সুনীলের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ইলিয়াস বাবর

শুক্রবার , ১৭ আগস্ট, ২০১৮ at ৮:৪৭ পূর্বাহ্ণ
250

অবাক নয়নে তাকানো ছাড়া উপায় নেইসেলফ জুড়ে রবীন্দ্রনাথের বই, বই আর বই। এক জীবনে একজন মানুষ এত লেখার সময় পায় কোথায়? সময় আর সুযোগের ভেতর দিয়ে ক্রমাগত চর্চা আর নিজেকে আবিষ্কারের প্রবল স্রোতে সচল রাখার মাধ্যমেই কেউ কেউ পারেন সবটুকু নিংড়িয়ে দিতে। বুদ্ধদেব বসু অবশ্য এমনই বলেন– ‘… বাংলাদেশেও, উচ্ছৃঙ্খল জীবনের ফাঁকেফাঁকে মধুসূদন কিছু কম লেখেননিরবীন্দ্রনাথের কথা কিছু নাই বললাম। বেশি লেখা খারাপ, এই ধারণার তা’হলে ভিত্তি কোথায়?’ ততোধিক বিস্ময়ে আরো লক্ষ করিরবীন্দ্রনাথের নিজের না যত বই, তার চেয়ে বেশি তাকে নিয়ে লেখা বই! এ রকম কপালও হয় লেখকের? হয়কেননা, তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে অনেক গ্রন্থেই হয়তো গুরুবন্দনা প্রবলভাবে আছে, স্মৃতিকথা কিংবা নিজেকে মহৎ করে তোলার প্রয়াস তবুও ওখানেই আছে শ্রমনিষ্ঠ ঘামের ইতিহাস, রবীন্দ্রনাথকে ব্যাখ্যা করার প্রাণান্তকর প্রয়াসগ্রহণীয় অনেকটা আদরনীয় করার মহৎ স্বপ্নও বর্তমান ছিল বা আছে তাতে। কে না জানে, রবীন্দ্রনাথ তার জীবদ্দশায় নানামুখি প্রতিকূলতার ভেতর দিয়ে গেছেনতা ব্যক্তিগত কি অন্যান্য বিষয়েও এবং মৃত্যুপরবর্তী রবীন্দ্রনাথকে নিষিদ্ধ করবার অপপ্রয়াসেও বিস্মৃত নই আমরা। ফলে, তাকে জানা, বিস্মৃত ও ব্যাপক করার পেছনে গ্রন্থভুক্ত করার চলিঞ্চু ইতিহাসকে আমরা শ্রদ্ধাভরেই সামনে রাখি। দেশিয় লেখককুলের দীর্ঘ যাত্রায় সংযুক্ত হয় বৈদেশী বোদ্ধামহলেযারা সত্যিকার অর্থেই রবীন্দ্রভাবনা তথা প্রাচ্যের সৌন্দর্যের সাথে পরিচয় করে দিয়েছেন। দেশজ সন্তানেরা কবি রবীন্দ্রনাথ, কথাসাহিত্যিক রবীন্দ্রনাথ, নাট্যকার রবীন্দ্রনাথ, চিত্রকর রবীন্দ্রনাথ, সংগীতজ্ঞ রবীন্দ্রনাথ, সমবায়শিক্ষায় রবীন্দ্রনাথএমনকি তা ছড়িয়ে আছে ব্যক্তিগত নানা বিষয় থেকে শুরু করে তার জন্মের রসুইঘর পর্যন্ত তুলে এনেছেন নানা লেখায়লেখায়। বস্তুত: ঠাকুরবাড়ির অভিজাত পরিবেশ, সদস্যদের মেধারুচি তৎকালীন সমাজকে বটে বর্তমানকেও নাড়া দেয় সমানভাবে। রবীন্দ্রনাথ এক অঙ্গে নানা রূপের সার্থক প্রতিফলন করতে পেরেছেন তার সাহিত্যিক এবং ব্যক্তিগত জীবনেও। ক্রমাগত অনিসন্ধিৎসু গবেষকঅনুরাগিরা রবীন্দ্রনাথকে দিনকে দিন ব্যবচ্ছেদ করে যাচ্ছে, তুলে