সৃজন-স্বরূপ পথ চলা

বিপ্লব কুমার শীল

মঙ্গলবার , ২৯ অক্টোবর, ২০১৯ at ১০:০৯ পূর্বাহ্ণ
24

সংস্কৃতির সাম্যের শোভাযাত্রায় আলোর মশাল হাতে সামনে এগিয়ে থাকার মানুষটির নাম শ্রী রণজিৎ রক্ষিত। যার নামের আগে ‘শ্রী’ শব্দটি লিখতে তাঁর গাঢ় অনুভূতি আছে। তাঁর ভাবনা জুড়ে শুধু ‘শ্রী’ সমৃদ্ধ সংস্কৃতি জগতে ছুটে চলা। জীবনের বিভিন্ন পর্বে কখনো তিনি শিক্ষাবিদ, কখনো বরেণ্য খ্যাতিমান আবৃত্তিশিল্পী,অভিনেতা ও সৃজন সংগঠক হিশেবে দেশজুড়ে বেশ সমাদৃত। সুধীজন পরিমন্ডলেও তিনি আমাদের সবারই প্রিয় ব্যক্তিত্ব। সংস্কৃতির জনপদে তিনি ছিলেন সংস্কৃতির বাতিঘর। সংস্কৃতিচর্চায় নেই কোনো তাঁর অহমিকা, নেই কোনো বিলাসিতা। আছে শুধু সারল্যময় মুখের ভাষা, আছে বটবৃক্ষের মতো প্রশান্তির ছোঁয়া ভালোবাসা। তাঁর অদম্য গতিতে মুগ্ধতা ছিলো প্রাণ জাগিয়ে তোলার বার্তা। তিনি চিন্ত ও মননে মানুষকে ভালোবাসাই দিয়ে যেতেন। বিনয় শেখাতেন। সেই ধারাবাহিকতায় তিনি আগলে রেখেছেন দেশে- বিদেশে সমাদৃত সংগঠন বোধন আবৃত্তি পরিষদ চট্টগ্রাম ও বোধন আবৃত্তি স্কুল চট্টগ্রাম। তিনি কখনো ছিলেন সংগঠনটির সভাপতি কখনো অধিষ্ঠিত হয়েছেন স্কুলের অধ্যক্ষ পদে। তিনি ‘বোধন’ শব্দটিকে ধারণ করে সরব হতে খুব গর্ব অনুভব করতেন। পরিবারের পর ‘বোধন’ পরিবারকে তিনি অনন্য স্থানে রেখেছিলেন। বাংলাদেশ আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদের সভাপতিমন্ডলীর অন্যতম জ্যেষ্ঠ এ সদস্য তাঁর সৃজন শ্রীরূপ পথচলায় গতবছরে জেলা শিল্পকলা একাডেমি, চট্টগ্রাম’ র কার্যনির্বাহী পরিষদের সহ-সভাপতি পদ সংস্কৃতিকর্মীদের বর্ণাঢ্য ভালোবাসায় অলংকৃত করেছিলেন। এছাড়া শ্রদ্ধায় বিভিন্ন পরিসরে তিনি একাধিক পদে সম্মানিত হয়েছেন। তিনি তাঁর অগ্রজ ও অনুজদের সাথে প্রাণজুড়ে মিশতেন। মনখোলা পরিবেশে তাঁর সারল্যতায় ভাব বিনিময় ছিল প্রাণময়। কর্মময় জীবনে ও সৃজন শিল্পের মননে তাঁর মেধা আমাদের বোধ জাগানোয় ছিলো এক অনন্য সম্পদ। ছিল না তেমন রাখঢাক, থাকতো শুধু চেতনাময় ও ভাবগাম্ভীর্যময় সরল কথার শুদ্ধ অনুভূতি। আমরা তাঁর একটু পরিশীলিত সান্নিধ্য পেতে কখনো দলবেঁধে ছুটে গিয়েছি ১৫০ সদরঘাটের বাসায়, কখনো কোনো সৃজন পরিসরের আলোচনায়। গতবছরের ২৩ অক্টোবর থেকে আকস্মিক ভাবে গুরুতর অসুস্থতায় নগরীর বেসরকারি একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর ২৯ অক্টোবর রাতে চমেক হাসপাতালে স্থানান্তর। পরদিন ৩০ অক্টোবর তিনি আমাদের শোকের মূর্চ্ছনায় ভাসিয়ে দেন। কেউই চাননি তাঁর অহিংস জীবন এত তাড়াতাড়ি থামুক। চেয়েছে আলোর মশাল হাতে শিল্পের শোভাযাত্রায় সরব থাকুক সংস্কৃতির মঞ্চ। আমাদের বিদায়ের সময়গুলো আষ্টেপৃষ্ঠে লেগে আছে, বারবার ক্ষণগুলো ব্যাকুল করে তুলছে সমস্ত। আপনার বিদায়ের মূর্হুতগুলো আমাদের সকলের জবান ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে আসছিল! কোথাও কোনো সাড়াশব্দ নেই। চোখজোড়া শুধু ভাসান জলে ভেসে ভেসে চলেছে! অনেকের সাথে অনেক লেনদেন! অনেকের সাথে অনেক হৃদ্যতাা! এ লেনদেন শুধু তাঁর মমতার, এ হৃদ্যতা তাঁর নিঃস্বার্থ মনের ভালোবাসার! তাও আবার মনের সৃজন ছড়ানো মোহের লেনদেন হৃদ্যতার হিসেবে লেখা, প্রতিটি সময়ের হিসেবও আছে ডায়েরিতে, পরিপাটি জীবন সহযোদ্ধারা তা একবারও ভুলতে পারছে না! ভাবতেই ক্ষণে ক্ষণে মন আর্তনাদ করে তুলছে, চিৎকার করছে অসময়ের খাদে পড়ে, এ কেমন দুনিয়া! সারা বুকের জমিন শুকিয়ে চৌচির হচ্ছে, মাঠের পর মাঠের মতো উজাড় হচ্ছে প্রাণের আকুতি, কেউ ফু্‌ঁঁপিয়ে ভারী করছে সেদিনের স্মৃতি! এ এক দুর্বিষহ মুহুর্ত! এ এক অবর্ণীয় বেদনাদায়ক!
এ এক বড়ই অসময়ে আমরা নিমজ্জিত! রাতদিন শুধু ব্রত করে যাই যত করি খেয়া পারাপার, তোমার অপূর্ণতায় কাঁদছে হৃদয় তুমি স্বজন নও শুধু এপাড়! তোমার জন্য সমস্ত উলট-পালট ন্যায়-অন্যায় যত অবিচার! ভালোবাসা তুমি ছড়িয়ে দিয়েছ দুঃসময়ে দাঁড়িয়েছো তোমার নির্মোহ শিষ্টাচার। দিগ্‌িবদিক হৃদয় ছুটে বেড়ায় তোমার আদর্শ যখন বলিয়ান, তবু দুঃসময়ে মানুষ পাশে দাঁড়ায় যেখানে তোমার জীবনযুদ্ধ ছিলো মহিয়ান! দু’চোখ জুড়ে এখনো স্বপ্ন আঁকি অলৌকিক ঘটুক শুধু একবার! কাকু, সেদিন তোমার অপেক্ষায় জেগেছি আমরা কারণ তুমি যে শিল্পরূপ দুর্নিবার! কাকু, কি লিখবো তোমাকে নিয়ে ভাবছি কখনো অহর্নিশ দিবারাত্রি। এ জীবন তোমার বৃথা নয়, তুমি আজ দিব্য ন্যায়ের জনশ্রুতি! দিকে দিকে ভালোবাসার উঠছে জয়ধ্বনি, তোমার কথা ভুলতে পারিনি- অমর যে কত বাণী। ভেদাভেদ ভুলে প্রায় সীমানা ডিঙ্গিয়ে, সকলের মনের তরে আপনি আজ সার্বজনীন। কাকু, তুমি শুধু শিল্পী নও, নও শুধু তুমি বিবেকবান ও গুণী। তোমার কন্ঠে