সুদানে বশিরকে হটিয়ে সামরিক অভ্যুত্থান

শুক্রবার , ১২ এপ্রিল, ২০১৯ at ৬:১৭ পূর্বাহ্ণ
56

দিনভর নাটকীয়তা আর গুঞ্জনের পর অবশেষে ‘অভ্যুত্থান’ই ঘটালো সুদানের সামরিক বাহিনী। তিন দশকের প্রেসিডেন্ট ওমর আল-বশিরকে গদিচ্যুত করে ক্ষমতা দখল করেছে তারা। স্থগিত করেছে সংবিধান, জারি করেছে তিন মাসের জন্য জরুরি অবস্থা। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে সুদানের প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট, প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ আওয়াদ ইবনে ইউসুফ রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত এক ভাষণে ক্ষমতা দখলের এই ঘোষণা দেন। খবর বাংলানিউজের।
তিনি বলেন, ‘প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে আমি এই শাসকগোষ্ঠীর পতন ঘোষণা করছি এবং এর প্রধানকে (প্রেসিডেন্ট বশির) একটি সুরক্ষিত জায়গায় বন্দি করছি।’ যদিও বশিরকে কোথায় রাখা হচ্ছে তা বলেননি তিনি। প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেন, সুদান দীর্ঘদিন ধরে অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি ও বিচারহীনতায় ভুগছিল। সেজন্য সামরিক বাহিনী হস্তক্ষেপ করেছে। এর ফলে সুদানের সংবিধান স্থগিত করা হচ্ছে। স্থগিত করা হচ্ছে জাতীয় সংসদ, নগর ও পৌরসভার কার্যক্রম। তবে বিচার ব্যবস্থা, জনসেবা, দূতাবাস ও কূটনৈতিক মিশনগুলো তাদের স্বাভাবিক কার্যক্রম চালিয়ে যাবে।
তিনি ঘোষণা দেন, ক্ষমতা হস্তান্তর দেখভালের জন্য দুই বছরের জন্য একটি সামরিক পরিষদ গঠন করা হয়েছে। তিন মাস ধরে জারি থাকবে জরুরি অবস্থা এবং রাত ১০টা থেকে ভোর ৪টা পর্যন্ত থাকবে কারফিউ। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সীমান্ত বন্ধ থাকবে, ২৪ ঘণ্টার জন্য বন্ধ থাকবে আকাশসীমা।
এছাড়া গত ডিসেম্বর থেকে সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ বা আন্দোলনের জন্য যে রাজনৈতিক কর্মীরা গ্রেফতার হয়েছেন তাদের মুক্তি দেওয়া হবে বলেও জানান প্রতিরক্ষামন্ত্রী। অবশ্য তার এ ঘোষণার আগেই সুদানিজ ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি সব রাজনৈতিক বন্দিকে মুক্তি দেওয়ার নির্দেশ দেয়। সঙ্গে সঙ্গেই কার্যকর হতে শুরু করে এই নির্দেশ।
এদিকে, সামরিক অভ্যুত্থানের সঙ্গে সঙ্গে সেনাসদর দফতরের সামনেসহ রাজধানী খার্তুম ও দেশের প্রধান প্রধান সড়কে অবস্থান নিয়ে উল্লাস প্রকাশ করেছে বশিরবিরোধীরা। বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে হাত মেলাতে দেখা গেছে সেনা সদস্যদের। অন্যদিকে সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা দখলের সঙ্গে সঙ্গে গ্রেফতার করা হয় বশিরের অনুগত প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ তাহের আয়ালা, ক্ষমতাসীন দল ন্যাশনাল কংগ্রেস পার্টির প্রধান আহেমদ হারুন, সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী আবদেল রহিম মোহাম্মদ হুসেইন, সাবেক সরকার বিষয়ক মন্ত্রী আওয়াদ আল-জাজ, সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট বেরি হাসান সালেহ ও আলি উথমান তাহাকেও।
