সুপ্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী চট্টগ্রাম রাইফেল ক্লাব

জাহেদুল কবির

মঙ্গলবার , ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ at ১১:২০ পূর্বাহ্ণ
39

আমাদের বালকবেলায় চট্টগ্রাম রাইফেল ক্লাবকে ব্যাডমিন্টনের ভেন্যু হিসেবেই ভাবতাম। কারণ চট্টগ্রামের অনেক বড় বড় ব্যাডমিন্টন টুর্নামেন্টই এতে অনুষ্ঠিত হত। দেশের নামকরা সব জাতীয় পর্যায়ের খেলোয়াড় এসব টুর্নামেন্ট খেলতে আসতেন। বিদেশি খেলোয়াড়ও এখানকার টুর্নামেন্টে অংশ নিতেন। জাঁকজমক এসব ব্যাডমিন্টন টুর্নামেন্ট চট্টগ্রামবাসীর নজর কেড়ে নিত। কিছুটা বড় হওয়ার পর বুঝলাম ঐতিহ্যবাহী এবং সুপ্রাচীন এই চট্টগ্রাম রাইফেল ক্লাবের মূল পরিচয় তার নিজস্ব ইভেন্ট শ্যুটিং দিয়ে। পাকিস্তান আমলেই জন্ম হয় চট্টগ্রাম রাইফেল ক্লাবের। ১৯৪৮ সালে এই ক্লাবের প্রতিষ্ঠাকাল। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির পর কিছু উদ্যমী শ্যুটার পাকিস্তানে ১৯৫২ সালে ন্যাশনাল রাইফেল অ্যাসোসিয়েশন (এনআরএ) গঠন করেন। এনআরএ-এর একক কার্যক্রম ছিল জেলা ও মহকুমা পর্যায়ে রাইফেল ক্লাব প্রতিষ্ঠা করা। এনআরএ’র প্রথম অনুমোদিত রাইফেল ক্লাব ছিল ‘চট্টগ্রাম রাইফেল ক্লাব’। এ অঞ্চলে প্রথম শ্যুটিং রেঞ্জ করার জন্য ১৯৬০-৬১ সালে চট্টগ্রাম রাইফেল ক্লাবকে সম্মাননা দেয়া হয়। সম্মাননা পদকগুলো এখনো চট্টগ্রাম রাইফেল ক্লাবের অধীনে আছে। তৎকালীন এয়ার ভাইস মার্শাল আজগর খান এ পদকগুলো চট্টগ্রাম রাইফেল ক্লাবের কাছে হস্তান্তর করেছিলেন। বর্তমানে শ্যুটিংকে একটি ক্রীড়া ইভেন্ট হিসেবেই দেখা হয়। চট্টগ্রাম রাইফেল ক্লাবও সেভাবে শ্যুটিংকে লালন করছেন। তবে শুরুতে এমনতরো ক্লাব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল ভিন্ন। তখন চিন্তা করা হয়েছিল এই ক্লাবের শ্যুটিং কার্যক্রম হবে সাধারণ জনগণের জন্য। যেমন দেশের কোনো জরুরি অবস্থায় সাধারণ জনগণ যেন অস্ত্র নিয়ে এগিয়ে আসতে পারে। দেশের প্রয়োজনেই অস্ত্রের ব্যবহার শিখবে জনগণ এই ক্লাব থেকে এমনটাই ভাবা হয়েছিল। পরবর্তীতে গতিপথ বদলে যায় ক্লাবের। লক্ষ্য উদ্দেশ্য হয় অন্যরকম। শ্যুটিংকে যখন ক্রীড়া হিসেবে বিবেচনা করা হয় চট্টগ্রাম রাইফেল ক্লাবের পরিচয়টাও অন্যরকম হয়ে যায়। বাংলাদেশ আমলে জাতীয় শ্যুটিং ফেডারেশনের আওতায় এসে চট্টগ্রাম রাইফেল ক্লাবের পরিচয় ঘটে অন্যভাবে। শ্যুটিংকে ক্রীড়া হিসেবে বিবেচনা করে এগিয়ে যায় চট্টগ্রাম রাইফেল ক্লাব। পাক আমলে স্থাপিত রেঞ্জেই চলে নিয়মিত অনুশীলন। সাথে জাতীয় প্রতিযোগিতায় নিয়মিত অংশ নিতে থাকে চট্টগ্রাম রাইফেল ক্লাব। দেশের গন্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলেও অংশ নিতে থাকে এই ক্লাবের শ্যুটাররা এবং তা বেশ ইতিবাচকভাবেই। পাক আমলের চাইতে বাংলাদেশ আমলেই চট্টগ্রাম রাইফেল ক্লাবের ভালো ভাবমূর্তি গড়ে ওঠে। এটার কারণে পাক আমলে যে উদ্দেশ্য নিয়ে ক্লাব প্রতিষ্ঠা হয় বাংলাদেশ আমলে