সেই মেয়েটি

রুনা তাসমিনা

রবিবার , ১১ আগস্ট, ২০১৯ at ৯:২৬ পূর্বাহ্ণ
51

এই নিয়ে তিনবার যেন তিনি শুনতে পেলেন,
মেয়েটাকে একলা ফেলেই চলে যাচ্ছিস! তোর মনে কী দয়ামায়া বলতে কিচ্ছু নেই?
প্রতিবারই চমকে পেছনে ফিরে তাকিয়েছেন ফরিদ সাহেব। কিন্তু কাউকে দেখতে পাননি। ভুতপ্রেতে জীবনেও বিশ্বাস করেন না তিনি। তাহলে কোত্থেকে আসছে এই কথাগুলো! অবচেতন মনের কথা এত জোরে শোনা যায়! তিনি দাঁড়িয়ে পড়লেন এবার। ট্রেন থেকে নেমে স্টেশন রোডের রাস্তা ধরে হাঁটছেন তিনি। ছড়িয়ে ছিটিয়ে জ্বলছে লাইট পোস্টের বাতি। প্রথমদিকে লাইটগুলো যখন লাগানো হয়েছিল দিনের আলোর মতো উজ্জ্বল হয়ে থাকতো এখানটায়।একটি দুটি করে ভাঙতে ভাঙতে এখন মাত্র কয়েকটি লাইট জেগে আছে। শুনেছেন দুর্বৃত্তের কাজ। কিন্তু লাইটগুলো ঠিক করার গরজও কেউ মনে করে নি তাই ছায়ান্ধকারে ঢেকে থাকে রাস্তাটি। কোন দুষ্ট ছেলেপেলে পিছু নিয়েছে কিনা পেছনে কিছুদূর হেঁটে গিয়ে দেখে আসলেন। নাহ্‌। কোথাও কোন মানুষের দেখা নেই। অন্ধকার দলা পাকিয়ে আছে বিল্ডংয়ের কোণায়,গাছের মাথায়। চিন্তা করতে লাগলেন তিনি আগাগোড়া বিষয়টি।
অফিসের কাজে প্রায়শই ঢাকা যেতে হয় ফরিদ সাহেবকে। রাতের ট্রেনেই আবার ফিরে আসেন। এবার রাতের ট্রেন ধরতে পারলেন না। তীব্র গরমের পর বিকেলের দিকে আকাশ যেনো কালো মোষে ছেয়ে গেলো। সন্ধ্যার সঙ্গে সঙ্গেই ঝমঝম করে নামলো বৃষ্টি। বিজলি চমকের সঙ্গে বিকট হুংকার! বৃষ্টি থামার অপেক্ষা করতে করতে ঘড়ির কাঁটা কখন আটটা তিরিশের ঘর পেরিয়ে গেছে খেয়ালই করেন নি। ট্রেন নয়টায়। বৃষ্টির মধ্যেই বেরিয়ে পড়লেন ট্রেন ধরার জন্যে। মতিঝিল থেকে কমলাপুর রেলস্টেশনের দূরত্ব বেশি না। সময় বাঁচানোর জন্য সিএনজি নিতে চাইলেন। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও কোনো সিএনজি ড্রাইভারকে রাজি করাতে পারলেন না রেলস্টেশন যেতে। সবার এক কথা।
স্যার, রিকশায় চইলা যান। রাস্তায় পানি জইম্যা গ্যাছে। গাড়ি চালান যাইবো না।
এমনিতেই ঢাকা শহরে ট্রাফিক জ্যাম লেগেই থাকে। এখন বৃষ্টির পানি জমে যাওয়ায় কি অবস্থা কে জানে! অগত্যা রিকশাই ভরসা। ঘণ্টা দেড়েকের বৃষ্টিতে নদীতে পরিণত হয়েছে ঢাকার রাজপথ। রিকশাওয়ালার মেজাজ সপ্তম চড়ে আছে। আবার এই পানি তাদের জন্য আশীর্বাদও। ইচ্ছেমতো ভাড়া চাওয়া যায় যাত্রীদের কাছে। স্টেশন যাওয়ার জন্য তিরিশ, চল্লিশ টাকার সঙ্গে একশো টাকা বাড়তি যোগ করে দিয়েছে সবাই। কিন্তু এখন ভাড়া নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় নেই। উঠে পড়লেন একটি রিকশায়। রিকশাওয়ালা সিটি কর্পোরেশনকে গালিগালাজ করে, ফরিদ সাহেবের কান ঝালাপালা করে কখনো হাঁটু সমান, কখনো