সুরের আকাশে শুকতারা

রওশন আরা বিউটি

মঙ্গলবার , ৩ ডিসেম্বর, ২০১৯ at ৫:১১ পূর্বাহ্ণ
14

সুরস্রষ্টা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দসৈনিক সুজেয় শ্যাম
মুক্ত বাংলার মুক্তির প্রথম গান এবং স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শেষ গান ‘বিজয় নিশান উড়ছে ঐ‘ সহ আরো অসংখ্য হৃদয় ছোঁয়া গানের সুর স্রষ্টা সঙ্গীত ব্যক্তিত্ব প্রখ্যাত শব্দ সৈনিক সুজেয় শ্যাম। তিনি একাধারে সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সংগীত পরিচালক হিসেবে কাজ করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে বিরাট ভূমিকা রাখেন সদা হাস্যজ্জোল, সরল প্রকৃতির মানুষ গুনী এই কিংবদন্তী সঙ্গীত পরিচালক। একাত্তরে রণাঙ্গনে মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে জাগরণী সংগীত। যার বাণী ও সুর সাহসী করে তুলেছিল মুক্তিযোদ্ধাদের। মুক্তিযুদ্ধে শব্দ সৈনিকদের প্রধান অস্ত্র ছিল সংগীত। গানে গানে তাঁরা সাহস যুগিয়েছে, স্বপ্ন বুনেছে স্বাধীন দেশের। এজন্য স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী, সুরকার ও সংগীত পরিচালকসহ সবাই দিন-রাত নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন। কবি দেলওয়ারের লেখা ‘আয়রে চাষি মজুর কুলি…’ গানটি ছিল সুজেয় শ্যাম’র প্রথম মুক্তিযুদ্ধের আয়োজন। এরপর আরও বেশ কয়েকটি গান করেছেন। গানে গানে তুলে ধরেছেন সাম্য, বিদ্রোহ আর মানবতার কথা। সুর ও সংগীতায়োজনের মধ্য দিয়ে আশার মশাল জ্বালানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে থাকাকালে মোট নয়টি গানে সুর করেছিলেন সুজেয় শ্যাম, যেগুলো একাত্তরের জুন থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত গাওয়া হয়েছিল। ওই সময় যেসব দেশাত্মবোধক গান রচনা হয়েছে সেগুলো হয়ে গেছে কালজয়ী। এখনও বিজয়ের উৎসবে চলে এসব গানই। তবে এসব গানের ভিড়ে একটু আলাদা রয়ে থাকবে সব সময় ‘বিজয় নিশান উড়ছে ঐ…,’ গানটি। কারণ, প্রথমকে হারানোর যে কোনো উপায় থাকে না। বাংলাদেশের জন্মের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে এই রচনাটি। মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক যে কোনো অনুষ্ঠানেই এটি এখনও গাওয়া হয়।
১৯৭১ সালে ১৬ ডিসেম্বর সকালে শহীদুল হক খান গানটি লিখেন। এতে তাৎক্ষণিক সুর দেন সুজেয় শ্যাম। আর কোরাসে গাওয়া গানটি লিড দেন শিল্পী অজিত রায়। আরো গেয়েছিলেন তিমির নন্দী, কাদেরী কিবরিয়া, প্রবাল চৌধুরী, রফিকুল আলম, কল্যাণী ঘোষ, উমা খান, রথীন্দ্রনাথ রায়, বুলবুল মহলানবীশ, মৃণাল কান্তি দাস, অনুপ ভট্টাচার্য, তপন মাহমুদ, রূপা ফরহাদ, মালা খুররমসহ আরও অনেকে। সেদিন এই গানে তবলা সংগত করেছিলেন অরুণ গোস্বামী, দোতারায় অবিনাশ শীল, বেহালায় সুবল দত্ত, গিটারে ছিলেন রুমু খান। সেদিন বিকেলেই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ৯৩ হাজার পাকিস্তানী সৈন্য নিয়ে আত্মসমর্পন করেছিলেন জেনারেল নিয়াজী। বিজয়কে সামনে রেখেই এই গানটি লেখা হয়েছিল। এই গানটিই ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম গান এবং স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শেষ গান।