তা এসে তা বদলে যায়। রাইফেল ক্লাব একটা ক্রীড়া প্রতিষ্ঠান হিসেবেই পরিগণিত হতে থাকে। এখানকার শ্যুটিং রেঞ্জে নিয়মিত অনুশীলন চলে। এই ক্লাবের শ্যুটাররা জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়মিতই অংশ নিয়ে থাকেন। জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় চট্টগ্রাম রাইফেল ক্লাব সবসময় ভালো ফলাফল করেছে। চ্যাম্পিয়ন,রানার্স আপ হয়েছে তারা বেশ কবারই। বাংলাদেশ যুব গেমস ও যুব শ্যুটিং চ্যাম্পিয়নশীপে চট্টগ্রাম রাইফেল ক্লাব বিজয়ী হয়। জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তাদের শ্যুটার বর্তমান কোচ মো. আলমগীর, সৈয়দা সাদিয়া সুলতানা,মো. নুরুদ্দিন সেলিম প্রমুখ কৃতিত্ব দেখিয়েছেন। ক্লাবের বর্তমান জয়েন্ট সেক্রেটারি সামির বঙ জানালেন চট্টগ্রাম রাইফেল ক্লাবের স্টোর রুমটিতে আছে ঐতিহাসিক অস্ত্রের চমৎকার সংগ্রহ। অনেক প্রাচীন এবং আধুনিক অস্ত্রে সমৃদ্ধ ক্লাবের এই স্টোর রুম। ক্লাবের বর্তমান রেঞ্জটি গত ২০০০ সালে স্থাপন করা হয়। এই রেঞ্জেই এখন শ্যুটিং প্র্যাকটিস চলছে। ক্লাবের বাড়তি জায়গায় এখনও নিয়মিত ব্যাডমিন্টন অনুশীলন হয়। ক্লাব এ ব্যাপারে সার্বিক সহযোগিতাই করে আসছে। চট্টগ্রাম রাইফেল ক্লাব ঘিরে আছে বেশ সমৃদ্ধ একটি মার্কেট। ৯০ দশকে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। চট্টগ্রামের অন্যতম একটি ইলেকট্রনিঙ মার্কেট এটি। সামির বঙ চমকপ্রদ একটা তথ্য দিলেন বর্তমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্বন্ধে। চট্টগ্রামে তাঁর বিয়ের রিসেপশন বা বৌভাতটা এই ক্লাবেই হয়েছিল। ঐতিহ্যবাহী চট্টগ্রাম রাইফেল ক্লাবের সমস্যাও আছে। ক্লাবের সামনের ফুটপাত দখল করে আছে অবৈধ হকাররা। এতে করে ক্লাব এরিয়ায় সৌন্দর্য বিলীন হচ্ছে। সীমানা দেওয়াল ভেঙে ঢুকে যাচ্ছে তারা। এটার সমাধান চান তারা যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে। চট্টগ্রাম রাইফেল ক্লাব পরিচালিত হয় একটি কার্যকরী পরিষদের মাধ্যমে। বর্তমান কার্যকরী পরিষদের সভাপতি হিসেবে আছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসেন। ক্লাবের সহসভাপতিবৃন্দ অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ মাশহুদুল কবীর, দৈনিক আজাদী সম্পাদক এম এ মালেক,পুলিশ সুপার,চট্টগ্রাম,উপ-পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ), ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও হোটেল আগ্রাবাদের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ.এইচ.এম. করম আলী, ক্লাবের কার্যকরী পরিষদের সদস্যগণ হচ্ছেন গোলাম মোস্তফা কাঞ্চন, কাজী সাহাদাৎ হোসেন, নাজমুল হক চৌধুরী এবং পি.আর.সিনহা, শোয়েব রিয়াদ। এই কার্যকরী পরিষদ চট্টগ্রাম রাইফেল ক্লাবের শুটিং ইভেন্ট দিয়ে বাংলাদেশের সুনাম আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরার আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

x