কোমর সমান পানি ভেঙে রিকশা নিয়ে যখন স্টেশনে পৌঁছালো-ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে তার আরো কুড়ি পঁচিশ মিনিট আগে। এই পানির মধ্যে আবার বাস স্টেশন যাবেন সে সাহস করতে পারলেন না। সাড়ে এগারোটায় তূর্ণা নিশীতা গটগট করে বেরিয়ে গেলো স্টেশন ছেড়ে। মহানগর প্রভাতীর টিকিটও পাওয়া গেলো না। অনেক ছুটোছুটির পর অবশেষে সুবর্ণের এই টিকিটটি যোগার করলেন। শোভন চেয়ার, ঠ বগি। সিটে বসে হাঁফ ছাড়লেন, যখন দেখলেন অনেকেই সিট না পেয়ে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। বৃষ্টি গরমটাকে যেন উস্কে দিলো আরো। অনেকেই দাঁড়িয়ে আছে। কেউ ভেজা গায়ে, কেউ কাক ভেজা। স্যাঁতসেঁতে বাতাসের সঙ্গে মিশেছে ঘামের বিশ্রী কটকটে গন্ধ। দম বন্ধ করা পরিবেশ ছেয়ে আছে কম্পার্টমেন্টে। পত্রিকা খুলে আজকের খবরগুলো পড়ার দিকে মন দিলেন। অন্য খবরের পাশাপাশি প্রতিদিনকার মতো খুন, ধর্ষণ, আত্মহত্যার খবর। এসবের প্রতিবাদে এতোক্ষণে ফেসবুক নিশ্চয় ভরে উঠেছে। মনে মনে হাসলেন তিনি। যে যার মতো করে ঘটনার বিবরণে ভরে তুলেছে ফেসবুক নামের পত্রিকার পাতা। কাল যদি আরেকটি ঘটনা ঘটে,এগুলো ভুলে গিয়ে ওটা নিয়েই মাতামাতি হবে। পাতাটা বাদ দিয়ে ভেতরের পাতাগুলো উল্টাতে লাগলেন। খেলাধূলার খবরগুলোয় একটু নজর বুলিয়ে রেখে দিলেন পত্রিকাটি। অফিসের কাজে আটকা পড়া তবুও কেন যেন নিজের ওপর বিরক্ত হয়ে উঠলো মনটা। টঙ্গিতে বেশকিছু যাত্রী নেমে যাওয়ায় বগি অনেকটা ফাঁকা এখন। ভ্যাপসা, দুর্গন্ধময় ভাবটাও নেই আর। ট্রেন আবার চলতে শুরু করতেই গাটা এলিয়ে দিলেন সিটে। সারাদিনের ছুটোছুটি, ধকলের পর শরীর একটু আরাম পেতেই চোখের পাতা লেগে গেলো আপনা আপনিই।
আটপৌঢ়ে ঘুম। কোন স্টেশনে থামলেই ছুটে যাচ্ছে। এই ঘুম পুরোপুরি ভাঙলো শোরগোল শুনে। লাকসাম স্টেশন থেকে কয়েকজন উঠেছে। এরাই নিজেদের মধ্যে হৈ চৈ করে কথা বলছে।
রহিম মিয়ার আইজ খুশির দিন। এক্কেরে হাত খালি কইরা যাইতাছে।
কোঁচড় তো ভইরা গ্যাছে। মুহের হাসি কেমুন দ্যাখছ না! আরেকজন বললো।
হাসি হাসি মুখ করা একজনকে উদ্দেশ্য করে বলা। যাকে নিয়ে বলা হচ্ছে বোঝাই যাচ্ছে কথাগুলো সে খুব উপভোগ করছে।
বহুতদিন পর ভাগ্য মুখ তুইল্যা চাইছে। খুশি তো লাগবোই। ঠোঁটে হাসি ঝুলিয়ে রেখেই বললো রহিম মিয়া নামের লোকটি।
হাটুরে হবে। এরপর শুরু হলো নিজেদের মধ্যে হিসাব নিকাশ। কে কত বিক্রি করলো, ক্রেতা দাম কম বলায় কে ঘরে পালা দেশি মোরগটি দেয়নি। ক্রেতাদের সঙ্গে স্বর উঁচু করে কথা বলতে বলতে ওদের হয়তো এভাবেই কথা বলায় অভ্যাস হয়ে গেছে। ট্রেন গতি নিয়ে চলতে শুরু করেছে আবার। বন্ধ জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখলেন রাতের নিকশ কালো অন্ধকার ছাড়া কিছুই দেখা যাচ্ছেনা। এখানেও বৃষ্টি হচ্ছে। রুপোর সুতোর মতো পানির ধারা এঁকেবেঁকে জানালার কাঁচ বেয়ে নেমে যাচ্ছে মাটিতে।