এখনো মধুর শোনায় ‘অবনী বাড়ী আছো, অবনী…। ’ মনে কি পড়ে সেই দিনের মঞ্চের স্মৃতি, যখন কন্ঠের উপস্থিতি একে একে বদলে দিতো কোনো ভাষার চলনে মননের গতি-প্রকৃতি! যখন কারো জীবন হতো রঙিন প্রজাপতি, কখনো উড়ে উড়ে ফুলের সৌরভে ছড়িয়ে দিতো দিগন্ত বিস্তৃত, কখনো বা রাঙিয়ে তুলতো বোধের সুপ্ত পরিধি! আজ মনে পড়ছে কারো সেই সুখস্মৃতি? মনে কি পড়ে-সময়-অসময় পরম মমতায় বলতেন, ‘কি রে কেমন আছিস? কেমন যাচ্ছে তোর দিনকাল? বাসায় আছিস কথা আছে। সেই আগলে রাখা স্নেহময় অবাধ প্রশ্ন, এখন কেউ আর করে না, এখন শুধু ক্ষণে ক্ষণে স্বজনের হাহাকার শুনি! চারদিক নীরব দৃষ্টির অপ্রত্যাশিত জলের গড়িয়ে পড়ার কান্না শুনি! বেদনায় তাড়িত পাখপাখালির ছটফট চিৎকার শুনি! কিন্তু সেদিন সর্বস্তরের ভালোবাসার জীবন্ত স্থির ছবিতে তাঁর সরব জীবন এতো মুখর, এতো বর্ণময়! কেউ কি ভেবেছে? তা দেখে নয়নজল ভেসে ভেসে উড়ন্ত কালোমেঘে ছড়িয়ে পড়ছে! হঠাৎ বৃষ্টির তোড়ে আজ সবই লন্ডভন্ড! কিন্তু আজ তিনি ওপারে নন, আজ তাঁর বিরল উপস্থিতির শক্তি দৈনন্দিন মনন জুড়ে। সৌরভে বিভোর হচ্ছে তাঁর আদর্শ স্মৃতি।
প্রিয় কাকু, সৌহার্দ্যের সম্মিলনে আজ আপনার শোকগাথা উচ্চারিত হবে, বেদনায় হতভম্ব মুখগুলো ফ্যালফ্যাল করে দেখবে শুধু আপনারকে। কারণ কারোর কিছু বলার থাকলেও বলার মতো আস্থাশীল কোনো ভাষা নেই। ক্রমে বিশেষণগুলো বিক্ষিপ্তভাবে ঘুরছে। সিক্ত চোখগুলো সাদা পোশাক পরেছে। শূন্যে উড়ছে স্বজন, পরিবার, শুভানুধ্যায়ী ও সুধীজন স্মৃতির দৃশ্যপট। ঘটা করে আপনার স্নেহের মূল্য দিতে অনেকের বাকশৈলী সৃজন হারাবে! কষ্টে জড়িয়ে যাবে স্থানীয় কিছু মুহুর্ত। এ এক অপ্রত্যাশিত সময়! এখনো মানতে পারছি না আপনার প্রস্থান! আমার মতো অনেকেই আপনার এ স্মৃতি কীভাবে নিয়ত বয়ে বেড়াবে জানি না, কিন্তু আপনার ভালোবাসা এখনো সকলকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। গুমরে জাগিয়ে তুলছে প্রতিরাত। মানুষকে আপন করার বাকশক্তি ও দৃঢ় মনোবল এখনো স্মৃতিগুলোকে ডাকছে। আমরা এখন মমতাহীন, আশ্রয়ে স্নেহহীন হয়েছি! আপনার শক্তি হারিয়ে হয়েছি ডানাহীন। আজ আপনি বাতিঘর গড়েছেন, আলো ছড়িয়ে মমতা দিয়েছেন সর্বোপরি। শিল্পের তৃষ্ণা মিটিয়েছেন ছুটে আসা তারুণ্যে। কাকু, বড় অসময়ে আপনার অভিমানি প্রস্থানে আমরা আপনার