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের তাঁর অন্যান্য গানের মধ্যে রয়েছে ‘রক্ত দিয়ে নাম লিখেছি, বাংলাদেশের নাম…’ গীতিকার – আবুল কাশেম সন্দীপ। ‘মুক্তির একই পথ সংগ্রাম…’, লিখেছেন – শহীদুল ইসলাম। ‘ওরে শোনরে তোরা শোন…’, ‘রক্ত চাই রক্ত চাই…’, ‘আজ রণ সাজে বাজিয়ে বিষাণ’, এ ছাড়া ছিল ‘বিশ্বপ্রিয়’র লেখা ‘আহা ধন্য আমার জন্মভূমি…’।
সুজেয় শ্যাম ১৯৪৬ সালের ১৪ মার্চ সিলেট জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা অমরেন্দ্র চন্দ্র শাহ ছিলেন একটি বিদ্যালয়ের সহকারী এবং ‘ইন্দ্রেশর-টি’ নামে একটি চা বাগানের মালিক। সেখানেই প্রতিদিন বসত বন্ধুদের নিয়ে আড্ডা। আর আড্ডার উদ্দেশ্য ছিল সামাজিক উন্নয়নে কে, কী করবে। বড় হয়ে তিনি একজন ইঞ্জিনিয়ার হতে চেয়েছিলেন। তাঁর শৈশব কেটেছে সিলেটের চা বাগানে আর আঁকাবাঁকা পাহাড়ি এলাকায়। দশ ভাইবোনের মধ্যে সুজেয় শ্যাম ষষ্ঠ। ছোটবেলা থেকেই সঙ্গীতে ছিল তাঁর ভীষণ আকর্ষণ। সকালে প্রার্থনা সঙ্গীত শুনে শুনেই এই আগ্রহ জন্মায়। তাঁর মা, বাবাও ছিলেন নজরুল সঙ্গীত শিল্পী। প্রতিদিন ভোরে বাবার রেওয়াজ শুনে ঘুম ভাঙত। তাঁর চাচা শ্রী নরেশ চন্দ্র শ্যাম ভালো গান করতেন। চাচার কাছ থেকে তিনি কীর্তন, বাউল ও রাধারমণের গান শিখে নেন। গান শেখার পাশাপাশি একদিন বাদ্যযন্ত্র শেখার ইচ্ছাও জাগে তাঁর মনে। তখন তাঁর বয়স পনেরো কিংবা ষোলো। বন্ধু প্রণব দাসের হাওয়াই গিটার ছিল। কিছুদিনের মধ্যেই সুজেয় শ্যাম আয়ত্ত করেন গিটার। তাঁর ছোট বোন ও ভাই বেতারে গান গাইতেন।
সুজেয় শ্যাম গিটার বাদক ও শিশুতোষ গানের পরিচালক হিসেবে ১৯৬৪ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের চট্টগ্রাম বেতারে যোগ দেন। পরে বড়দের অনুষ্ঠান পরিচালনা শুরু করলেও ১৯৬৮ সালে ঢাকা বেতারে চলে আসেন। কাজ করেছেন বাংলাদেশ বেতারে। ২০০১ সালে বাংলাদেশ বেতার থেকে প্রধান সঙ্গীত প্রযোজক হিসেবে অবসরে যান।
সুজেয় শ্যাম ১৯৬৯ সালে সঙ্গীত পরিচালক রাজা হোসেনের সাথে একত্রে রাজা-শ্যাম নামে চলচ্চিত্রের সঙ্গীত পরিচালনা শুরু করেন। সত্তর-আশির দশকে তাঁরা একত্রে সূর্য গ্রহণ, সূর্য সংগ্রাম, ভুল যখন ভাঙলো সহ পঁচিশটি চলচ্চিত্রের সঙ্গীত পরিচালনা করেন। সূর্য গ্রহণ চলচ্চিত্রের সঙ্গীত পরিচালনা করে অর্জন করেন বাচসাস চলচ্চিত্র পুরস্কার। ১৯৮৬ সালে আবদুল লতিফ বাচ্চু পরিচালিত বলবান ও অবাঞ্ছিত চলচ্চিত্রের মাধ্যমে এককভাবে সঙ্গীত পরিচালনা শুরু করেন। ২০০২ সালে হাছন রাজাকে নিয়ে নির্মিত হাছন রাজা চলচ্চিত্রের সঙ্গীত পরিচালনা করে লাভ করেন তাঁর প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। ছবিটি মূলত মরমী কবি, বাউল শিল্পী