চায়ের হাঁক শুনে এককাপ চা দিতে বললেন। সেই লোকগুলোও নিলো। রহিম মিয়া নামের লোকটি আরো কিছুটা উঁচু স্বরে বললো,
এইদিকে চাইড্ডা চা দেন। বিস্কুট আছে ভাই? থাইকলে দুইডা কইরা বিস্কুটও দিয়েন।
যেন কম্পার্টমেন্টের সবাইকে জানাতে চায়,সে-ই তার সঙ্গীদের চা খাওয়াচ্ছে। প্রকাশিত খুশি। এদের সমাজে এসব নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না। এদের ভালোবাসা যেমন প্রকাশ্য,ঘৃণাটাও তেমন। গলার স্বরের মতোই উচ্চকিত এদের জীবন। চাইনিজ রেস্টুরেন্টের মতো আলো আঁধারির খেলা চলেনা এখানে। ফরিদ সাহেব মনে মনে ভাবেন,বেশ ভালোই আছে রহিম মিয়ারা। বৃষ্টির মতো ঝরঝরে জীবন এদের।
লাকসাম থেকে চট্টগ্রামের দূরত্ব কম নয়। তবুও প্রতিবার এই স্টেশনে আসলেই ফরিদ সাহেবের মন কেমন যেন উৎফুল্ল হয়ে ওঠে। নাড়ির টান একেই বলে মনে হয়। লাকসাম পেরুলেই ফেনী! আহ! একেবারে নিজের শহরের সঙ্গে! রাত এগারোটার দিকে ট্রেন থামলো বটতলী স্টেশনে। এক্সিট গেটের পাশে এক মহিলাকে জেরা করছে পুলিশ। মহিলার টিকিট নেই। ছয় সাত বছরের মেয়েটি মায়ের আঁচল ধরে সেঁটে আছে গায়ের সঙ্গে। ছেলেটি কোলে। মহিলা কিছু বোঝানোর চেষ্টা করছে পুলিশ দু’জনকে। ফরিদ সাহেব কি মনে করে এগিয়ে গিয়ে জানতে চাইলেন কী ঘটনা?
আর কী! টিকিট না নিয়ে ট্রেনে উঠে এখন নাকি কান্না। মনে করছে চালাকি করে পার পেয়ে যাবে।
কথার মাঝখানে মৃদুস্বরে প্রতিবাদ করে উঠলো মেয়েটি।
সা’ব! বিশ্বাস করেন! আমি চালাকি করতাছি না। বিপদে পইড়া টেরেনে উইট্টা পড়ছি। এই পত্তম টেরেনে উটছি। টিকেট কীভাবে লইতে হয়,এইডাও জানি না। সা’ব! হেদের একটু বুঝাইয়া কন না! ফরিদ সাহেবকে পেয়ে যেন সে সম্বল খুঁজে পেলো। দূর থেকে যাকে মহিলা মনে হয়েছিল, কাছে এসে দেখলেন তেইশ চব্বিশ বছর বয়স হবে তার। চুল থেকে পা পর্যন্ত ঢেকে আছে অভাব। মায়ের কান্না দেখে ভয়ার্ত চোখে তাকিয়ে থাকা মেয়েটির চোখও টলমল করছে পানিতে। ছেলেটা ঘুমিয়ে আছে মায়ের ঘাড়ে মাথা রেখে। রাত অনেক। এভাবে এখানে ওদের ফেলে যেতে বিবেক বাঁধা দিলো। ওদের ভাড়াটা তিনিই দিয়ে দিলেন। ঝামেলাটা মিটিয়ে তিনি বেরিয়ে এসে বাসার পথ ধরেছেন। আসার পথেই কথাগুলো শুনতে পেলেন। পরপর তিনবার! বুঝতে পারছেন না কী করবেন! কি ভেবে আবার ফিরে গেলেন টিকেট কাউন্টারের সামনে। দেখলেন সারি সারি চেয়ার থাকা সত্বেও মেয়েটি ফ্লোরে বসে আছে। ঠাণ্ডায় কুঁকড়ে মেয়েটি ঘুমিয়ে পড়েছে মায়ের পাশ ঘেঁষে। ছেলেটি কোলে।
এভাবে বসে আছ কেন! কোথায় যাবে, চলে যাও! কেউ নিতে আসবে?