আনছে নানা কুসুমকাঁটাসহ। আবিষ্কারের বিপুল উৎসাহে আমরা রবীন্দ্রনাথকে অস্বীকারের স্পর্ধা দেখি কালে কালেযুগের যন্ত্রণায় হোক, বয়সের চঞ্চলতায় হোক রবীন্দ্রনাথকে আক্রমণের ভেতর দিয়েই হয়তো জাগিয়ে তোলে রবীন্দ্রচর্চার অবারিত দুনিয়া। এ যাত্রায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ভূমিকা অন্যদের চেয়ে ব্যতিক্রম এবং আলাদাভাবেই প্রতিভাত হয় আমাদের সমুখে। সুনীল নিজেও ছিলেন তার সমকালের অন্যতম প্রধান লেখক ও সম্পাদক। সমকালে বটেই বাংলাসাহিত্যের গৌরবময় ইতিহাসেও সুনীল নিজের স্থানকে পোক্ত কওে গেছেন অবিরল কাজের মাধ্যমে। দীর্ঘজীবনে রবীন্দ্রনাথকে অস্বীকার এবং পুনরাবিষ্কারের দীর্ঘ মননের গঠনশৈলীকে সুনীল বিবৃত করেন আড়াল ছাড়াই। জীবনযাপনের অকপটতা, শিল্পের সাথে আপোসহীনতা আর নিত্যবর্তমান রুচির সাথে সুনীলের সখ্যতার ফলে একেবারে খাঁটি ও নির্মেদ ছিলেন তিনি প্রায় সব ভূমিকাতেই। সুনীলের রবীন্দ্রনাথকে দেখার, দেখানোর, ভাবার, ভাবানোর এবং প্রকাশ করার ব্যাপারটির সাথে তাই জুড়ে থাকে হৃদয় আর প্রেমের ছায়া, বোধ আর বোধনের সংশ্লেষ।

নারবীন্দ্রনাথ

রবীন্দ্রনাথকে না বলা? জ্বি, তাই হয়েছে, হচ্ছেও অহরহ। রবীন্দ্রচর্চার ব্যাপকতা এমনকি রবীন্দ্রবাণিজ্যের ডামাডোলের ভেতরেও রবীন্দ্রনাথকে অস্বীকার করেছেন কেউ কেউ। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের হাত দিয়েই এসেছে– ‘তিনজোড়া লাথির ঘায়ে রবীন্দ্ররচনাবলী লুটোয় পাপোশে।’ লক্ষ্য করার মতোন কথাতিনজোড়া! অর্থাৎ সমবায় আক্রমণে পতিত হয় রবীন্দ্রনাথ! সুনীলদের সময় বিবেচনা করলে আমাদের সমুখে হাতছানি দেয় তিরিশের কাব্যআন্দোলন। তিরিশের দশকে উপমহাদেশে বটে পৃথিবীব্যাপি কবিতায় আসে আধুনিকতার বান। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের মনোভাবে আসে বিপুল পরিবর্তন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগেই বাংলা কবিতার পালে লাগে আধুনিকতার হাওয়া। মাসুদুল হকের মতে– ‘… ঠিক এ সময়েই বাংলা কবিতাতেও বিবর্তনের হাওয়া লেগে যায়। এক দল তরুণ কবি সচেতনভাবেই বিদ্রোহ করলেন রোমান্টিকতার বিরুদ্ধে।’ স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ তাতে স্থির থাকতে পারলেন নাবিশাল ব্যক্তিত্ব নিয়েও। তিনি লিখলেন– ‘শ্রী নেই, তাতে পরিমিতি নেই, তাতে রূপ নেই, আছে বাক্যের প্রচুর পিণ্ড।’ বোঝা যায় প্রজন্মের গ্যাপ শুধু বয়সে নয় চিন্তায়ও। বিবিধ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় তিরিশের রবীন্দ্রবিরোধিতা পরিণত হয় তরুণের প্রধান বিবেচ্য। বুদ্ধদেব বসু আলাদাভাবে কবিতার সংজ্ঞায়নে তৎপর হয়ে উঠেন। তিনি বলেন– ‘আধুনিক কবিতায়, নগরকেন্দ্রিক যান্ত্রিক সভ্যতার ছোঁওয়া থাকবে, থাকবে বর্তমান জীবনের ক্লান্তি ও নৈরাশ্যবোধ, দেখা যাবে আত্মবিরোধ ও অনিকেত মনোভাব এবং রবীন্দ্র ঐতিহ্যের (রোমান্টিকতা) বিরুদ্ধে সচেতন বিদ্রোহ ও নতুন পথের সন্ধানের প্রয়াস।’ তিরিশের সচেতন উত্তরাধিকার সুনীল, শক্তি প্রমুখের যূথবদ্ধতা। তরুণেরা সৃষ্টি করেন নতুন ঢেউ; রবীন্দ্রনাথের মহিরূহ অবস্থানের অনড় অবস্থানকেই তারা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেন; সেইসাথে সামনে আনেনজোয়ারভাটা না থাকলে নদীর মৃত্যুর প্রসঙ্গও। কারো কারো আদিখ্যেতার প্রতিক্রিয়া তাতে থাকতে পারে, মৃত্যুর এতকাল পর রবীন্দ্রনাথ কেন এত পঠিতচর্চিত; তার প্রতিবাদেও হতে পারেমধ্য পঞ্চাশের সুনীলেরা রবীন্দ্রনাথের গোষ্ঠী উদ্ধারে তৎপর হলেন। সুনীলের মন্তব্য শুনলেই বোঝা যায় সময়ের চারিত্র– ‘কিন্তু এমন একটা রবীন্দ্র ভাবধারা প্রসারিত হয়েছিল, যাতে রবীন্দ্র পরবর্তী যে কোনো আধুনিক রচনাকেই নস্যাৎ করতেন সাহিত্যের কর্তাব্যক্তিরা। রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য এবং রাবীন্দ্রিকতা পরস্পরের পরিপূরক না হয়ে দ্বিতীয়টি হয়ে উঠল মারাত্মক রকমের প্রতিক্রিয়াশীল।’ আক্রোশ যে সেভাবেই হোক আর যে মাধ্যমেই আসুক তাতে বাদ যায় না ব্যক্তিগত চৌহদ্দিও। বলাবাহুল্য, রবীন্দ্রবিরোধিতায় একেবারেই বিস্মৃত হয় একটা স্মার্ট ভাষা নির্মাণে তার অবদানের কথা, ছোটগল্পের আলাদা জগত দানের কথা এবং বিশ্বব্যাপি তার প্রতিনিধিত্বের কথা। ব্যক্তিগত আক্রমণের অন্যতম কারণ হয়তো, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত প্রমুখের-‘ সম্মুখেতে পথ জুড়ি রয়েছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’ কিংবা এরূপ বাণীসংযুক্তি। সুনীলের মতে– ‘এটা তাঁর বা তাঁর সমসাময়িকদের পক্ষেও সম্মানজনক নয়…’। তরুণের থাকে অদম্য স্পৃহা, পুরনোকে বদলে ফেলার দুর্নিবার অথচ সহজাত দ্রোহ। সাহিত্যের আলোচনায় কি উদাহরণে সমুখে কেবল রবীর ছায়ায় আচ্ছন্ন হতে তাদের বয়সের কারণেই অস্বস্তি লাগতে পারে। তাছাড়া যুগযন্ত্রণাসময়চেতনার