হাছন রাজার জীবন ও কর্ম নিয়ে নির্মিত। চলচ্চিত্রকার চাষী নজরুল ইসলামের বিশেষ অনুরোধে এই চলচ্চিত্রের একটি গানেও কণ্ঠ দেন তিনি। পরবর্তীতে জয়যাত্রা ও অবুঝ বউ চলচ্চিত্রের গানের সঙ্গীত পরিচালনা করে যথাক্রমে ২০০৪ ও ২০১০ সালে পুরস্কার লাভ করেন। ২০১৪ সালে একাত্তরের ক্ষুদিরাম ও একাত্তরের মা জননী নামে দুটি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্রের সঙ্গীত পরিচালনা করেন তিনি। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের এই শব্দ সৈনিক সঙ্গীতে শিল্পকলা পদক পান ২০১৫ সালে। একই বছর পান স্বাধীনতা সম্মাননা ও ভারত গৌরব সম্মাননা। ২০১৮ সালে পেয়েছেন একুশে পদক। পেয়েছেন রবি-চ্যানেল আই বিজয়মেলা পদক – আজীবন সম্মাননা ২০১১। ২০০৬ সালে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ে বাংলাদেশ বেতারে প্রচারিত ৪৬টি গানের সংকলন নিয়ে স্বাধীন বাংলা বেতারের গান শিরোনামের একটি অ্যালবামের সঙ্গীত পরিচালনা করেন তিনি। এর ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে ২০১৩ সালে আরও ৫০টি গানের সংকলন নিয়ে স্বাধীন বাংলা বেতারের গান – ২ নামে আরেকটি অ্যালবামের সঙ্গীত পরিচালনা করেন। ‘টুনাটুনি অডিও’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গীত পরিচালক হিসেবেও কাজ করছেন তিনি। মুক্তা দেবের প্রযোজনায় আল মামুনের লেখায় সুজেয় শ্যামের সর্বশেষ গানের অ্যালবাম ‘এক জনমের ভালোবাসা’। প্রায় দুশো গানে সুর করেছেন সুজেয় শ্যাম।
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রখ্যাত শব্দ সৈনিক, বাংলাদেশের সঙ্গীতাকাশের উজ্জ্বল নক্ষত্র সুজেয় শ্যাম প্রোস্টেট ক্যান্সারে আক্রান্ত। বছরখানেক আগে কিডনির জটিলতা নিয়ে নারায়ণী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর পরীক্ষা-নিরীক্ষায় তাঁর ক্যান্সার ধরা পড়ে। প্রধানমন্ত্রীর আর্থিক সহযোগিতায় তিনি ভারতের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। নির্দিষ্ট একটি সময়ে তাঁকে ভারতে যেতে হয় চিকিৎসার জন্য। আবার দেশে ফিরে পেশাগত কাজও করেন তিনি। আবার ছুটে যান ভারতে। এভাবেই যেন চলছে সুজেয় শ্যামের জীবন। সুজেয় শ্যাম বলেন, ‘‘দিনগুলো ভালোভাবেই কাটছিলো। ভেবেছিলাম এভাবে সুস্থ থাকতে থাকতেই হয়তো এই সুন্দর পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে পারবো। কিন্তু কখনো যে ক্যান্সারে আক্রান্ত হবো তা ভাবিনি। আর্থিকভাবে খুব সচ্ছল নই আমি। যে কারণে এই রোগের ব্যয়বহুল চিকিৎসা আমার জন্য অনেক কষ্টের ছিলো। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী পাশে দাঁড়ানোর কারণে এখন নিশ্চিন্তে চিকিৎসা নিতে পারছি।’’ যদিও তাঁর চিকিৎসা চলছে তবে সবার আশীর্বাদ আর দোয়াতে তিনি আগের চেয়ে এখন ভালো আছেন। গুনী এই সঙ্গীত ব্যক্তিত্ব’র জন্য রইলো শুভ কামনা। সুস্থ ও সুন্দর জীবন নিয়ে বেঁচে থাকুক আরো দীর্ঘদিন।
লেখক : প্রাবন্ধিক, সংগীত বিষয়ক গবেষক

x