মেয়েটি চুপ করে আছে।
আরে বাবা কথা না বললে কী করে বুঝবো কী সমস্যা! বেশ বিরক্তি নিয়েই বললেন তিনি।
সা’ব….
কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেলো মেয়েটি। নিজের মনকে শান্ত করে এবার কিছুটা নরম গলায় বললেন,
দেখো,স্টেশন ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। এভাবে বসে না থেকে কোথায় যাবে চলে যাও।
কোথায় যামু? এই শহরের কিছুই আমি চিনিনা।
অচেনা জায়গায় দুটো বাচ্চা নিয়ে চলে এলে! মেয়েটির সাহস দেখে আশ্চর্য ফরিদ সাহেব।
এক কুটুম আছে,তার ঠিকানা লইয়া আইছি।
কুটুমের ঠিকানা হাতে নিয়েই চলে এসেছে। অচেনা জায়গায়। খালি হাতে।ব্যাপারটা কেমন গোলমেলে লাগছে ফরিদ সাহেবের কাছে। বাড়ছে কৌতুহলও। এদিকে বাসা থেকে ফোন আসছে বার বার।
তোমার কুটুম কি জানে তুমি আসবে?
না। ঠিকানা লইয়া আইছি। ভেতরের কান্নাটা মুখে স্পষ্ট।
বোকা মেয়ে। এইরাতে এত বড় শহরে কোথায় খুঁজবে তোমার কুটুমকে?
পকেট থেকে বের করে দুটো একশ টাকার নোট মেয়েটির হাতে দিয়ে বললেন,
বাচ্চা দুটোকে কিছু কিনে দিও। বাসে করে যেও যেখানে যাবে।
কি মনে করে পকেট থেকে নিজের একটি কার্ড দিয়ে বললেন,
এখানে আমার ফোন নম্বর আছে। দরকার হলে ফোন দিও। আবারও ফোনে রিং হচ্ছে। তিনি বেরিয়ে এলেন স্টেশন থেকে। ভেজা রাস্তা দেখে বুঝতে পারলেন বৃষ্টি এখানেও হয়েছে। সঙ্গে ছাতা নেই। তাড়াতাড়ি পা চালালেন বাসার দিকে। সময় অনুমান করলেন বারোটা তো হবেই। মনে দ্বিধা নিয়েই বাসায় পৌঁছে গেলেন মিনিট কুড়ির মধ্যে।
কাপড় চোপড় ছেড়ে, ফ্রেস হয়ে পাশে রুমে গেলেন। গভীর ঘুম আরিবা,আদিবা। ফরিদ সাহেবের দুই মেয়ে। চোখেমুখে নেই কোন ভয়ার্ত ভাব। নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে দু’জন। মনে পড়ে গেলো বাসা থেকে কুড়ি,পঁচিশ মিনিটের দূরত্বে একই বয়সি আর দুটো বাচ্চা উপোস ঘুমিয়ে আছে। ঠাণ্ডায় কুঁকড়ে থাকা শরীরে মায়ের আঁচল ছাড়া আর কিছু নেই। তার দিয়ে আসা টাকায় ওদের মা খাবার কিনতে পেরেছে কীনা কে জানে! কিছু খাবার তো আমি নিজেই কিনে দিয়ে আসতে পারতাম! হঠাৎ এই করে কথাটি মনে এসে ভীষণ অস্বস্তি লাগছে। মেয়ে দুটোকে আদর করে রুম থেকে বেরিয়ে এলেন। স্ত্রী টেবিলে খাবার নিয়ে অপেক্ষা করছে। খেতে বসে বার বার মনে পড়ছে মেয়েটির কথা, বাচ্চা দুটোর কথা। কানে অনবরত বেজে চলেছে সেই আওয়াজ- মেয়েটিকে একলা ফেলেই চলে যাচ্ছিস? ঘুমোতে গিয়ে বিছানায় এপাশ ওপাশ করছেন।
