সেনসাস রিহার্সেল ইভেন্ট ব্রিটেন ২০১৯

নুজহাত নূর সাদিয়া

শনিবার , ২৩ নভেম্বর, ২০১৯ at ৪:০৩ পূর্বাহ্ণ
8

বইন, ইতা কিতা আমরারে হাম দিবো নি? ইলেকশন তো দরজাত গোড়ার হড়া নাড়ের-খোদ সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায় জিজ্ঞাসু দৃষ্টিটির সামনে কিছুটা হলে ও হকচকিয়ে গেলাম-প্রশ্নকারি মাঝবয়সি ব্রিটিশ বাঙালি মহিলা। পোড় খাওয়া চেহারার চোখ দুটিতে একি সাথে কাজ করার আগ্রহ আর অন্য দিকে ব্রিটিশ সরকার হতে তাঁর প্রাপ্ত বেনিফিট বন্ধ হওয়ার আশংকায় আনন্দ আর শংকার এক যুগল অনুভূতি খেলা করছে।
থমকে দাঁড়ালাম, বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রাম হতে বিলেতে চলে আসা এ অনাবাসিদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ইংরেজিতে কাঁচা। ব্রিটেনের চলমান রাজনীতির অনিশ্চয়তাময় পরিস্থিতি তাদেরকেও স্পর্শ করেছে।
ব্রেক্সিট অমীমাংসিত এ ইস্যুটির একটি পরিপূর্ণ সমাধান ও আগামী ১২ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিতব্য সাধারণ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনীতি সচেতন বোদ্ধা হতে ব্রিটেনবাসি আম জনতা সকলের মনে এখন একটিই প্রশ্ন- কি হতে যাচ্ছে চলতি ২০১৯ সালের সাধারণ নির্বাচনে? কি হবে ব্রিটেনের ভবিষ্যত!
নিজের পরিচয় দিলাম-দেখুন আমি নুজহাত, সরকারি অফিসার। জাতীয় পরিসংখ্যান অফিস ইউকে হতে এসেছি জরিপের কাজে। এটি বর্তমান কনজারভেটিভ সরকার পরিচালিত সেনসাস রিহার্সেল ইভেন্ট আসন্ন ২০২১ সালের মার্চ মাসে অনুষ্ঠিতব্য মূল প্রকল্পটিকে সফল করতে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আশা রাখছি।
ও বইন, বুজলাম আদমশুমারি নি? জি সরকার, আপনাদের এলাকা তথা গোটা ইংল্যান্ডে আপনাদের প্রয়োজনেই আর ও স্কুল, সার্জারি,লাইব্রেরি ও আবাসন প্রকল্প করতে চায়। আর ঠিক সে কারণেই পর্যাপ্ত ও সঠিক তথ্য দরকার।
এখন আসা যাক মূল বিষয়ে- সেনসাস ; বর্তমান টোরি সরকারের একটি অভিনব উদ্যোগ। অভিনব এই কারণে, এ প্রথমবারের মত সরকার একগাদা নতুন অ্যাপস সংযুক্ত করেছে এ প্রকল্পটি সফলভাবে পরিচালনার জন্য।
প্রতি ১০ বছর পরপর পরিচালিত এ প্রকল্পটির সাথে বিগত ২০১১ সালে সৌভাগ্যক্রমে যুক্ত হয়েছিলাম। পর পর ৩ টি লিখিত পরীক্ষা আর একটি মৌখিক সাক্ষাৎকারের সফল বৈতরণী পার হওয়া এ আমি সে সময় ডাটা কো-অর্ডিনেটর (তথ্য সমন্বয়কারি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলাম। প্রসঙ্গক্রমে বলছি-সেসময় আমি ও আমার সহকর্মী মার্ক দু’জন মিলে প্রকল্পের শতকরা ৯০ ভাগ কাজ শেষ করতে সমর্থ হয়েছিলাম বাঙালি অধ্যুষিত বেথনাল গ্রীন এলাকায়।
চলতি বছরে পরিসংখ্যান অফিস হতে পাওয়া একটি চমৎকার ই-মেইল আবার আমাকে এ জনসংযোগের কাজে উদ্বুদ্ধ করল। চিঠিতে লেখা ছিল-তোমার গতবারের দারুণ পারফর্মেন্সে আমরা যথেষ্ট উপকৃত হয়েছি। ইচ্ছে করলে তুমি আবার আবেদন করতে পার এ চলমান প্রকল্পে। সে পুরনো পরীক্ষাগুলো আবার নতুন করে নতুন আঙ্গিকে দেওয়া। আমাকে কাজের এলাকা বাছাইয়ের ক্ষেত্রে কিছু সুবিধা দেওয়া হল- ইংরেজ অধ্যুষিত অভিজাত এলাকা ক্যানারি ওর্য়াফ বাদ দিয়ে বাঙালি অধ্যুষিত বো এলাকাটিকে বেছে নিলাম। আরেকটু সংক্ষেপে বললে প্রথম ব্রিটিশ বাংলাদেশি এমপি রুশনারা আলীর এলাকা।
টাওয়ার হ্যামলেটস, হ্যাকনি, কারলিসলি, ক্যানারি ওর্য়াফ চলতি ২০১৯ সালের এপ্রিলের শেষ নাগাদ এ এলাকাগুলো জুড়ে প্রকল্পটির কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