দিকে দৃষ্টি দিতে হয় তরুণদেরমুখ্যত এ কারণেই কিছুকাল আগেরও পংক্তিগুচ্ছ তাদের কাছে প্রাচীন আর প্রাণহীন ঠেকতে পারে। বিশ্বভারতীর কল্যাণে তো বটেই বাঙালির জনজীবনকেও স্বাভাবিক এবং দৈনন্দিনতার অনুষঙ্গ হয়ে উঠেন রবীন্দ্রনাথ। তার গানের অমোঘ বাণী, কবিতায় বেদউপনিষেদ ও প্রেমের অতি চমৎকারিত্ব এবং গল্পে বাঙালির অন্তরবাহির কোনটাই বাদ দেয়া যায় না, অথচ রবীন্দ্রনাথই আক্ষেপ করে বলেন– ‘চিরদিন এই গল্পগুলো আমার অত্যন্ত প্রিয় অথচ আমাদের দেশ গল্পগুলোকে যথেষ্ট অভ্যর্থনা করে নেয় নি।’ স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের ভেতরও সংশয় ছিল, সুনীলদের মতো ‘কলকতার রাত শাসন করা’ তরুণেরা তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতে চাইবে যেকোন কিছুই, কোন কারণ ছাড়াই।

সাহিত্যিক রবীন্দ্রনাথকে বিদ্রুপ করার সুযোগ খুব বেশি না থাকলেও অমীয় চক্রবর্তী ‘ছিনু, গেনু, হিয়া ইত্যাদি শব্দ ব্যবহারের বিরুদ্ধে কঠোর সমালোচনামূলক প্রবন্ধ লেখার সাহস দেখিয়েছেন। ধ্যানী রবীন্দ্রনাথ নিজেকে ঠিক রাখতে পেরেছেন কিনা তা তর্কসাপেক্ষ হলেও ‘ভাঙন ধরা, রাবিশ জমা’ বলতে ভুল করেননি! পারস্পরিক প্রতিক্রিয়ার ব্যাপারটা বেশ জমেছিল বটে তিরিশের দশকে। সেখানে সুনীলেরা জীবনানন্দের কবিতাকে ‘রবীন্দ্রনাথের তুলনায় যথেষ্ট অগ্রবর্তী’ হিসেবেই উল্লেখ করেন। প্রাসঙ্গিকভাবে শান্তিনিকতনের কানুনের কথা আসেঐতিহ্যসূত্র ভেঙে প্রজার ভেদাভেদ করা রবীন্দ্রনাথের বিপক্ষে গিয়ে! সুনীলের মতে– ‘শান্তিনিকেতনের বিদ্যালয়টিতে বর্ণাশ্রম প্রথা অক্ষরে অক্ষরে পালিত হয়েছে। এমন কি ব্রাহ্মণকায়স্থবৈশ্য ছাত্রদের পোশাকের রং পর্যন্ত আলাদা আলাদা, ব্রাহ্মণ ছাত্ররা খাওয়ার সময় পৃথক সারিতে বসবে ছোঁয়াছুঁয়ি বাঁচিয়ে, ব্রাহ্মণ ছাত্ররা কায়স্থ শিক্ষকদের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করবে না, এইসব কুপ্রথা রবীন্দ্রনাথ কী জন্য মান্য করতে চেয়েছিলেন, তা ভাবলে বিস্ময়বোধ হয়।অথচ তাঁর এই শখের বিদ্যালয়টিতে মুসলমান ছাত্রদের স্থান ছিল না। ক্রিশ্চানদেরও না।’ বক্তৃতাপ্রেমপত্রের অসারতা সুনীলের চোখ এড়ায় না কোনভাবেই। সুনীল অপার বিস্ময়ে বলতে পারেন– ‘শান্তিনিকতনের বেদীতে উপবিষ্ঠ রবীন্দ্রনাথের বক্তৃতাগুলো যেমন কৃত্রিম, তেমনি অসার। তাঁর লেখা হাজার হাজার চিঠিপত্র পড়লে মনে হয়, এত বড় একজন শিল্পী এতখানি আত্মপ্রবঞ্চকও হতে পারেন? এত লোককে এত চিঠি লিখেছেন, কোথাও নিজের মনের কথা বিন্দুমাত্র প্রকাশ করেননি।’ এবং সামনে আসে ঠাকুরবাড়ির ঐতিহ্যিক পরিমণ্ডলের ভূমিকার কথা। রবীন্দ্রনাথের মেধাপ্রজ্ঞার চেয়েও যেন বড় হয়ে ওঠে ঠাকুরবাড়ির সৃজনযজ্ঞ। পারিবারিক পরিমণ্ডল তাকে সহায়তা করেছেনএ বড় সত্যটিই রবীন্দ্রনাথের দিকে তীর তাক করার বলবান বস্তুতে পরিণত হয় যেনবা। অথচ, ধারাবাহিক চর্চা আর পঠনের রাজ্যে যেকেউ প্রবেশ করলেই নিজেকে উত্তোরণ করতে পারেন তা কে মনে করিয়ে দেবে! সুনীল যেমন বলেন– ‘বিখ্যাত পরিবারের সন্তান না হলে নিজস্ব পত্রিকা না থাকলে তাঁর সেই সময়কার কবিতাগুলির মুদ্রণসৌভাগ্য কিংবা মনোযোগযোগ্যতা ছিল না। কবি হিসেবে তাঁর প্রস্তুতি অতি ধীর, এখনকার অনেক কবির তুলনায় প্রাক বিংশতি বর্ষে তাঁর কবিতার ভাষা বেশ দুর্বল।’ কে যোগ হয়নি রবীন্দ্রনাথকে অস্বীকার করার এ মিছিলে? উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক থেকে গাদ্দার অধ্যাপক, বেপথু তরুণ থেকে ঋদ্ধ প্রৌঢ় প্রায় অনেকেই এক কাতারে সামিল হয়েছেন কি এক সম্মোহনে। রবীন্দ্রনাথকে বিদ্রুপ করে জাতে উঠার প্রবণতায় সুরেশ সমাজপতি, সজনীকান্ত দাস ছিলই, বাদ যায়নি বিপিনচন্দ্র পাল, যদুনাথ সরকার প্রমুখও। ডি. এল. রায়ের মতো মানুষ রবীন্দ্রনাথের ব্যক্তিগত জীবনে মিথ্যে কালিমা লেপনে ব্যস্ত ছিলেন। দীর্ঘ জীবনে রবীন্দ্রনাথে বিপুল সমীহ, ভালোবাসা, শ্রদ্ধা থাকলেও স্বকালে এবং উত্তরকালে বারবার জর্জিত হয়েছেন। এমনকি নোবেল জিতে বাঙালির মুখ উজ্জ্বল করলেও অনেকেই বলাবলি করেছে, নোবেল পুরস্কারের সম্মানটা ধূলোয় গেল! ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় তার বিরোধিতা, মেয়েদের পাত্রস্থ করতে বিশাল পণ দেয়াসহ নানা বিষয়ই বিবেচ্য হয়ে যায় সাহিত্যিক রবীন্দ্রনাথের বিরোধিতায়। হায়, ঈশ্বর! একজন মানুষের নানাবিধ ঝামেলা থাকার পরেও সাহিত্যে মনোনিবেশ করা, তাতে সোনা ফলানো তো বাহবা পাওয়ারই বিষয়। মনেমননে জর্জরিত হয়েছেন রবীন্দ্রনাথ, ঋষী ব্যক্তিত্বেও দাগ দিয়েছে কেউ কেউ। অস্বীকারের এই ঢেউ কালেকালে সংক্রমণ হয়েছে, সুনীলের পরে, তারও পরে এমনকি ভাবিকালেও এরকম বিরোধিতা আর বিসংবাদ হয়তো শুনতো থাকবো আমরা। এই বিসংবাদের ভেতরেও চর্চার নতুন একটি ভুবন তৈরি হয় তা সহজেই অনুমেয় এবং তা হচ্ছে রবীন্দ্রনাথের বেলায়ও।

হ্যাঁ রবীন্দ্রনাথ