কি ব্যাপার? কি হয়েছে তোমার? এসেছ পর্যন্ত কেমন গম্ভীর হয়ে আছ? কিছু খেলেও না। স্ত্রীর প্রশ্ন এড়িয়ে গিয়ে বললেন, বৃষ্টিতে ভিজে শরীর ম্যাজম্যাজ করছে। তাই ঘুম আসছে না।
ইচ্ছে করেই মিথ্যেটা বললেন। দেখা আর অদেখাতে অনেক পার্থক্য। খামাকা বাইরের কথা ঘরে এনে অশান্তি হবে। পুরুষ হলে হয়তো কিছুক্ষণ তাকে নানা বিশেষণ দিয়ে চুপ হয়ে যেতো। কিন্তু মেয়ের বেলায় হাজার প্রশ্ন করবে। ফরিদ সাহেব ছোটকাল থেকেই দেখে বড় হয়েছেন, তার বাবাকে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে। বাবার সূত্রে এই অভ্যাস তারও। কিন্তু তার স্ত্রীর কথা হলো এখন বাবার আমল নেই। চড়া দামের বাজারে নিজেদেরই চলতে হয় হাজার হিসেব নিকেশ করে। ফরিদ সাহেব প্রথমদিকে বউকে বোঝানোর চেষ্টা করতেন। এখন আর করেন না। তার কথায়ও যুক্তি আছে। ব্যাংকের একজন অফিসারের যে বেতন, তাতে আসলেই হিমসিম খেতে হয় সবদিক সামলে চলতে। আবার নিজেকেও পারেন না দমিয়ে রাখতে। তাই বাইরের কথা বাইরেই রেখে দেন।
তোমার কী হয়েছে ঠিক করে বলতো? অফিসের কাজে ঢাকা গিয়েছিলে? কোনো ঝামেলা হয়েছে?
না না। কোনো ঝামেলা হয়নি। ট্রেনে খানিকটা ঘুমিয়ে পড়েছিলাম সে জন্যে হয়তো ঘুম আসছে না। বুঝতে পারছেন বউ ঠিকই তার অস্তিরতা আঁচ করতে পারছে। প্রসঙ্গটা এড়িয়ে যাওয়ার বউকে ঘুমোতে বলে নিজেও পাশ ফিরে শুয়ে চোখ বন্ধ করলেন।
অফিসে যাওয়ার পথে কৌতূহল সামলাতে পারলেন না। রিকশা ঘুরিয়ে নিলেন স্টেশনে। নেই! এদিক সেদিক খোঁজ করলেন, কয়েকজন সুইপারকে জিগ্যেসও করলেন। কেউ কিছু বলতে পারেনি। ব্যস্ত স্টেশনে প্রতিদিন হাজার মানুষ আসা-যাওয়া করে। একজন মা তার বাচ্চা দুটো নিয়ে কুটুমের বাড়িতে পৌঁছাতে পারল কি-না কে রাখে সে খবর! পস্তাচ্ছেন ঠিকানাটি কেন দেখেন নি। স্টেশন থেকে বের হয়ে আসার পথে আবার যেন শুনতে পেলেন-মেয়েটিকে তুই একলা ফেলে রেখে চলে যাচ্ছিস? চমকে পেছন ফিরে তাকান। সবাই যার যার কাজে ব্যস্ত। কে করছে এই প্রশ্ন! তিনি যখন নিজের কার্ড দিয়ে বের হয়ে আসছিলেন, মেয়েটির চোখে করুণ এক আকুতি ছিল। সে কী বলতে চেয়েছিল
সা’ব! আমগোরে সঙ্গে লইয়া যান! একটু আশ্রয় কুনোহানে জুটাইয়া দ্যান!
ফরিদ সাহেবের চোখ খুঁজে বেড়ায় তেইশ চব্বিশ বছরের এক মেয়ে আর তার দুটো বাচ্চাকে। যাদের বয়স আরিবা আদিবার মতো…

x