খার্তুমে ক্ষমতাসীন দলের সহযোগী সংগঠন ইসলামিক মুভমেন্টের প্রধান কার্যালয় দুমড়ে-মুচড়ে দেয় সেনাসদস্যরা। অন্যান্য এলাকায়ও বশিরের দলের কার্যালয়ে হামলার খবর পাওয়া যায়।
এর আগে কয়েক সপ্তাহ ধরে তুমুল বিক্ষোভের পরিপ্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার দুপুরে বশিরের ‘পদত্যাগ’র খবর ছড়ায়। এই খবরের সঙ্গে সঙ্গে প্রধান প্রধান সড়কে সামরিক বাহিনীর সশস্ত্র অবস্থান দেখা যায়। তখনই বলা হয়, প্রেসিডেন্ট বশিরকে গৃহবন্দি করে আগের নিরাপত্তারক্ষীদের সরিয়ে নতুন নিরাপত্তারক্ষী নিয়োগ করা হয়েছে। তাকে রাখা হয়েছে ‘কড়া নজরদারিতে’।
রুটি ও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর কারণে বশিরের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল। বিক্ষোভকারীদের হটাতে নিরাপত্তা বাহিনীর বলপ্রয়োগের কারণে উল্টো এই বিক্ষোভ তার পতনের দাবিতে বৃহত্তর আন্দোলনে রূপ নেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে কয়েকদিন ধরেই সামরিক বাহিনীর মধ্যে কানাঘুষার খবর ছড়াচ্ছিল।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন জানায়, সকালে কথিত মিলিটারি ট্রানজিশনাল কাউন্সিলের পক্ষ থেকে একটি বিবৃতি প্রচার করা হয়। সেখানে প্রেসিডেন্ট বশিরকে ক্ষমতাচ্যুত করার পদক্ষেপের কথা বলা হয়। এরপরই খার্তুমসহ প্রধান প্রধান সড়কে নেমে আসে সরকারবিরোধীরা। প্রেসিডেন্ট ভবনের সামনের এলাকা এবং সেনাসদর দফতরের সামনেও অবস্থান নেয় বশিরবিরোধীরা। এরপর সকালেই সামরিক বাহিনীর তরফ থেকে ছড়িয়ে দেওয়া হয়, তারা রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে ‘বিশেষ ঘোষণা’ দেবে। এতে ‘সামরিক অভ্যুত্থানে’র গুঞ্জন আরও পোক্ত হতে থাকে। শেষ পর্যন্ত ঘটলো তা-ই।
সামরিক বাহিনীর ‘হস্তক্ষেপে’ বশিরের ‘পতন’ ঘটলেও সুদানের বুদ্ধিজীবী ও পেশাজীবীদের সংগঠন এসপিএ বলেছে, তারা চায় সামরিক বাহিনী যেন বেসামরিক অন্তর্র্বতী সরকারের হাতেই ক্ষমতা তুলে দেয়। দু’বছরের জন্য সামরিক পরিষদ গঠন করায় কেউ কেউ এই অভ্যুত্থানের নিন্দা জানিয়ে বলেছে, এই অভ্যুত্থান যেন জনগণের ভাগ্য নিয়ে নতুন করে খেলা।
কয়েক দশক ধরে সাহারা মরুভূমি অঞ্চলের আফ্রিকান দেশটি শাসন করে আসছিলেন বশির। দারফুরে যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যার জন্য তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) অভিযোগ রয়েছে।
১৯৮৯ সালে সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল থাকাকালে বশির আল-ওমর ‘অভ্যুত্থান’ ঘটিয়ে তৎকালীন নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী সাদিক আল-মাহদীকে উৎখাত করেন। পরে নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন করেন তিনি। কয়েকবছর ধরে তার বিরুদ্ধে ‘সামরিক অভ্যুত্থান’ চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু সেসব উতরে ৩০ বছর ধরে দারিদ্র্যপীড়িত দেশটি চালিয়ে আসছিলেন তিনি। রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে বশিরের বিরুদ্ধে জনরোষ থাকলেও তিনি কট্টর আরব জাতীয়তাবাদীদের কাছে পরিচিত ছিলেন ইসরায়েলবিরোধী নেতা হিসেবে।