রবীন্দ্রনাথ তার বহুমুখী প্রতিভার উজ্জ্বল আভায় প্রতিনিয়ত আলোকিত করে যায় সাহিত্যের আপাতকঠিন পথরেখা। তার আশীর্বাদ বলি, পথচিহ্নায়ন বলি প্রায় সবটাই পলে পলে নিয়ে থাকি আমরা উত্তরাধিকার সূত্রেই! সুনীল তার কবিতায় যেমন শোনান– ‘চেয়ার ছেড়ে যাওয়া নিষেধ, চেয়ার জুড়ে দিন রাত্রি কাটে/ কলম ছোটে পাহাড় চূড়ায় কলম ছোটে সাগর, নদী, মাঠে/ সাদা পাতায় রাত্রি জাগি, ঘুমোই কালো পাতায়/ রবীন্দ্রনাথ হাত বুলিয়ে দিলেন আমার মাথায়।’ কবিতা তো বটেই নাটক, কথাসাহিত্য, প্রবন্ধ, চিত্রকলা, শিক্ষা এমনকি সমবায় চিন্তায়ও তার অংশীদার ব্যাপক, পাইনিয়র এবং অনেক ক্ষেত্রে তাকেই তৈরি করতে হয়েছিল একেকটি পথ। কে না জানে, বানানো পথে হেটে যাবার আনন্দের অধিক বেদনায়শংকায় তৈরি করতে হয় নতুন পথ! বর্তমানে থেকে অতীতের সবক নিয়ে দূরদৃষ্টিসম্পন্নতার স্বাক্ষর রাখতে নির্মাতাকে। শুধু বাংলা ছোটগল্পের জগৎ ধর্তব্যে আনলেই রবীন্দ্রনাথ দ্রষ্টা একই সাথে স্রষ্টা হিসেবে কতোটা আধুনিক ও স্বকাল পেরিয়ে যেকোন সময়েই প্রাসঙ্গিক তা ভাবতেই বিস্ময় জাগে। তিরিশের দ্রোহীদের হাতে রবীন্দ্রনাথ প্রশ্নবিদ্ধ হন প্রবলভাবে, রক্তাত্তসেইসাথে মুখরিতও বটে। তিরিশের সেই কাব্যযোদ্ধারা সময়ের প্রেক্ষিতে রবীন্দ্রনাথকে আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়। বুদ্ধদেব বসু, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, প্রেমেন্দ্র মিত্র প্রমুখ রবীর সৃজনরাজ্যে ডুবে যেনবা নিয়ে আসেন আধুনিক মণিমুক্তা। তাদের অনেকেই পূর্বের ধারণা থেকে সরিয়ে নিজেদের নিয়োজিত রাখেন রবীন্দ্রবন্দনায়! স্বকালেই রবীন্দ্রনাথের আলোয় আলোকিত, প্রভাবিত হয়ে কবিতায় আসেনসত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, যতীন্দ্রনাথমোহন বাগচী, কুমুদরঞ্জন মল্লিক, করুণানিধান বন্দ্যোপাধ্যায়, কালিদাস রায় প্রমুখ। মহৎ শিল্পীরা প্রভাবিত এবং পথ দেখানোর কাজটাই করে যান যুগেযুগে। এবং এ কথাটাও কবুল বলতে হয় যে, যেকোন মহৎ রচনার প্রেক্ষাপটেই দেখা যায় তা বারবার পঠনে, অধ্যয়নে রূপ বদলায়জীবনের পরতে পরতে সে ঢুকে যায় অনিশেষ দাপটে। তিরিশের কবিরা যখন ছন্দমুক্তির ব্যাপারে একজোট, তখন রবীন্দ্রনাথ হয়তো আড়ালে মিটিমিটি হেসেছিলেনতিনি ‘পুনশ্চ’এ দেখালেন মুক্তকছন্দের খেল। সুধীন্দ্রনাথ দত্ত তো বলেই দেন– ‘তপস্যা কঠিন রবীন্দ্রনাথের পক্ষে যেটা মোক্ষ, আমাদের ক্ষেত্রে তা হয়তো সর্বনাশের পথ।’ এমনকি সাধু ভাষার স্থলে যখন চলতি ভাষায় সাহিত্যচর্চা হচ্ছে হুলস্থূল তখনো চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়প্রমথ চৌধুরী এবং সময়ের চাহিদার সাথে মিলিয়ে চলতিহাওয়ায় খুব স্বাভাবিকভাবেই মিলে যান রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। সহজাত মেধা, নিরন্তর সাধনা আর শ্রমের মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথ আসলে যেকোন চ্যালেঞ্জের জন্যই প্রস্তুত ছিলেন। খোদ নোবেল প্রাপ্তির পরেই তাকে গানে বলতে হয়– ‘এই মণিহার আমায় নাহি সাজে।’ এমন বিনয় আজকে লিখতে আসা তরুণও কি দেখাতে চায়, এ সময়ে? যেখানে পথ প্রদর্শককে পথের ধূলো বানায় নিমিষেই সেখানে রবীন্দ্রনাথের নোবেল লাভের পরেও এমন নমনীয়তা, এমন বিনয় বস্তুত আমাদের জন্যই অনন্য উদাহরণ।

সারাদিন রবীন্দ্রনাথের গোষ্ঠী উদ্ধারের পর ঠিকই, বিছানায় কাত হয়ে হাতে নেয় রবীন্দ্রনাথের কবিতা কি গল্পের বই। দেয়ালে টাঙানো ঠাকুরপোর ছবির দিকে তাকিয়ে চেয়ে নেয় বরমাল্য। সুনীল যেমন বলেন– ‘রবীন্দ্রসাগর মন্থন না করে কারও পক্ষে বাংলায় কলম ধরা সম্ভবই নয় মনে হয়। কল্লোল যুগের বিদ্রোহীরা যে রবীন্দ্রসৃষ্টির বিরোধী ছিলেন না, তার প্রমাণ, কোনো কোনো লেখক সারাদিন আড্ডাতর্কে রবীন্দ্রনাথের মুণ্ডপাত করে রাত্রে বাড়ি ফিরে প্রায়শ্চিত্ত করার মতন আপন মনে অবিরাম রবীন্দ্রনাথের কবিতা মুখস্থ বলতেন, এমন দৃষ্টান্ত আছে। দু’এক দশক পরেই জানা যায়, বুদ্ধদেব বসুপ্রেমেন্দ্র মিত্র প্রমুখ গভীরভাবে রবীন্দ্রভক্ত।’ আমাদের প্রজন্ম যেখানে প্রেমপত্র কি প্রিয়াখুশিতে সুনীলের কবিতার লাইন উদ্ধৃতি দেই সেখানে কিশোর সুনীল প্রেমপত্রে হুবহু তুলে দেন রবীন্দ্রনাথেরই কবিতা! এবং সুনীল স্বীকার করতে বাধ্য হন বয়সের সাথে সাথে তাদের রবীন্দ্রভাবনায় আসে ব্যাপক পরিবর্তন– ‘আসলে তো রবীন্দ্রনাথের মধ্যেও আধুনিকতার অনেক বীজ রয়ে গেছে, অবচেতনে আমরা তার থেকেও শিক্ষা গ্রহণ করেছি। নতুনভাবে রবীন্দ্রনাথের কাব্যসমগ্র পাঠ করতে গিয়ে আমার সেই উপলব্ধি হয়। তখন আমার পূর্বকৃত বেয়াদপির দোষ মোচনের জন্য আমার ইচ্ছে হয়, সমগ্র রবীন্দ্রসাহিত্য থেকে একটি নির্বাচিত সংকলন প্রকাশ করা উচিত।’ শান্তিনিকেতন নিয়ে সুনীলদের যে অভিযোগ তা সুনীলেরাই খণ্ডন করে ফেলে অলক্ষ্যে– ‘রবীন্দ্রনাথ তাঁর এই পশ্চাদমুখিনতা শুধরে নিয়েছিল। শান্তিনিকেতনের ব্রহ্ম বিদ্যালয় রূপান্তরিত হয় বিশ্বভারতী হিসেবে। তার উদার আদর্শ আমাদের গর্বিত করেছে তো বটেই, বহু দেশে স্বীকৃতি পেয়েছে। এবং বিশ্বভারতী নিয়ে রবীন্দ্রনাথের যে ত্যাগ, যে অনন্য উদাহরণ তুলে আনেন তা অদ্বিতীয়। নোবেল ভাষণে কোন বিজয়ীই তার প্রাপ্ত অর্থকে এরকম কোন প্রতিষ্ঠানে দিয়ে দেয়ার নজির দেখিনা। অথচ রবীন্দ্রনাথ নোবেল ভাষণেই বলেন– ‘সম্প্রতি আমি যে বিশ্ববিদ্যালয়ের সূচনা করেছি, তার প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনার জন্য আপনাদের প্রদত্ত অর্থ আমি ব্যবহার করেছি। আমি স্বপ্ন দেখি যে, এই বিশ্ববিদ্যালয় এমন একটা কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠবে যেখানে পাশ্চাত্যের ছাত্ররা আসবে, তাদের প্রাচ্যের সতীর্থদের সঙ্গে মেলামেশা করবে।’ এভাবেই ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথ হয়ে যান সর্বজনীন।

যাদের সাহিত্য শুরু রবীন্দ্রবিরোধী মনোভাব থেকে সেই সুনীল এক সময় পুনরাবিষ্কারের ফলে বলতে বাধ্য হন– ‘কোনো নবীন লেখক যদি সূচনাপর্বে রবীন্দ্রনাথকে অস্বীকার করে নিজস্ব ভাষা সন্ধানের চেষ্টা না করে, রবীন্দ্রনাথেই আপ্লুত হয়ে থাকে সে অতি মুর্খ্য। পরিণত বয়সেও যদি কোনো লেখক রবীন্দ্রনাথের থেকে দূরে সরে থাকে, তাঁকে জীবনযাপনের সঙ্গী করে না নেয়, তা হলে সে আরও বড়ো মূর্খ্য!’ আসলে রবীন্দ্রনাথ ছাড়া আমাদের গত্যন্তর নেই। কবি ওবায়েদ আকাশ যেমন বলেন– ‘… সবাই মাতালের মতো খেলছি আর/ ভোর হতে না হতেই প্রত্যেকের ব্যাগভর্তি টাকা শূন্য হয়ে গেলভাবছি, ফিরতি ট্রেনে জমিদার রবীন্দ্রনাথ/ প্রত্যেকের খোয়াযাওয়া টাকা/ ফিরিয়ে না দিয়ে যেতেই পারেন না।’ তিনি মানুষের মনের জমিদার হয়ে শাসন করেন সাহিত্যের ভূগোল। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তার সময়ের নয় শুধু বাংলা সাহিত্যের উল্লেখযোগ্য গুরুত্বপূর্ণ লেখকদের একজন যারা বিবিধ বিষয়ে ফুল ফুটিয়েছেন, দিশা দিয়েছেন, তারুণ্যের উন্মাদনায় নাচিয়েছেন সময়কে। তার অসাধারণ প্রজ্ঞা আর অনুভূতি রবীন্দ্রনাথ নিয়ে বয়সের বাঁকে বাঁকে বিভিন্ন দিকে মোড় নিয়েছে। শেষ কথা এভাবেই বলে যান সুনীল– ‘রবীন্দ্রনাথ পড়া আমাদের অত্যন্ত দরকার। তাঁকে অস্বীকার করার কোনো প্রয়োজন নেই। বাংলা সাহিত্যকে জানতে হলে রবীন্দ্রনাথকে বার বার পড়তেই হবে।’

x