁচটি পয়েন্টের নাম ও বলছে সহিস। আবার হিন্দী কোন্‌ কোন্‌ ছায়াছবির স্যুটিং কোন্‌ পয়েন্টে। নায়ক সালমান, আমির খান সহ কে নেই? ৎঁহহরহম পড়সসবহঃধৎু আবার কখনো প্রশ্ন ‘ম্যাডাম কেমন লাগছে?’ সাথে আবার একজন ফটোগ্রাফারও সুদর্শন তরুণ। অনেকটা জোর করে এক হাজার রুপিতে একশত ছবিতে চুক্তি। কিছুক্ষণ পর পর সাটারের শব্দ। তবে ভর দুপুরের কড়া সূর্যের আলোতে পুরো অবয়ব ঢেকেই নিতে হচ্ছে- চোখে সানগ্লাস আছেই। ঘোড়ায় চলার টেকনিকও আছে। কখনো রশিতে হালকা টান, একবার বামে একবার ডানে। শরীরও কখনো সামনে কখনো পেছনে। আবার পায়ে চাপ দিতে হয় নরম বা কঠিন ভাবে। চলছি তো চলছি, অবশেষে জিরো পয়েন্ট। পর্যটকদের ভীড় আশে পাশে, চারদিকে অসংখ্য ধাবা-বাতাসে খাবারের সুবাস এবং গরম কফির ধোঁয়া। তবে অনেকের হাতে গরম নুডুলস। কাছে দূরে শাল, শাড়ি, কামিজ নিয়ে অনেক কাশ্মিরী বিক্রেতার আকুতি-মিনতি। সামনের সুউচ্চ পাহাড় থেকে নামছে বরফের হিমস্রোত। কিন্তু ওখানে যেতে হলে হেঁটে পার হতে হবে। ঝিরঝিরে পানির বয়ে যাওয়া স্রোত, এর পরে উঠতে হবে বরফ মাখানো চূড়োয়। বাহ! সেই দুঃসাহস আর হলোনা। ফটোগ্রাফার এবারে বরফের চূড়োকে পেছনে রেখে-বুড়ো বুড়ি দুজনকে নিয়ে স্যুাটিং পর্বের মতো বেশ কয়েকটা ছবি, এবারে সে বিদায় নেবে। ছবি লোড করে দিয়েছে মোবাইলে। নীচে গিয়ে বাজারের নির্দিষ্ট ঠিকানায় গেলেই প্রিন্টেড একশো ছবি আসবে হাতে। যাওয়ার সময তেমন কষ্ট বা ভয় না লাগলেও, ফেরার পথ বেশ দুর্গম। বুঝলাম শর্টকাটে অন্য পথে ফিরছে সহিস।
বেলা প্রায় দুপুর তিনটা। খেতে তো হবে! রফিকই ভরসা। প্রথমেই নির্দিষ্ট দোকানে গিয়ে একশ ছবি নিলাম এবং পথের সাথে লাগোয়া ওয়াশরুমে। বেশ পরিস্কার পরিচ্ছন্ন- তবে পানি একেবারে বরফ শীতল। সোনামার্গের কাছাকাছি একটা হোটেলে! নাকি রেস্টুরেন্ট বোঝা গেলনা। কালিক মধ্য বয়সের, ডাক্তার সাহেব, এ ‘ভেজ’ খেয়ে একেবারে বিরক্ত। সুতরাং মালিককে গোশ্‌তের আইটেমের আবেদন। দু’ প্লেট কাশ্মিরী চাউলের পোলাও, সাথে দেশি ছাগলের রেজালা। হায়! খাসির গোশত! কাঁটা চামচ বাদ দিয়ে হাতে ও দাঁতের বেজায় কসরতে সদ্‌গতি করতে হলো। স্বাদে একেবারে বাজে-তবু ক্ষিধের রাজ্যে গলধকরণ্‌-আর দাম দিতে গিয়ে চক্ষু চড়কগাছ! এখানে চাউল মানে কাশ্মিরী ভাত-তথা “ভেতো”র দাম অতি চড়া।

x