ফিরে আসছি ব্রিকলেনস্থ ‘কবি নজরুল সেন্টারে’ কাজ শুরুর প্রথম দিনের তিন ঘণ্টাব্যাপী ইনডাকশন পিরিয়ডে। কাজে সংযুক্ত সকলকে একটি করে স্যামসাং (১০) ডিভাইস সেট দেওয়া হলো, স্ক্রিনে সেনসাস ২০২১ শোভা পাচ্ছে। ও বলতে ভুলে গেছি-এ প্রকল্পটির রিক্রুটিং এজেন্সি হিসেবে আন্তর্জাতিক এজেন্সি ‘এডেকো’ কাজ করছে।
প্রথম দু’দিনের আপ্রাণ চেষ্টা, রাগে দু:খে চোখে পানি আসার জোগাড়। মাথায় পুরোপুরি জট লেগে গেছে, কিছুতেই সে জট ছাঁড়াতে পারছি না। তবে, অন্যতম বাঙালি অফিসার হিসেবে সহজে হার মানি কি করে! ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আর অন্য সহকর্মীদের সহায়তায় এক সময় আবিষ্কার করলাম অ্যাপসগুলো ধীরে ধীরে বুঝতে পারছি। গুগল ম্যাপস- একদিন আগেই সারাদিনের কাজগুলো আপলোড করা হয়। নানা ডিজাইনের হরেক কাজের অ্যাপস সংগত কারণেই নামগুলো প্রকাশ করা সম্ভব নয়। তবে, একজন নারী হিসেবে যে অ্যাপসটি আমাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছে-তা হল সিকিউরিটি হাব( প্রতি ১ ঘন্টা পর পর সিকিউরিটি চেক ) বাড়িতে না পৌঁছা পর্যন্ত ট্র্যাক করা। মাত্র ৩টি মিনিটের বিরতি- ৪টি ফোন, ৩টি মেসেজ আর ৩টি ই-মেইল অবিশ্বাস্য সচেতনতা!
প্রায় ১৭৫০০ কর্মী আর ২০টি ভাষায় পরিচালিত এ অপারেশনটিতে আমরা সহকর্মীরা প্রতিনিয়ত বিচিত্র অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হচ্ছি- ইতালি হতে আসা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলাদেশিদের আক্ষেপ ভরা উক্তি-আপা আমরা তো রেজিস্টার্‌ড না, আমরা কি ভোট দিতে পারব?পূর্ব লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটস এলাকা, নানা দেশের নানা বর্ণের নানা চরিত্রের মানুষের মিলনস্থল এ এলাকাটি নানা নেতিবাচক ঘটনায় ভরপুর। অনেকে সন্দেহ ভরা দৃষ্টি নিয়ে কখনো আমাদের নানা প্রশ্নবাণে কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছেন, কখনো বা দরজা খুলতে নিতান্তই অপারগতা প্রকাশ করছেন। সেই আঠারশ শতক হতে নানা পরিবর্তনের মুখোমুখি বো এলাকাটিতে বয়স্কদের স্বাভাবিকভাবেই কম্পিউটারের প্রতি প্রবল বিরাগ, তাদের ভাষায়-চুলোয় যাক অনলাইন সার্ভে। আর একদল অবুঝদারের অসময়োচিত উক্তি; কি হবে এসব করে! এসব কিছু পেছনে ফেলে কাজ এগিয়ে নিতে উদ্যমী আমি বাঙালিদের মুখে কিছু নাম বেশ জোরে-সোরে শুনতে পাচ্ছিলাম।
কার্ডিফ এলাকার এমপি পদপ্রার্থী ড. বাবলিন মল্লিক, কেনজিংটন ও চেলসি আসন হতে মনোনয়ন পাওয়া শ্যাডওয়েল ওয়ার্ডের কাউন্সিলার রাবিনা খান, টাওয়ার হ্যামলেটস ওয়ার্ডের ডেপুটি মেয়র ও বো ওর্য়াডের কাউন্সিলার রহিমা বেগম, টাওয়ার হ্যামলেটস কলেজের গভর্নর বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত রহিমা বেগম,যুক্তরাজ্য বিএনপির সভাপতি মরহুম কমর উদ্দিনের মেয়ে সাবিনা খান এবং নিউহ্যাম এলাকার কাউন্সিলার মমতাজ খান।
রুশনারা আলী, টিউলিপ সিদ্দিকি ও রুপা হক এ ত্রিরত্নদ্বয়ের পর ব্রিটিশ বাঙালিরা অধীর অপেক্ষায় ব্রিটিশ পার্লামেন্টে আর ও কিছু উজ্জ্বল মুখের পদচারণায়। আমাদের সে আন্তরিক ইচ্ছে কি পূরণ হবে?
প্রযুক্তি নির্ভর এ গতিময় বিশ্বে ব্রিটেন সরকারের এ নব উদ্যোগ নি:সন্দেহে প্রশংসনীয়। দুর্নীতি প্রতিরোধ, সঠিক তথ্যের পূর্ণাঙ্গ উপস্থাপন আর সময়ের উপযুক্ত ব্যবহার পশ্চিমা বিশ্বের এ কার্যকরী মডেলটি কি বাংলাদেশে ও ভবিষ্যতে অনুকরণীয় হতে পারে না।
লেখক : প্রাবন্ধিক

x