অভিমান ভাঙ্গাতে পারিনি! কানে কানে আপনি আর বলবেন না, একটু দাঁড়া, তোর কাকিমা (দীপ্তি রক্ষিত বনানী) ফোন দিয়েছে। হ্যাঁ বলো, এইতো আসছি, আরো দশ-পনের মিনিট লাগবে। এ শোন, তোর কাকিমা বলা শুরু করেছে, আজ যাই, কি হয়েছে আমাকে জানাবি…। আপনাকে আর কোন কিছুই জানানো হয়নি.. . এরপর কাকু বলে ডাকতে পারিনি…। এরপর সবকিছুই শুধু লন্ডভন্ড..। আজও আপনার সৃজন ঘরের দেয়ালজুড়ে ছেয়ে গেছে ঝাপসা শাদামেঘ, জানালার কাঁচে বাতাসের ঝাপটাও তেড়ে আসছে। ড্রইংরুমে সোফার পিছনে দুলছে ক্যালেন্ডার, উড়ছে গোলদীঘির মতো পূর্ণ গোলাকার তারিখগুলো, সেলফে সাজানো বইগুলোও মিত্রদের ভয়ে ভয়ে দেখছে! মাঝেমধ্যে দেয়াল আঁকড়ে ধরা অতীতস্মৃতিও আঁতকে উঠছে! শো-কেস জুড়ে শুধু ইতিহাস- নীরব শুধু বইয়ের পাতা, থেকে থেকে উল্টিয়ে দেখছে সব!
প্রতিটি মুহুর্তে মানবতা গুমরে কেঁদে উঠবে, হাতড়িয়ে দেখবে তাঁর হাসিমাখা কন্ঠের মমতার শাসন, কিন্তু এদেশ, এই জাতি, এই সংস্কৃতি যেন ভয়াল মুখোশের মুখোমুখি। দুঃসময়ে বঞ্চিত হয়েছে আস্থাশীল এমন অভিভাবকের ভালোবাসার বলয় থেকে। ফুঁপিয়ে মঞ্চের আবহও ভারী হচ্ছে ! যে স্মৃতি বলবে- কি খবর তোদের, নতুন কি চিন্তা করছিস? একঘেঁয়েমি আর কতদিন….এমনি অনেক আলোড়িত সে সাহসে আর খুঁজে পাবো কোথায়?
তোমার বীরত্বগাথা আজ সুধীজন বলে, তোমার মহানুভবতায় ভোরে শেফালিকা হাসে। তোমার ভালোবাসায় হৃদয়ে গহীন মমতা দোলে, কখনো তোমার বিনম্র ভাষায় গর্বে বুক ভাসে। তোমার নীরব হাসিতে বিনয় উজাড় করে, তোমার দৃঢ়তায় মানবতা পেখম খোলে। তোমার ছুটে চলা আগামীর ভিত গড়ে, তোমার মনন উড়ে সাম্যের পতাকা তলে। তোমার সারা জীবন কেটেছে মিত্রতার খোঁজে, তোমার কন্ঠ বেঁধৈছে সবাইকে একসূত্রের মালা গেঁথে।

বোধনের রণজিৎ রক্ষিত স্মরণ আয়োজন-
দেশবরেণ্য আবৃত্তিশিল্পী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রণজিৎ রক্ষিতের প্রথম প্রয়াণ দিবসে ‘প্রাণের মানুষ আছে প্রাণে’ শীর্ষক দুই দিনের স্মরণানুষ্ঠানের আয়োজন করেছে বোধন আবৃত্তি পরিষদ চট্টগ্রাম। স্মরণানুষ্ঠানের প্রথমদিন ২৯ অক্টোবর মঙ্গলবার সন্ধে ছয়টায় থিয়েটার ইন্সটিটিউট চট্টগ্রাম মিলনায়তনে ও দ্বিতীয় দিন ৩০ অক্টোবর বুধবার সন্ধে ছয়টায় নগরীর ডিসিহিল সংলগ্ন নন্দনকাননস্থ ফুলকিতে নানা আয়োজনে তাঁকে স্মরণ করা হবে।

x